আজ শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৬ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



ভাসান চরের ভাসানী

Published on 17 February 2016 | 6: 50 pm

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

বৃটিশ, পাকিস্তান ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী তৎকালীন যে কয়জন নেতা ছিলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম রাজনীতিবিদ। তিনি একাধারে রাজনৈতিক ও মানবতাবাদী জননেতা ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম এ নেতা একজন পরিচ্ছন্ন ও সৎনেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রগতিশীল রাজনীতির ধারকবাহকরাই তাঁর উত্তরসূরী হিসেবে খ্যাত। বাংলাদেশের যে কজন রাজনৈতিক নেতা পরিচ্ছন্ন নেতা হিসেবে খ্যাত প্রশ্ন করলে পাওয়া যায় তাঁরা একসময় ভাসানী ন্যাপ করতেন। এ প্রশ্নের মধ্যেই ভাসানীর আদর্শের উত্তর পাওয়া যায়। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ছিল কৃষক শ্রমিক জনসাধানের অধিকার আদায়। তাদের স্বার্থরক্ষার জন্য তিনি হয়ে উঠেন মজলুম জননেতা হিসেবে।

১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার ধনপাড়া গ্রামে মাওলানা আবদুল হামিদ খানের জন্ম। তাঁর প্রকৃত নাম আবদুল হামিদ খান। তার পিতার নাম হাজি শরাফত আলী। আসামের ব্রক্ষপুত্র নদের ভাসান চরের কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে সেখানকার লোকজন তাকে ভাসানী নামে অভিহিত করেন এবং ভাসানী সাহেব নামে ডাকতেন। তাই তাঁর নাম পরবর্তীতে হয়ে যায় মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী।

মক্তবে শিক্ষা ও মক্তবে শিক্ষাদান ছিল তাঁর প্রধান শিক্ষা। তবে ১৮৯৭ সালে পীর ছৈয়দ নাছির উদ্দিনের সাথে আসাম গমন করেন। ১৯০৭ সালে দেওবন্দ যায় ইসলামী শিক্ষা লাভের জন্য। দুবৎসর পর আবার আসামে পত্যাবর্তন করেন। মওলানা ভাসানী ১৯১৯ সালে কংগ্রেসে যোগদান করেন। অত:পর খেলাফত ও অসংযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহন করে কারাবরন করেন। ১৯২৬ সালে আসামে প্রথম কৃষকপ্রজা আন্দোলন এর যাত্রা শুরু করেন। ১৯২৯ সালে আসামের ধুবড়ী জেলার বহ্মপুত্র নদের ভাসান চরে বন্যাকবলিত কৃষকদের রক্ষার জন্য সেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মান করেন এবং প্রথম কৃষক সম্মেলন করেন। তখন থেকে ভাসান চরের তথা আসামের মানুষ তাঁকে সম্মান করে ভাসানী সাহেব নামে ডাকতে শুরু করেন। এরপর থেকে তাঁর নামের সাথে ভাসানী যুক্ত হয়ে যায়। তখন থেকে তাঁর নাম হয় মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।

১৯৩১ সালে টাঙ্গাইলের সন্তোষের কাগমারিতে কৃষক সম্মেলন করেন ভাসানী। যা এখনো ‘‘কাগমারি সম্মেলন” নামে পরিচিত। ১৯৩৭ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করেন এবং মুসলিম লীগে যোগদান করে সভাপতি হন আসাম শাখার। ঐ বছরই আসামে বাঙালী নিপিড়নের হাতিয়ার ‘‘লাইন প্রথা” চালু হলে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন মওলানা ভাসানী। ১৯৪০ সালে এ কে ফজলুল হকের সাথে লাহোর সম্মেলনে যোগদান করেন।

১৯৪৪ সালে আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন ভাসানী, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি টাঙ্গাইলের সন্তোষের কাগমারিতে ফিরেন। এ সময় মুসলিম লীগ সরকারের জোড়, জুলুম ও নির্যাতনের কারনে তিনি ১৯৪৯ সালে ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ঐ দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হয়, এরপর ভূখা মিছিল, অনশন, কারাগারে অনশন ইত্যাদি আন্দোলন করেন, বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য তাঁর সভাপতিত্বে এক সভায় ‘‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদ’’ গঠিত হয় এবং ঐ পরিষদের অন্যতম সদস্য নিযুক্ত হন মাওলানা ভাসানী। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সহযোগিতার জন্য গ্রেফতারের নির্দেশ দেয় এবং পূর্ব পাকিস্তান আসলে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হবে বলে তিনি ১১ মাস পরবাসী ছিলেন।

১৯৫৪ সালে মাওলানা ভাসানী এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সহ যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন, এবং নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে জয়ী হয়, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কোয়ালিশন সরকার গঠন হলে মার্কিন ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র নীতির বিরোধিতা, নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি ও পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে আন্দোলন করতে থাকে, ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে ভাসানী ‘‘পাকিস্তান সামরিক চুক্তি’’ বাতিলের দাবী জানায়, প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী সে দাবী প্রত্যাখ্যান করলে ভাসানী আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে পদত্যাগ করেন এবং একই বৎসর ন্যাশনাল আওয়ামী পাটি (ন্যাপ) নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং তার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন, তখন থেকে দেশে পূজিবাদী অর্থ ও সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তে সমাজবাদী বা সমাজতান্ত্রিক অর্থ ও সমাজ ব্যবস্থা কায়েমের লক্ষে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। বাঙালী বাংলাদেশীদের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। তাঁর মূলমন্ত্র ছিল ধর্ম কর্ম সমাজতন্ত্র।

এ লক্ষে স্থীর থেকে সমাজতান্ত্রিক অর্থ ও সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করার লক্ষে সংগ্রাম চালিয়ে ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকায় পরলোকগমন করেন নির্লোভ, নির্মোহ এ নেতাদের জন্ম না হলে হয়ত আমরা এ দেশ স্বাধীন দেশ পেতাম না। এ দেশের জন্মের জন্য যেমন তার অতুলনীয় ভূমিকা ছিল, তেমনি আজ এদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য মনে হয় তাঁর বড় বেশী প্রয়োজন।

Untitled-1

লেখক: ব্যাংকার, ঢাকা ব্যাংক লিঃ


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন