আজ মঙ্গলবার, ২১ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০৬ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



কোন মতেই বিবেক ক্ষমা করছিলোনা, কারন আমিও কন্যার বাবা

Published on 20 April 2018 | 7: 44 pm

:: এস এম কামরুল হাসান পি পি এম ::

১৬ এপ্রিল ২০১৮ দিবাগত রাত । ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের ট্রেন তুর্না-নিশিতার ছ বগির ৩০ নাম্বার সীটের যাত্রী আমি। ট্রেনটি ছাড়ার ঠিক একটু আগে দেখলাম খুব অসুস্থ একজন মানুষ এক পা দুই পা করে ছ বগিতে উঠতে চেষ্টা করছে। কোনমতেই সুবিধা করতে পারছিলেন না । পাশেই দাঁড়ানো ছিলাম বলে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিলাম।যাক তিনি উঠে পাশে থাকা তাঁর ছোট মেয়েটাকে নিয়ে দু’জন দু’টি সীটে বসলেন ।

কমলাপুর থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত মনে হয় এক সাথে ছিলেন। এয়ারপোর্ট আসার পর এক তরুন যাত্রী এসে বললেন, ছোটবোন এইটা আমার সীট, অসুস্থ বাবার পাশে বসে থাকা মেয়েটি উঠে গিয়ে তাকে বসতে বললেন। ভদ্রলোক যথারীতি বসে পরলেন। কিছুক্ষন পর আমি হাঁটতে গিয়ে দেখি ছোট মানুষটা কি অসহায়ের মতো বসে আছে। এসির বাহিরে দরজার পাশে। একটু পর পর তার বাবাকে গ্লাস দিয়ে দেখে আবার গিয়ে বসে । আমি নিজের সীটে এসে বসলাম। কোনমতেই বিবেক ক্ষমা করছিলোনা , কারন আমিও কোন এক কন্যার বাবা, এমন যে আমার বেলায় বা আমার মেয়ের বেলায় হবে না,তা বলা মুশকিল ।

তাই আমি উঠে গিয়ে অসুস্থ বাবাটার পাশে যেই ভদ্রলোক বসেছিলেন তাকে বললাম, আপনি যদি আমার সীটে গিয়ে বসতেন মেয়েটি তার বাবার পাশে বসতে পারতো। ভদ্রলোক সাথে সাথে রাজী হয়ে গেলেন। তিনি আমার সীটে যাওয়ার পর আমি মেয়েটকে বললাম, ছোটবোন আপনি আপনার বাবার কাছে গিয়ে বসুন।আমি এইখানে বসে চলে যেতে পারবো।মনে হলো মেয়েটি ও মেয়ের বাবা ব্যপারটা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না!

তবুও আমি বলাতে সে তারাতারি তার অসুস্থ বাবার পাশে গিয়ে বসলো । আমি আমার ব্যাগটা বাবাটার মাথার উপরের ক্যারিয়ারে রেখে বোনটাকে বললাম,একটু লক্ষ্য রাখতে ।
যাক সারা রাত পার করে ট্রেন যখন চট্টগ্রাম পৌঁছায় তার একটু আগে আমি আমার ব্যাগটি আনতে গেলে, বাবাটা কি দিয়ে বা কি করে ধন্যবাদ দিলে আমি খুশী হবো যেনো ভাষা হারিয়ে ফেললেন।

যাক, তারপর বললেন, আপনার বাড়ি কোথায়? বললাম। তিনি তাঁর বাড়ির কথা বললেন।

কি করি জিজ্ঞাসা করলো?

বললাম, পুলিশ ইন্সপেক্টর।

তিনি বললেন, বাবা, সারারাত আমাদের জন্য কষ্ট করলেন । বললাম, এটা কষ্ট হলো কই? আমার মেয়ে হলেও আমি এই কাজটাই করতাম।যাক, এক পর্যায়ে বাবাটা জিজ্ঞাসা করলেন কোথায় বাসা বললাম।

তিনি বললেন, আমাকে একটু সি.এন.জিতে তুলে দিবেন কষ্ট করে? কারন আমি কারো উপর ভর না দিয়ে চলতে পারিনা। যাক তাঁর কথামতো ট্রেন থেকে নামালাম। দেখলাম একটু হেটে হয়রান হয়ে যান , তাই একটু বসেন আবার হাঁটেন।

যাক শেষ পর্যন্ত সি.এন.জিতে তুলতেই বললেন, বাবা আসেন, আপনার বাসা তো আমার যাওয়ার পথে পরবে, তাই আপনাকে নামিয়ে দিয়ে আমরা যাবো, যেতে চাইছিলাম না কেমন যেনো বিনিময় মনে হচ্ছিলো, তবুও বাবাটা এমন করে বললেন, না উঠে পারলাম না। সিএন.জিতে কথার এক ফাঁকে বললেন, অনেক চেষ্টা করে একটার বেশী সীট পাইনি তাই আপনাকে কষ্ট করতে হলো। বললাম এটা হতেই পারে, এখানে কষ্ট বা দয়ার কিছু নেই এটা আমার দায়।
পরে জানলাম তিনি সাবেক চেয়ারম্যন। তাঁর মেয়েটি চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে এমবিবিএস এর ৪র্থ বর্ষের ছাত্রী । সি এন জি থেকে আমি যখন নেমে যাচ্ছি সে সময়, বাবাটা বললেন, আমার ফোন নাম্বারটা দিতে। দিলাম। তিনি মিস কল দিয়ে তাঁর নাম্বারটাও দিলেন।

যাওয়ার সময় বললেন, আপনার সহযোগীতার কথা আমার সারাজীবন মনে থাকবে, অনেক দোয়া বাবা, তোমার জন্য , অনেক বড় হও তুমি, এমন পুলিশ হয় ?

সবাই বাবাটার জন্য দোয়া করবেন আমিও চাই তিনি যেনো সুস্থ্য হয়ে আবার একা একা সব করতে পারেন, আমার মতো অধমকে যেনো পথ চলতে কাজে না লাগে । ভালো থেকো বাবা।

আমি মনে করি ও বিশ্বাস করি-
নারী কে সন্মান দেওয়া অর্থ মাকে সন্মান দেওয়া।
নারী কে সন্মান দেওয়া অর্থ বোনকে সন্মান দেওয়া।
নারী কে সন্মান দেওয়া অর্থ স্ত্রীকে সন্মান দেওয়া।
নারী কে সন্মান দেওয়া অর্থ কন্যা কে সন্মান দেওয়া।
নারী কে সন্মান দেওয়ার অর্থই হলো নিজেকে সন্মান দেওয়া ।
একটা কথা যদি সবাই মনে মনে শপথ নেই আজ থেকে আমি পুরুষ কর্তৃক কোন নারীর সন্মান নষ্ট হবে না বা আমি নারী কর্তৃক কোন পুরুষ অসম্মান হবে না , দেখবেন সমাজটা পাল্টে যাবে , সবাইকে সবাই যার যার প্রাপ্য সন্মানটুকু দিই । হোক শুরু আমাকে দিয়ে ।
জয় হোক মানুষের।
জয় হোক মানবতার।
জাগ্রত হোক মানবিকতা।


# লেখক : পুলিশ পরিদর্শক, সদর ট্রাফিক, নোয়াখালী।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন