আজ বৃহঃপতিবার, ১৬ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০১ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



যিনি সৃষ্টি করে তাকে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ করেছেন — আল-আ়লা ১-৫ পর্ব ১

Published on 26 July 2018 | 8: 50 am

তোমার রবের মহত্ত্ব ঘোষণা করো। যিনি সৃষ্টি করে তাকে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ করেছেন। যিনি পরিমাপ নির্ধারণ করে দিয়ে পথ দেখিয়েছেন। যিনি তৃণাদি বের করে এনে ঘন-কালো সবুজে পরিণত করেন। —আল-আ়লা ১-৫

সুরাহ আল-আ়লা’য় আমরা বহু ধরনের স্রষ্টা বিদ্বেষীদের প্রশ্নের উত্তর পাবো। আজকে যদি আমরা চারিদিকে তাকিয়ে দেখি কত ধরনের মানুষ স্রষ্টাকে অস্বীকার করে নানা ধরনের প্রশ্ন, তর্ক, প্রমাণ নিয়ে হাজির হয়েছে, তাহলে আমরা তাদেরকে কয়েকটি দলে ভাগ করতে পারবো—

উঠতি নাস্তিক: আল্লাহ ﷻ যদি সবকিছু সৃষ্টি করে থাকে, তাহলে তাকে সৃষ্টি করলো কে?

হতাশাগ্রস্থ নাস্তিক: সত্যিই যদি আল্লাহ ﷻ থাকে, তাহলে পৃথিবীতে এত দুঃখ, কষ্ট, মুসলিমদের উপর এত অত্যাচার, এত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি হয় কেন? আল্লাহ ﷻ এগুলো হতে দেয় কেন?

বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নাস্তিক: আল্লাহ ﷻ বলে কেউ আছে —এর পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। এখন পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞান সম্মত প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, সৃষ্টিজগৎ কোনো অতিবুদ্ধিমান সত্তা বানিয়েছে। সুতরাং আল্লাহ ﷻ বলে কেউ নেই।

আঁতেল নাস্তিক: আল্লাহ ﷻ ধারণাটা আসলে মানুষের কল্পনা প্রসূত। মানুষ যখন কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা ব্যাখ্যা করতে পারত না, তখন তারা মনে করত: নিশ্চয়ই কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তা রয়েছে, যে এসব ঘটাচ্ছে। একারণে মানুষ এমন কোনো সত্তাকে কল্পনা করে নেয়, যার কোনো দুর্বলতা নেই। যেমন: তার ক্ষুধা, ঘুম পায় না; সে মারা যায় না; কেউ তাকে জন্ম দেয় না; তার কোনো শরীর নেই যেখানে সে আবদ্ধ; তার কোনো আকার নেই, যা তাকে দুর্বল করে দেবে। এরকম নিরাকার, অবিনশ্বর, অসীম ক্ষমতা ইত্যাদি যত সব কল্পনাতীত গুণ মানুষ চিন্তা করে বের করতে পেরেছে, তার সবকিছু ব্যবহার করে সে এক স্রষ্টা সৃষ্টি করেছে। এর মানে তো এই না যে, স্রষ্টা বলে আসলেই কেউ আছে? এগুলো সবই মানুষের ধারণা।

ঘৃণাস্তিক: ধর্মের নামে যে পরিমাণ মানুষ হত্যা হয়েছে, আর অন্য কোনোভাবে এত মানুষ মারা যায়নি। ধর্মের কারণে মানুষে মানুষে ঝগড়া, ঘৃণা, মারামারি, দলাদলি, এক জাতি আরেক জাতিকে মেরে শেষ করে ফেলা —এমন কোনো খারাপ কাজ নেই যা হয় না। পৃথিবীতে যদি কোনো ধর্ম না থাকতো, তাহলে মানুষে-মানুষে এত ভেদাভেদ, এত রক্তারক্তি কিছুই হতো না। যদি আল্লাহ বলে আসলেই কেউ থাকে, তাহলে ধর্মের নামে এত হত্যা কেন হয়? ধার্মিকরা এত অসাধু হয় কেন? যতসব চোর, লম্পট, প্রতারকরা দেখা যায় দাঁড়ি-টুপি পড়ে মসজিদে নামাজ ঠিকই পড়ে।

—এগুলো হলো বিজ্ঞানে যারা অ-জ্ঞান, তাদের উর্বর মস্তিষ্ক থেকে বের হওয়া যুক্তি, তর্ক। আবার, বিজ্ঞানী মহলে যারা স্রষ্টা বিদ্বেষী রয়েছেন, তাদের বক্তব্যগুলোও একই রকমের অবাস্তব, বৈজ্ঞানিক পরিভাষার জালে লুকোনো ধোঁকাবাজি—

মহাকাশ বিজ্ঞানী: মহাবিশ্ব শূন্য থেকে নিজে থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে কিছু ছিল না। এর কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই। Quantum Vaccum ‘কোয়ান্টাম শূন্যতা’ থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে।

পদার্থবিজ্ঞানী: মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে এক অতি-মহাবিশ্ব থেকে। একে কোনো সৃষ্টিকর্তা বানায় নি। এক অতি-মহাবিশ্ব, যাকে মাল্টিভার্স বলা হয়, সেখানে প্রতিনিয়ত সকল ধরনের সৃষ্টি জগত তৈরি হয়। সকল সম্ভাবনা সেখানে বিদ্যমান। এরকম অসীম সংখ্যক মহাবিশ্বের একটিতে আমরা রয়েছি। আরেকটি মহাবিশ্বে হয়ত আমারই মত একজন রয়েছে, যে আমার থেকে একটু লম্বা। আরেকটিতে আমার থেকে একটু খাটো। আরেকটিতে আমার জন্মই হয়নি। মোট কথা যত কিছুই ঘটা সম্ভব, তার সবই ঘটেছে, ঘটছে এবং ঘটবে।

দার্শনিক: মহাবিশ্ব অনন্তকাল থেকে রয়েছে। পদার্থ এবং শক্তি অবিনশ্বর। এদের সৃষ্টি বা ধ্বংস হয় না। এদের শুধু রূপান্তর হয়। সময় অসীম।

জীববিজ্ঞানী: কোনো অতিবুদ্ধিমান সত্তা মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণী বা উদ্ভিদ সৃষ্টি করেনি। এগুলো সবই প্রাকৃতিক নিয়মের ফলাফল। বিবর্তনের ফলে এক কোষী প্রাণী থেকে বহুকোষী প্রাণী তৈরি হয়েছে এবং কোটি কোটি বছর ধরে তা উন্নত হতে হতে একসময় বানর বা শিম্পাঞ্জি থেকে মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণী তৈরি হয়েছে। মানুষ কোনো বিশেষ প্রাণী নয়, শুধুই বানর থেকে বিবর্তনের ফলে একটু উন্নত প্রাণী।

ইতিহাসবিদ: যদি কোনো বুদ্ধিমান সত্তা মহাবিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করতই, তাহলে ইতিহাসে অনেক ঘটনা থাকতো, যা থেকে বোঝা যেত: কোনো বুদ্ধিমান সত্তা সেগুলো ঘটিয়েছে, যা কোনোভাবেই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে ঘটা সম্ভব নয়। এরকম ঘটনা ঘটতে তো দেখা যাচ্ছে না। তাহলে প্রমাণ কী যে, আল্লাহ تعالى বলে সত্যিই কেউ আছে?

এবার দেখা যাক, এই যুক্তি-তর্কগুলো কতখানি বাস্তব এবং বৈজ্ঞানিক—

মহাকাশবিজ্ঞানী: মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে শূন্য থেকে

সবচেয়ে অবৈজ্ঞানিক এবং অবাস্তব দাবি হলো: মহাবিশ্ব নিজে থেকেই, শূন্য থেকে সৃষ্টি হয়েছে, এর কোনো কারণ বা উৎপাদক নেই। একে সহজ ভাষায় বললে, আপনার মা নিজেই নিজেকে জন্ম দিয়েছেন, কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। একদিন তিনি ছিলেন না। তারপর হঠাৎ করে তিনি নিজেই নিজেকে জন্ম দিলেন। এর মানে দাঁড়ায়: কোনো জিনিসের একই সাথে অস্তিত্ব থাকতে পারে, আবার অস্তিত্ব নাও থাকতে পারে এবং সে নিজেই নিজেকে অস্তিত্ব দিতে পারে, যখন কিনা তার কোনো অস্তিত্বই ছিল না!

  1. J. Zwart তার বইয়ে, এটা কত অবাস্তব একটা দাবি, তা দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত মন্তব্য করেছেন—

“If there is anything we find inconceivable it is that something could arise from nothing.”
যদি অবিশ্বাস্য বলে কিছু থাকে, তাহলে সেটা হলো যে, কোনো কিছু শূন্য থেকে উৎপত্তি হতে পারে।[২১৬]

এরপর, বিজ্ঞানীরা তাদের খেলা পালটিয়ে ফেলেন। প্রফেসর স্টিফেন হকিন্স, লরেন্স ক্রাউস-এর মতো বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা বলেন, শূন্য বলতে আসলে Quantum Vaccum বা কোয়ান্টাম শূন্যতা বোঝানো হচ্ছে। কোয়ান্টাম শূন্যতা হলো ভৌত কোনো কিছুর অনুপস্থিতি। এটি সব জায়গায় বিরাজমান একটি স্পন্দিত শক্তির ক্ষেত্র।

“…is not ‘nothing’; it is a structured and highly active entity.”
“এটা ঠিক  ‘শূন্য’ নয়; এটি বিশেষ গঠনের অত্যন্ত সক্রিয় অস্তিত্ব”[২১৭]

তাহলে প্রশ্ন হলো, এই ‘বিশেষ গঠনের অত্যন্ত সক্রিয় অস্তিত্ব’ আসলো কোথা থেকে? কে একে সৃষ্টি করলো? কীভাবে এটি এমন সব গুণ পেল, যা থেকে এটি এক বিশাল মহাবিশ্ব বিশেষভাবে ডিজাইন করে তৈরি করতে পারে?

এগুলো সবই হচ্ছে স্রষ্টাকে অস্বীকার করার জন্য নানা অজুহাত। মহাবিশ্বের যে সৃষ্টি হয়েছে, সেটার কোনো সঠিক ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীরা দিতে পারছে না। আবার একই সাথে মানতে পারছে না যে, স্রষ্টা বলে কেউ আছে। একজন বিজ্ঞানীর স্রষ্টায় বিশ্বাস করা মানে ভয়ংকর ব্যাপার। সে বিজ্ঞানী মহলের দুই-তৃতীয়াংশের কাছে হাসির পাত্র হয়ে যাবে। তার প্রজেক্টগুলোর ফান্ডিং হুমকির মুখে পড়বে। তার ক্যারিয়ার অনিশ্চিত হয়ে যাবে। তাহলে কী করা যায়? ‘কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়ম’ নামের এক মহাজটিল অস্তিত্ব জন্ম দেই। তাহলে বেশ কিছুদিন এটা নিয়ে মানুষকে ঘোল খাওয়ানো যাবে।

পদার্থবিজ্ঞানী: মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে এক অতি-মহাবিশ্ব Multiverse (মাল্টিভার্স) থেকে

মহাবিশ্বে কিছু অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিমাপ রয়েছে, যা মহাবিশ্বের সবকিছুর অস্তিত্বর মূলে কাজ করে। যেমন, অভিকর্ষ বলের পরিমাপ, পরমাণুর কণিকাগুলোর মধ্যে আকর্ষণ বলের পরিমাপ, ইলেকট্রন এবং প্রোটনের চার্জ, তড়িৎ চুম্বকীয় বলের ধ্রুবক, প্রোটনের ভরের অনুপাতে ইলেকট্রনের সংখ্যা, প্রোটনের সংখ্যার অনুপাতে ইলেকট্রনের সংখ্যা, কার্বন পরমাণুর বিশেষ গঠন ইত্যাদি। এই সবগুলো পরিমাপ যদি আজকে ঠিক যেভাবে আছে, সেভাবে না থেকে সামান্যও এদিক-ওদিক হতো, তাহলে প্রাণ সৃষ্টি কোনোদিন সম্ভব হতো না।

এখন, বিজ্ঞানীরা কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করতে পারছেন না: কীভাবে আমাদের এই মহাবিশ্বটি এত নিখুঁতভাবে, এত পরিকল্পিতভাবে প্রাণের সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করে তৈরি করা হয়েছে।

যেমন, অভিকর্ষ বল যদি ১০০ কোটি ভাগের এক ভাগ বেশি বা কম হতো, তাহলে কোনো গ্রহ সৃষ্টি হতো না, প্রাণের সৃষ্টির কোনো সম্ভাবনাই থাকতো না। বিগ ব্যাংগের সময় যে শক্তির প্রয়োজন ছিল, সেটা যদি ১০৬০ ভাগের এক ভাগ এদিক ওদিক হতো, তাহলে অভিকর্ষ বলের সাথে অসামঞ্জস্য এত বেশি হতো যে, এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়ে বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারতো না। ১০৬০ হচ্ছে  ১ এর পরে ৬০টি শূন্য বসালে যে বিশাল সংখ্যা হয়, সেটি। বিগ ব্যাংগের মুহূর্তে প্ল্যাঙ্ক সময়ের পর মোট পদার্থের যে ঘনত্ব ছিল, সেটা যদি ১০৫০ ভাগের এক ভাগও এদিক ওদিক হতো, তাহলে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হতো না, যাতে আজকের মতো নক্ষত্র, গ্রহ এবং প্রাণ সৃষ্টি হতো।[৪২০]

—এরকম শত শত ভারসাম্য কীভাবে কাকতালীয় ভাবে মিলে গেলো? কীভাবে এগুলো সব নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা হল, যেন নক্ষত্র, গ্রহ, পানি, ভারী মৌলিক পদার্থ সৃষ্টি হয়ে একদিন প্রাণের সৃষ্টি হয়, যেই প্রাণ বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে একদিন মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণীর জন্ম দিবে? — এর পক্ষে কোনো ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীরা এখনও দিতে পারছে না।

এমনকি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী Steven Weinberg বলেন—

…how surprising it is that the laws of nature and the initial conditions of the universe should allow for the existence of beings who could observe it. Life as we know it would be impossible if any one of several physical quantities had slightly different values.”
কী অবাক করার মত ব্যাপার এটা যে, প্রাকৃতিক নিয়ম এবং মহাবিশ্বের আদি অবস্থা এমন ছিল যে, এগুলো পর্যবেক্ষণ করার মত একটি প্রাণীর সৃষ্টি তা হতে দেবে। প্রাণ বলতে আমরা যা বুঝি, তা পুরোপুরি অসম্ভব হতো, যদি ভৌত পরিমাণগুলো একটুও অন্য রকম হতো।

—এতগুলো সূক্ষ্ম ভারসাম্য এক সাথে মিলে যাওয়া যে কোনোভাবেই গাণিতিক সম্ভাবনার মধ্যে পড়ে না —এটা বিজ্ঞানীরা বুঝে গেছে। তখন, তারা এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এক নতুন তত্ত্ব নিয়ে এসেছে: আমাদের মহাবিশ্ব আসলে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন মহাবিশ্বের মধ্যে একটি। একেক মহাবিশ্বে পদার্থ বিজ্ঞানের ধ্রুবকগুলোর একেক মান রয়েছে। কিছু মহাবিশ্ব বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না, কারণ সেই মহাবিশ্বে পদার্থবিজ্ঞানের ধ্রুবকগুলোর মানগুলোর মধ্যে ভারসাম্য থাকে না। আর কিছু মহাবিশ্বে পদার্থবিজ্ঞানের ধ্রুবকগুলোর মান এমন হয় যে, সেখানে কোনোদিন সূর্যের মতো একটি তারা এবং পৃথিবীর মতো একটি গ্রহ তৈরি হতে পারে না। যার ফলে সেই সব মহাবিশ্বে কোনো প্রাণ সৃষ্টি হয় না। পদার্থবিজ্ঞানের সুত্রগুলোর যতগুলো সম্ভাব্য সম্ভাবনা হওয়া সম্ভব, সেটা যতই কল্পনাতীত, অবাস্তব একটা ব্যাপার হোক না কেন, যা কিছু হওয়া সম্ভব, তার সবকিছুই সেই মাল্টিভারসের ‘ল্যান্ডস্কেপ’-এ কোথাও না কোথাও হয়েছে এবং হয়ে যাচ্ছে। আমরা মানুষেরা, সেই অসীম সংখ্যক সম্ভাবনাগুলোর একটি, যেখানে পদার্থবিজ্ঞানের হাজার হাজার নিয়ম কাকতালীয়ভাবে, কল্পনাতীত সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করে কোনোভাবে মিলে গেছে এবং যার কারণে আজকে আমরা এই মহাবিশ্বে দাঁড়িয়ে নিজেদেরকে উপলব্ধি করতে পারছি।[৪২০]

তাদের দাবিটা হচ্ছে এরকম: ধরুন কোনো এক সমুদ্রের তীরে বালুতে আপনি একটি মোবাইল ফোন পড়ে থাকতে দেখে তাদেরকে জিগ্যেস করলেন, এই মোবাইল ফোনটা নিশ্চয়ই কোনো বুদ্ধিমান সত্ত্বা বানিয়েছে। তারা বলবে, “না, কোটি কোটি বছর ধরে সমুদ্রের পানি বালুতে আছড়িয়ে পড়তে পড়তে এবং ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাতের ফলে বালুতে রায়ায়নিক বিক্রিয়া হয়ে একসময় এই মোবাইল ফোনটি তৈরি হয়েছে। এটি কোনো বুদ্ধিমান সত্ত্বা বানায়নি, এটি পদার্থবিজ্ঞানের সুত্রগুলোর অসীম সব সম্ভাবনাগুলোর একটি। এরকম কোটি কোটি সমুদ্রের তীর আছে, যেগুলোর একটিতে হয়তো শুধুই একটা প্লাস্টিকের বাক্স তৈরি হয়েছে, পুরো মোবাইল ফোন তৈরি হতে পারেনি। কিছু তীর আছে যেখানে হয়তো একটা স্ক্রিন পর্যন্ত তৈরি হয়েছে, কিন্তু কোনো বাটন তৈরি হয়নি। আপনি, আমি আসলে সেই অসীম সব সমুদ্রের তীরগুলোর বিশেষ একটিতে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে পদার্থ বিজ্ঞানের সব সম্ভাবনা কাকতালীয় ভাবে মিলে গেছে, যে কারণে এই তীরে একটি সম্পূর্ণ মোবাইল ফোন সৃষ্টি হয়েছে।” —এই হচ্ছে মাল্টিভার্স থিওরি।

আরেকটি প্রশ্ন হলো, যদি মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয় মাল্টিভার্স থেকে, তাহলে সেই মাল্টিভার্স সৃষ্টি হলো কীভাবে? কীভাবে মাল্টিভার্স এমন সব বৈশিষ্ট্য পেল যে, তা একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন মহাবিশ্ব তৈরি করতে পারে? কে শেখালো তাকে বিশাল সব জগত সৃষ্টি করার অতিমহাজাগতিক নিয়ম? — কোনো উত্তর নেই।

দার্শনিক: মহাবিশ্ব অনন্তকাল থেকে রয়েছে

Bertrand Russell এর মতো কিছু বিখ্যাত ফিলসফার এই ধারণাটিকে বেশ জনপ্রিয় করার চেষ্টা করেছেন। তাদের দাবি হচ্ছে, মহাবিশ্ব আদি এবং অনন্ত। এটি অসীম সময় ধরে চলছে এবং চলবে।

‘অসীম’ ধারণাটি আসলে একটি ধারণা মাত্র। বাস্তব জীবনে কোনো ‘অসীম’ বলে কিছু নেই, কারণ অসীম ধারণাটি নানা সমস্যার জন্ম দেয়। যেমন ধরুন, আপনার অসীম সংখ্যক বল রয়েছে। যদি সেখান থেকে দুটি বল নিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে কী দাঁড়ায়? “অসিম – ২ = ?” সংখ্যক বল রয়েছে? যদি তাই হয়, তাহলে আমাদের গুণতে পারা উচিত কয়টা বল বাকি থাকলো। যদি গুণতে পারি, তার মানে দাঁড়ায় সেটা এমন একটা সংখ্যা, যার সাথে ২ যোগ করলে হঠাৎ করে সেটা অসীম সংখ্যা হয়ে যায় —যা অবাস্তব। সুতরাং, অসীম ধারণাটা একটি ধারণা মাত্র, প্রকৃতিতে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। বিখ্যাত জার্মান গণিতবিদ David Hilbert বলেছেন—

“The infinite is nowhere to be found in reality. It neither exists in nature nor provides a legitimate basis for rational thought…the role that remains for the infinite to play is solely that of an idea.”
বাস্তবে অসীমের কোনো অস্তিত্ব নেই। এর প্রকৃতিতে কোনো অস্তিত্ব নেই, এটা কোনো যুক্তিযুক্ত চিন্তাভাবনার গ্রহণযোগ্য ভিত্তিও দেয় না… অসীমের একমাত্র ভূমিকা হলো এটি একটি ধারণা মাত্র।[২১৮]

২) আপনাকে এক মিটার লম্বা একটা লাঠি দেওয়া হলো। এখন আপনাকে বলা হলো, তাকে সমান দুইভাগ করতে। তার একটি ভাগকে আবার সমান দুই ভাগ করতে। তার একটি ভাগ নিয়ে আবার সেটাকে সমান দুই ভাগ করতে।  এভাবে অসীম সময় পর্যন্ত ভাগ করে যেতে হবে। আপনি কি কোনোদিন অসীম-ক্ষুদ্রতম ভাগটি পর্যন্ত যেতে পারবেন? সুতরাং দেখা যায়, অসীম একটি অবাস্তব ধারণা। এর কোনো বাস্তবতা নেই। এরিস্টটল বলেছেন—

“…the infinite is potential, never actual”
“অসীম একটি সম্ভাবনা মাত্র, এর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই”[২১৯]

সুতরাং আমরা দেখতে পাই, কোনো ঘটনার পেছন দিকে অসীম সময় পর্যন্ত যাওয়া যায় না। সুতরাং মহাবিশ্ব কখনই অসীম সময় পর্যন্ত ছিল না, মহাবিশ্ব সসীম। সুতরাং মহাবিশ্বের একটি সূচনা রয়েছে। কেউ একজন আছেন, যিনি মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন।

যিনি সৃষ্টি করে তাকে সুসামঞ্জস্য করেছেন। যিনি পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়ে পথ দেখিয়েছেন। — আল-আ়লা ১-৩

ইতিহাসবিদ — ইতিহাসে কোনো অলৌকিক ঘটনার প্রমাণ নেই

এরচেয়ে বড় মিথ্যা কথা আর কিছু হতে পারে না। এখন পর্যন্ত কেউ প্রমাণ করতে পারেনি কীভাবে আদ, ছামুদ, ফিরাউন জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং ইতিহাসবিদরা বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের তত্ত্ব দেখাচ্ছেন। কিন্তু যেই ভয়ংকর পর্যায়ের প্রাকৃতিক দুর্যোগ দরকার এধরনের শক্তিশালী জাতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য, সেটা কীভাবে ঘটা সম্ভব, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। এছাড়াও কেউ প্রমাণ করতে পারছে না: কীভাবে বনি ইসরাইল হঠাৎ একদিন ফিরাউনের ভীষণ শক্তিশালী বাহিনীর হাত থেকে ছাড়া পেল। ফিরাউন নিশ্চয়ই একদিন হাসিমুখে তার বনি ইসরাইল দাসদের চলে যেতে বলেনি? বনি ইসরাইলেরও কোনো ক্ষমতা ছিল না ফিরাউনের বাহিনীর বিরুদ্ধে একদিনও টিকে থাকার? তাহলে কীভাবে তারা মুক্তি পেল? কীভাবে তারা ফিরাউন বাহিনীর মত পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনীকে পরাজিত করার অলৌকিক শক্তি রাতারাতি হাসিল করলো?

—আগামী পর্বে দেখব বিস্ময়কর কিছু ঘটনা, যা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে একজন স্রষ্টা প্রাণীজগত নিয়মিত নিয়ন্ত্রণ করেন।

[২১৬] P. J. Zwart, About Time (Amsterdam and Oxford: North Holland Publishing Co., 1976), pages 117-19
[২১৭] John Polkinghorne and Nicholas Beale. Questions of Truth. 2009, page 41
[২১৮] David Hilbert. On the Infinite, in Philosophy of Mathematics, ed. with an Intro. by P. Benacerraf and H. Putnam. Prentice-Hall. 1964, page151.
[২১৯] Aristotle, “Physics 207b8” http://classics.mit.edu/Aristotle/physics.html

-Omar Al Zabir


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন