আজ শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৬ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



পুলিশের কব্জায় জব্দ সম্পত্তি : এক মাসে ডেসটিনির দুই সিনেমা হলের আয় ৫০ হাজার!

Published on 29 January 2016 | 7: 20 am

স্বাভাবিক অবস্থায় দুটি সিনেমা হলে ১০ থেকে ১৩ লাখ টাকা আয় হলেও এখন পুলিশ এখান থেকে আয় দেখাচ্ছে অনেক কম। এমনকি মাসে দুটি সিনেমা হল থেকে মাত্র ৫০ হাজার টাকা আয় দেখানো হয়েছে। এতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী।

রাজধানীর আনন্দ, ছন্দ সিনেমা হলসহ ৬টি চলমান ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ডেসটিনির কাছে হস্তান্তরের আদেশ দিয়েছিলেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত। তবে ওই আদেশের দুই বছরেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে তা হস্তান্তর করেনি পুলিশ। বরং আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে প্রতিষ্ঠানগুলো ধরে রেখে আয়ের টাকা লোপাট করার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। স্বাভাবিক অবস্থায় দুটি সিনেমা হলে ১০ থেকে ১৩ লাখ টাকা আয় হলেও এখন পুলিশ এখান থেকে আয় দেখাচ্ছে অনেক কম। এমনকি মাসে দুটি সিনেমা হল থেকে মাত্র ৫০ হাজার টাকা আয় দেখানো হয়েছে। এতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী।

দুদকের করা মামলা সূত্রে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক পুলিশকে ডেসটিনির জব্দ সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে রাজধানীর সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের রিসিভার বা তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ দেয়া হয়। দেশের অন্যান্য মহানগর ও জেলার সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ দেয়া হয় সংশ্লিষ্ট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সুপারকে। ডেসটিনির ৪ হাজার কোটি টাকার সম্পদের মধ্যে পুলিশ প্রথম দিকে প্রায় সাড়ে ছয় শ’ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করে বলে জানিয়েছিল। আর ডেসটিনির সম্পদ দেখভালের জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) একটি কমিটি গঠন করে। পরে ‘ডেসটিনি মাল্টি পারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি ও ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড লিমিটেড নামক কোম্পানির ক্রোককৃত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা ও তদারকি-সংক্রান্ত আহ্বায়ক কমিটি’ শীর্ষক ওই কমিটি সংশ্লিষ্ট সম্পদের দায়িত্ব বুঝে নেয়।

এ কমিটির আহ্বায়ক করা হয় ডিএমপির যুগ্ম কমিশনারকে (ক্রাইম ও অপস)। এ ছাড়া ২০১০ সালে ৫৭ কোটি টাকায় ডেসটিনির কেনা আনন্দ ও ছন্দ সিনেমা হলের আয়কৃত অর্থ রাখার জন্য ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের কাওরান বাজার শাখায় একটি যৌথ সঞ্চয়ী হিসাব (নং-১০৭১১০১৮১৯২, তাং-৬-১০-১৩) খুলে পুলিশ। ডিএমপির তেজগাঁও জোনের সহকারী কমিশনার, তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং তার পরবর্তী কর্মকর্তা বা পরিদর্শকের নামে এই যৌথ হিসাব খোলা হয়।

পুলিশ ২০১৩ সালের অক্টোবরে ওই দুটি সিনেমা হলের দায়িত্ব গ্রহণ করে। এর আগে ওই হলে প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৩ লাখ টাকা আয় হতো। খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা জমা হতো। পুলিশ দায়িত্ব গ্রহণের আগের মাসেই খরচ বাদে ওই দুটি হল থেকে ৬ লাখ টাকা আয় হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ডেসটিনির একাধিক কর্মকর্তা। তবে পুলিশ দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম মাস ২০১৩ সালের অক্টোবরে খরচ বাদ দিয়ে ৩ লাখ টাকা ওই ব্যাংক হিসাবে জমা করে পুলিশ। শুধু তাই নয়। পুলিশ একই ব্যবস্থাপনায় সিনেমা হল দুটি পরিচালনা করে এলেও কেবলই কমেছে নিট আয়। এমনকি দুটি সিনেমা হলের নিট আয় মাসে ৫০ হাজার টাকাও দেখানো হয়, যা অবিশ্বাস্য বলে উল্লেখ করেছেন অনেকে।

এভাবে ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ২২ মাসে ওই হিসাবে পুলিশ জমা করে ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিগত ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে আনন্দ সিনেমা হল থেকে আয় হয়েছিল ৬ লাখ ৬৮ হাজার ৮৫০ এবং ছন্দ সিনেমা হলে আয় হয়েছিল ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৯০ টাকা।

ওই মাসে দুই হলের আয়কৃত ১০ লাখ ২৬ হাজার ৫৪০ টাকা পুলিশের হাতে দেয়া হলেও পুলিশ প্রায় পৌনে আট লাখ টাকাই খরচ দেখায়। সম্প্রতি গত বছরের জানুয়ারিতে ৩ লাখ, ফেব্রুয়ারিতে ২ লাখ, মার্চে দেড় লাখ, এপ্রিলে ২ লাখ, মে মাসে ১ লাখ ও গত জুনে ৫০ হাজার টাকা নিট আয় দেখিয়ে ব্যাংকে জমা করা হয়েছে। এরপর স্বয়ং দুদক সংশ্লিষ্টরা আয়ের এই অস্বাভাবিকতা নিয়ে ডিএমপি গঠিত কমিটির বর্তমান আহ্বায়ক ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণপদ রায়ের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর আয় আবার বাড়তে থাকে বলে জানা গেছে।

এরপর গত আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে দেড় লাখ টাকা করে জমা করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ৬ই জানুয়ারি আগের মাস ডিসেম্বরের নিট আয় হিসেবে দেড় লাখ টাকা জমা করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের পিপি মীর আহমেদ আলী সালাম মানবজমিনকে বলেন, ডেসটিনির কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো ও গ্রাহকের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে।

এ ছাড়া আনন্দ, ছন্দ সিনেমা হলসহ কয়েকটি চলমান প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ডেসটিনির সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য প্রায় দুবছর আগে আদালত আদেশ দিয়েছিলেন। পুলিশ তাদের তা বুঝিয়ে না দিলে তারা আবার তা আদালতকে জানাতে পারেন। ওই দুই সিনেমা হলের আয় বিষয়ে তিনি বলেন, পুলিশ দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে হল দুটির আয় কমছে। কয়েক মাস আগে দুটি হলের মাসিক আয় মাত্র ৫০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছিল। তা কী বিশ্বাস করা যায়। তখন আমি কৃষ্ণপদ রায়ের সঙ্গে দেখা করে এত কম আয় দেখানোটা যে কতটা বেমানান তা বলি। তারপর থেকে আয় আবার বাড়ছে। এ বিষয়ে কৃষ্ণপদ রায় মানবজমিনকে বলেন, আনন্দ, ছন্দ সিনেমা হলসহ ডেসটিনির কোনো সম্পদ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য আদালতের কোনো আদেশ আমরা পাইনি। আদালতের আদেশ পেলে দুর্নীতি দমন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে বুঝিয়ে দেয়া হবে। পুলিশ তা ধরে রাখতে চায় না।

কৃষ্ণপদ রায় আরও বলেন, এসব উৎস থেকে আয়ের টাকা পুলিশ নিচ্ছে না। ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের পর যখন যে পরিমাণ টাকা অবশিষ্ট থাকছে তা জমা করা হচ্ছে। তবে আয় বাড়ানোর দায়িত্ব তো পুলিশের নয়।

ডেসটিনির কোম্পানি সচিব মো. মিজানুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, পুলিশের কাছে বারবার আদালতের আদেশের কপি ও আবেদন নিয়ে যাওয়া হলেও তারা নানা কথা বলে তা এড়িয়ে যাচ্ছেন। আমরা দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার আগের মাসেই হল দুটি থেকে নেট আয় হয়েছিল ৬ লাখ টাকা। পুলিশ দায়িত্ব নিতেই তা অর্ধেকে নেমে যায়। দুটি হলের আয় ৫০ হাজার টাকায় গিয়েও ঠেকেছে।

উল্লেখ্য, ২০০০ সালের ডিসেম্বরে আত্মপ্রকাশের পরের বছর শুরু হয় ডেসটিনির বহুস্তর বিপণন কার্যক্রম। এরপর ২০০৫ সালে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি এবং পরের বছর ডেসটিনি ট্রি প্ল্যানটেশন লিমিটেড নামে আরও দুটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু করে। ২০১২ সাল পর্যন্ত একযুগে ডেসটিনি গ্রুপের সহযোগী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৭টিতে দাঁড়ায়। এ সময়ের মধ্যে স্থায়ী ও ভাসমান ৪৫ লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে ৪১১৯ কোটি ২৪ লাখ ৩৮২ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেড ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ৫১ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগ আনে দুর্নীতি দমন কমিশন। রাজধানীর কলাবাগান থানায় মানিলন্ডারিং আইনে করা হয় মামলা দুটি। ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল আমিন, গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সাবেক সেনাপ্রধান লে. জে. (অব.) এম হারুন-উর-রশিদ, ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেনসহ এক মামলায় ৪৬ ও অপর মামলায় ১৯ জনকে আসামি করা হয়। উভয় মামলায় মোট ৫১ জন আসামির মধ্যে বর্তমানে রফিকুল আমিন, মোহাম্মদ হোসেনসহ ৭ জন কারাগারে এবং বাকিরা জামিনে ও পলাতক রয়েছেন। মামলার পর আদালত ডেসটিনি ও সহযোগী সব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ক্রোকের আদেশ দেন।

সুত্রঃ মানব জমিন


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন