আজ বৃহঃপতিবার, ১৬ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০১ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



প্রবাসীকল্যাণ সচিবের স্বেচ্ছাচারিতা: এক বছরে ৯ বার বিদেশ সফর

Published on 25 July 2018 | 8: 11 am

মাত্র এক বছরে ৯ বার বিদেশ ভ্রমণের রেকর্ড গড়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নমিতা হালদার। সচিব হিসেবে দায়িত্বভার নিয়ে এই মন্ত্রণালয়ে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত তার কর্মকাল এক বছর তিন দিন অতিবাহিত হয়েছে। মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা জানান, সচিব এই সময়ে রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, জাপান, কম্বোডিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস সফর করেন। এখন অস্ট্রেলিয়া সফরের অপেক্ষায় রয়েছেন। অথচ মন্ত্রণালয়ের খোদ মন্ত্রী এই সময়ে সরকারি খরচে বিদেশে গেছেন মাত্র একবার।

জানা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো সফরের সময় সচিব কোনোটিতেই মন্ত্রীকে সঙ্গে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। মন্ত্রীর অনুপস্থিত থাকার কারণে সফরের ন্যূনতম সুফল আসেনি। মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডে ড. নমিতা হালদারের ভয়াবহ রকমের স্বেচ্ছাচারিতার এটিও একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।

সংশ্লিষ্টদের মতে, একদিকে তিনি ধৃষ্টতা দেখিয়ে মন্ত্রীকে এড়িয়ে গেছেন। অন্যদিকে তার ভ্রমণের ভবিষ্যৎ ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে অনুগত কর্মকর্তাদের দুই হাত খুলে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ করে দিচ্ছেন। তার প্রমাণ পাওয়া যায় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা থেকে সহকারী সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের ২০১৭-২০১৮ জুন পর্যন্ত এক বছরের বিদেশ ভ্রমণের তালিকা পর্যালোচনা করে। এতে দেখা যায়, সচিবের (নমিতা হালদার) এই এক বছরের মেয়াদে তিনি (সচিব) ছাড়াও আরও ৩৬ কর্মকর্তা বিদেশ বিভুঁইয়ে ঘুরে এসেছেন। এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত একই কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ পাঁচবার এবং সর্বনিম্ন একবার বিদেশ গেছেন।

বিদেশ ভ্রমণের তালিকা পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়- অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার অনেক কর্মকর্তা মাত্র একবার বিদেশ সফর করলেও তার পছন্দের (সচিবের একান্ত সচিব) লোক বিদেশ সফর করেছেন আটবার। এ ছাড়া সর্বোচ্চ পাঁচবার বিদেশ ভ্রমণকারী যুগ্ম সচিব, উপ-সচিবদের বেশির ভাগই সচিবের অনুগত।

এদিকে সচিব নমিতা হালদারের বিদেশ ভ্রমণের কার্যতালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তিনি ০১-০৪ অক্টোবর ২০১৭ (রাশিয়া), ১০-২১ নভেম্বর ২০১৭ (যুক্তরাজ্য), ০৩ অক্টোবর-০২ নভেম্বর ২০১৭ (জাপান), ০৩-০৫ ডিসেম্বর ২০১৭ (কম্বোডিয়া), ২৮-৩১ জানুয়ারি ২০১৮ (জাপান), ১৩-১৫ মার্চ ২০১৮ (সৌদি আরব), ১৬-১৭ এপ্রিল ২০১৮ (সংযুক্ত আরব আমিরাত) ও ২১-২৫ মে ২০১৮ (গ্রিস) সফর করেছেন।

মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কয়েকজন জানান, ২০১৭ সালে বিদেশে জনশক্তি রফতানি ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেলেও চলতি বছর (২০১৮) এ সংখ্যা ছয় লাখও পৌঁছাবে না। অথচ গত এক বছরে বর্তমান সচিব নিত্যনতুন দেশে ব্যয়বহুল আনন্দ ভ্রমণ করেছেন। সরকারি অর্থ খরচা করেছেন। কিন্তু জনশক্তি রফতানির ন্যূনতম উন্নয়ন তিনি ঘটাতে পারেননি। শুধু তাই নয়, সফর করা দেশগুলোতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের যেসব সমস্যা রয়েছে, তারও সমাধান হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। কারণ তিনি প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বসেও জনশক্তি রফতানি বাড়ানোর কাজে মনোযোগী হতে পারছেন না। দফতরে বসে শুধু লোক দেখানো বিভিন্ন দিবস পালনের প্রস্তুতি নিয়েই সময় পার করেন। বাকি সময় লেগে থাকেন তার অপছন্দের কর্মকর্তাদের পেছনে। ফলে মন্ত্রণালয়ের সুষ্ঠু কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

নমিতা হালদারের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। আরও দৃষ্টান্ত হচ্ছে- মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের (দক্ষতা উন্নয়ন তহবিলের) মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই এ প্রকল্পে কর্মরত সাতজন কর্মচারীকে বাধ্যতামূলক বিদায়ের মৌখিক বার্তা দিয়েছেন সচিব। যদিও এ প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২০ সাল পর্যন্ত। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এসব নিম্ন পদের কর্মচারীদেরও চাকরি খাওয়ার হুমকি কেন তা পরিষ্কার নয়। এদিকে উপায় না দেখে প্রকল্পের এসব কর্মচারীকে চাকরিতে বহাল রাখা এবং মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর আবেদন করেছেন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির কাছে।

মন্ত্রণালয়ে সচিবের পছন্দের একজন কর্মকর্তা হলেন, মো. মিজানুর রহমান (যুগ্ম সচিব)। সম্প্রতি তাকে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে অন্যত্র বদলির জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে আদেশ আসে। কিন্তু সচিব নমিতা হালদারের হস্তক্ষেপে বদলি আদেশটি প্রত্যাহার হয়ে যায়। বর্তমানে ওই কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ শাখায় ন্যস্ত করেছেন সচিব। এভাবেই নমিতা হালদার তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে চলেছেন।

অভিযোগে আরও জানা যায়, নমিতা হালদার প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে থাকাকালে প্রভাব খাটিয়ে শুল্কমুক্ত সুবিধায় মদ ও সিগারেট আনার জন্য বেনামে দুটি বন্ড লাইসেন্স ভাগিয়ে নিয়েছেন। একইভাবে অনেককে তিনি বিরাট অংকের অর্থের বিনিময়ে এ লাইসেন্স পাইয়ে দিতে নেপথ্য ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বসে অন্য মন্ত্রণালয়ে নিয়মিত তদবির বাণিজ্য অব্যাহত রেখেছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, লোক পাঠিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ফোনে বলে দেন, আমি ড. নমিতা হালদার। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের পরিচালক ছিলাম। এখন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব। লোক পাঠাচ্ছি, কাজটি করে দেবেন। এতে তার অনৈতিক আয়ের চাকাও সচল থাকছে।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সচিব ড. নমিতা হালদার বলেন, আমি একজন সচিব। একটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিত্ব করি। দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দরকষাকষি কিংবা জনশক্তি রফতানির নতুন বাজার খোঁজা ও বিদ্যমান বাজার সম্প্রসারণের জন্য রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই যেতে হয়েছে। তা ছাড়া জনশক্তির বাজার খুব স্পর্শকাতর। গেলাম আর সুফল পেয়ে গেলাম বিষয়টি এমন নয়। সুফল পেতে সময় লাগবে। অনুগত কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও ডেক্স আছে। যেখানে যার দায়িত্ব পালন করার কথা ও প্রয়োজনে বিদেশ যাওয়ার কথা তারাই যাচ্ছে এবং গেছে। এখানে আনুগত্যের কোনো বিষয় নেই। আর অন্যান্য অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, এসব সঠিক নয়।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন