আজ বৃহঃপতিবার, ১৬ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০১ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



ডায়াবেটিস প্রতিরোধযোগ্য রোগ

Published on 14 January 2016 | 12: 40 pm

আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে ডায়াবেটিসের প্রাদুর্ভাব বেড়ে চলেছে লাগামহীন গতিতে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস নির্বাচন করতে না পারা, অলস জীবনযাপন এবং গর্ভাবস্থায় যত্নের অভাবে ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি আমাদের দেশে বেশি। ধারণা করা হচ্ছে আগামী দু’দশকে আমাদের দেশে ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা ১.৫ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। ডায়াবেটিস প্রতিরোধযোগ্য রোগ। আপনার যদি ডায়াবেটিস না থাকে তাহলে এখনই প্রতিরোধের সময়। লাইফস্টাইলে সামান্য পরিবর্তন এনে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা যায়।

রক্তে গ্লুকোজ কেন বাড়ে

মানবদেহে অগ্নাশয় নামের একটি গ্রন্থি আছে। এটি থেকে ইনসুলিন নামের একটি হরমোন নিঃসৃত হয়। আমরা সাধারণত যে খাবার খাই তার মধ্য শর্করা, আমিষ ও চর্বি থেকে প্রক্রিয়ায় বেঁচে থাকার জন্য রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপন্ন হয়। এ ক্ষেত্রে শর্করা যে রাসয়নিক প্রক্রিয়ায় শরীরে ব্যবহার উপযোগী হয় তাতে ইনসুলিন হরমোন প্রয়োজন। ইনসুলিন রক্তের গ্লুকোজকে কোষের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। কোষের ভেতরে ঢুকেও গ্লুকোজ গ্লাইকোজেনে পরিবর্তিত হয় এবং এটি ভেঙে গিয়ে ক্যালরিতে রূপান্তরিত হয়। এ ক্যালরিই দেহে শক্তির সৃষ্টি করে। ইনসুলিন না থাকলে বা ঠিক মতো কাজ করতে না পারলে এ কাজ সম্পন্ন হয় না, ফলে গ্লুকোজ ও অন্যান্য খাদ্য উপাদানের বিপাক বা মেটাবলিজমে বিঘ্ন ঘটে। ফলে রক্তে সুগারের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং অতিরিক্ত সুগার প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে আসে। এর ধারাবাহিকতায় দেহে প্রয়োজনীয় শক্তির অভাব দেখা দেয়। আক্রান্ত ব্যক্তি দুর্বলতা অনুভব করেন। ক্রমান্বয়ে তার শরীরে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দেয়।

ইনসুলিনের অভাব কেন হয়

বংশগত কারণ বা জীবাণুর সংক্রমণেও হতে পারে। এক ধরনের ভাইরাসের জন্য দায়ী। এরা দেহের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে ইনসুলিন উৎপাদনকারী অগ্নাশয়ের কোষগুলোকে আক্রমণ করে। এ ভাইরাস মানবদেহে লুকিয়ে থেকে সুপারটিজেন নামক এক ধরনের অণুপদার্থ তৈরি করে। এ সুপারটিজেন আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রধান সৈনিক লিস্ফোসাইটকে অত্যধিক তৎপর করে তোলে। এগুলো তখন অগ্নাশয়ে ইনসুলিন উৎপাদক বিটা কোষকে আক্রমণ করে। ফলে ইনসুলিন উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং রক্তে ইনসুলিনের অভাব দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রেই ডায়াবেটিসের সূত্রপাত।

ডায়াবেটিসের পূর্বাবস্থা : প্রি-ডায়াবেটিক রোগী কারা

সকালে অভুক্ত অবস্থায় রক্তে সুগারের পরিমাণ ৫.৬-৬.৯ মিলিমোল থাকলে অথবা ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খাওয়ার দুই ঘণ্টা পর রক্তে সুগারের পরিমাণ ৭.৮-১১ মিলিমোল হলে তাকে প্রি-ডায়াবেটিস হিসেবে ধরা হয়।

কখন ডায়াবেটিক রোগী বলা যায়

সকালে অভুক্ত অবস্থায় রক্তে সুগারের পরিমাণ ৭.০ মিলিমোল বা তার বেশি হলে অথবা ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খাওয়ার দুই ঘণ্টা পর রক্তে সুগারের পরিমাণ ১১.১ মিলিমোল বা তার বেশি হলে এবং ডায়াবেটিসের প্রধান লক্ষণ বা চিহ্ন থাকলে তাকে ডায়াবেটিক রোগী বলা যাবে।

images 11111111111111111111111

ডায়াবেটিসের কারণ

জেনেটিক বা বংশগত কারণ মুখ্য। এছাড়া অটোইমিউন কারণও আছে। এ দুটি কারণই আমাদের নিয়মের বাইরে। কিছু কারণ আছে যেগুলো প্রতিরোধ করা যায়। যেমন- জন্মের পরপরই গরুর দুধ খাওয়ালে বড় হওয়ার পর সেই বাচ্চার ডায়াবেটিস হতে পারে। এ বয়সে মায়ের দুধ খাওয়ানো উচিত। স্মোকড ফুড বেশি বেশি খেলেও ডায়াবেটিস হতে পারে। বিজ্ঞানীরা কিছু দিন আগেও বলতেন, যারা খুব বেশি কফি খায় তাদের ডায়াবেটিস হতে পারে (ডেভিডসন্স প্রিন্সিপালস অ্যান্ড প্রাকটিস অব মেডিসিন পৃ.-৬৫৩, ১৯তম সংস্করণ)। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, কফি ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সাহায্য করে (ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মেটাবলিজম পৃ.-৪৯ ভলিউম-৬, ২০০৩)। স্ট্রেস বা টেনশনের জন্য কিছু হরমোন বেশি নিঃসৃত হয়, যারা ইনসুলিনের বিপরীতে কাজ করে। এতে ডায়াবেটিস হতে পারে। গর্ভাবস্থায় ভ্রুণ যদি রুবেলা ভাইরাসে আক্রান্ত হয় তবে ভবিষ্যতে সেই বাচ্চার ডায়াবেটিস হতে পারে। গর্ভবতীদের সাবধানে থাকা উচিত যাতে কোনো ধরনের ইনফেকশন না হতে পারে। মাম্পস, কক্সাকি বি৪ ভাইরাস, সাইটোমেগালো ভাইরাস এবং এপেস্টেইনবার ভাইরাসের সংক্রমণেও ডায়াবেটিস হতে পারে। যারা বেশি খান, ওজন খুব বেশি অথচ কাজ কম করেন অর্থাৎ শারীরিক পরিশ্রমের কাজ তেমন একটা করে না তাদের দেহে ইনসুলিন ব্যবহৃত হতে পারে না। মেদভুঁড়িওয়ালা অলস লোকদের ডায়াবেটিস দেখা দেয়। যে গর্ভবতী ধূমপান করেন তাদের গর্ভস্থ সন্তান সঠিক পুষ্টি পায় না। এ বাচ্চারা গর্ভাবস্থা থেকেই অপুষ্টিতে ভোগে। এ বাচ্চাদের ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস হতে পারে। অনেকদিন ধরে স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ ব্যবহার করলে শিশু, তরুণ, মধ্যবয়সী এবং পড়ন্ত বয়সী সবারই ডায়াবেটিস হতে পারে। গর্ভাবস্থায় ফুল বা প্লাসেন্টা থেকে হিউম্যান প্লাসেন্টাল ল্যাকটোজেন, হিউম্যান কোরিয়োনিক গোনাডোট্রোপিন, ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন নামক কতগুলো হরমোন নিঃসৃত হয়। গর্ভাবস্থায় এছাড়া আর কিছু হরমোন যেমন- গ্রোথ হরমোন, গ্লুকাগন, ক্যাটেকোলামাইন, থাইরয়েড হরমোন এবং স্টেরয়েড অন্য সময়ের চেয়ে বেশি পরিমাণে নিঃসৃত হয়। হরমোনগুলো ইনসুলিনের বিপরীতে ক্রিয়া করে। ফলে রক্তে অতিরিক্ত সুগার দেখা দেয়। গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস এভাবে হতে পারে।

কাদের ডায়াবেটিস হতে পারে

* রক্তের সম্পর্কের কারও ডায়াবেটিস থাকলে

* যাদের বয়স চল্লিশের বেশি

* যাদের মেদভুঁড়ি আছে

* যাদের ওজন অত্যধিক

* যারা শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করেন না

* যাদের খাওয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই

* গর্ভবতী মহিলা

* যাদের রক্তে চর্বির পরিমাণ বেশি

* যাদের হাইপ্রেসার বা উচ্চরক্তচাপ আছে

কাদের ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা উচিত

* যাদের বয়স ৪৫ এর ঊর্ধ্বে

* যাদের শরীরের ওজন বেশি

* হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে ওজন হ্রাস পেলে

* অতিরিক্ত পানির পিপাসা

* অতিরিক্ত ক্ষুধা

* অতিরিক্ত প্রস্রাব হওয়া

* শরীর অত্যধিক দুর্বল হয়ে যাওয়া

* গর্ভবতী

* রক্ত সম্পর্কীয় কারও ডায়াবেটিস থাকলে

* পূর্বে ৯ পাউন্ডের বেশি ওজনের সন্তান হলে এমন গর্ভবতীর

* রক্তচাপ ১৪০/৯০ বা এর বেশি হলে

ডায়াবেটিস প্রতিরোধ

ডায়াবেটিস প্রতিরোধের জন্য বিজ্ঞানীরা কিছু পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এগুলো মেনে চললে ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে। প্রথমেই আপনাকে পরীক্ষা করে দেখতে হবে আপনার ডায়াবেটিস আছে কি নেই। যদি ডায়াবেটিস থাকে তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যাবেন। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রেখে জটিলতা প্রতিরোধ করুন। আর যদি ডায়াবেটিস না থাকে তাহলে এখনই প্রতিরোধ পরিকল্পনায় যুক্ত হয়ে যান। উচ্চতা অনুযায়ী ওজন যা থাকা দরকার তা চার্ট দেখে নিন এবং আপনার ওজন কমিয়ে এ আদর্শ ওজনে নিয়ে আসুন। চর্বি জাতীয় খাবার ছেঁটে ফেলুন। শর্করা জাতীয় খাবার পরিমিত খাবেন। শাকসবজি ফলমূল বেশি খাবেন। অতিরিক্ত ময়দা, চিনি, কোমল পানীয় মিষ্টি এড়িয়ে চলুন। হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতারকাটা অথবা যে কোনো খেলাধুলা নিয়মিত করবেন। প্রতিদিনের কর্মকাণ্ড ও খাবারের একটা হিসাব নোট বুকে রাখুন। সপ্তাহ শেষে আপনার জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালরির সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন তা বেশি হয়ে গেল কিনা। এ থেকে নিজেকে সংশোধন করতে পারবেন। প্রতি ৬ মাস পরপর ডায়াবেটিসের পরীক্ষা করে দেখবেন। পরিমিত স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং টেনশনমুক্ত জীবন আপনাকে ডায়াবেটিস থেকে দূরে রাখতে পারবে।

ডায়াবেটিস কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়

* অতিরিক্ত ওজন কমিয়ে ফেলুন

* হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতারকাটা অথবা যে কোনো খেলাধুলা নিয়মিত করুন।

* টেনশনমুক্ত জীবনযাপন করার চেষ্টা করুন।

* চর্বিজাতীয় খাবার একেবারে ছেঁটে ফেলুন।

* শর্করাজাতীয় খাবার পরিমিত খাবেন।

* শাকসবজি, ফল-মূল বেশি খাবেন।

* অতিরিক্ত চিনি, পানীয়, মিষ্টি এড়িয়ে চলুন।

* নবজাতককে গরুর দুধ খাওয়াবেন না।

* প্রতি ছয় মাস পরপর ডায়াবেটিসের পরীক্ষা করুন।

ডা. গোলাম মোর্শেদ


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন