আজ মঙ্গলবার, ১৯ জুন ২০১৮ ইং, ০৫ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



সন্তানের স্বার্থে পুরুষ কিংবা নারী একজন পরিবারে থাকা প্রয়োজন

Published on 24 April 2018 | 12: 31 pm

:: আকতারুজ্জামান মোহাম্মদ মোহসীন ::

নারী মানে স্নেহ, মায়া, মমতা, ভালবাসার আধার । নারী মানে মা, ভগ্নি, কন্যা, স্ত্রী স্মমানিত সম্পর্ক । নারী মানের সমাজের মৌলিক এবং অবিচ্ছেদ্ধ অংশ । নারী মানে সমাজের সৌন্দর্যের, শান্তির, মানবতার শিক্ষার সুতিকাগার ।

নারী মানে প্রথম শব্দ উচ্চারনের কারিগর, প্রথম বর্ণের শিক্ষাগুরু । নারী মানে আদর্শ শিক্ষাদানকারী । কখনও কখনও নারী ধর্ম শিক্ষা দানেও সন্তানদের কাছে প্রথম শিক্ষক হয়ে থাকেন ।

সমাজের যে কোন স্তরে নারীকে বাদ দিয়ে এসব ভাবনা সম্ভব নয় । যত দিন নারী আমাদের স্নেহ, মায়া, মমতা, ভালবাসা, মা, ভগ্নি, কন্যা, স্ত্রী, বর্ণের শিক্ষাগুরু, নারী মানে আদর্শ শিক্ষাদানকারী হিসাবে দায়িত্ব পালন করে আসবে ততদিন আমরা একটা আদর্শ সমাজ, মানবতার মাঝে বাস করতে পারব । এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস ।

কারণ আমার দাদী, নানী, মা, খালা, মামী, বোন, চাচীদের দেখেছি । তাঁদের হাতে যেমন নারীদের অপমান করার মত পুরুষ তৈরি হতে পারে না, তেমনি তাঁদের কাছে নারী সম্মান শিখতেও আমাদের সমস্যাও হয়নি । আমাদের জীবনে শিক্ষার বড় উৎস ছিল আমাদের (দাদী, নানী, মা, চাচী, খালা, মামী) নারীরা । সুতারাং তাঁদের বাদ দিয়ে সমাজে সভ্যতা বিবেচনা করা যায় না ।

আমাদের সমাজে নারীদের সম্মান নিয়ে অনেক কথা প্রচলিত রয়েছে । কিন্তু প্রচলিত কথার অর্থ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমরা একেক জন একেক ভাবে বর্ণনা করে থাকি । যেটাকে প্রচলিত কথায় বলা যায় “অতি সন্যাসীতে গাঁজন নষ্ট” । আবার কেউ কেউ সালমান রুশদীর মত জ্ঞানের চর্চা করতে গিয়ে বিতর্কিত কিছুর অবতারনা করে ফেলি ।

বর্ণনা বা বিশ্লেষণ আলাদা হলেও তাৎপর্য এক রকম হলে তেমন সমস্যা হয় না । কিন্তু তাৎপর্যটা যদি আলাদা বা বিপরীত হয়ে যায়, সেখানে সমস্যা তৈরি হতে বাধ্য । নারী পরিবার, সমাজ, দেশ, জাতি উন্নয়নে অগ্রনী ভুমিকা পালন করে থাকে । সেটা যে অস্বীকার করবে তার অনেক কিছু জানার বাকী । কারণ নারীইত সকল প্রেরনার উৎস ।

নজরুল তার কবিতায় পৃথিবীতে যত কল্যাণকর কাজ হয়েছে, তার অর্ধেক নারী আর অর্ধেক পুরুষে করেছেন বলে ছন্দায়িত করেছেন । বিষয়টা কেউ অস্বীকার করেছে বলে আমার জানা নেই ।

গত শবাব্দীতে করেনি বলে আগামীতে কেউ করবে না এটা হলফ করে বলতে পারছি না । কারণ ইদানিং অনেক সাধারণ বিষয় নিয়েও অনেক গবেষক খুদ খুজতে উঠে পরে লেগে থাকেন । কিন্তু নজরুল যে সময় এ রচনা করেছেন তখন আমাদের সমাজে এত বিপুল সংখ্যক নারী কর্মজীবি ছিলেন না । তাহলে বোধ হয় তখন তিনি নারীদের খুশি করতে বাড়িয়ে লিখেছেন বলে মনে করবেন ? না ।

কারণ তিনি নারী সম্পর্কে তার দর্শনকে উপস্থাপন করেছেন মাত্র ।

অপর দিকে এটা সত্য জেনেই উপস্থাপন করেছিলেন । আমি আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে আসি । আমি আমার কর্ম জীবনের শুরু থেকে খুব মনযোগসহকারে আমার দায়িত্ব পালন করে চলেছি । তার মানে আমি আমার দায়িত্বে যা করছি তাকে শতভাগ বিবেচনা করে থাকি । আমি এত মনযোগসহকারে কাজ করতে, যুদ্ধ করতে, লেখালেখি করতে পেরেছি কেবল আমার পাশের নারী আমার পরিবারের দেখাশুনা, সন্তানদের লেখাপড়া, আমার সামাজিকতা ইত্যাদির দায়িত্ব নিশ্চিন্তে পালন করেছেন বলে ।

তাহলে আমার দায়িত্বে করা শতভাগ কাজের অর্ধেক ভাগ তার পাওয়ার নয় কী ?

আমি যদি তার পালনকৃত দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম তাহলে আমার পালন করা দায়িত্বের শতভাগ নয়, কুড়ি ভাগও সুষ্ঠু ভাবে করতে পারতাম কি না সন্দেহ আছে । সুতারাং নারী আমার কাজে অংশগ্রহণ না করেও অর্ধেক ভাগের দাবীদার কি করে হয় সেটা আমি বুঝতে পেরেছি, আশা করি আপনাদের বুঝাতে পেরেছি । সুতারাং নজরুলের মত দর্শনের মানুষের সব কথা বুঝার শক্তি আমার না হলেও সমাজে কল্যাণকর কাজের অর্ধেক নারীর বিষয়টি সামান্য হলেও বুঝতে পেরেছি বলে মনে হয় ।

যুগে যুগে জেনে এসেছি রাজা বাদশা থেকে শুরু করে সকল শ্রেণির পুরুষদের সকল কাজের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন তাঁদের সাথে থাকা নারীরা । সুতারাং অগ্রগতির জন্য নারীরা সশরীরে ঘরের বাইরের সব কাজে যোগদান না করলেও তার সাথের পুরুষকে অনুপ্রেরণা যুগিয়ে গেছেন । তাঁদের ষে সম্মোহনী শক্তি আছে তা দ্বারা পুরুষের সকল কাজের অংশীদার হতে পেরেছে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাই হয়ে এসেছে । নতুন করে আমরা নারী সম্পর্কে ভিন্ন ধারনা সৃষ্টি করে আমি আমার মা, বোন, কন্যাকেই শুধু অবমাননা করছি না, বরং তাঁদের ছোটও করছি । যা আমার না বুঝার কারনে, কিংবা ইচ্ছা করে কোন কুট কৌশল চরিতার্থ করার জন্য করছি । আমার সন্তান আমার কাছে একটা চকলেট পেতে পারে ।

আমি সেটা তাকে দিয়ে থাকি তার মুখের হাসি দেখার জন্য । সেখানে কেউ যদি তার অধিকারের কথা বলে আমার কাছ থেকে জোর করে আদায় করার চেষ্টা করে তা কি তাকে ছোট করা এবং সন্তানকে তার বাবা মুখোমুখি করে দেয়া নয় কী ? যেখানে নারীদের জন্য আমরা অধিকারের আন্দোলন করছি সেখানে সেটা নারীরা সসম্মানের সাথে পাওয়ার কথা ।

আমরা যারা আমাদের দাদী, নানী, মা, খালা, মামী, বোন, চাচীদের কাছ থেকে শিক্ষা পেয়েছি তারা দিয়েও থাকি । আজ দেশের অগ্রগতির মাপকাঠি হিসাবে নারী কর্ম সংস্থানকে বিবেচনা করা হয়, নারীদের বাবা, মা, স্বামী, সন্তান ছেড়ে বাইরে বেড়িয়ে আসাকে পরিমাপ করা হয় । শত শত বছর আগেও আমাদের সমাজে নারীরা তাঁদের সুযোগ সুবিধা অনুযায়ী ঘরের বাইরে কাজ করেছে । কত নারী ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, মাস্টার, শিল্পী, কবি, অভিনেত্রী, আরও অনেক পেশাদার নারী ছিল । তখন এসব মাপকাঠিতে নারী কিংবা সমাজকে মুল্যায়ন করা হত না ।

যে সমস্ত নারীদের পিছু টান নেই, সন্তান মানুষ করার দায়িত্ব পালনে সমস্যা নেই, তারা কাজ করেছে, করছে এবং করবে । আমাদের দেশে নারী প্রধানমন্ত্রী, নারী বিরোধী দলীয় নেত্রী, নারী স্পীকার, নারী মন্ত্রী, নারী বিচারপতি, নারী পুলিশ কর্মকর্তা, নারী সামরিক কর্মকর্তা, নারী পাইলট, আরও কত পেশা আছে বলে শেষ করা যাবে না । তারা কি তাঁদের যোগ্যতায় নিজের অবস্থানে আসেননি ?

তাঁদের কি নারীর অধিকার দিতে গিয়ে এমন জায়গায় এসেছেন ?

না । তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গায় যোগ্যতার প্রমান করে এসেছেন । আমরা নারী বিচারপতি বলি না, বিচারপতি বলি । আমরা নারী পুলিশ অফিসার বলি না, বলি পুলিশ অফিসার । তাহলে নারী বলে আলাদা পোকাস করলে পুরুষদের অবহেলা হয়ে যায় না ?

পুরুষতো সমাজের আলাদা কেউ নন, তারাও এ সমাজের নারীদের বাবা, স্বামী, ছেলে ইত্যাদি । আমরা ছেলেরাও আমাদের নারী মায়ের সন্তান । কোন নারী মা নিশ্চয় চাইবে না তার মেয়েকে পোকাস করতে গিয়ে ছেলেটাকে অবহেলা করা হউক ।

 

এখন নারীদের নিয়ে যে ভাবে পোকাস চলছে ভয় হয় আমাদের ছেলেরা কবে বলে বসে বাবা ছেলে না হয়ে মেয়ে হওয়া ভাল ছিল । এটা সন্তান হিসাবে নারী মায়ের জন্যও দুঃখ জনক বলেই মনে করি । আমাদের সমাজে নারী পুরুষকে আলাদা করে তূলে আনা এক ধরনের অন্যায় বলে মনে করছি । কারণ আমার মেয়েটা নারী, তার জন্য সুস্থ্য সুন্দর জীবনের জন্য একটা পুরুষ ছেলে প্রয়োজন, আবার আপনার ছেলেটা পুরুষ, তার সুস্থ্য সুন্দর জীবনের জন্য একটা মেয়ে নারীর প্রয়োজন ।
সুতারাং কর্তব্য হিসাবে বরং একটু নজর দিলে নারীদের নিয়ে যৌন হয়রানী, নির্যাতন ইত্যাদির বিষয়গুলো বেশ আলোচিত হচ্ছে । সে দিকে তাকালে আমরা নারীদের কর্তব্যের কারনে সন্তানের প্রতি সঠিক মনযোগ দিতে পারছি না বলে ধরে নিতে পারি (যদিও বিষয়টি অত্যন্ত গৌণ)। এর পিছনে আরও অনেক কারণ নিহিত আছে । কিন্তু নারীরা পুরুষের সাথে এভাবে ঘরের বাইরে থাকলে আমাদের জন্যও ইউরোপ আমেরিকার মত ভয়ানক (সন্তানকে শিশু সদনে বড় হওয়া, বাবা মা’কে বৃদ্ধাশ্রমে জীবন কাটানো, বুড়ো বয়সেও সন্তানের দায়িত্ব নিতে না পার ইত্যাদি ।
যদিও বিবরণটা অনেক বৃহৎ তাই সংক্ষেপে টানা হল) সময় অপেক্ষা করছে । সেটা পুরুষ হিসাবে বাবা যেমন প্রত্যাশা করেন না, তেমনি নারী হিসাবে মাও প্রত্যাশা করবেন না । সমাজে আজ ঘুনে ধরেছে । চারিদিকে পেথিদ্রিন, মদ, সিগারেট, গাঁজা, হিরোইন, পেন্সিডিল, ইয়াবা, অন্যানয় কেমিক্যাল মাদক, ইন্টারনেট ইত্যাদির ছড়াছড়ি ।
নারীদের পোশাক নিয়ে কথা বললে আমার মেয়েটাও হয়তো রেগে যাবে । কিন্তু তার আকর্ষণীয় স্থানগুলো তারই ছোট সন্তান কিংবা ছোট ভাইয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মত না রাখলে, নিজে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে এবং সন্তানকে ধর্মীয় অনুশাসন শিক্ষা দিলে সে বর্তমানের মত ফসকে যেতে পারবে না । তাকে একা না রেখে সাথে থাকলে, অঢেল টাকা পয়সা না দিলে, স্মার্ট মোবাইলের পরিবর্তে সৃজনশীল বই উপহার দিলে নিশ্চয় তাকে কিছুটা হলেও আগলে রাখা যাবে । আমরা জন্ডিসের চিকিৎসা করতে অভ্যস্ত, কিন্তু নিয়মিত পান করা জন্ডিসের জীবানুবাহী পানির উৎসটা নিরাপদ করার কথা একবার ভাবি না ।
কারণ তাতে অনেক দায়িত্ব নিতে হয় । বাবা মায়ের অসতর্কতায় এ পেথিদ্রিন, মদ, সিগারেট, গাঁজা, হিরোইন, পেন্সিডিল, ইয়াবা, অন্যানয় কেমিক্যাল মাদক, ইন্টারনেট এসব মরণ নেশা সন্তানকে গিলে খাওয়ার আগে বাবা মা আটকাতে পারেন । স্নেহ, মায়া, মমতা, ভালবাসা সন্তানকে এমন ব্যাধি থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে । হয়তো বাবা নয়তো মা কেউ একজন পরিবারে থাকা খুব জরুরী ।
সুতারাং সময় এসেছে নারী কিংবা পুরুষের একজনকে সন্তানের কাছে থাকার জন্য উদ্বোদ্ধ করার । নয়তো দেশ ও অর্থনীতির উন্নতি হবে, কিন্তু সমাজের অবস্থা দাঁড়াবে নর্দমায় । নারী কিংবা পুরুষ একজন সন্তানের সাথে না থাকার কারনে আমার সন্তান আদর্শ মানুষ হতে পারবে না । আদর্শ মানুষ না হলে আদর্শ পুরুষ হবে কি করে ।
আদর্শ পুরুষ না হলে সে নারীদের প্রকৃত মর্যাদা দিতে শিখবে না । নারীদের মর্যাদা দিতে না শিখলে তার দ্বারা যৌন হয়রানী, যৌন নির্যাতন অসম্ভব কিছু নয় । একটি সমাজের জন্য অর্থনৈতিক উন্নতির চাইতে মানবিক উন্নয়ন অনেক বেশি প্রয়োজন । যেখানে মানুষ মানবতা, মনুসত্যতা, নম্রতা, ভদ্রতা, শিষ্টাচার, ধর্ম ইত্যাদি শিখবে । এখন নারীর ক্ষমতায়ন, নারী কর্মজীবী বৃদ্ধির মাধ্যমে উন্নত বিশ্বের কাছে আমাদের চিত্র তূলে ধরার চেয়ে আমাদের সমাজের দিকে তাকানোর সময় এসেছে ।
একটি সন্তানের বাবা মা দু’জন কর্মজীবী হওয়ার চেয়ে একজনকে সন্তানের স্বার্থে, সমাজের স্বার্থে, আমাদের প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার স্বার্থে (পরিবার প্রথা, সন্তান দ্বারা বাবা মায়ের দেখা শোনা) বাবা মা একজনকে পরিবারে, সন্তানের যত্ন নিতে থাকা দরকার । নয়তো নিজেদের সকল উপার্জনই ব্যর্থতায় পরিণত হতে পারে ।
নারীকে উন্নয়ন আর প্রগতির মাপকাঠিতে পরিণত না করে মানুষকে (যেখানে নারী/ পুরুষ আলাদা বিবেচনা না করে) উন্নয়ন আর প্রগতির মাপকাঠি বিবেচনা করি । পুরুষ কিংবা নারী একজন পরিবারে থাকা খুব প্রয়োজন ।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন