আজ বৃহঃপতিবার, ১৬ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০১ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



কয়লা কেলেঙ্কারি – পেট্রোবাংলার তদন্তে শুভংকরের ফাঁকি

Published on 07 August 2018 | 9: 03 am

পেট্রোবাংলা গঠিত কমিটির তদন্তে কয়লা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়নি। কয়লা গায়েব বা চুরির সঙ্গে জড়িত কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশও করা হয়নি। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘বাতাসের সঙ্গে ডাস্ট উড়ে যাওয়ায় কয়লার মজুদ হ্রাস পেয়েছে। বৃষ্টির পানিতেও মজুদ কয়লা থেকে কোল ডাস্ট বা ফাইন পার্টিকেল ধুয়ে যাচ্ছে। এসব কারণেও কয়লার ঘাটতি হতে পারে।’

রিপোর্টে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৫২৫ টন কয়লা ঘাটতির কথা স্বীকার করে সাবেক এমডিসহ মার্কেটিং ও মাইন অপারেশন বিভাগের কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও অজ্ঞতাকে দায়ী করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০০৫ সালের পর থেকে কখনোই কয়লার মজুদ পরিমাপ করা হয়নি। এ সুযোগে কেউ কয়লা পাচার বা জালিয়াতি করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ব্যাপক তদন্তের প্রয়োজন। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইন্স) মো. কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি ২৫ জুলাই রিপোর্ট দাখিল করে। ওইদিনই পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর কাছে দাখিল করেন। একই দিন ঘটনাটি অধিকতর তদন্তের জন্য জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৩ বছরে কয়লা খনির অনিয়ম, দুর্নীতি তদন্ত করে দেখবে এই কমিটি। পেট্রোবাংলার এই তদন্তের বাইরে দুদকও এ ঘটনায় খনি কর্তৃপক্ষের করা মামলার তদন্ত করছে। এরই মধ্যে খনির সাবেক এমডি নুরুল আওরঙ্গজেবকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এছাড়া সাবেক তিন এমডিসহ ২১ কর্মকর্তার বিদেশ গমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে দুদক।

পেট্রোবাংলার এ রিপোর্ট দুদকের তদন্তে আমলে নেয়া হবে কি না জানতে চাইলে দুদক সচিব ড. শামসুল আরেফিন যুগান্তরকে বলেন, পেট্রোবাংলার রিপোর্ট আমাদের তদন্ত টিম চাইলে পর্যালোচনা করে দেখতে পারে। সেখান থেকে কোনো ক্লু পায় কি না, তা স্টাডি করে দেখা যেতে পারে। তবে তাদের (পেট্রোবাংলা) রিপোর্টের মতো দুদকের তদন্ত রিপোর্ট হবে না। দুদক দুর্নীতির তদন্ত করছে। তদন্তে যাদের অপরাধ বেরিয়ে আসবে, তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

খনির কয়লা গায়েবের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টটি সম্প্রতি যুগান্তরের হাতে এসেছে। পেট্রোবাংলার তদন্ত কমিটির রিপোর্টে সত্য আড়াল করা হয়েছে বলে দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে। এতে তদন্তের নামে শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে। সে কারণে ওই রিপোর্ট দুদকের তদন্তে আমলে নেয়া হচ্ছে না। বরং প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে দায়সারা রিপোর্ট দেয়ায় পেট্রোবাংলার তদন্ত কমিটির তিন সদস্যকে দুদকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

কমিটির রিপোর্টের ভূমিকা অংশে বলা হয়, চলতি বছরের জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খনিতে ১ লাখ ৪৭ হাজার টন কয়লা মজুদ থাকার কথা ছিল। কিন্তু পরিদর্শনকালে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টন কয়লা ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। বিসিএমসিএল’র তথ্যমতে, খনিতে উত্তোলিত কয়লা মজুদ যথাযথ থাকলে তা দিয়ে পার্শ্ববর্তী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৫০ দিনের নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতো। কিন্তু এরই মধ্যে কয়লা ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজ দারুণভাবে ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পেট্রোবাংলাকে এই বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদানের কারণে পেট্রোবাংলা তথা সরকারের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

তদন্ত কমিটির পর্যালোচনা : কমিটি বিসিএমসিএলের কাছ থেকে যে তথ্য পেয়েছে তার বরাত দিয়ে রিপোর্টে উল্লেখ করে বলেছে, খনি কর্তৃপক্ষ বছরভিত্তিক কয়লার উৎপাদন, বিক্রয় ও মজুদের দালিলিক তথ্যাদি সংরক্ষণ করলেও মজুদ ও ঘাটতির বছরভিত্তিক কোনো তথ্য নেই তাদের কাছে। শুরু থেকে উৎপাদিত কয়লা পিডিবির তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরবরাহ করা হচ্ছে। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদিত কয়লার ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ ব্যবহার করে। ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে বড়পুকুরিয়ায় ২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন একটি ইউনিট চালু হওয়ায় পিডিবির কয়লার চাহিদা বৃদ্ধি পায়। ফলে সব কয়লাই পিডিবির কাছে সরবরাহ করা হয়। পিডিবির জন্য কয়লা মুজদ রেখে স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে কয়লা বিক্রি করা হতো।

কমিটির পক্ষ থেকে খনি পরিদর্শনকালে দেখা যায়, বিসিএমসিএলের কোল স্টক ইয়ার্ডে যে পরিমাণ কয়লা রয়েছে তা দিয়ে ১০-১২ দিন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানো যাবে। অর্থাৎ কোল ইয়ার্ডে কয়লা বিশাল ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে। বিসিএমসিএলের তথ্যমতে, কোল ইয়ার্ডে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৫২৫ দশমিক ৫৪ টন কয়লার ঘাটতি রয়েছে। খনি পরিদর্শনকালে জানা যায়, কয়লার অভাবে ২২ জুলাই বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। কমিটি কয়লার ঘাটতির বিষয়ে বিসিএমসিএলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে জানতে পারে, শুরু থেকে কয়লা উৎপাদনের পরিমাণ থেকে বিক্রয় বিয়োগ করে মজুদ হিসাব করা হয়েছে। কোল ইয়ার্ড কোনো সময়ের জন্য সম্পূর্ণ খালি হয়নি। তাই মজুদ কয়লার কোনো পরিমাপ গ্রহণ করা হয়নি। কোল স্টক ইয়ার্ড সম্পূর্ণ খালি না থাকায় দৃশ্যমান কয়লার পরিমাপকে গাণিতিক হিসাবে মজুদ বিবেচনা করা হতো।

১ লাখ ৪৪ হাজার ৫২৫ টন কয়লার ঘাটতির বিষয়ে খনির কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে রিপোর্টে বলা হয়, ২০০৫ সাল থেকে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা উৎপাদন শুরু হয়। উৎপাদিত কয়লার বেশিরভাগই পিডিবির আওতাধীন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়। অবশিষ্ট কয়লা স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হয়। বিভিন্ন সময়ে পিডিবির জন্য স্টক ইয়ার্ডে বিশাল পরিমাণ কয়লা মজুদ রাখতে হয়। স্টক ইয়ার্ডের ১৭ একর জায়গায় কয়লা উৎপাদনের শুরু থেকে প্রায়ই বিপুল পরিমাণ কয়লা মজুদ রাখতে হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষ ৩-৪ লাখ টন কয়লাও মজুদ রাখতে হয়েছে, যা ১৭ একর জায়গায় স্টক ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত। স্টক ইয়ার্ডে মজুদ থাকাকালীন বাতাসে অক্সিজেনের উপস্থিতিতে কয়লার অক্সিডেশন সংঘটিত হয়। ২০০৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত অক্সিডেন্টের কারণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কয়লার ঘাটতি হয়েছে। স্টক ইয়ার্ডে কয়লার স্বাভাবিক মজুদের উচ্চতা ৫ মিটার হওয়ার কথা থাকলেও কখনও কখনও ১০ থেকে ১৫ মিটার উচ্চতায় সংরক্ষণ করতে হয়েছে। এমনকি কখনও কখনও স্টক ইয়ার্ডে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় স্টক ব্যারাকের মাঠেও কয়লা মজুদ রাখতে হয়েছে। এছাড়া স্টক ইয়ার্ডে মজুদ কয়লা থেকে বৃষ্টির পানিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কোল ডাস্ট / ফাইন পার্টিকেল ওয়াশ আউট হয়ে যায়। যার পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। উত্তোলনের পর ভূপৃষ্ঠে মজুদকৃত কয়লার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডাস্ট বা ফাইন পার্টিকেল থাকায় শুষ্ক মৌসুমে বাতাসের সঙ্গে কিছু পরিমাণ ডাস্ট উড়ে যায়, যা কয়লার মজুদ হ্রাস করেছে। খনির কয়লায় পানিবাহী স্তর থেকে অনবরত পানি প্রবেশের ফলে কয়লার সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানির উপস্থিতি (আর্দ্রতা) রয়েছে। কয়লা দীর্ঘদিন সারফেসে থাকায় আর্দ্রতা কমে গিয়ে এর ওজন হ্রাস করে। এসব কারণে কয়লার পরিমাণ হ্রাস হয়ে থাকলেও বাস্তবে কখনও এর সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি। শুরু থেকেই গাণিতিকভাবে এর মজুদ দেখানো হয়েছে। কিন্তু ২০১৭ সালের নভেম্বরে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার তৃতীয় ইউনিট চালুর পর পিডিবির কয়লার চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যায়। অপরদিকে শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে মে-জুনে ২৩ দিন উৎপাদন বন্ধ থাকে। একই সঙ্গে ফেইস শিফটিংয়ের কারণে ১৫ জুন থেকে উৎপাদন বন্ধ থাকায় ২০০৫ সালে যাত্রা শুরুর পর প্রথমবারের মতো খনির কোল স্টক ইয়ার্ড খালি হয়। সেই সময় ১ লাখ ৪৪ হাজার ৫২৫ টন কয়লার ঘাটতির বিষয়টি দৃশ্যমান হয়, যা ২০০৫ সাল থেকে অদ্যাবধি গাণিতিক মজুদের সঙ্গে কয়লার বর্ণিত ঘাটতি সমন্বয় না করার ফলে হয়েছে বলে জানানো হয়।

কয়লা বিক্রির পদ্ধতি সম্পর্কে তারা জানায়, কোম্পানির মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস ডিভিশন প্রথমে সংশ্লিষ্ট ক্রেতার আবেদন যাচাই-বাছাই করে ডেলিভারি আদেশ প্রদান করে। ওই ডেলিভারি আদেশ অনুযায়ী কয়লা সরবরাহের অনুরোধ জানিয়ে তা মাইন অপারেশন বিভাগে পাঠান। ডেলিভারি আদেশের কপি প্রশাসন বিভাগকেও দেয়া হয়। প্রশাসন বিভাগ ওই ডেলিভারি আদেশ যাচাই করে কোল ইয়ার্ডে ট্রাক প্রবেশের অনুমতি দেয়। আর কোল ওয়েয়িং কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট ক্রেতার ভোটার আইডি কার্ড, আবেদনপত্রের ছবি ও স্বাক্ষর যাচাই করে কয়লা ডেলিভারি করে। নিয়ম অনুযায়ী ওয়েয়িং স্কেলে ট্রাকের নম্বর অনুযায়ী খালি ট্রাক এবং কয়লাবোঝাই ট্রাক ওজন করে এর পার্থক্য থেকে কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে কয়লার পরিমাণ নির্ণয় করে একটি ডেলিভারি স্টেটমেন্ট প্রিন্ট করা হয়। ফলে বাইরে থেকে অনাকাক্সিক্ষতভাবে কোনো ট্রাক বা যানবাহন কোল ইয়ার্ডে প্রবেশের সুযোগ নেই। খনির কোল ইয়ার্ডে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকায় সেখান থেকে কয়লা চুরি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

রিপোর্টে বলা হয়, কমিটি বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও জার্নালে প্রকাশিত তথ্যাদি পর্যালোচনা করে জানতে পারে, কয়লা উৎপাদনের পর পরিবহন ও উন্মুক্ত স্থানে মজুদের সময় স্পনটেনিয়াস কম্বাসসন/ অক্সিডেশন, বৃষ্টির পানিতে ওয়াশ আউট, বাতাসের মাধ্যমে ফাইন পার্টিকেল ও ডাস্ট উড়ে যাওয়ার মাধ্যমে এবং ভূমির সঙ্গে স্টক ইয়ার্ডের নিুস্তরের কয়লার মিশ্রণের ফলে কয়লার ঘাটতি হয়ে থাকে।

কমিটির পর্যবেক্ষণ : কমিটি তাদের তদন্ত রিপোর্টে পর্যবেক্ষণ অংশে বলেছে, ২০০৪ সালের জুন থেকে চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত কয়লা উৎপাদন, বিক্রয় এবং মজুদের পরিমাণ কোম্পানির বার্ষিক রিপোর্টে উল্লেখ থাকলেও মজুদের পরিমাণ আজ পর্যন্ত ফিজিক্যাল কোল স্টক ভেরিফিকেশন গণনা করা হয়নি। এমনকি শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কয়লার মুজদের পরিমাণ গণনা বা পরিমাপ করা হয়নি। শুধু কাগজে রক্ষিত তথ্যের ভিত্তিতে স্টকের পরিমাণ বিভিন্ন সময় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়।

রিপোর্টে বলা হয়, ঘাটতিকৃত কয়লার পরিমাণ ১ লাখ ৪৪ হাজার ৫২৫ টন। বর্তমানে পিডিবির কাছে প্রতি টন কয়লা ১৩৩ মার্কিন ডলারে বিক্রি করা হচ্ছে। অন্যদিকে স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে কয়লার বিক্রয়মূল্য প্রতি টন ১৫ হাজার ৯২১ টাকা। পিডিবির হার অনুযায়ী, ১ লাখ ৪৪ হাজার ৫২৫ টন কয়লার মূল্য (প্রতি ডলার ৮৩ টাকা হিসাবে) ১৫৯ কোটি ৫৪ লাখ ১৭ হাজার ৩২৫ টাকা। অন্যদিকে স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে বিক্রয়মূল্য অনুযায়ী ২৩০ কোটি ৯ লাখ ৯০ হাজার ৯৬৩ টাকা।

রিপোর্টে বলা হয়, ২০০৮-২০০৯ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ে উৎপাদিত কয়লার ৬৬ ভাগ পিডিবিকে প্রদান করা হয়েছে। আর পিডিবি ছাড়া অন্য গ্রাহকের কাছে উৎপাদনের ৩৩ ভাগ কয়লা বিক্রয় করা হয়েছে। উৎপাদিত কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য মজুদ না থাকার কয়েকটি কারণ খুঁজে পায় তদন্ত কমিটি। এর মধ্যে রয়েছে কোম্পানি কর্তৃক শুরু থেকে অদ্যাবধি ফিজিক্যাল স্টক ভেরিফিকেশন না করা, আন্তর্জাতিকভাবে অনুসরণযোগ্য সিস্টেম লস হিসাবভুক্ত না করা, রাষ্ট্রীয় স্বার্থে পিডিবির চাহিদা ফাস্ট প্রায়োরিটি হিসেবে বিবেচনা না করে অন্যান্য গ্রাহকের কাছে কয়লা বিক্রি করা, সর্বোপরি কোম্পানি কর্তৃপক্ষের অদক্ষতা, অজ্ঞতা ও দায়িত্বে অবহেলা। তদন্তকালে আরও জানা যায়, বিভিন্ন মেয়াদে মজুদকৃত কয়লা থেকে কী পরিমাণ লস হয়েছে, তা নিরূপণের জন্য কোম্পানির পক্ষ থেকে ২০১৩ সালে ৬ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন দাখিল করেনি। কমিটি যদি যথাসময়ে ওই প্রতিবেদন দাখিল করত তবে আগে থেকে ঘাটতির পরিমাণ নিরূপিত হতো। কিন্তু কমিটির গাফিলতির কারণে তা হয়নি।

ঘাটতির বিষয়টি পর্যালোচনায় তদন্ত কমিটি মনে করে, এ ঘাটতির পরিমাণ খনি উৎপাদনের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে হয়েছে। যেহেতু কখনোই কয়লার মজুদ পরিমাপ করা হয়নি, তাই এ সুযোগে কেউ কয়লা পাচার বা জালিয়াতি করেছে কি না তা খতিয়ে দেখার জন্য ব্যাপকভাবে তদন্তের প্রয়োজন।

তদন্ত কমিটির সুপারিশ : তদন্ত কমিটি মনে করে, ২০০৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষই কয়লার ফিজিক্যাল স্টক ভেরিফিকেশন কার্যক্রম সম্পাদনে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেননি। এ বিষয়ে খনির মাইন অপারেশন ডিভিশন, মার্কেটিং ডিভিশন এবং অ্যাকাউন্টস ডিভিশন প্রধানদের অদক্ষতা ও অজ্ঞতা রয়েছে। একটি বিভাগ থেকেও ফিজিক্যাল স্টক ভেরিফিকেশন করার জন্য নথি উপস্থাপিত হয়নি। এক্ষেত্রে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির মার্কেটিং ও মাইন অপারেশন বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তারা দায়ী বলে কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়। এছাড়া কয়লার মজুদ না থাকা সত্ত্বেও এ সম্পর্কে ধারাবাহিক বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে বিসিএমসিএলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক দায়ী বলে কমিটি মনে করছে।

ভবিষ্যতে কয়লার উৎপাদন, বিক্রয় ও মজুদের পরিমাণ ছয় মাস বা বাৎসরিক ইনভেনন্টরির মাধ্যমে নিরূপণ করার জন্য কমিটির পক্ষ থেকে সুপারিশ করা হয়। স্বল্পতার কারণে কমিটি এ ঘটনা ব্যাপকভাবে তদন্ত করতে পারেনি। তাই এ বিষয়ে অধিকতর তদন্তের জন্য সুপারিশ করে কমিটি।

খনি পরিদর্শনে দুদকের টিম : এদিকে দুদকের পরিচালক কাজী শফিকুল আলম ও উপপরিচালক মো. সামসুল আলমের নেতৃত্বে দুদকের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত টিম সোমবার দিনাজপুরে কয়লা খনি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জব্দ করে। তারা কয়লার উৎপাদন ও বিপণনের হিসাব সংক্রান্ত যাবতীয় দলিলপত্র জব্দ করে। বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। খনি পরিদর্শন শেষে দুদক পরিচালক কাজী শফিকুল আলম বলেন, তদন্তের অংশ হিসেবে এখানে পরিদর্শন করা হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে কমিশনে খনির কয়লা দুর্নীতির রিপোর্ট দাখিল করা হবে।

264Shares


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন