আজ বৃহঃপতিবার, ১৬ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০১ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



“ঝর্ণা রাণী” খৈয়াছড়ায় একদিন

Published on 20 July 2018 | 2: 41 pm

=| আব্দুর রব নিশান |=

“নিরাপত্তা নিজ দায়িত্বে” এমন একটি ‘রেল ক্রসিং’ পায়ে হেঁটে পার হওয়া। মেঠো পথ মাড়িয়ে উঁচু-নিচু ছোট টিলার দিকে এগিয়ে যাওয়া। কখনো দশ ফুট, কখনো পঞ্চাশ ফুট আবার কখনোবা তার থেকেও বেশি উঁচু-নিচু এই পাহাড়ি টিলাগুলোর নিচে থাকা ছোট খাদে পড়ে যাওয়ার ভয় নিয়েও সাম‌নের দি‌কে হাঁটা। খাদের কোথাও হাঁটু সমান আবার কোথাও টাকনু সমান পানির স্রোত অ‌বিরাম বয়ে চলছে। যান পাড় ধরেই গুটি-গুটি পায়ে ঘন গাছের বেস্টনিতে আবদ্ধ পাহাড়ি বনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। নিচে পাথড়ের সাথে যুদ্ধ করে বয়ে চলা পাহাড়ি ঝর্ণার পানির স্রোত, আর মাথার ওপর বিশাল গাছের ঘন জঙ্গল। নাহ, এখন তো একটু পানিতে নামতেই হয়! কিন্তু পানিতে তো রক্ত চোষা জ্যোকের রাজত্ব! রক্ত চোষা জ্যোকের ভয়ে কখনো পাহাড় কিনারের সড়ু অংশ বেয়ে- আবার কখনো পানিতে তলিয়ে থাকা বা মাথা জাগিয়ে রাখা পিচ্চিল ছোট-বড় পাথর থেকে পাথরে লাফিয়ে লাফেয়ে দুর্গম অজানা পথের দিকে এগিয়ে যাওয়া। কখনো ভেজা পায়ে পাড়ের গায়ে হোঁচট খেয়ে খাদে পড়ে যাওয়ার ভয়। কখনোবা পাথরেই পা পিছলে সপৎ করে কোমড় পানিতে গড়াগড়ি খাওয়া। আবার তাৎক্ষণিক সেই রক্ত চেষা জ্যোকের আতঙ্কে তাড়াহুড়ো করে ডাঙ্গায় ওঠার চেষ্টা। এভাবেই জ্যোকের ভয়কে হার মানিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটারের বেশি বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে ক্লান্ত শরীটাকে কাঙ্খিত মায়াজালের ভাসিয়ে দেয়া কতটাইনা এডভেঞ্চারাস। দুর্গম ও বন্ধুর পথের ভয়কে জয় করতে যারা সবসময়ই স্বপ্ন দেখেন, এডভেঞ্চার ভালোবাসেন, তাদের জন্যই ঝর্ণা রানী (খৈয়াছড়া ঝর্ণা) উপযুক্ত একটি জায়গা।

# খৈয়াছড়া ঝর্ণা : খৈয়াছড়া ঝর্ণার সৌন্দর্য্য নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করাটা আসলেই কঠিন। আকার আকৃতি ও গঠন শৈলির দিক দিয়ে অন্যতম বড় ঝর্ণাগুলোর একটি এটি। ঝর্ণার একই অংশে সিঁড়ির মতো মোট দশটি ধাপ। যার নিচ থেকে প্রথম ধাপটিই সব থেকে বড়।

তবে উপরের বাকি ধাপগুলো কোনটা দশ ফুট- আবার কোনটা পাঁচ ফুট হলেও, ঘনঘন ধাপ হওয়াতে পাশের পাহাড় থেকে দেখতে খুবেই আকর্ষনীয়। তবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বেস্টনী না থাকাতে দুর্বল হৃদয়ের অনেকে প্রথম ধাপ থেকে দ্বিতীয় ধাপে যাওয়াটাও এড়িয়ে চলেন। কারণ প্রথম ধাপ থেকে বাকি ধাপে ওঠতে একেবারেই খাড়া। তার ওপর সাহসি দর্শনার্থীরা ভিজা পায়ে ওপরে ওঠার ফলে পানিতে ভিজা পিচ্ছিল অংশ ধরেই পাহাড় বেয়ে উপরের ধাপগুলোতে ওঠতে হয়।

এ ক্ষেত্রে সাহসী দর্শনার্থীদের এডবেঞ্চারের মাত্রা বাড়ানোর জন্য, পাহাড়ের গাঁ বেযে ওঠা সহজ করতে পহাড়ি গাছগুলোর সাথে সরু দড়ি বেঁধে দেয়া হয়েছে। ঝুঁকি থাকা সত্তেও এই দড়িগুলো অবলম্বন করে ঝর্ণার ওপরের ধাপে যেতে হয়। তবে ঝর্ণার পাথর বেযে ওপরে ওঠার কোন সুযোগ নেই। বাকি ধাপ গুলোর হিসেব বাদ দিলে ঝর্ণার মূল আকর্ষণ, তার প্রথম ধাপে পৌছনো অনেকটা পরিশ্রমে উপার্জিত সম্পদের মতোই। অর্থাৎ খৈয়াছড়া ঝর্ণার পানিতে নিজের দুঃখগুলোকে মুছতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই প্রায় ২.২ কিলোমিটারের এবং মোট প্রায় ৩০০-৪০০ ফুট উঁচু নিচু বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে।

# যেভাবে খৈয়াছড়া যাবেন : কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে রাতের ট্রেনে রওনা দিয়ে সীতাকুন্ডে নামবেন। সকালে ট্রেন থেকে নেমে সীতাকুন্ডেই নাস্তা সেরে নিবেন। এরপর সীতাকুন্ড বাস স্ট্যান্ড থেকে বরতাকিয়া বাজার। অথবা ঢাকা থেকে বাসে করে সরাসরি সেখানে নামতে পারেন। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া বাজারের পাশে।

ঢাকা চট্টগ্রাম সমাসড়কের পূর্ব দিকে প্রায় ৪.২ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের ‘ঝর্ণা রাণী’ খ্যাত খৈয়াছড়া ঝর্ণার অবস্থান। মহাসড়ক থেকে প্রায় এক-দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত সিএনজি বা ছোট গাড়িতে করে যেতে পারবেন। সিএনটি ২৫-৩০ টাকা নিতে পারে। এরপরই শুরু পায়ে হাঁটার অভিযান। উঁচু নিচু মেঠোপথ, কখনো ছোট খালের ওপর সরু বাঁশ বা কাঠের সাকো পার হওয়া। কখনোবা ছোট উঁচা টিলা পেরিয়ে সামনের অজানার দিকে এগিয়ে যাওয়া।

অবশেষে পানিতে নিজের পা ভিজিয়ে হাঁটার অনুভূতি উপভোগ করার সুযোগ পাওয়া যাবে।

# খাবারের ব্যবস্থা : খৈয়াছড়া ঝর্ণায় যাওয়ার আনুমানিক এক কিলোমিটার আগেই ঝুপড়ির কিছু খাবারের হোটেল আছে। ঝর্ণায় যাওয়ার আগে আপনাদের অপ্রয়োজনিয়ে জিনিশ ওই হোটেলে রেখে যেতে পারেন। একই সাথে দুপুরে এসে কি খাবেন সেটা ওখানে অর্ডার করে যাবেন। ব্যস, চিন্তামুক্ত হয়ে ঝর্ণার পানিতে দাপাদাপি করে হোটেলে ফিরলেই আপনার জন্য আপনার অর্ডার অনুসারে কম খরচে গরম গরম সুস্বাদু খাবর তৈরি পাবেন।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন