আজ শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৬ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



প্রবল ঝাঁকুনিতে কেঁপে উঠল দেশ ।। চট্রগ্রামে ১টি শপিং কমপ্লেক্সসহ হেলে গেছে ১৩টি ভবন, আহত অর্ধশত

Published on 14 April 2016 | 3: 45 am

চট্টগ্রামসহ সারা দেশে শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্পে মহানগরীসহ বিভিন্ন স্থানে একাধিক ভবন পাশের ভবনের ওপর হেলে পড়ছে। অনেকগুলো ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে আহত হয়েছে অনেক মানুষ। গতকাল বুধবার সন্ধ্যা ৭ টা ৫৬ মিনিটে এই ভূমিকম্প অনুভূত হয়। চট্টগ্রামের দক্ষিণপূর্বে মিয়ানমারের মাউলাইক শহরের ৭৪ কিলোমিটার দক্ষিণ পূর্বে ছিলো ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল। স্থানটি বাংলাদেশভারত ও মিয়ানমারের সীমান্ত সংলগ্ন। ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৩৪ কিলোমিটার গভীরে ভূমিকম্পটির কেন্দ্র বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস)। ভূমিকম্পের পরপরই এর মাত্রা ৭.২ বলে খবর পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে এর মাত্রা রিখটার স্কেলে ৬.৯ বলে নিশ্চিত করে যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসজিএস। ভূমিকম্পে নগরীর সব ভবন দুলে উঠেছিল। এই সময় তীব্র আতংকে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। নারী ও শিশুরা কান্নাকাটি শুরু করেন। মানুষ চিৎকার করে আজান এবং দোয়া দরুদ পড়তে থাকেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও নিজেদের মতো করে প্রার্থনা করেন। ভূমিকম্পের আনুমানিক স্থায়িত্বকাল ছিল ১ মিনিটের মতো। এ সময় সবার চোখেমুখে ছিলো আতঙ্ক। বেশ কয়েকজন বয়স্ক মানুষের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, তারা নিকট অতীতে এত জোরালো ভূমিকম্প কখনো দেখেননি। কাজের ব্যস্ততায় ভূমিকম্পের অনুভূতি সামান্য দেরিতে টের পেলেও পরক্ষণেই নগরবাসীর মধ্যে শুরু হয় ছুটাছুটি। তাদের অনেককেই সুউচ্চ ভবন থেকে সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে নিচে নেমে আসতে দেখা গেছে। চারদিকে শুরু হয় মানুষের হইহুল্লোড়। যে যেভাবে পারছে আত্মরক্ষায় ছুটছে। কেউ কেউ হয়তো সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রেখে ঘরেই বসেছিলেন।

ভূমিকম্পে তীব্র আতংকে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে অর্ধশত মানুষ নানাভাবে আহত হয়েছেন। ভূমিকম্প থেমে গেলেও আতংকে মানুষ ঘরে ফিরছিলেন না। বিভিন্ন স্থানে ভবন ধসে পড়ার গুজবও রটানো হচ্ছিল। ভূমিকম্পের পরপরই সারা দেশে ইন্টারনেটসহ মোবাইল নেটওয়ার্ক সংযোগে বিঘ্ন দেখা দেয়। তবে অল্প সময় পর মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগ পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে।

ভূমিকম্পে নগরীর রেয়াজউদ্দিন বাজার এলাকায় একটি, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বি ব্লকে তিনটি, হালিশহর আবাসিক এলাকার বি ব্লকে একটি, বারিক মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সন্নিকটে একটি গার্মেন্টস, মোমিন রোড ঝাউতলা এলাকায় একটি, জুবিলি রোডে একটি, মুরাদনগরে দুইটি, কোতোয়ালী এলাকায় একটি, জিইসি মোড়ে একটি, আতুরার ডিপো এলাকায় একটিসহ বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি ভবন কিছুটা হেলে পড়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সিডিএ থেকে কয়েকটি ভবন হেলে পড়ার কথা স্বীকার করে এগুলো পরিদর্শনে টিম যাওয়ার কথা জানিয়েছেন চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আবদুচ ছালাম। তবে বড় ধরনের কোন বিপর্যয় না হওয়ায় তিনি পরম করুণাময়ের নিকট শোকরিয়া আদায় করেন। ভূমিকম্পে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মূল ভবনের কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে ভবনের সামনের অংশের ছাউনির পলেস্তারা খসে পড়েছে।

ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের রায়হান ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থী শাহজালাল হলের ডাইনিংয়ের দ্বিতীয় তলার নিচে লাফিয়ে পড়ে আহত হয়েছেন। ডাইনিংয়ের স্টাফ তাজুল ইসলাম জানান, রায়হান হলের ডাইনিংয়ে রাতের খাবার খাচ্ছিলেন। এ সময় সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও ভূমিকম্প অনুভূত হলে তিনি ডাইনিংয়ের দ্বিতীয় তলা থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে গেলে বুকে ব্যথা পান। পরে তাকে উদ্ধার করে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, নগরীর হকার্স মার্কেটের বিপরীতে অবস্থিত বিএম সুপার মার্কেটের ভবনটি পাশের সিদ্দিক শপিং কমপ্লেক্সে হেলে লেগে আছে। এদিকে নগরীর ঝাউতলা এলাকায় টাইটানিক বিল্ডিং নামে একটি ভবন পাশের একটি ভবনে হেলে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া ভূমিকম্পপরবর্তী সময়ে নগরীর মাঝিরঘাট এলাকার সিম্ফনি গার্মেন্টসে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে দুইতিনজন শ্রমিক সামান্য আহত হয়েছেন বলে সদরঘাট থানার ওসি জানিয়েছেন।

চট্টগ্রামে ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আলী আকবর জানান, নগরীর রিয়াজ উদ্দিন বাজারে দারুল ফজল মার্কেটের পেছনে বিএম সুপার মার্কেটের ভবনটি পাশের সিদ্দিক শপিং কমপ্লেক্সের সঙ্গে হেলে লেগে আছে। এতে সেখানকার লোকজনের মধ্যে ব্যাপক আতংকের সৃষ্টি হয়েছে। নন্দনকানন রাইফেল ক্লাবের উত্তরে মুসাফিরখানা মসজিদের পাশে ১১ তলা একটি নির্মাণাধীন ভবন পশ্চিমউত্তর দিকে হেলে গেছে। লাভ লেইন মোড়ে ১৭৩ জুবিলি রোডে তিনতলা একটি আবাসিক ভবন দক্ষিণ দিকে হেলে পড়েছে। কোতয়ালী থানার মধ্যে তিনটি ভবন হেলে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। আমরা ঘটনাস্থলে আছি, বলেন আলী আকবর।

নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় ছয়তলা একটি ভবন আংশিক হেলে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বিব্লকে আট নম্বর রোডের ৫৩৮ নম্বর ভবন হেলে পড়ার বিষয়টি জানিয়েছেন চান্দগাঁও থানার ওসি আবু মো.শাহজাহান কবির। ভবনটির মালিক জনৈক নূরুল আজিম বলেও জানিয়েছেন ওসি। তিনি জানান, ভূমিকম্পের আধাঘণ্টার মধ্যে নূরুল আজিমের ভবনটি পশ্চিম দিকে হেলে পড়ার খবর থানায় আসে। তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে হেলে পড়ার সত্যতা পান। পাশের বিল্ডিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েছে ছয়তলা ভবনটি। তবে পাশের ভবন থেকে এখনও প্রায় পাঁচ ইঞ্চি দূরত্বে আছে। দুই ভবনের বাসিন্দাদের মধ্যে আতংকের সৃষ্টি হয়েছে, বলেন ওসি।

নাইক্ষ্যংছড়ি :

ওদিকে আমাদের নাইক্ষ্যংছড়ি প্রতিনিধি জানান, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু শাফায়েত মোহাম্মদ শাহেদুল ইসলাম নিজের বাসভবনে ফাটল দেখা দেয়ার কথা স্বীকার করেছেন। দোছড়ি ইউনিয়নে বেশ কয়েকটি মাটির ঘর ধ্বসে পড়েছে।

খাগড়াছড়ি :

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পর আতংকিত হয়ে স্থানীয়রা দোকানঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। তবে ক্ষয়ক্ষতির তেমন খবর পাওয়া না গেলেও খাগড়াছড়ির সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ রইস উদ্দিন জানিয়েছে, ভূমিকম্পে পুলিশ লাইন্সের ব্যারাকের ছাদের প্লাস্টার খসে পড়েছে।

বান্দরবান:

বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, বান্দরবান জেলা শহর এবং আশের পাশের উপজেলাগুলোতে ভূমিকম্পের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায় শহরে। রাত ১০ টায় এ রিপোর্ট পাঠানোর সময় পর্যন্ত জেলা শহরের বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ থাকে। মানুষ এখনও আতংকে রয়েছেন। সবগুলো মোবাইল অপারেটিং ব্যবস্থাও সাময়িক ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তবে ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সংবাদ এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এখনও পাওয়া যায়নি। পুলিশ ও দমকল বাহিনী এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ভূমিকম্পে কোথাও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিনা সেই বিষয়ে মনিটরিং করছেন বলে জানান ।

কক্সবাজার :

কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, প্রচণ্ড ভূমিকম্পে হঠাৎ কেঁপে উঠেছে পুরো কক্সবাজার। আতংকে বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে এলো মানুষ। সর্বত্র আতংকের ছাপ কয়েক মুহূর্তের জন্য। পরে অবশ্য সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসে। গতকাল বুধবার রাত ৭টা ৫৫ মিনিটের দিকে সাগরপাড়ের মানুষের স্বাভাবিক জীবনে আকস্মিক এ ছন্দপতন ঘটে। এসময় সাগরপাড়ের বিভিন্ন হোটেলে অবস্থানকারী পর্যটকদের অনেকেই কান্নাকাটি জুড়ে দেয়। অনেকেই ঢলে পড়ে যায়। তবে এ ভূমিকম্পে বড় ধরনের কোন ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

লোহাগাড়া :

লোহাগাড়া প্রতিনিধি জানান, সেকেন্ডের মধ্যে দু’বার মারাত্মক ঝাঁকুনি দেয়ার পর লোকজনের মাঝে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে দালান থেকে খোলা জায়গায় নেমে আসেন। কোন ক্ষয়ক্ষতি কিংবা প্রাণহানির সংবাদ পাওয়া যায়নি।

কাপ্তাই :

কাপ্তাই প্রতিনিধি জানান, ভূমিকম্পের আলামত বোঝার সাথে সাথে বহুতল ভবনের বাসিন্দারা হুড়োহুড়ি করে ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। কেউ কেউ আল্লাহর রহমত কামনা করে আযান দিতে থাকেন। অনেকে দূরদুরান্তে থানা স্বজনদের খবর নেবার চেষ্টা করেন। তবে তাৎক্ষনিক মোবাইলের নেটওয়ার্কেও সমস্যা দেখা যায় বলে জানা গেছে। কাপ্তাই উপজেলার কর্ণফুলী পেপার মিল, কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ সর্বত্র মানুষের মাঝে ভূমিকম্পের আতঙ্ক বিরাজ করলেও কোন ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

টেকনাফ:

টেকনাফ প্রতিনিধি জানান, আতঙ্কে বহুতল ভবনের বাসিন্দারা এবং মার্কেট ও দোকানের লোকজন রাস্তায় ও খোলা আকাশে চলে আসে। এ সময় সবার চোখেমুখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সূত্রে জানা গেছে, ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

সিইপিজেডে হুড়োহুড়ি, অর্ধশত গার্মেন্টস কর্মী আহত : চট্টগ্রাম নগরীতে বিভিন্ন পোশাক কারখানার কমপক্ষে অর্ধশতাধিক কর্মী আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে তিনজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ভূমিকম্পের সময় আতংকে হুড়োহুড়ি করে কারখানা থেকে বের হতে গিয়ে তারা আহত হয়েছেন। নগরীর ইপিজেড থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের সময় সিইপিজেডের ভেতরে কমপক্ষে ১০টি পোশাক কারখানায় নাইট শিফটের কাজ চলছিল। ভূমিকম্প শুরু হলে সব কারখানা থেকে তড়িঘড়ি করে নারী ও পুরুষ কর্মীরা বেরিয়ে আসতে থাকেন। হুড়োহুড়িতে প্রায় ৫০ জন শ্রমিককে আহত অবস্থায় বেপজা হাসপাতালে নেয়া হয়। তবে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তিনজন ছাড়া বাকি সবাইকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তিনজনকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

সদরঘাট থানা পুলিশ জানায়, মাঝিরঘাটে সিম্ফনি গার্মেন্টস ভূমিকম্প শুরুর আনুমানিক পাঁচ মিনিট আগে ছুটি হয়। ভূমিকম্প শুরুর পর শ্রমিকরা হুড়োহুড়ি করে ফটক দিয়ে বের হতে গিয়ে তিনজন আঘাত পান। তবে তাদের আঘাত তেমন গুরুতর নয়।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন