আজ মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৮ ইং, ০২ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



প্রেস ক্লাবের বই উৎসব উদ্বোধনে সেলিনা হোসেন ।।

Published on 02 April 2016 | 4: 21 am

তারুণ্যের শক্তিই অনুপ্রেরণার উৎস বলে মন্তব্য করেছেন বরেণ্য কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। গতকাল শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব আয়োজিত দুদিনব্যাপী বই উৎসবের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।

সেলিনা হোসেন বলেন, আগামী দিনের বাংলাদেশ যে ডিজিটালের কাছে যাবে, সে ডিজিটালকে তরুণ প্রজন্ম যেন সমুন্নত রাখে, মুদ্রণ মাধ্যমটিকে একসাথে পথচলার সুযোগ করে দেয়। সেই সুযোগের মধ্যে যেন সব লেখকের জ্ঞান, মননশীলতা ও সৃজনশীলতা স্থান পায়।

তিনি বলেন, আমি কিছুদিন আগে টেলিভিশনের স্ক্রলে দেখেছিলাম লন্ডন থেকে প্রকাশিত দি ইনডিপেন্ডেন্ট পত্রিকাটির প্রিন্ট মাধ্যমটি বাতিল করা হয়েছে। সেটি আর ছাপা হবে না। অনলাইন মাধ্যমটি থাকবে। তার বিপরীতে আজকের সাংবাদিকদের এই যে বইমেলা, সেটি ওদের কাছে দৃষ্টান্ত হোকণ্ডসেটি আমার কাছে সবচেয়ে বড় চাওয়া। প্রিন্ট মাধ্যমকে বাদ দিয়ে সভ্যতার ধারাবাহিকতা থাকবে এবং আমাদের সবটুকু তথ্যপ্রযুক্তির ভেতর চলে যাবেণ্ডএ প্রত্যাশা আমরা কোনোভাবেই করব না এবং আমাদের জ্ঞানের জায়গা এখান থেকে কখনোই সরিয়ে দেব না। আমরা সেই দুর্বৃত্তায়নের শিকার হব না। প্রযুক্তির কাছে আমরা আমাদের মেধা ও মননকে নতজাত করতে দেব না।

বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়ায় অনুষ্ঠানের সভাপতি, বই উৎসব উপকমিটির আহ্বায়ক কবি আবুল মোমেনকে ধন্যবাদ জানান সেলিনা হোসেন। বিশ্বজিৎ চৌধুরীর বই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বজিৎ বইয়ের নামের ক্ষেত্রে প্রশ্নবোধক রেখে দেন। যেমন বাসন্তী তোমার পুরুষ কোথায়? এটি সাংবাদিকতা ও সৃজনশীলতাকে এক করে নতুন কিছু উদ্ভাবন। আগামী দিনে হয়ত পাঠক শিল্পসত্তা ও কাহিনির পাশাপাশি উদ্ভাবনী সত্তারও বিচার করবে। তিনি আশা করেন, অত্যন্ত জরুরি, প্রাসঙ্গিক ও অনুপ্রেরণার উৎস সাংবাদিকদের বই নিয়ে বইমেলার এ আয়োজন কলকাতা ছাড়িয়ে লন্ডন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে।

ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক মিলনায়তনে আয়োজিত উৎসবে সেলিনা হোসেনের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন প্রেসক্লাব সভাপতি কলিম সরওয়ার ও অনুষ্ঠানের সভাপতি আবুল মোমেন। প্রধান অতিথিকে ফুল দিয়ে বরণ করেন ক্লাবের কার্যনির্বাহী সদস্য শামসুল হক হায়দরী।

অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো প্রবর্তিত চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের ‘সেরা লেখক’ পুরস্কার তুলে দেন প্রধান অতিথি। এবার প্রবন্ধ ও গবেষণায় কবিসাংবাদিক আবুল মোমেন, কথাসাহিত্যে বিশ্বজিৎ চৌধুরী ও শিশুসাহিত্যে রাশেদ রউফ পুরস্কার পেয়েছেন। পুরস্কার হিসেবে প্রত্যেকে পেয়েছেন ২০ হাজার টাকা, স্মারক ও সনদ।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সেরা লেখক নির্বাচনের লক্ষ্যে গঠিত জুরি বোর্ডের সদস্য সাহিত্যিক আনোয়ারা আলম, প্রেস ক্লাব সভাপতি কলিম সরওয়ার, সাধারণ সম্পাদক মহসিন চৌধুরী, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের নবনির্বাচিত সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী প্রমুখ। সঞ্চালনায় ছিলেন যুগ্ম সম্পাদক চৌধুরী ফরিদ।

আবুল মোমেন বলেন, বলা হয়ে থাকে সাংবাদিকতা হচ্ছে ‘লিটারেচার ইন এ হারি’ বা দ্রুততার সঙ্গে রচিত সাহিত্য। সাংবাদিকতা ও সাহিত্য পরস্পরবিরোধী এটা বলা যায় না। দৈনিক পাকিস্তান ও আনন্দবাজারে অনেক বড় লেখকরা সাংবাদিকতা করেছেন। একসময় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতাকে সাহিত্যচর্চার অনুকূল পেশা মনে করা হতো। এখন পরীক্ষা গ্রহণ ও সনদডিগ্রি প্রদানের কারখানায় পরিণত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। অভিজ্ঞতা, মানসিকতা ইত্যাদি ক্ষুদ্র হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষকরা হয় কনসালটেন্সি করছেন, নয়তো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান করছেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কাছ থেকে ভালো সাহিত্য, ভালো উপন্যাস পাচ্ছি না। কালান্তর হতে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, অতীতে সাংবাদিকতা পেশায় বেশি রাত জাগতে হতো। আমরা ঠাট্টা করে বলতাম, সাংবাদিকদের ঠাণ্ডা ভাত গরম বৌ। এক পাড়ার কুকুর ঘেউ ঘেউ করে আরেক পাড়ার কুকুরের হাতে তুলে দিত আমাদের। এখন অবশ্য সবাইকে রাত জাগতে হয় না। দুচারজন লেট নাইটের দায়িত্ব পালন করেন। সাংবাদিক জীবনে সাহিত্য চর্চার বড় সুযোগ রয়েছে। চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বই পড়ার, পঠনপাঠনের। সভ্যতার অবদান বই। মুদ্রণ সংস্কৃতির অঙ্গীভূত হয়ে গেছে। পশ্চিমা বিশ্ব এখনো তাদের লাইব্রেরি বন্ধ করেনি, প্রকাশনা বন্ধ করেনি। কারণ ল্যাপটপে বা ডিভাইসে শুয়ে, বসে বই পড়ার মতো সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, আমাদের এখানে বই পরিচিতি চোখে পড়ে, কিন্তু সমালোচনা সাহিত্য গড়ে উঠছে না। তুলনামূলক আলোচনার জায়গায় পরিণতির অভাব আছে। সেটি হলে বইয়ের মান ভালো হবে। জীবন সাহিত্য ব্যতীত হতে পারে না। জীবনকে বিশ্লেষণ করতে হলে, জীবনের ভেতরে ঢুকতে হলে বই অপরিহার্য। জীবনকে চারদিকে সাজিয়ে নিতে হবে। সাহিত্য ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। সাহিত্যশিল্পকলা জীবনের ভূষণ। সাহিত্য, সংগীত, চারুকলা, নৃত্য এসবেই জীবনের সার্থকতা। এগুলো না থাকলে জীবনের তাৎপর্য হারিয়ে ফেলবে।

বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, প্রেমের উপন্যাস হিসেবে ‘হে চন্দনা পাখি’ লিখতে চেয়েছি। মানবমানবীর সম্পর্ক তুলে ধরতে চেয়েছি। দেশ বরেণ্য কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের কাছ থেকে কথাসাহিত্যের জন্যে পুরস্কার নিতে পেরেছিণ্ডএটি খুবই সৌভাগ্যের। তার বই পড়ছি কৈশোরকাল থেকে। নিয়মিত পড়ছি। পৃথিবীর বাংলা ভাষাভাষী ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বই পাঠ্য।

রাশেদ রউফ বলেন, লেখকরা পুরস্কারের জন্যে লেখেন না। তবে পুরস্কার লেখককে প্রেরণা দেয়। প্রেস ক্লাবে আগেও দুইবার বই উৎসব হয়েছে কিন্তু সেরা লেখক পুরস্কারের বিষয়টি নতুন সংযোজন। আশা করি, আগামী দিনে এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। তিনি তার পুরস্কারটি শিশুসাহিত্য চর্চাকারীদের উৎসর্গ করেন।

কলিম সরওয়ার বলেন, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ২২০ জন সদস্যের মধ্যে ৬০ জনেরই বই বেরিয়েছে। তাদের বই নিয়ে এ উৎসব। এর মধ্যে জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত অনেক লেখকও রয়েছেন। আবুল মোমেন এ বছর বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন। এ উৎসব নতুন পাঠক সৃষ্টির পাশাপাশি সাংবাদিকদের মধ্যে যাদের লেখা ছড়িয়েছিটিয়ে আছে, তাদের গ্রন্থভুক্ত হওয়ার প্রেরণা জোগাবে।

মহসিন চৌধুরী বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ৩ নম্বর সতর্ক সংকেতের পরও ক্লাবের সদস্য এবং চট্টগ্রামের বইপ্রেমীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি উৎসবকে প্রাণবন্ত করেছে। এবার আমরা নতুন সংযোজন করেছি ‘সেরা লেখক’ পুরস্কার। এ লক্ষ্যে জুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছিল তিন সদস্যের। সেখানে ছিলেন সমাজবিজ্ঞানী ও প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অনুপম সেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গল্পকার মহীবুল আজিজ ও সাহিত্যিক আনোয়ারা আলম। তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনজনকে পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে ক্লাবের সিনিয়র সহসভাপতি কাজী আবুল মনসুর, সহসভাপতি সালাউদ্দিন মো. রেজা, গ্রন্থাগার সম্পাদক শওকত ওসমান, সিনিয়র সাংবাদিক মুহাম্মদ শামসুল হকসহ এ জনপদের লেখকসাহিত্যিকসংস্কৃতিকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

উদ্বোধন পর্ব শেষে শুরু হয় আড্ডা। বিকেল সাড়ে তিনটায় অনুষ্ঠিত হয় আবৃত্তি প্রতিযোগিতা। আজ শনিবার বিকেল চারটায় শুরু হবে আবৃত্তি প্রতিযোগিতা। সকাল ১০টা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত বই উৎসব সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

উৎসবে ক্লাবের স্থায়ী সদস্য অরুণ দাশগুপ্ত, আতাউল হাকিম, আনোয়ার হোসেন পিন্টু, আবদুল মালেক, আবু তাহের মুহাম্মদ, আবু সুফিয়ান, আবুল মোমেন, আল রাহমান, আলিউর রহমান, আবুল কালাম বেলাল, আরিফ রায়হান, এজাজ ইউসুফী, এম নাসিরুল হক, ওমর কায়সার, কল্যাণ চক্রবর্তী, কাজী আবুল মনসুর, গোলাম মাওলা মুরাদ, জসীম চৌধুরী সবুজ, জাহেদ মোতালেব, দেব প্রসাদ দাস, নাজিমুদ্দীন শ্যামল, নাসিরুদ্দিন চৌধুরী, নিরূপম দাশগুপ্ত, নুরুল আমিন, নুর মোহাম্মদ রফিক, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, প্রদীপ দেওয়ানজী, বিপুল বড়ুয়া, মুস্তফা নঈম, মুহাম্মদ শামসুল হক, মোয়াজ্জেমুল হক, মো. মাহবুব উল আলম, যীশু রায় চৌধুরী, রাশেদ রউফ, রিয়াজ হায়দার চৌধুরী, শতদল বড়ুয়া, শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, শামসুল হক হায়দরী, শুকলাল দাশ, সমীর ভট্টাচার্য, সিদ্দিক আহমেদ, সৈয়দ আবদুল ওয়াজেদ, সৈয়দ উমর ফারুক, স্বপন দত্ত, হাসান আকবর, হাসান নাসির এবং অস্থায়ী সদস্য মামুনুর রশীদ, অমিত বড়ুয়া, রমেন দাশগুপ্ত ও আবু মোশাররফ রাসেল, আজীবন দাতা সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, জাহিদ আকবর চৌধুরী, ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী, নুরুল ইসলাম বিএসসি, নেছার আহমদ, সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম বীরপ্রতীক ও সহযোগী সদস্য অভীক ওসমানের বই ৩০ শতাংশ ছাড়ে বিক্রি হচ্ছে। প্রেস বিজ্ঞপ্তি।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন