আজ বুধবার, ১৫ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



স্বামী কি স্ত্রীকে মারতে পারবে?

Published on 19 January 2016 | 2: 29 am

by ওমর আল জাবির

এই বিতর্কিত লেখাটি পড়ার আগে আপনাদের একটি ব্যাপার খেয়াল রাখতে হবে: এই আর্টিকেলটি ইতিমধ্যে পাবলিশ হওয়া কিছু কু’রআনের অনুবাদ, কু’রআন ভিত্তিক বই এবং আর্টিকেলের বাংলা অনুবাদ, এখানে আমার কোনো কৃতিত্ব নেই। এই আর্টিকেলের উদ্দেশ্য নয় কোনো বিভ্রান্তি ছড়ানো, বরং পাঠককে উৎসাহিত করা কু’রআনের আয়াতকে কীভাবে পর্যালোচনা করা হয়, কী ধরনের গবেষণা ইতিমধ্যেই করা হয়েছে, কী ধরনের একাডেমিক বিতর্ক রয়েছে — সেগুলোর একটি উদাহরণ দেওয়া। যারা কু’রআনের আয়াত নিয়ে এর আগে একাডেমিক বিতর্ক কখনও পড়েননি এবং ওরিয়েন্টালিস্টদের কাজ দেখেননি, তাদের জন্য এই আর্টিকেলটি ‘শক’ হতে পারে। এই আর্টিকেল থেকে পাঠকের একটি শিক্ষাই নেওয়া উচিত: কু’রআনের আয়াত নিয়ে যথেষ্ট পড়াশুনা না করে, শুধু অনুবাদের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা একটা বিরাট বোকামি। এই আর্টিকেলটির বিপক্ষে মুফতি ইউসুফ সুলতানের লেখা একটি সুন্দর সমালোচনা আছে। একইসাথে এর পক্ষে  ইমাম আব্দুল্লাহ হাসানের  বিস্তারিত গবেষণা ধর্মী একটি আর্টিকেল রয়েছেসে দুটো পড়ে দেখার অবশ্য অনুরোধ করব। 

সুরা নিসা এর ৩৪ নম্বর আয়াতটির প্রাচীন অনুবাদ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছে, যেখানে কী না বলা হয়েছে যে স্বামীরা তাদের স্ত্রী দেরকে প্রহার করার অধিকার রাখেঃ

ডঃ জহুরুল হকের অনুবাদ—

পুরুষরা নারীদের অবলম্বন, যেহেতু আল্লাহ তাদের এক শ্রেণীকে অন্য শ্রেণীর উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন, এবং যেহেতু তারা তাদের সম্পত্তি থেকে খরচ করে। কাজেই সতীসাধ্বী নারীরা অনুগতা, গোপনীয়তার রক্ষয়ীত্রি, যেমন আল্লাহ রক্ষা করেছেন। আর যে নারীদের ক্ষেত্রে তাদের অবাধ্যতা আশঙ্কা কর, তাদের উপদেশ দাও, আর শয্যায় তাদের একা ফেলে রাখো, আর তাদের প্রহার কর। তারপর যদি তারা তোমাদের অনুগত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে অন্য পথ খুঁজো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্ব জ্ঞাতা, মহামহিম। (৪:৩৪)

মুহিউদ্দিন খানের অনুবাদ—

পুরুষেরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল এ জন্য যে, আল্লাহ একের উপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে নেককার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ যা হেফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন লোক চক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাযত করে। আর যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং প্রহার কর। যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোনো পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সবার উপর শ্রেষ্ঠ। (৪:৩৪)

প্রফেসর হাফিয আব্দেল হালেম, মুহম্মদ আসাদ, শাব্বির আহমেদ, ডঃ মুনির মুনশী, ডঃ কামাল ওমর, বিলাল মুহাম্মাদ, মুহাম্মাদ আহমেদ-সামিরা—এরকম কমপক্ষে ৮টি অনুবাদ অনুসারে, এবং শেখ আব্দুল্লাহ হাসানের এই আয়াতের উপর লেখা বিস্তারিত গবেষণা অনুসারে এর শুদ্ধতর অনুবাদ প্রস্তাব করা হয়েছে—

পুরুষরা নারীদের সংরক্ষণকারী [ভরণপোষণকারী] কারণ আল্লাহ পুরুষদের কয়েকজনকে অন্যদের(নারী/পুরুষ) থেকে বেশি দিয়েছেন [অনুগ্রহ করেছেন, সন্মানিত করেছেন], এবং তারা(পু) নিজেদের সম্পত্তি থেকে খরচ করে। আর নীতিবান নারীরা আল্লাহর প্রতি অত্যন্ত অনুগত [ধর্ম প্রাণ, আন্তরিক, অনুগত], গোপন ব্যাপারগুলো গোপন রাখে যা আল্লাহ তাদেরকে রক্ষা করতে বলেছেন। আর তাদের(স্ত্রী) মধ্যে যাদেরকে তোমরা(পু) অন্যায় আচরণ/বিদ্রোহাচারণ ভয় করো, তাদেরকে(স্ত্রী) তোমরাপু সতর্ক করো [উপদেশ, সাবধান, পরিণাম জানানো], তারপর তাদেরকে(স্ত্রী) তোমরা(পু) বিছানায় [শোবার ঘরে] ত্যাগ করো, এবং সবশেষে তাদেরকে(স্ত্রী) তোমরা(পু) আলাদা করে দাও/রাগের দৃষ্টান্ত দাও তবে যদি তারা(স্ত্রী) তোমাদের(পু) সম্মতি দেয়, তাদের(স্ত্রী) বিরুদ্ধে কিছু করবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছু জানেন এবং সবচেয়ে প্রজ্ঞাময়। (৪:৩৪)

প্রচলিত অনুবাদে তিনটি বিতর্কিত ব্যপার রয়েছে—

  • পুরুষরা স্ত্রীদের উপর কর্তৃত্ব করার অধিকার রাখে।
  • স্ত্রীরা স্বামীর প্রতি অনুগত হতে বাধ্য।
  • স্বামী স্ত্রীর অবাধ্যতার আশঙ্কা করলে স্ত্রীকে প্রহার করতে পারবে, যতক্ষন না স্ত্রী স্বামীকে বাধ্যতার প্রমাণ দেখিয়ে সন্তুষ্ট করতে না পারে।

অনেকেই এই আয়াতটি পড়ে বিভ্রান্তিতে পড়ে যান যে, কীভাবে আল্লাহ্‌ ﷻ, যিনি সবচেয়ে জ্ঞানী এবং সবচেয়ে দয়ালু, এরকম একটি পুরুষ পক্ষপাতী নির্দেশ কু’রআনে দিতে পারেন, যা যুগে যুগে স্ত্রীদেরকে পুরুষদের অধীন করে রাখতে এবং স্ত্রীদের উপর স্বামীর শারীরিক নির্যাতন সমর্থন করবে? তিনি কি জানেন না যে, স্বামীরা যখন দেখবে কু’রআন তাদেরকে তাদের স্ত্রীদেরকে প্রহার করার অনুমতি দিচ্ছে, তখন তারা তা ব্যাপকভাবে অপব্যবহার করবে? তাছাড়া স্ত্রীদেরকে প্রহার করাটা কীভাবে কোনো পারিবারিক সমস্যার সমাধান হতে পারে? স্বামীরা কি সবসময় সঠিক এবং স্ত্রীরা কি সবসময়ই ভুল করে?

এই আয়াতটির প্রচলিত অনুবাদ পড়ে যেন বিভ্রান্তি কম হয়, অনেকে তার জন্য “হালকা প্রহার” অনুবাদ করেছেন, যেখানে মূল আরবিতে “হালকা” বলে কোনো শব্দ নেই। অনেকে হাদিস দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে, স্ত্রীদেরকে খুব অল্প প্রতীকী আঘাত করতে হবে, আক্ষরিক অর্থে প্রহার করা যাবে না।

কিন্তু সত্যিই কি আল্লাহ ﷻ যে কোনো সামাজিক, পারিবারিক পরিস্থিতিতে, যে কোনো যোগ্যতার স্বামীদেরকে স্ত্রীদের উপর কর্তৃত্ব দিয়েছেন, স্ত্রীদেরকে স্বামীর প্রতি অনুগত থাকতে বলেছেন এবং স্ত্রীদেরকে প্রহার করার অনুমতি দিয়েছেন, যদি স্বামীরা অবাধ্যতার আশঙ্কা করে এবং শেষ পর্যন্ত স্ত্রীদেরকে তাদের অবাধ্যতা থেকে দূরে রাখতে না পারে?

এই প্রবন্ধে প্রহার করার পক্ষে এবং বিপক্ষেদুটো দিকই ব্যাখ্যা করা হলো। আপনি সিদ্ধান্ত নিয়ে দেখুন কোনটা আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়। মনে রাখবেন, এগুলো সবই ইতিমধ্যে প্রকাশিত বই এবং আর্টিকেলের অনুবাদ। এখানে আমার কোনো কৃতিত্ব নেই। এখানে প্রসিদ্ধ তাফসির যেমন তাফসির ইবন কাসিরের উদাহরণ দেওয়া হয়নি কারণ সেটি সবার ইতিমধ্যেই জানা। এখানে বিপক্ষের ব্যাখ্যাগুলো দেওয়া হয়েছে। 

কর্তৃত্ব

আরবি قَوَّامُونَ কা’ওয়ামুন্না শব্দটির অর্থ “কর্তৃত্ব” আর কোথাও নেই। কু’রআনে এই শব্দটি অন্যান্য আয়াতে সংরক্ষক, অটল থাকা, দাঁড়ান, পুনরুত্থান, ভরণপোষণ ইত্যাদি অর্থে ব্যবহার হয়েছে। এটি কা’ইম (যে যত্ন করে, যে কারও জন্য দায়ী) এর একটি বিশেষ রুপ। ২:২২৪ – ২:২৪২ পর্যন্ত আয়াতগুলোতে এটাই পরিস্কার হয় যে পারিবারিক সম্পর্কের ব্যপারে স্ত্রীরা পুরুষদের সমান অধিকার রাখে এবং পুরুষরা স্ত্রীদের ভরণপোষণ করার জন্য দায়ী। তাই কা’ওয়ামুন্না অর্থ ‘কর্তৃত্ব’ হবার কোনো যুক্তি বা প্রমাণ কোনোটাই নেই। বরং এর অর্থ হবে “সংরক্ষণকারী” বা “ভরণপোষণকারী”। [সুত্রঃ মুহম্মাদ আসাদ, প্রফেসর হাফিয আব্দেল হালেম, লালেহ বখতিয়ার, ইদিপ ইয়ুক্সেল]

অনুগত

আরবি قَانِتَاتٌ কা’নিতাতুন অর্থ কয়েকজন অনুবাদক করেছেন “স্বামীর প্রতি অনুগত”, অথচ কু’রআনে আর যত জায়গায় কা’নিতাতুন এবং তার অন্যান্য রূপগুলো এসেছে, তার প্রত্যেকটি “আল্লাহর প্রতি অত্যন্ত অনুগত” অর্থ করা হয়েছে। শুধুমাত্র এই একটি আয়াতে স্ত্রীদেরকে পুরুষদের প্রতি অনুগত – এই অর্থ করা হয়েছে। কু’রআনে ৬৬:১২ আয়াতে আল্লাহ ﷻ একই শব্দ ব্যবহার করেছেন ঈসা ﷺ  নবীর মা মরিয়মের ﷺ বেলায়। মরিয়মের ﷺ  কোনো স্বামী ছিলনা। তাই তার স্বামীর প্রতি অনুগত হবার প্রশ্ন আসে না। সুতরাং কা’নিতাতুন অর্থ স্বামীর প্রতি অনুগত হতে পারেনা বরং বাকি সবগুলো আয়াতের মত এখানেও “আল্লাহর প্রতি অনুগত হবে।” আল্লাহ ﷻ যদি শুধুমাত্র এই আয়াতে কা’নিতাতুন ভিন্ন অর্থ করতেন, তবে তিনি তা পরিস্কার করে বলে দিতেন। আরও সমর্থন পাওয়া যায় ৬৬:৫ থেকে যেখানে আল্লাহ ﷻ আদর্শ স্ত্রীর গুণগুলো বর্ণনা করেছেন, যেখানে তিনি একই কা’নিতাতুন শব্দটি ব্যবহার করেছেন “আল্লাহর প্রতি অত্যন্ত অনুগত” অর্থে। কয়েকজন অনুবাদক সেখানেও সুবিধামত “স্বামীর প্রতি অনুগত” ব্যবহার করেছেন কোনোই ভিত্তি ছাড়া। [সুত্রঃ মুহাম্মাদ আসাদ, প্রফেসর হাফিয আব্দেল হালেম, লালেহ বখতিয়ার]

প্রহার

[ইমাম আব্দুল্লাহ হাসানের এই আয়াতের উপর লেখা গবেষণা থেকে কিছু দলিল দেওয়া হলো। মনে রাখবেন, এগুলো একটাও আমার কৃতিত্ব নয়।]

আরবি اضْرِبُوهُنَّ ইদ্‌রিবু’হুন্না শব্দটি ৪:৩৪ আয়াতে বাংলা করা হয়েছে “তাদেরকেস্ত্রী প্রহার কর”। অথচ এই আরবি শব্দটির অনেকগুলো অর্থ হয় যা কু’রআনে বিভিন্ন আয়াতে ভিন্ন ভিন্ন অনুবাদ করা হয়েছে। এই শব্দটি এসেছে মূল ض ر ب দা-রা-বা থেকে যার অর্থগুলো হল—

  • ভ্রমণ করা, চলে যাওয়া – ৩:১৫৬, ৪:১০১, ৩৮:৪৪, ৭৩:২০, ২:২৭৩।
  • আঘাত করা – ২:৬০, ২:৭৩, ৭:১৬০, ৮:১২, ২০:৭৭, ২৪:৩১, ২৬:৬৩, ৩৭:৯৩, ৪৭:৪।
  • প্রহার করা – ৮:৫০, ৪৭:২৭।
  • উপস্থাপন করা – ৪৩:৫৮, ৫৭:১৩।
  • উদাহরন, প্রতীক, দৃষ্টান্ত দেওয়া – ১৪:২৪, ১৪:৪৫, ১৬:৭৫, ১৬:৭৬, ১৮:৩২, ১৮:৪৫, ২৪:৩৫, ৩০:২৮, ৩০:৫৮, ৩৬:৭৮, ৩৯:২৭, ৩৯:২৯, ৪৩:১৭, ৫৯:২১, ৬৬:১০, ৬৬:১১।
  • দুর্দশা পতিত হওয়া – ২:৬১।
  • ঢেকে দেওয়া – ১৮:১১।
  • পার্থক্য করা – ১৩:১৭।
  • ফেরত নেওয়া – ৪৩:৫।

এথেকে বোঝা যায় যে, দা-রা-বা শুধু প্রহার করাই বোঝায় না, এর ব্যবহার এবং প্রেক্ষাপট অনুসারে এর অনেকগুলো অর্থ হতে পারে। এখন দেখি ৪:৩৪-এ এর মানে ‘প্রহার’ হওয়ার পক্ষে কী যুক্তি দাঁড় করানো যায়।

অনেকে বলেন, দা-রা-বা এর একটি অর্থ যেহেতু “আঘাত করা” হয়, তাহলে কেন স্ত্রীদেরকে আঘাত করা যাবে না। লক্ষ্য করুন, যতগুলো আয়াতে আল্লাহ ﷻ আঘাত করতে বলেছেন, তার প্রত্যেকটি আয়াতে তিনি পরিস্কার করে বলে দিয়েছেন কী দিয়ে বা কোথায় আঘাত করতে হবে। ২:৬০, ৭:১৬০, ২৬:৬৩ بِّعَصَاكَ লাঠি দিয়ে, ২:৭৩ بِبَعْضِهَا একটি অংশ দিয়ে, ৮:১২ فَوْقَ الْأَعْنَاقِ ঘাড়ের উপরে, ২০:৭৭ فِي الْبَحْرِ নদীতে, ২৪:৩১ بِأَرْجُلِهِنَّ পা দিয়ে,  ৩৭:৯৩ بِالْيَمِينِ ডান হাত দিয়ে, ৪৭:৪ الرِّقَابِ ঘাড়ে। প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ ﷻ পরিস্কার করে বলে দিয়েছেন “কী দিয়ে” বা “কোথায় আঘাত” হবে। তাই ৪:৩৪–এ স্ত্রীদেরকে “আঘাত কর” হতে পারে না, কারণ আল্লাহ ﷻ বলেন নি ‘কী দিয়ে’ আঘাত করতে হবে বা স্ত্রীকে ‘কোথায় আঘাত’ করতে হবে। আল্লাহ কু’রআনে কোনো বিভ্রান্তি রাখেন না, যেন মানুষ নিজের ইচ্ছা মত অর্থ করে নিতে পারে এবং নিজের ইচ্ছা মতো স্ত্রীকে যেখানে ইচ্ছা আঘাত করতে পারে। এরপরেও যদি কেউ দাবি করেন যে এই আয়াতে আঘাত করাই হবে, তবে এটি হবে একমাত্র আয়াত যেখানে আল্লাহ ﷻ কী দিয়ে বা কোথায় আঘাত করতে হবে তা সুস্পষ্ট করে বলেননি। [সুত্রঃ  আব্দুল্লাহ হাসান]

অনেকে দাবি করেন যে, যখন ‘দারাবা’ এর সাথে অন্য কোনো শব্দ যুক্ত হয় এবং তারা একসাথে একটি বাক্যাংশের রুপে ব্যাবহার হয়, তখনি শুধুমাত্র দারাবা এর অর্থ প্রহার না হয়ে অন্য কিছু হবে। যেমন দারাবা মাছালা অর্থ ‘উদাহরণ দেওয়া’, দারাবা আ’লা অর্থ ‘ঢেকে দেওয়া’। যদি দারাবা এর সাথে অন্য কোনো শব্দ যুক্ত না হয়, শুধুই যদি দারাবা ক্রিয়াবাচক শব্দটি থাকে, তাহলে দারাবা অর্থ হবে ‘প্রহার করা’ এবং কাকে প্রহার করতে হবে তা মাফুউ’ল বিহি অর্থাৎ ক্রিয়া পদের উদ্দেশ্য হিসেবে আসবে। যদি এই নিয়ম অনুসরণ করি আমরা, তাহলে ১৩:১৭ আয়াতে কী হয় দেখুন—

… এভাবে আল্লাহ প্রহার করেন সত্য এবং মিথ্যা। (১৩:১৭)

এটি অর্থহীন। এখানে দা-রা-বা নিশ্চিতভাবে ‘পার্থক্য করা’ / ‘আলাদা করা’ হবে।

আতা ইবন আবি রাবাহ (১১৪ হিজরি) দা-রা-বা শব্দের সঠিক অর্থ নিয়ে বলেছেন, “স্বামী কখনই যেন তার স্ত্রীকে আঘাত না করে, যদি সে স্ত্রীকে কিছু করতে বলে এবং স্ত্রী তা না করে, তাহলে বরং স্বামীর স্ত্রীর প্রতি রাগ দেখানো উচিত। (ইয়াগ্ধাব আলাইহা)।” এই মন্তব্যকে নিয়ে ইবন আল-আরাবি বলেছেন, “এটি আতার একটি আইনগত উপলব্ধি, তার নিজস্ব শারিয়াহ-এর জ্ঞান, এবং তার যুক্তিগত উপলব্ধি।” [সুত্রঃ ইমাম আব্দুল্লাহ হাসান]

ইবন আশুর আরও সমর্থন করে বলেন, “আমি আতার উপলব্ধিকে ইবন আল-আরাবির থেকেও আর বেশি ব্যপক মনে করি, যেহেতু তিনি দলিল সাপেক্ষে যেটা যেভাবে করা দরকার, তা করতেন। আলেমদের একটি বড় দল এই উপলব্ধির সমর্থন করেন।”  [সুত্রঃ ইমাম আব্দুল্লাহ হাসান]

এভাবে আতা-এর ব্যাখ্যা অনুসারে দা-রা-বা এর এই আয়াতে সঠিক অনুবাদ হবে: রাগ প্রদর্শন করা।  [সুত্রঃ ইমাম  আব্দুল্লাহ হাসান]

কু’রআনে আল্লাহ ﷻ নারীদের মর্যাদা, অবদান, অধিকার অত্যন্ত সুন্দর ভাবে বলা আছেঃ

আর তাঁর নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি হল যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই সত্তা থেকে সহধর্মিণী সৃষ্টি করেছেন, যাতে করে তোমরা তাদের(স্ত্রী) মধ্যে প্রশান্তি [শান্তি, নিরাপত্তা, দয়া, করুণা, নম্রতা, বিনয়] খুজে পাও; এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা এবং দয়া তৈরি করেছেন। নিশ্চয়ই এর মধ্যে তাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে যারা চিন্তা করে। (৩০:২১)

হে বিশ্বাসীরা, নারীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের উত্তরাধিকার হবে না। আর তাদের উপর এমন কোনো সীমাবদ্ধতা তৈরি করবে না যাতে করে তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ তার কিছু ফেরত নিয়ে নিতে পারো, যদি না তারা প্রকাশ্যে কোনো নীতিবিগর্হিত [মাত্রাতিরিক্ত, লজ্জাজনক, সীমালঙ্ঘন, ব্যভিচার] কাজ করে। আর তাদের সাথে দয়ার [সন্মান, ন্যায়ভাবে, সদ্ভাব] সাথে বসবাস কর। তবে যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, হতে পারে তোমরা এমন কিছু অপছন্দ কর যাতে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন। (৪:১৯)

এই দুটি আয়াত থেকে পরিস্কার ভাবে বোঝা যায় নারীদের সম্পর্কে আল্লাহর ﷻ সিদ্ধান্ত কী। নারীদের প্রতি এত সুন্দর সহমর্মিতার নির্দেশ যিনি দেন, তিনি কীভাবে  তাদেরকেই প্রহার করার কথা বলতে পারেন?

এছাড়াও দেখুন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীদের ব্যপারে আল্লাহ ﷻ কী বলেছেনঃ

আর যখন তুমি স্ত্রীদেরকে তালাক দাও এবং স্ত্রীরা অপেক্ষার সময় পূরণ করে, তখন হয় তাদেরকে সন্মানের সাথে/ন্যায্যভাবে রাখবে অথবা তাদেরকে সন্মানের সাথে ছেড়ে দিবে। তাদেরকে আঘাত/কষ্ট দিয়ে ধরে রাখবে না, যেন তোমরা তাদের উপর কোনো সীমালঙ্ঘন করে না ফেল। আর যে সেটা করবে সে নিঃসন্দেহে নিজের উপর অন্যায় করবে। (২:২৩১)

যে স্ত্রী স্বামীকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে তালাকের মত একটি চরম পর্যায়ে পৌঁছাবার পর, তাকেই যেখানে আল্লাহ ﷻ কোনো রকম কষ্ট না দিয়ে সন্মানের সাথে রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে কীভাবে যে স্ত্রী স্বামীর সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে সংসার করার চেষ্টা করছে, তাকে আল্লাহ ﷻ প্রহার করতে বলতে পারেন?

যুগে যুগে অনেক মহীয়সী নারী এসেছেন যারা ধর্ম, কর্ম, গুণে তাদের স্বামীদের থেকে অনেক উপরে ছিলেন। সে সব স্বামীরা যদি তাদের অপেক্ষাকৃত কম বিচারবুদ্ধি, জ্ঞান এবং যোগ্যতায় মনে করতেন যে, তাদের স্ত্রীরা তাদের অবাধ্যতা করছে এবং তাদেরকে প্রহার করতেন, তাহলে সেটা কি কখনও শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে যেত?

অনেক স্ত্রী আছেন যাদের সম্পত্তি এবং শারীরিক সামর্থ্য স্বামীর থেকে বেশি। স্বামী দুর্বল, গরিব, মানসিকভাবে অসুস্থ হতে পারে।  তাদের বেলায়ও কি এই আয়াতটি প্রযোজ্য? একজন স্কিত্‌জোফ্রেনিক, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার বা বাইপোলার ডিসঅর্ডার-এ ভোগা স্বামী, যে কী না সবসময় নিজেকে সব ব্যাপারে সঠিক মনে করে, সে যদি এই আয়াত পড়ে ভাবে যে, আল্লাহ ﷻ তাকে তার স্ত্রীদের মারার অধিকার দিয়েছেন, যখন তার স্ত্রী তার কথা মানে না, তাহলে প্রতি একশ জন পুরুষের মধ্যে গড়ে পাঁচ থেকে দশ জনের স্ত্রীরা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হবেন, যদিও তাদের কোনোই দোষ নেই।

কু’রআনের নির্দেশ যে কোনো পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ সমাধান দেয়। কু’রআনের বাণী বিশেষ কোনো গোত্র, সমাজ, পরিবার, মানুষের জন্য প্রযোজ্য নয়, বরং যে কোনো পরিস্থিতিতে, যে কোনো সমাজ, সংস্কৃতি, যুগের মানুষের জন্য প্রযোজ্য। তাই ৪:৩৪ এর প্রচলিত অনুবাদ যদি যে কোনো সময়ে, যে কোনো দেশে, যে কোনো সংস্কৃতিতে সবার জন্য প্রযোজ্য না হয়, তবে ধরে নিতে হবে আমরা তার ভুল উপলব্ধি করেছি, আল্লাহ ﷻ ভুল করেননি।

৪:৩৪ যে স্ত্রীদেরকে প্রহার করতে বলে না বরং রাগ প্রদর্শন করতে বলে বা আলাদা করে দিতে বলে, তার সমর্থনে ঠিক এর পরের আয়াতটি ৪:৩৫ দেখুন—

আর যদি তোমরা(২+) তাদের দুজনের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা কর, তাহলে পুরুষের পক্ষ/পরিবার থেকে একজন মধ্যস্থতাকারী এবং স্ত্রীর পক্ষ/পরিবার থেকে একজন মধ্যস্থতাকারী নিযুক্ত কর। যদি তারা উভয়ে (মধ্যস্থতাকারী) মিটমাট করতে চায়, তাহলে আল্লাহ তাদের দুজনের মধ্যে মিটমাটের ব্যবস্থা করে দিবেন।  নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সবকিছু সম্পর্কে অবগত। (৪:৩৫)

স্বামী যদি স্ত্রীকে প্রহার করেই সমস্যার সমাধান করতে পারে, তাহলে কী দরকার এত কষ্ট করে দুই পক্ষ থেকে মধ্যস্থতাকারী এনে সালিস করার? স্ত্রীদেরকে প্রহার করে বশ করিয়ে রাখলেই তো হল। প্রহার করার পড়ে অভিভাবক ডেকে এনে মধ্যস্থতা করা যুক্তিযুক্ত, নাকি প্রহার করার আগে অভিভাবক ডেকে এনে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করা উচিত?

লক্ষ্য করুন ৪:৩৪ এর প্রেক্ষাপটটা কী? স্ত্রী স্বামীর সাথে একমত নয়। স্ত্রী প্রকাশ্য অন্যায় করেছে। স্বামী তাকে সংশোধন করার জন্য মুখে বলেছে। তাতে কাজ হয়নি। তারপর বিছানা/ঘর আলাদা করে দিয়েছে। তাতেও কাজ হয় নি। স্ত্রীর অবস্থা নিচের যে কোনো একটি—

  • স্ত্রী মনে করে সে যা করছে তা ঠিক, স্বামী ভুল।
  • স্ত্রী ইচ্ছাকৃত ভাবে জেনে শুনে অন্যায় করছে কারণ ক) স্ত্রী বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য স্বামীর বিরুদ্ধাচারন করতে চায়, বা খ) স্ত্রী চারিত্রিকভাবে খারাপ।

৪:৩৪ এ ن ش ز নুসুজ ব্যবহার করা হয়েছে যার অর্থ ইচ্ছাকৃত অবাধ্যতা, বিরোধিতা, বিদ্রোহচারণ। এই পরিস্থিতিতে স্বামী যদি স্ত্রীকে প্রহার করে, তবে কি কোনো শান্তিপূর্ণ সমাধান হবে? বরং তা শারীরিক সংঘাতের দিকে যেতে পারে।

কু’রআন ৬৬:৩-৫ একটি ঘটনার কথা বলে যেখানে নবী মুহাম্মাদের ﷺ  স্ত্রীদের একজন কোনো একটি গোপন ব্যাপার প্রকাশ করে দিয়েছিল, যা আল্লাহ ﷻ নবীকে ﷺ  জানিয়ে দিয়েছিলেন। আল্লাহ ﷻ এই তিনটি আয়াতে এই ধরনের গুরুতর অবাধ্যতার শাস্তি হিসেবে নবীকে ﷺ  বলেছিলেন কি যে তার স্ত্রীকে প্রহার করতে? তিনি বলেছেন, স্ত্রীকে আল্লাহর ﷻ কাছে ক্ষমা চেতে হবে (স্বামীর কাছে নয়।) কিন্তু যদি তারা তা না করে নবীর ﷺ  বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়, তাহলে নবী ﷺ তাদেরকে তালাক দিবেন।

ধর্মের মত একটি আবশ্যিক ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই—

ধর্মের ব্যপারে কোনো জবরদস্তি নেই। নিশ্চয়ই সঠিক পথ/বিচার স্পষ্টভাবে আলাদা হয়ে গেছে মিথ্যা/ভুল থেকে। তাই যে তাগঘুতে   অবিশ্বাস করে এবং আল্লাহকে বিশ্বাস করে, সে মজবুত অবলম্বন/হাতল ধরেছে, যা ভাঙবে না। আর আল্লাহ সব শোনেন, সব জানেন।  (২:২৫৬)

মানুষকে আল্লাহর ﷻ প্রতি অনুগত করার জন্য কোনো জবরদস্তি করা যাবে না, প্রহার করাতো দুরের কথা। সেখানে কীভাবে স্বামীর প্রতি অনুগত না হলে স্ত্রীদেরকে জবরদস্তি এবং প্রহার করা যাবে? স্বামীর প্রতি অনুগত হওয়া কি আল্লাহর ﷻ প্রতি অনুগত হওয়া থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

এসব কারণে অনেকগুলো সাম্প্রতিক অনুবাদে বেশ কয়েকটি যুক্তি দেখানো হয়েছে – কেন ৪:৩৪ আয়াতে দা-রা-বা অর্থ ‘প্রহার’ না হয়ে ‘আলাদা করা’ হবে—

  • যে ১১টি আয়াতে দা-রা-বা অর্থ আঘাত/প্রহার করা হতে পারে তাদের মধ্যে একমাত্র এই আয়াতে দা-রা-বা এর পর ‘কীভাবে’ বা ‘কোথায়’ আঘাত করতে হবে তা বলা নেই। একমাত্র ৪:৩৪ ব্যতিক্রম হতে পারে না।
  • এই ১১টি আয়াত বাদে দা-রা-বা অর্থ ‘প্রহার’ বাকি কমপক্ষে ৩০টি আয়াতে সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত, এমনকি সেই সব আয়াতেও যেখানে ‘দারাবা’ অন্যান্য শব্দের সাথে যুক্ত হয়ে বাক্যাংশ গঠন করে না।
  • দা-রা-বা এর সর্বাধিক ব্যবহার ‘দৃষ্টান্ত দেওয়া’ যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আল্লাহ ﷻ মানুষকে কোনো কিছু উপলব্ধি করানোর জন্য ব্যবহার করেছেন। এই অর্থটিও স্ত্রীকে আলাদা করে দেওয়া সমর্থন করে কারণ আলাদা হয়ে যাওয়াটা স্বামী-স্ত্রীর উভয়ের জন্য একটি ‘দৃষ্টান্তমূলক’ কাজ।
  • শুধু দা-রা-বা শব্দটি যে দুটি আয়াতে এসেছে, যেগুলোতে দা-রা-বা অন্য কোনো শব্দের সাথে (যেমন আ’ন, আ’লা, মাছালা) যুক্ত হয়ে কোনো বাক্যাংশ গঠন করেনি, সেগুলোর প্রত্যেকটিতে দা-রা-বা অর্থ ‘আলাদা করা’ যথার্থ হয়, ‘প্রহার করা’ সঠিক হয় না।
  • ৪:৩৪-৩৫ এই দুটি আয়াতে যে ধারাবাহিকতা রয়েছে তা ‘প্রহার’ অর্থ করলে ভেঙ্গে যায়। বরং প্রথমে সাবধান করা, তারপর বিছানা আলাদা করা, তারপর দৃষ্টান্তমূলক কিছু করা/আলাদা হয়ে যাওয়া, অভিভাবক ডেকে সালিশের চেষ্টা করা এবং সবশেষে তালাক দেওয়া – এই ধারাবাহিকতা ঠিক রাখে।
  • স্ত্রীদেরকে প্রহার করা ২:২৩১ এবং ৬৬:৩-৫ সমর্থন করে না।
  • যে কোনো যোগ্যতার স্বামী তাদের স্ত্রীদেরকে প্রহার করলে সবসময় শান্তিপূর্ণ সমাধান হবে না। স্বামী সবসময় স্ত্রীদের থেকে সঠিক হতে পারে না। এছাড়াও অনেক পরিস্থিতিতে স্বামী স্ত্রীকে প্রহার করলে তা গুরুতর শারীরিক সংঘাতে পরিণত হতে পারে। সবসময় শান্তিপূর্ণ সমাধান না হলে তা আল্লাহর ﷻ বাণী হতে পারে না।
  • কোনো সাহিহ হাদিসে কোথাও আমাদের নবি ﷺ -কে তার কোনো স্ত্রীকে প্রহার করতে জানা যায় নি, যেখানে তার স্ত্রীরা অন্তত একবার হলেও তার বিরুদ্ধে কাজ করেছিল, যা কু’রআনে প্রকাশ করা হয়েছে।যদি নবী ﷺ কখনও তার কোনো স্ত্রীকে প্রহার করে না থাকেন, তাহলে মুসলমানদের কাছে স্ত্রীদের প্রহার করার কোনো নির্ভরযোগ্য নজীর নবি ﷺ  রেখে যাননি।
  • আতা ইবন আবি রাবাহ (১১৪ হিজরি) সহ বেশ কিছু প্রাচিন আলেম দা-রা-বা এর অর্থ রাগ প্রদর্শন করা সমর্থন করেন এবং প্রহার করার সম্পূর্ণ বিপক্ষে।

তাই দাবি করা হয়: ৪:৩৪ এর শুধতর অনুবাদ হবে—

পুরুষরা নারীদের সংরক্ষণকারী [ভরণপোষণকারী] কারণ আল্লাহ পুরুষদের কয়েকজনকে অন্যদের(নারী/পুরুষ) থেকে বেশি দিয়েছেন [অনুগ্রহ করেছেন, সন্মানিত করেছেন], এবং তারা(পু) নিজেদের সম্পত্তি থেকে খরচ করে। আর নীতিবান নারীরা আল্লাহর প্রতি অত্যন্ত অনুগত [ধর্ম প্রাণ, আন্তরিক, অনুগত], গোপন ব্যাপারগুলো গোপন রাখে যা আল্লাহ তাদেরকে রক্ষা করতে বলেছেন। আর তাদের(স্ত্রী) মধ্যে যাদেরকে তোমরা(পু) বিদ্রোহাচারণের ভয় করো, তাদেরকে(স্ত্রী) তোমরাপু সতর্ক করো [উপদেশ, সাবধান, পরিণাম জানানো], তারপর তাদেরকে(স্ত্রী) তোমরা(পু) বিছানায় [শোবার ঘরে] ত্যাগ করো, এবং সবশেষে তাদেরকে(স্ত্রী) তোমরা(পু) আলাদা করে দাও/রাগ প্রদর্শন করো। তবে যদি তারা(স্ত্রী) তোমাদের(পু) সম্মতি দেয়, তাদের(স্ত্রী) বিরুদ্ধে কিছু করবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছু জানেন এবং সবচেয়ে প্রজ্ঞাময়। (৪:৩৪)

এই আয়াতটি থেকে স্বামীর দায়িত্বের পর্যায়গুলো পরিস্কার হয় – যখন স্বামী তার স্ত্রীর কাছ থেকে প্রকাশ্য অন্যায়/নীতিবিগর্হিত কাজের ভয় করবে, তখন ১) তাদেরকে বোঝাতে হবে, যদি তাতে না হয়, ২) তাদেরকে বিছানায় আলাদা করে দিতে হবে, যদি তাতে না হয়, ৩) তাদের প্রতি রাগ প্রদর্শন করতে হবে কোনো ধরনের সীমা অতিক্রম না করে। যেমন, কোনো মিসওয়াক দিয়ে হাল্কা বাড়ি মারা রাগ প্রদর্শন করার একটি উপায় হতে পারে, যেখানে স্ত্রীর শারীরিক ক্ষতি হচ্ছে না, কিন্তু স্ত্রী পরিষ্কার ভাবে বুঝে যাচ্ছে যে, স্বামী রেগে গেছে। অথবা তাদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যেতে হবে কিছু সময়ের জন্য। এই আলাদা হয়ে যাওয়াটা কয়েক ভাবে হতে পারে, যেমন স্ত্রীকে তার পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া, বা স্বামীকে বাসা ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে থাকা। এটাও রাগ প্রদর্শন করার একটি উপায়। যদি তাতেও না হয়, ৪) দুই পক্ষ থেকে মধ্যস্থতাকারী এনে সালিশের ব্যবস্থা  করতে হবে। যদি তাতে না হয় ৫) তালাক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে কু’রআনে নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে।

শুধু এ পর্যন্তই নয়, বিছানায় ত্যাগ করার নির্দেশটি দেওয়া হয়েছে পুরুষকে, নারীকে নয়। এর অর্থ পুরুষ অন্য বিছানায়/ঘরে চলে যাবে, নারী তার আগের নির্ধারিত বিছানায়/ঘরে থাকবে। কু’রআনের বাণী যে কতটা শান্তি প্রিয় এবং নারীর নিরাপত্তার প্রতি কতখানি গুরুত্ব দেয়, তা আবারও প্রমাণিত হয়।

স্ত্রীকে প্রহার করার পক্ষে যুক্তি

এতক্ষন স্ত্রীকে প্রহার করার বিপক্ষে আলোচনা করা হয়েছে, এবার স্ত্রীকে প্রহার করার পক্ষের ব্যাখ্যাগুলো দেখুন—

আরবিতে ن ش ز নুসুজ শব্দটির অর্থ হচ্ছে: চরম বিদ্রোহচারণ। আপনার স্ত্রী যদি আপনার সাথে ঝগড়া ঝাটি করে, রাগ করে খাওয়া বন্ধ করে দেয়, আপনার জন্য রান্না করা বন্ধ করে দেয়, বাচ্চাদেরকে স্কুলে নেওয়া বন্ধ করে দেয়—এগুলো নুসুজ নয়। কারণ শারিয়াহ অনুসারে স্ত্রী ঘরের কোনো কাজ করতে বাধ্য নয় এবং তার সম্পত্তি থেকে কোনো কিছুই সংসারের জন্য খরচ করতে বাধ্য নয়। নুসুজ একটা বিরাট ব্যাপার। ধরুন আপনার স্ত্রী একদিন রেগে গিয়ে থালা বাসন ছুঁড়ে মারছে। আপনি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। কোনো লাভ হলো না। তারপর আপনি তার কাছ থেকে আলাদা ঘরে থাকা শুরু করলেন। তারপরেও লাভ হলো না। বরং তার বিদ্রোহচারণ আরও বেড়ে গেলো। একদিন সে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কাঁচের গ্লাস-প্লেট ভাঙ্গা শুরু করলো, বা আপনাকে আঘাত করলো, দোকানে গিয়ে উল্টোপাল্টা কেনাকাটা করে আপনার লাখ টাকা উড়িয়ে আসলো, তার পুরনো বয়-ফ্রেন্ডের সাথে ঘোরা শুরু করলো—এধরনের ব্যাপক ঝুঁকিপূর্ণ, অনৈতিক, ইসলাম বহির্ভূত বা পরিবারের জন্য বিরাট ক্ষতিকর কাজ সে করতে থাকলো—তখন সেটা নুসুজের পর্যায়ে পড়বে। তখন আপনি যদি তাকে একটা চাপড় মেরে তার হুঁশ ফিরিয়ে আনতে চান, সে ক্ষেত্রে আপনার তা করার অনুমতি আছে। কিন্তু সেই প্রহার করার সীমা খুব অল্প: আপনি কিছু প্রতীকী আঘাত করতে পারবেন এবং মুখে চিহ্ন রেখে আঘাত করা যাবে না। জোড়ে চড়, কিল, ঘুসি মেরে আল্লাহর ﷻ দেওয়া শারীরিক সৌন্দর্য বা গঠন নষ্ট করার কোনো অধিকার আপনার নেই, কারণ তার দেহ এবং মন দুটোই আল্লাহর ﷻ সম্পত্তি, আপনার নয়। [সুত্রঃ নওমান আলি খান]

সুতরাং এই অধিকতর সমর্থিত মত অনুসারে যখন স্বামী তার স্ত্রীর কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত প্রকাশ্য অন্যায়/নীতিবিগর্হিত কাজের ভয় করবে, তখন ১) তাদেরকে বোঝাতে হবে, যদি তাতে না হয়, ২) তাদেরকে বিছানায় আলাদা করে দিতে হবে। একা থেকেও যদি সে তার ভুল না বোঝে, তখন ৩) তাকে মৃদু প্রহার করতে হবে তাকে তার ভুল বোঝানোর জন্য। স্বামীর হাতে প্রহারের পরেও যদি সে তার ভুল না বোঝে, তখন ৪) দুই পক্ষ থেকে মধ্যস্থতাকারী এনে সালিশের ব্যবস্থা  করতে হবে। যদি তাতে না হয় ৫) তালাক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে কু’রআনে নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে।

এই মতটি বেশিরভাগ প্রসিদ্ধ তাফসীর, সহিহ বুখারি ৪৯০৮ নম্বর হাদিস ইত্যাদি দ্বারা সমর্থিত।

সবশেষে বলবো: আল্লাহইজানেন কোনোটা সঠিক, কোনটা ভুল। আমি আপনাকে বলছি না যে, আপনাকে প্রথম বা দ্বিতীয় মতটি মেনে নিতে হবে। আমি শুধুই আপনাকে দেখালাম যে কু’রআনের এই আয়াত নিয়ে দুইটি মত রয়েছে, যা একদম তাবিইনদের সময় থেকে চলে এসেছে। এটি কোনো নতুন মত নয়, যা বিংশ শতাব্দিতে আবিস্কার হয়েছে। ইবন আতা ছিলেন ইবন আব্বাসের ছাত্র এবং একজন মুফাসসির এবং মুহাদ্দিস। উনি ইবন আব্বাসের এই আয়াতের ব্যাখ্যাকে যেভাবে ব্যাক্ষা করেছেন, তা গ্রহণ করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। 

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে:বহুল প্রচলিত অনুবাদগুলোর কোনোটাই ১০০% সঠিক অনুবাদ নয়, যাতে করে আমরা সন্দেহাতীতভাবে ধরে নিতে পারি তারা কোনো ভুল করেননি। প্রচলিত অনুবাদগুলোতে অনেক আয়াতের অনুবাদ গত শত বছরে সংশোধন, পরিবর্ধন করা হয়েছে। এমনকি তারা সুরা ফাতিহার অনুবাদেও ভাষাগত ভুল করেছেন, যা বিংশ শতাব্দীতে সংশোধন করা হয়েছে। আবার নতুন অনুবাদকদের অনুবাদগুলোতেও যথেষ্ট ভুল ধরা পড়েছে।

আপনার নিজের বিবেক বুদ্ধি ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নিন  কোন আলেম বা মাযহাবকে আপনি অনুসরণ করবেন। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি নিশ্চিত: আপনি কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে দাড়িয়ে তাঁকে জবাব দিতে পারবেন, কেন আপনি কোনো মত বেছে নিয়েছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি নিরাপদ, ইন শাআ আল্লাহ। 

আল্লাহ জানেন কে সঠিক, কে ভুল। 

কু’রআনের অনুবাদঃ

  • প্রফেসর হাফিয আব্দেল হালিম,
  • শাব্বির আহমেদ,
  • ডঃ মুনির মুনশী,
  • ডঃ কামাল ওমর,
  • বিলাল মুহাম্মাদ,
  • মুহাম্মাদ আহমেদ – সামিরা

সূত্র:


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন