আজ সোমবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৮ ইং, ১০ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



২৫ মার্চ কাল রাত

Published on 25 March 2018 | 4: 15 pm

:: আকতারুজ্জামান মোহাম্মদ মোহসীন ::

পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের অদূরদর্শী এবং হিংসার এক বিশাল উদাহরণ ২৫ মার্চ কাল রাত । তাঁদের আচরণ সেদিন সারা বিশ্বকে স্তব্দ আর হতবাক করে দিয়েছিল । কারণ তারা বাঙ্গালীদের উপর চিরকাল বৈষম্য মুলক আচরণ করে আসলেও তাঁদের হত্যা কিংবা খুনের মাধ্যমে দমনের ইচ্ছা ছিল মারাত্তক ভুল সিদ্ধান্ত । পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতারা এমন ভুল এবং জঘন্য কাজ করতে পারে তা কোন অবস্থাতেই চিন্তা করা যায় না । কারণ রাজনীতিবিদ হিসাবে পাকিস্তানের মানুষ এতটা অদূরদর্শী হতে পারে তা তারা নিজেদের আচরণে যেমন প্রমান করেছে, তেমনি তাঁদের গণতান্ত্রিক মতাদর্শের ভাবনা আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে তারা আমাদের ঘৃণা করেছে, আমাদের তারা উপ-জাতি হিসাবে মনে করেছে । আমাদের পাকিস্তানের নাগরিক হিসাবে তারা কখনও মেনে নিতে পারেনি ।

ব্রিটিশ শাসকেরা পাকিস্তান এবং ভারতকে স্বাধীনতা দিয়ে এই উপ-মহাদেশ ছেড়ে গেল । ভারত নিজেদের পুরো দেশকে নিজের দেশ হিসাবে সাম্যের মাধ্যমে পরিচালিত করে তাঁদের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে চলেছে । কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানকে (বাংলাদেশ) তাঁদের আলাদা উপ-নিবেশ ভাবতে শুরু করে । চলতে থাকে বাঙ্গালীদের উপর তাঁদের বৈষম্য মুলক আচরণ । জনা কয়েক বাঙ্গালীকে তাঁদের আত্তীয় করে সারা বাংলাদেশকে একটা উপজাতিতে পরিণত করতে থাকে । রাষ্ট্রীয় বাজেট, উন্নয়ন, অবকাঠামো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ইত্যাদিতে চরম বৈষম্যতা শুরু করে । সামরিক সরকারের সহায়তায় রাজনৈতিক ফয়দা আদায় করে নিজেরা চলতে থাকে । ফলে বাঙ্গালীরা উপেক্ষিত হতে থাকে দিনের পর দিন ।

গণতান্ত্রিক বুলি মুখে বলে বেড়ালেও মানার বেলায় তাঁদের দারুন উদাসীনতা ছিল । কারণ সংখ্যায় কম লোক উর্দু ভাষায় কথা বললেও তারা উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে ঘোষণা করে বাংলাকে উপেক্ষা করতে শুরু করে । কিন্তু বাঙ্গালী ছাত্র জনতা তা মেনে নেয়নি । তাঁদের এমন অন্যায় ঘোষণা সফল করার জন্য বাঙ্গালীদের উপর গুলি পর্যন্ত চালায় এবং অনেক ছাত্র জনতাকে খুন করে । বাঙ্গালীরা তাঁদের মানসিকতা বুঝতে পেরে ধীরে ধীরে স্বাধিকার আন্দোলনের দিকে পা বাড়ায় । হোসেন শহীদ সরওয়ারদী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আব্দুল হামিদ ভাসানীরা অনেকে বাঙ্গালীদের দাবী আদায়ের চেষ্টা করেন । কিন্তু কাউকে সফল হতে দেননি ।

আগের নেতাদের হাত ধরে আন্দোলনের প্রসারতা আনেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । গণতন্ত্রের সুত্র ধরে নির্বাচন করার কথা থাকলেও তারা এটা বুঝতে পেরেছিল সংখ্যা গড়িষ্ঠ বাংলাদেশের মানুষের কাছে তারা পরাজিত হবে । বাঙ্গালী নেতাদের দমিয়ে রাখার জন্য অনেক মামলা মোকদ্দমার মাধ্যমে দমন করতেও পিচ পা হল না । কিন্তু তাতে কোন ফল হয়নি । তারা যত নির্যাতন করেছে, বাংলাদেশের মানুষ তত বেশি জেগে উঠেছে । তবু অনেক টালবাহানা শেষে নির্বাচন দেন । নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে । শুরু হয় দায়িত্ব প্রদানের হঠকারিতা । সংসদ অধিবেশন ডাকার বদলে তা স্থগিত করেন । শুরু করেন হাজারও বাহানা । তারা তাঁদের প্রতিহিংসার কারনে কিছুতেই বাঙ্গালীদের শাসন মানতে পারেনি ।

সামরিক সরকারের সহায়তায় বিলম্ব করতে শুরু করে ক্ষমতা হস্তান্তর । গণতন্ত্রের প্রথাকে তারা পায়ে ঠেলে আওয়ামীলীগকে দেশ চালাতে দিতে রাজী হয়নি । বাঙ্গালীরা ভাল করে বুঝতে পেরে শুরু করে আন্দোলন । ৭ই মার্চে রেস কোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমান কালজয়ী ভাষণ দেন । যে ভাষণ সারা বাংলাদেশের মানুষকে দারুন ভাবে স্বাধীনতায় উজ্জীবিত করে । তিনি বাংলাদেশের মানুষকে পরবর্তী পরিকল্পনা, দিক নির্দেশনা, দেশবাসীর সকলের করনীয় ইত্যাদি জানিয়ে দেন । যে ভাষণ সারা বিশ্বে মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার জন্য সংরক্ষণ যোগ্য প্রামান্য চিত্রের স্বীকৃতি পেয়েছে । তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এ ভাষণের পর হয়তো তাকে কারাগারে জীবন কাটাতে হতে পারে । তাই মানুষকে জানিয়ে দিয়ে গেছেন তার অনুপস্থিতিতে কি করতে হবে । যে ভাষণে ছিল একটি দেশের উপর, মানুষের উপর বৈষম্য, নির্যাতন, অবিচারের পূর্ণ ইতিহাস । বর্তমানে কে কি করবে এবং কি করবে না তার স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে দেন। ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের কি ভাবে জম্ম দেবে তার পরিষ্কার উপদেশ দিয়ে গিয়েছিলেন ।

রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিক ভাবে মকাবেলা করার কথা হলেও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতারা এতটা ভয় পেল যে তারা সামরিক শক্তির সাহায্য নিতে ছাড়ল না । নিজেরা বাঙ্গালীদের হত্যার মাধ্যমে দমন করার আশায় নীল নকশা তৈরি করে । ২৫শে মার্চ ১৯৭১ কাল রাতে অপারেশন সার্চ লাইট নামে ঘুমন্ত, নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষের উপর ঝাপিয়ে পড়ে । খুন করতে থাকে শহরের উল্লেখযোগ্য স্থান সমূহে । যে হত্যা পৃথিবীর জঘন্যতম নারকীয়, বর্বর, নির্মম, নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডে পরিণত হল । এক রাতে এত মানুষ হত্যা পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম ঘটনায় রুপ নিয়েছিল । স্তব্দ করে দিয়েছিল সারা পৃথিবীর বিবেকবান মানুষগুলোদের ।

আমরা সেই সব বাঙ্গালী শহীদ বীরদের উত্তরসূরি । এটা কারও একার, গোষ্ঠীর উপর নির্যাতন ছিল না । এ প্রতিবাদ ছিল এ দেশের আপামর জনসাধারণ সকলের । সে দিনের বেঁচে যাওয়া মানুষের যেমন এ দিনটিকে সরণ করার কথা, তেমনি আমরা যারা তার পড়ে জম্মেছি তাদেরও সশ্রদ্ধে চিত্তে সরন করা উচিত । মানুষের অনেক বিষয় থাকতে পারে যা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে । কিন্তু কিছু বিষয় থাকে যা সব সময় বিতর্ক, বিসংবাদের উপরে থাকা উচিত । জাতীয় এমন সব বিষয়ে নিজেরা এক হতে না পারা মানে নিজেদের ছোট করে রাখা । মানুষের রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকতে পারে । কিন্তু দেশের কিছু বিষয় থাকে যা সব কিছু উপড়ে থাকার কথা ।

আমাদের এ দিন থেকে শিক্ষার আছে অনেক কিছু । মানুষ নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে মানুষের উপর কতটা নির্মম, নিষ্ঠুর আর বর্বর হতে পারে তার একটা জীবন্ত উদাহরণ । মানবতা, যুদ্ধাপরাধ, আইনের কাছে এমন গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করা উচিত । তাঁদের এমন অপরাধের জন্য বিচার হওয়া উচিত । আমরা আমাদের স্বাধীনতা আদায় করে নিলেও অপরাধের বিচারের কথা আমরা অস্বীকার করতে পারি না । এমন অপরাধের বিচার হয়নি বলে পৃথিবীতে এমন অপরাধ নিত্য ঘটে চলেছে । আজকের ২৫শে মার্চের কাল রাতের আমাদের সকলের দাবী হউক এমন মানবতা বিরোধী, নির্মম, নিষ্ঠুর, বর্বর গণহত্যার মত অপরাধের বিচার চাই ।


Advertisement

আরও পড়ুন