আজ মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮ ইং, ১১ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক সন্দ্বীপের নুরুল আলম হত্যা মামলায় ৫ আসামীর ফাঁসি

Published on 10 April 2018 | 7: 48 pm

যুক্তরাষ্ট্রের সিটিজেন বৃদ্ধ নুরুল আলম হত্যা মামলার ৫ আসামীর ফাঁসি হলো গত ১০ এপ্রিল।
যেভাবে উদঘাটিত হলো হত্যাকান্ডের ক্লু —–

চট্টগ্রাম জজ কোর্ট এর আইনজিবি এম, মিলাদুল আমীন (মিলাদ) কিভাবে প্রমান করলেন আসামীদের অপরাধ তা স্ববিস্তারে তুলে ধরেছেন তার ফেসবুকে। সেই লিখাটি নচে হুবহু সোনালী নিউজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল।
**********************************************************************************************************************

বায়েজীদ থানাধীন আলম মনজিল, মালিক ধনাঢ্য নুরুল আলম, থাকতেন সপরিবারে আমেরিকায়, ২০১১ সালের এপ্রিলে সস্ত্রীক বাংলদেশে বেড়াতে আসেন।দোতালার ১টা ফ্লোর রেখেছেন নিজেদের জন্য। বাড়ীর কেয়ার টেকার রেখেছিলেন স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের আপন ভাইয়ের ছেলে মুজিবুর রহমান (মুজীব)কে, তার আগে কেয়ার টেকার স্ত্রীর বোনের ছেলে মিজান উদ্দীন নিজামকে। নিজাম ও স্ত্রীক বিনা ভাড়ায় থাকতো আলম ম্যানসন সংলগ্ন আলম সাহেবের টিন সেডের ঘরে, মিজান অক্সিজেন কাঁচা বাজারে মুরগীর ব্যবসা করতো।
ঘটনার তারিখ ৩০ এপ্রিল ২০১১। সন্ধ্যার দিকে নিজামের স্ত্রী খালেদা বেগম আলম ম্যানসন থেকে কিছুক্ষনের জন্য আলম সাহেবের চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পেলো, তারপর শুনশান নিরবতা।
প্রায় ঘন্টাখানেক পর মিজান বাসায় ফিরলে স্ত্রী নিজামকে ঘটনা জানায়, নিজাম আলম সাহেব হয়তো স্ত্রী কিংবা কেয়ার টেকার মুজীবের সাথে চিল্লচিল্লি করেছে গুরুত্ব দেয়নি, পরে স্ত্রীর অনুরুধে আলম সাহেবের ফ্ল্যাটে গিয়ে কলিংবেল দেয় কেউ দরজা খোলেনা দেখে আলম সাহেবের মোবাইলে কল দেয়, বার কয়েকবার রিং পড়ার পর তাও বন্ধ হয়ে যায়। এবার মিজান মুজিবকে কল দিলে মুজিব জানায় আমিতো ফুফুকে (আলম সাহেবের স্ত্রী) নিয়ে মার্কেটে এসেছি কেনাকাটা করতে। কারন পরদিন আলম সাহেব স-স্ত্রীক আমেরিকায় চলে যাওয়ার কথা।

এ অবস্হায় মিজানের মনে অজানা আশংকা জাগে কিছু একটা হয়েছে, কিন্তু হয়তো ভাবতেও পারেনি নুরুল আলমের জীবনের নির্মম পরিনতি ঘটে গেছে ইতিমধ্যে। কিন্তু তখনো নুরুল আলম সাহবের ফ্ল্যাটের ভিতরে অবস্হান করছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়, মিজান দৌড়ে নীচে গিয়ে চায়ের দোকানদার মাসুদ ফরহাদকে ডেকে নিয়ে আসে দুজনে মিলে বাড়ীর বাউন্ডারী ওয়াল বেয়ে নুরুল আলমের বেড রুমের ভিতরে টর্চলাইট মেরে আলম সাহেবেকে খাটের সাথে হাত পা বাঁধা মুখে কাপড় ঢুকানে অর্ধেক খাটে অর্ধেক ফ্লোরে অবস্হায় দেখতে পায়। দুজনে মিলে দ্রুত লোহা জোগাড় করে দরজার তালা ভেঙ্গে দেখে আলম সাহেবের নিথর দেহ।

তারা পুলিশকে খবর দেয় পুলিশ আসে, মার্কেট থেকে এসে পৌঁছে নিহত নুরুল আলমের স্ত্রী ও কেয়ার টেকার মুজিব। মুজীব অনেক কান্নাকাটি করে ফুফার জন্য। আসে আত্মীয় সম্পর্কে জামাতা মো: মোস্তফাও।
রাতে অজ্ঞাত দুবৃত্তের হাতে নুরুল আলম খুন হয়েছেন মর্মে মো: মোস্তফা হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তের দায়িত্ব পড়ে চৌকুস অফিসার এস, আই প্রিটন সরকারের উপর।
পুলিশ মুজিবের সন্দেহ মতে মিজান উদ্দীন নিজামকে গ্রেফতার করে। প্রয়োজনে যোগাযোগ করার জন্য কেয়ার টেকার মুজিবের মোবাইল নম্বর নিয়ে যায়।
নুরুল আলম সাহেবের লাশ সন্দ্বীপের বাউরিয়া ইউনিয়নে দাফন শেষে কুলখানি শেষ হয়ে আমেরিকা থেকে আসা সন্তানেরা আলম ম্যানসনে ফিরে আসে। সন্ধ্যায় বায়েজিদ থানার ও,সি সাহেব আলম সাহেবের বড় ছেলেকে কল করেন কেয়ার টেকার মুজীবকে নিয়ে একটু থানায় আসতে। বাদী ও ভিকটিমের ছেলেরা সবাই থানায় হাজির হলো।

ও,সি সাহেবের কক্ষে তদন্ত কর্মকর্তা মামলা সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা সবাই উপস্হিত, খানিকটা নিরবতা, তদন্ত কর্মকর্তা জানালেন এই বিশ্বাস ঘাতক কেয়ার টেকার মুজিবই তার অপর ৪ সঙ্গী মিলে নুরুল আলমকে পুর্ব পরিরিকল্পিত ভাবে খুন করেছে। বলতে না বলতে মুজিব দৃড় কন্ঠে অস্বিকার করলো। আলম সাহেবের ছেলেদেরও বিশ্বাস হচ্ছিলনা। ও,সি সাহেব হত্যাকান্ড পরবর্তী অপরাপর খুনি—– মো:মনির, কাকন বড়ুয়া প্র: জুয়েল বড়ুয়া, বাবলু বড়ুয়া, সন্জীব বনিকদের সাথে মুজিবের মোবাইলের কথোপকথনের রেকর্ড বাজিয়ে শুনালে ভেঙ্গে পড়ে স্বীকার করে খুনের পরিকল্পনা সমস্ত ঘটনা। মুজীবকে সাথে নিয়ে মুজিবের মাধ্যমে মুজিবের মোবাইল ফোন থেকে কৌশলে কল দিয়ে রাতেই গ্রেফতার করা হয় খুনী জুয়েল বড়ুয়া ও বাবলু বড়ুয়া কে। তাদের দেয়া স্বীকারোক্তি অনুয়ায়ী ঐ দিন মধ্য রাতেই গ্রফতার করা নজুমিয়ারহাট এলাকার ব্যাবসায়ী জনৈক নাছির উদ্দীন কে, তার কাছ থেকে উদ্ধার হয় নিহত নুরুল আলমের ব্যবহ্নত সেই মোবাইল সেটটি। সে আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দী দিয়য়ে জানায় এই মোবাইল হত্যাকান্ডের পরদিন ভুলবশত সন্জীবের কাছ থেকেই কিনেছে। পরবর্তীতে তদন্ত কর্মকর্তা বিগত ১৪/১০/২০১১  আসামী ( ১) মুজিবুর রহমান মুজীব, পিতা– নুরুচ্চাফা,(২) মো: মুনির, পিতা–ফখরুল ইসলাম, (৩) বাবলু বড়ুয়া, পিতা– দিলীপ বড়ুয়া, (৪) কানন বড়ুয়া প্রকাশ জুয়েল বড়ুয়া, পিতা –লালেন্দ্র বড়ুয়া (৫) সনজীব বনিক পিতা–রতন বনিক সহ মোট ৫ জনকে আসামীর বিরুদ্ধে মামলার চার্জশীট দেয়। মিজান উদ্দীন নিজাম কে অব্যহতি দেয়। নাসির উদ্দীনকে সাক্ষী করারা হয়।
গ্রেফতারকৃত ৩ আসামী আদালতে পাঁচ জন সকলেই এই নির্মম খুনের সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে ১৬৪ ধারার জবানবন্দী দেয়।
এই পর্যায়ে ২০১১ সালে আমি সংবাদ দাতা অর্থ্যাৎ বাদীর পক্ষে আইনজীবী নিযুক্ত হয়ে মামলা প্রমানের দায়য়িত্বভার গ্রহন করি এবং সি,এম,এমম আদালতে চার্জশীট এক্সেপ্ট করাই, অতপর বিচার নিষ্পত্তির জন্য মামলাটি বিজ্ঞ ৫ম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদলতে প্রেরিত হয়, নিয়মিত আদালতে বিচার বিলম্বিত হতে পারে বিধায় ২০১৩ সালে জানুয়ারীতে মামলাটি চাঞ্চল্যকর মামলা হিসাবে অন্তরভুক্ত করে বিভাগীয় দ্রুত বিচার আনি। ট্রাইবুমালে মামলাটি পরিচালনা করি আমি ও বিজ্ঞ স্পেশাল পি,পি জনাব আইয়ুব খান, প্রায় শেষ পর্যায়ে এসেছিলো বিচার প্রক্রিয়া কিন্তু দুর্ভাগ্য বশত: হরতাল, অবরোধ আন্দোলনের কারনে কোর্ট না বসায় ১৩৫ কার্য দিবসে মামলা শেষ করতে না পারায়———
মামলাটি আবার ৫ম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে ফিরে আসে। সবকিছু নতুন করে আবার শুরু। এখানে মামলার এডি: পি,পি ছিলেন শ্রী পি,কে দেব। কিন্তু তিনি অফিসিয়াল্লি রাষ্ট্র পক্ষে থাকলেও ৫ম আদালতে বাদী পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করি মুলত: আমি এবং আমাকে সার্বিক আইনী সহযোগীতা করেন চট্টগ্রাম বারের সাবেক সভাপতি প্রখ্যাত আইনজজীবী জনাব ফেরদৌস আহম্মেদ চৌধুরী।
এখানেও মামলার শেষ পর্যায়ে এলো,মৌখিক যুক্তিতর্কও শেষ করলাম,জজ সাহেবের নির্দেশনায় ইংরেজীতে যুক্তিতর্কের লিখিত কপি জমা দিলাম।রায়ের তারিখ পড়বে ঠিক এই সময় আবার বিনা মেঘে বজ্রপাত, জজ সাহেবের বদলীর আদেশ এলো তিনি চলে গেলেন, নতুন জজ সাহেব আবার যুক্তি তর্ক করতে শুনানী করতে হবে——–

শুরু হলো অপেক্ষার পালা, দীর্ঘ প্রায় ১বছর জজ নাই, কৌশলগত কারনে চার্জেস কোর্টে রায় করানেটা যথার্থ মনে করিনি। ইতিমধ্যে এডি:পি,পি—পি,কে দেব ব্রেন স্ট্রোক করে অচল হয়ে গেলেন মামলার রাষ্ট্র পক্ষে অফিসিয়াল দায়িত্ব পেলেন এডি: পি,পি, মে: তসলিম উদ্দীন তিনিও পি,কে দার মত আমার চাহিত মতে রাষ্ট্র পক্ষে হাজিরা কিংবা সময়ের দরখাস্ত দিয়ে আমাদের কৃতার্থ করেছেন বৈ আর কিছু নয়। মুলত: চাঞ্চল্যকর নুরুল আলম হত্যা মামলাটির সফল সমাপ্তি ঘটিয়েছি একমাত্র আমি এডভোকেট এম, মিলাদুল আমীন (মিলাদ) লার্নেড সিনিয়ার জনাব ফেরদৌস আহম্মদ চৌধুরী। সুতরাং সাংবাদিক বন্ধুদের অনুরুধ করবো শুধু অফিসিয়াল প্রসিডিওরের পিছনে না দৌড়ে, বাস্তবতার নিরিখে সংবাদ ছাপান।
রায় ও আদেশ —– ৫ আসামী সকলকে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যদন্ড কার্যকর করার নির্দেশ।
আমি বাদী পক্ষের মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী এ রায়ে সন্তুষ্ট।
এম, মিলাদুল আমীন (মিলাদ)
এডভোকেট এন্ড এ,পি,পি জজ কোর্ট
চট্টগ্রাম।


Advertisement

আরও পড়ুন