আজ শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৬ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



জাযাকাল্লাহু খায়রান

Published on 17 May 2018 | 10: 30 am

“জাযাকাল্লাহু খায়রান” ছোট্ট দুটি শব্দে একটি দু’আ। রাসূল ﷺ বলেছেন যে, কেউ আমাদের কোনো উপকার করলে, কোনো সাহায্য করলে, কারো কাছে কৃতজ্ঞতাপূর্ণ আচরণ পেলে কিংবা নেক কাজে আনুকূল্য পেলে আমরা যেন তার জন্য অনুরূপ করি, তার জন্য দু’আ করি। আর তিনি ﷺ শিখিয়েছেন ছোট্ট একটি দু’আ- “জাযাকাল্লাহু খায়রান”, অর্থাত্‍ আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান/বিনিময় দিন।[১]

দু’আটি ছোট, কিন্তু তাৎপর্য চমৎকার। একজন মুসলিম বিশ্বাস করে তার জীবনের সকল ভালো ও খারাপ কাজের প্রতিবিধানের মালিক আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন এবং একদিন সে সবকিছুর প্রতিদান পাবে। তাই কারও কোনো উপকার করলে বা কারও কাছে থেকে উপকার পেলে সে সর্বোচ্চ প্রতদানটুকু আশা করে মহান রবের কাছে থেকেই।

প্রতিদান শব্দটি সাধারণ অর্থে দৃশ্যত পরিশ্রমের বা সাহায্যের বদলা বা বিনিময় হিসেবে ভাবতেই আমরা অভ্যস্ত। যেমন ধরুন, কেউ আপনার প্রয়োজনে আপনাকে কিছু পরিমাণ টাকা ধার দিলো। আপনি তার প্রতি খুশি হলেন, আবার সুবিধামতো সময়ে সমপরিমাণ ফেরতও দিয়ে দিলেন। পরবর্তীতে কোনো বিপদে আপনি তার পাশে দাঁড়ালেন কিংবা ঠিক একই পরিমাণ আর্থিক সহযোগিতা করলেন। স্বভাবতই আমরা ভেবে নিই যে, আমরা বদলা দিতে পেরেছি; আর কিছু না হোক, ভালো কাজের বিনিময় করতে পেরেছি বলে কিছুটা তৃপ্ত হই। আমার প্রতি তার সুধারণা ও বন্ধুত্বের প্রতিদান আমি দিতে পেরেছি ভেবে আত্মপ্রসাদ লাভ করে থাকি।

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

আরও একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। আপনার প্রয়োজনের তাগিদে কিছু দিনমজুরকে কাজে লাগিয়েছেন। কাজ সম্পন্ন হলে তাদের মজুরি হিসেবে অর্থ দিয়ে দিচ্ছেন আর স্বাভাবিকভাবে এটিকেই প্রতিদান বা বদলা হিসেবে ভেবে নিচ্ছেন। একজন রিকশাওয়ালা আপনাকে আপনার প্রদেয় অর্থের বিনিময়ে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিচ্ছেন আর কিছু অর্থ ধরিয়ে দিয়ে আপনি ভেবে নিচ্ছেন যে তাঁর পরিশ্রমের প্রতিদান আপনি দিয়ে দিলেন।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যথার্থ প্রতিদান বা বিনিময় এভাবে নিশ্চিত হয় না। প্রতিদান তো সেটিই, যার মাধ্যমে মানসিক, দৈহিক, সামাজিক ও আরও অনেক বিষয়ের সামঞ্জস্য বিধান হয়। সর্বৈবভাবে যেখানে বিনিময় পাওয়া সম্ভব হয়।

হ্যাঁ, উপরে আপনি যা করেছেন, তা দিয়ে আপনার পক্ষ থেকে কিছুটা দায়মুক্ত হয়েছেন বটে; তবে প্রতিদান হয়নি। অর্থনীতির ভাষায় আপনি একজন ভোক্তা আর কোনো দ্রব্য বা বস্তু থেকে যে উপযোগিতা পেয়েছেন, আপনি তার চোখে দেখা বিনিময় শোধ করছেন মাত্র। ঠিক বুঝতে পারছেন না তো?

একটু ভেবে দেখুন – আপনার যে বন্ধু আপনার উপকার করেছে বা আর্থিক সাহায্য দিয়েছে, তাকে আপনিও সহায়তা ও সমপরিমাণ আর্থিক সাহায্য করলেও দুজনের আন্তরিকতা, প্রয়োজনের মাত্রা বা সাহায্য করার সামর্থ্যের মাঝে থাকতে পারে বিরাট ফারাক। তাই দুজনের উপর্যুক্ত বিষয় না জেনে শুধু টাকার অংক দিয়ে উপকারকে এক করে ভাবা যাবে না। এমনকি যে লোক আপনার দিনমজুর খেটে গেলো, তার আন্তরিকতাও আপনি মাপতে পারবেন না। আর কয়েকজন কাজ করলে তো প্রত্যেকের আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি ও কাজের পরিমাণ বা আন্তরিকতার তফাত্‍ থাকার পরেও আপনি সমান পারিশ্রমিক দিচ্ছেন। তাই এর কোনোটাই প্রকৃত প্রতিদানের খাতায় পড়ছে না। ঠিক একইভাবে ঐ রিকশাশ্রমিকের শারীরিক কষ্টের মজুরিটুকু আপনি দিতে পারলেও আপনার মতো বাবুগিরি হালের কাউকে যে নিজ পরিশ্রমে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আনতে গিয়ে মানসিক কষ্ট করছে, তার দাম আপনি কী দিয়ে শোধ করবেন?

এজন্যই ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে আল্লাহর কাছে থেকে প্রতিদান চাইতে এবং কারও জন্য উত্তম প্রতিদানের দু’আ করতে। এর মাধ্যমে জানানো হচ্ছে যে, আমাদের পক্ষে কোনোকিছুরই যথাযথ প্রতিদান দেওয়া সম্ভব নয়। একমাত্র যিনি পারবেন, তিনি আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন; যার কাছে দৃশ্যমান বস্তুর খবর যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে অদৃশ্যের খবরও। আবার মনের যত ভাবনা, তাও তাঁর আয়ত্বে। আর তিনি চাইলেই সব পারেন। তাই একজন মুসলিম কারও প্রতিদান দিতে চাইলে নিজের দিক থেকে সর্বোচ্চটুকু করার পরেও বাকিটা আল্লাহর সমীপে পেশ করবে এই বলে যে, জাযাকাল্লাহু খায়রান (আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন)।

কারও উপকারের প্রতিদান দেওয়া বা বিনিময় প্রদানের জন্য একজন ধন্যবাদ জানিয়েই দায়িত্ব শেষ করে নিচ্ছে। ধন্যবাদ বাংলা শব্দ। এটি প্রশংসাবাদ, সাধুবাদ বা কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপক উক্তি। আর Thank you ইংরেজি শব্দ। এর অর্থ তোমাকে ধন্যবাদ, তোমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। অথচ এই ধন্যবাদটুকু তার ইহজীবন বা পরলৌকিক জীবনে ন্যূনতম উপকারও কি করতে পারে? পারে কি তার মর্যাদা বাড়াতে? আর একজন মুসলিম যখন জাযাকাল্লাহু খায়রান বলছে, তখন সে ব্যক্তির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান চাওয়া হচ্ছে। আর আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন জানেন যে, বান্দার মঙ্গল কোথায় আছে, কী তার প্রয়োজন। তা দুনিয়া বা আখিরাতের যেকোনো জায়গাতেই হতে পারে।

এ শব্দগুলোর মধ্যে কোনটা আরবি, বাংলা বা ইংরেজি – এদিকে না তাকিয়ে শুধু এগুলোর অর্থের দিকে লক্ষ করলে দেখবো, জাযাকাল্লাহু খায়রান বাক্যটি সবচেয়ে সারগর্ভ। কারণ এতে শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ নয়, উপকারীর জন্য কল্যাণের প্রার্থনাও আছে। আর যদি বলা হয়, জাযাকাল্লাহু খায়রান ফিদ দারাইন (আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাকে উত্তম বিনিময় দান করুন) তাহলে তো সোনায় সোহাগা।

কেউ জাযাকাল্লাহ বললে উত্তরে ওয়া ইয়্যাকা বা ওয়া ইয়্যাকুম বলা যায়। অর্থাৎ আল্লাহ তোমাকেও দান করুন।

কত চমৎকার! তাই না? ইসলামের ছোট্ট ছোট্ট বিষয়, নিয়ম আর অনুশাসনের মাঝে লুকিয়ে থাকে গভীর মাহাত্ম্য, অনুপম সৌন্দর্য। ইসলাম শুধু সুন্দর আর শান্তির কথা বলেই চুপ থাকে না, বরং দেখিয়ে দেয় সেই পথ। কত সুন্দর শিক্ষা আমাদের ছিলো, কিন্তু আমরা শুধু অবহেলা করেছি এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।

কখনো এমন হতে পারে যে, যাকে জাযাকাল্লাহ বলা হলো, তিনি তা বুঝলেন না। সেক্ষেত্রে আমরা জাযাকাল্লাহর সাথে ধন্যবাদও বলতে পারি অথবা বাংলাতেই তার জন্য দু’আ করুন এই বলে যে, আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আজ থেকেই তাই অসার বাক্য Thank you (ধন্যবাদ আপনাকে) এর পরিবর্তে জাযাকাল্লাহু খায়রান বলার অভ্যাস গড়ি।

আপনার যে বন্ধু বা আপনজন আপনার উপকার করেছে, তার জন্যও দু’আ করুন; আবার যে রিকশাওয়ালা কয়টা টাকার বিনিময়ে আপনাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিলো, তার ভাড়াটা মিটিয়ে দিয়েও দু’আ করুন। কারণ আপনি দৃশ্যত বিনিময় করতে পারছেন, ভাড়া দিয়ে নিজের দায়মুক্তি করেছেন; তবে যথার্থ প্রতিদান দিতে পারবেন না। তাই সংকোচ, দ্বিধা আর সংকীর্ণতা ঠেলে ফেলে বলুন “জাযাকাল্লাহু খায়রান।”

সর্বশেষ কথা এই যে, আমরা মুসলিম জাতি। আমাদের আছে একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতি। অথচ পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে আস্তে আস্তে আমরা তা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এমনকি জাতীয় জীবনেও এখন বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুসরণ হচ্ছে। এটা খুবই ভয়ানক বিষয়। এটা একদিন আক্বীদাহ-বিশ্বাসের উপর প্রভাব ফেলবে; বরং প্রভাব ফেলছে।

তথ্যসূত্র

[১] জামে তিরমিযী, হাদীস : ২০৩৫; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৩৪১৩; সুনানে আবু দাউদ; আল আদাবুল মুফরাদ, বুখারী :২১৬


লেখক: এস এম আবু নাছের


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন