আজ বৃহঃপতিবার, ১৬ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০১ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



যৌন হয়রানী প্রসঙ্গে

Published on 16 April 2018 | 10: 55 am

:: আকতারুজ্জামান মোহাম্মদ মোহসীন ::

গত কিছু দিন যাবত নারীদের উপর যৌন হয়রানী নিয়ে বেশ আলোচিত হচ্ছে । বিষয়টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর্যায়ের একটি অপরাধ । বাংলাদেশের পরিস্থিতির প্রতিবেদন পেশ করেছে একশন এইড বাংলাদেশ শাখা । বিবিসি থেকে বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচিত হয় । তার মাত্র কয়েকদিন আগে ব্রাজিল থেকে অর্ধশত ক্রীড়া সাংবাদিক বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন শুরু করে । তারা যে বর্ণনা দিয়েছে তা রীতিমত হতবাক করার মত । তারই দিন কয়েক আগে হলিউড থেকে বিখ্যাত আর প্রখ্যাত অভিনেত্রীদের আন্দোলন শুরু হয় । তারা সারা বিশ্বে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় । সেখানে অস্কার পুরস্কার অনুষ্ঠানে বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোড়ন হয় । এমন কি তারা এমন বিশ্ব মানের অনুষ্ঠানে পোশাকের মাধ্যমে প্রতিবাদও করেছে । মজার বিষয় হচ্ছে ০২ এপ্রিল ২০১৮ তারিখের বিবিসি নিউজ বাংলার সংবাদে উঠে আসে খোদ জাতিসংঘ প্রধান কার্যালয়ে যৌন হয়রানীর বিরুদ্ধে । ব্যক্তি হিসাবে স্বয়ং বিল ক্লিনটন, বুশ এবং বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল ট্রাম্পসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বিরুদ্ধে নারীদের উপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠছে ।

প্রসঙ্গত বিষয়টি নিয়ে এভাবে খোঁজ খবর করা হয়, তাহলে দেখা যাবে পৃথিবীর সব দেশে এ ভাইরাস বিরাজমান রয়েছে । জাতিসংঘ সদর দপ্তরের মত জায়গায় যদি এটা বিরাজ করে তবে আশা করি পৃথিবীর আর কোন অফিস বা জায়গা বাদ নেই । তার আগে আর একটু বলতে ইচ্ছা করছে, তাহলে কি সভ্যতার শুরু থেকে বিগত সময়গুলোতেও এমন সমস্যা ছিল না ? হয়তো ছিল, তার জন্য ইতিহাস খুজতে হবে, বয়োবৃদ্ধ যারা আছেন তাঁদের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে । যদি তখনও এমন বিষয় থেকে থাকে, তাহলে এ সমস্যা আমাদের জন্য অনেক পুরানো । কিন্তু আমরা আগে সোচ্চার না হলেও এখন বেশ সোচ্চার হয়ে প্রতিবাদ করছি । তাহলে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে যৌক্তিক, বাস্তব সম্মত ভাবনা ভাববার সময় এসেছে । এমন সমস্যা কেন তৈরি হচ্ছে, আমাদের সমস্যা কোথায়, এমন সমস্যা হওয়ার কারণ কী ? আমাদের কোথায় স্খলন হয়েছে যার জন্য এমন জঘন্য একটি বিষয় মহামারী হিসাবে প্রচার হচ্ছে । এতে মা, স্ত্রী, সন্তানের সামনে পুরুষ হিসাবে নিজেকে লজ্জিত হতে হচ্ছে ।

যুগে যুগে পৃথিবীতে অপরাধ সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রতিকারের জন্য আইন হয়েছে । কিন্তু তাতে কি কোন অপরাধ কখনও কমেছে ? যদি কমে থাকে তাহলে কমতে কমতে এক সময় সে অপরাধ নির্মূল হয়ে যেত । পৃথিবীতে রোগ নির্মূলের অনেক সাফল্য আছে, কিন্তু অপরাধ নির্মূলের কোন সফলতার কথা আমাদের জানা নাই । অপরাধ মানুষের স্বভাবের একটি অংশ । তার মানে মানুষের স্বভাবের সমস্যা নির্মূল করা যায় না বলে ধরে নেয়া যায় । চিকিৎসা বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় পৃথিবী থেকে কলেরা, বসন্ত নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে । কিন্তু সেই চিকিৎসা বিজ্ঞান মানুষের সিগারেট/ ধূমপান/ নেশা/ আসক্তি ইত্যাদির স্বভাব নির্মূল করা সম্ভব হয়নি । তাহলে কি চিকিৎসা বিজ্ঞান কি মানুষের স্বভাবের কাছে অসহায় ? অথচ কেউ যদি মাদকাসক্তি থেকে রক্ষা পেতে চায় তাঁদের চিকিৎসাও কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের মানুষগুলো দিয়ে থাকেন । এসব আনুপাতিক হাড়ে কমলেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারনে সংখ্যায় কমেনি । কথাগুলো শুনতে কিছুটা খারাপ লাগলেও বিষয়টি বাস্তব ।

সমাজে একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে খুন করে থাকে, তখন সে মানুষটাকে সবাই খুনী বলে । কেউ চুরি করলে তাকে চোর বলে, ডাকাতি করলে তাকে ডাকাত বলে । অর্থাৎ তখন ঐ অপরাধীকে পুরুষ কিংবা মানুষ বলে সম্বোধন করা হয় না । তাকে তার বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়ে থাকে । কিন্তু যৌন হয়রানী, যৌন নির্যাতন কারীদের তার বিশেষণে বিশেষায়িত না করে পুরুষ বলে আখ্যায়িত করে থাকে । ফলে সমগ্র পুরুষ জাতি এটার জন্য কলঙ্কবোধ করে থাকে । অধিকারের দিকে বিবেচনা করলে এটাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলা যায় না ? অথচ এটা কেউ বিবেচনায় আনছেন না । যৌন হয়রানী/ নারী নির্যাতন একটা অপরাধ, এটা একজন অপরাধী করে থাকে, কিন্তু দোষী সাভ্যস্ত করা হচ্ছে সব আদর্শ পুরুষকেও । এটা কি কোন যুক্তির কথা ?

আমরা প্রতিদিন সভ্যতাকে জয় করে চলেছি । শিক্ষার উন্নতির মাধ্যমে আমরা উন্নত থেকে উন্নততর মানুষে পরিণত হচ্ছি । এটা কে অস্বীকার করবে ? আশা করি কেউ অস্বীকার করবে না । আমাদের নারী পুরুষের ভালবাসা প্রকাশের বৃদ্ধি ঘটেছে । আমাদের ছেলে মেয়েদের ভালবাসার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে । আমাদের ছাত্র ছাত্রীদের সহশিক্ষার বিস্তার ঘটেছে । আমরা নারী পুরুষ মিলে মিশে এক অফিসে বসে কাজ করছি । আমরা মহিলা পুরুষ পাশাপাশি বসে দুরদুরান্তে যাত্রা করছি । আমরা নারী পুরুষ একই পরিবারে দাদা দাদী, বাবা মা, ভাই বোন, স্বামী স্ত্রী, সমাজের অন্য সম্পর্কের মত সবাই বসবাস করছি । এমন কলঙ্কজনক বিশেষণ আমরা বেশিরভাগ পুরুষ গ্রহণ করতে রাজী নই । তাহলে আমাদের মাঝে যৌন হয়রানী, নারী নির্যাতনের মানসিকতা হয় কী করে ? কিন্তু হবে, সমাজে যেমন খুনী আছে, চোর আছে, ডাকাত আছে তেমনি যৌন হয়রানীকারী বা নারী নির্যাতনকারীও থাকবে । কারণ এটাও সামাজিক অন্য অপরাধের মত একটি অপরাধ । তাহলে আমাদের শিক্ষিত, সভ্য, আধুনিক, বিজ্ঞান মনস্ক সমাজে এমন যৌন হয়রানীর মত এমন জঘন্য বিষয়টি দিন দিন এত বৃদ্ধি পাচ্ছে কেন ? আমাদের (নারী পুরুষদের) কোথাও নিশ্চয় অধপতন ঘটছে । যার কারনে আগে এমন জঘন্য অপরাধ কম ছিল, এখন বেশি হচ্ছে বলে ধরে নিচ্ছি । কিন্তু কেন ?

এভাবে অপরাধের প্রচার না করে আসুন সকলে মিলে ভাবি । আসুন নিজেরা বিষয়টি সম্পর্কে সকল মানুষকে সচেতন করে তুলি, বুঝিয়ে দিই এ কেবল মানসিক সমস্যা যা একটু সংবরণ করলেই রোধ করা যায় । অপর দিকে এ ব্যপারে দাদী, মা, স্ত্রী, কন্যারও দায়িত্ব রয়েছে নিজের সদস্যদের প্রেষণা প্রদানের । তাছাড়া যখনই এমন ঘটনা ঘটে তখনি সেই অপরাধী পুরুষকে যদি শিক্ষক হয়ে বুঝিয়ে দেন এটা করে যেমন তার তেমন কোন লাভ হচ্ছে না, তেমনি না করলেও চলত । তাছাড়া সকল নারীদের প্রতি তার একটা পুরুষ দায়িত্ব আছে নিরাপত্তা প্রদান করায় । এ দায়িত্ব থেকে স্কুল/ কলেজ/ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সমাজের সচেতন মানুষ, মসজিদের ইমাম কেউ বাদ পরেন না । আশা করি বহির্বিশ্বের কোন উন্নতি করতে না পারলেও আমাদের সমাজের পরিবর্তন আনতে পারব ।

2.
বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে লিখতে হচ্ছে । কারণটা বুদ্ধিমানেরা সহজে বুঝতে পারছেন । তবুও আর একটু লেখার ইচ্ছা থেকে লিখছি । আমি এ সমাজের একজন মানুষ । আমি যেমন একজন পুরুষ, তেমনি আমার আছে একজন স্ত্রী । আমার যেমন একটা ছেলে আছে তেমনি আছে একটা মেয়েও । তাহলে আমি কিংবা আমার ছেলেটা কখন যৌন হয়রানীর অপরাধে অপরাধী হয়ে পরি, কিংবা কখন আমার স্ত্রী কিংবা মেয়েটা কখন যৌন হয়রানীর শিকার হয়ে পরে সে ভয়ে আতঙ্কিত থাকতে হচ্ছে । আমাদের ছেলে মেয়েদের, ছাত্র ছাত্রীদের, নারী পুরুষদের রাস্তায় যে ভাবে চলাফেরা করতে দেখি তাতে যৌন হয়রানীর মত অভিযোগের কথা ভাবতে বিশ্বাস হয় না । তাঁদের দেখা-দেখি, চলা-ফেরা দেখে বিশ্বাস হতে চায় না যে তারা এমন হয়রানী করতে পারে । কিন্তু তারপরও অভিযোগ যেহেতু আছে সেহেতু বিশ্বাস না করে উপায় নেই ।

যেখানে আমাদের ছেলে এবং মেয়েরা তাঁদের বন্ধু ছেলে এবং মেয়েদের বগলের নিচে হাত দিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে, তাঁদের কারনে পথচারীদের চলতে সমস্যা হয় । তারা এখন ছেলে আর মেয়ের মধ্যে কোন তফাৎ রাখতে চায় না । তাঁদের একের প্রতি অন্যের প্রীতি আর ভালবাসা দেখে বুঝার উপায় নেই তারা যৌন হয়রানীর মত অপরাধের অপরাধী হওয়ার মত এতটা অসভ্য হতে পারে । তারা যেহেতু একে অন্যকে এতটা ভালবাসে কেন অন্য মেয়েকে যৌন হয়রানী করতে যাবে ? কেন তারা একে অন্যকে অপ্রীতিকর স্পর্শ করতে যাবে ? প্রত্যেক ছেলে আর মেয়েদের সাথে যেরকম বন্ধুত্ব দেখা যায় সেখানে এমন কাজ ভাবতে বিশ্বাস হতে চায় না । কিন্তু তারপরও অভিযোগ যেহেতু আসছে সেহেতু বিশ্বাস না করে উপায় নেই ।

আমরা এখন অনেক আধুনিক হয়েছি, আমাদের মাঝে উন্নত বিশ্বের মানসিকতা তৈরি করার আন্দোলন চলছে । নিজেদের মন আর মানসিকতা পরিবর্তন করার সময় চলছে । আমরা নারী পুরুষ দেশের সব কাজে এক সাথে কাধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি । আমরা এখন অধিকার নিয়ে ভাবতে শিখেছি । আমরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মানবাধিকার নিয়ে কাজ করছি । আমরা সমাজের উন্নয়নে কাজ করছি । আমরা এখন নারী পুরুষ মিলে মিশে কাজ করছি না এমন কোন স্থান নেই । তাহলে এমন ঘটনা কেন ঘটছে ? আশা করি যারা নারীদের যৌন হয়রানী করছে তারা যেমন এ সমাজের পুরুষ তেমনি যারা এমন জঘন্য কাজটি করছি তারাও এ সমাজের নারী ।

এ হয়রানী হওয়া এবং হয়রানী করা পুরুষ আর নারীরা অন্য কোন গ্রহের বাসিন্দা নয়, এ সমাজেরই মানুষ । এমন বিষয় নিয়ে এভাবে হৈ হুল্লুর না করে আমাদের সমাজের এমন অবক্ষয় নিয়ে আমাদের ভাবা দরকার । হঠাৎ করে পুরুষেরা এমন যৌন হয়রানীর ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে কেন, নারীরাও কেন এমন জঘন্য মানুষের শিকার হচ্ছে ? এর গানিতিক সমাধান দুটি – একটা হচ্ছে পুরুষদের এমন ভাইরাস থেকে রক্ষা করে ফিরিয়ে আনা, দ্বিতীয়টি হচ্ছে নারীদের এমন জঘন্য হয়রানী থেকে বেঁচে থাকার কৌশল অবলম্বন করা । যে কোন মুল্যে এমন জঘন্য অপরাধ থেকে দেশ, সমাজ, নারীদের বাচাতে হবে, পুরুষদের এমন অপরাধ থেকে প্রতিরোধ করতে হবে ।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন