আজ রবিবার, ২২ এপ্রিল ২০১৮ ইং, ০৯ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়ে আদেশ আজ

Published on 19 March 2018 | 2: 09 am

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া জামিন আদেশের বিরুদ্ধে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষের নিয়মিত আপিলের আবেদনের (লিভ টু আপিল) শুনানি শেষ হয়েছে। আদেশের জন্য আজ দিন ধার্য করেছেন আপিল বিভাগ। খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া জামিন আদেশ বহাল থাকবে কি না, তা জানা যাবে আজ।

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বিভাগ রোববার শুনানি শেষে আদালত আদেশের এ দিন ধার্য করেন। অন্য বিচারপতিরা হলেন- বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। আদালতে দুদকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। খালেদা জিয়ার পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও এজে মোহাম্মদ আলী।

রোববার সকাল থেকেই সুপ্রিমকোর্টে প্রবেশে ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। পরিচয়পত্র ছাড়া কাউকে প্রবেশ

করতে দেয়া হয়নি। বিচারপ্রার্থীসহ সবাইকে আদালত চত্বরে প্রবেশ করতে হয় কড়া তল্লাশির মধ্য দিয়ে। মাজারগেট এলাকায় রায়টকার, জলকামানসহ পুলিশের ব্যাপক সমাগম দেখা যায়। আদালতে বিএনপি নেতাদের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও নজরুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, জয়নুল আবেদীন, ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, অ্যাডভোকেট বাসেত মজুমদার, শ ম রেজাউল করিম, নুরুল ইসলাম সুজন, আবদুর রেজাক খান, মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদলসহ বিপুল সংখ্যক আইনজীবী ও মিডিয়াকর্মী উপন্থিত ছিলেন।

শুনানির শুরুতেই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, চার যুক্তিতে খালেদা জিয়াকে হাইকোর্ট জামিন দিয়েছেন। খালেদা জিয়াকে লঘুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এরপর তিনি একটি মাদকদ্রব্য আইনের মামলার রায়ের অংশ পড়ে শুনিয়ে বলেন, ওই মামলায় একজনের দুই বছরের সাজা হয়েছিল। তবুও সাবেক বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমেদ লঘুদণ্ড বিবেচনায় নেননি। তাদের জামিন দেননি। হাইকোর্টে আমরা এই যুক্তি দেখিয়েছিলাম। হাইকোর্ট আমাদের বক্তব্য গ্রহণ না করে খালেদা জিয়ার মামলায় সাংঘর্ষিক আদেশ দিয়েছেন। হাইকোর্ট যে চারটি যুক্তিতে জামিন দিয়েছেন এর একটিতে বলেছিলেন, খালেদা জিয়া জামিনের অপব্যবহার করেননি। এ প্রসঙ্গে দুদক আইনজীবী বলেন, তিনি বিচারিক আদালতের অনুমতি না নিয়েই বিদেশে গেছেন। কাজেই হাইকোর্টের এই যুক্তি সঠিক নয়। মেডিকেল গ্রাউন্ডস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানে তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে কোনো কাগজপত্র দেননি। শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, বিচারিক আদালতের রায়ে একজন সাক্ষীর মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে, এতিমখানার টাকা উত্তোলনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার অনুমোদন ছিল। এর মধ্যে তারেক রহমান ও তার ভাগ্নে মুমিনুর রহমান চার লাখ টাকা তুলে নিয়েছেন। তারা কীভাবে এ টাকা তুলে নিলেন? অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বিচার বিলম্বিত করতে তারা এমন কোনো পথ নেই যে অবলম্বন করেননি। এ মামলা যেন বাস্তবে না আসে, সেজন্য তারা বেশ কয়েকবার উচ্চ আদালতে বিভিন্ন অজুহাতে আসেন। মামলার নথি থেকে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার অজ্ঞাতে টাকা এসেছে বা তোলার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না এটা ঠিক না। অ্যাটর্নি জেনারেল হাইকোর্টের চারটি যুক্তির পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, তাকে স্বল্প মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে, আর আপিল শুনানি হবে না, এটা অযৌক্তিক।

খালেদা জিয়া জামিনের অপব্যবহার করেননি- এর পাল্টা যুক্তি দেখিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এখন তিনি (খালেদা জিয়া) দণ্ডিত। এটা এখন বিচারাধীন বিষয়। একই যুক্তি এখানে প্রযোজ্য হবে না। খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে অসুস্থ- এ যুক্তির জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, খালেদা জিয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী। একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং বয়স্ক নারী। এ বিবেচনায় তাকে দশ বছরের সাজা না দিয়ে পাঁচ বছরের সাজা দিয়েছেন বিচারিক আদালত। একজন আসামিকে কতবার এই সুবিধা দেয়া হবে? এখানে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারা প্রযোজ্য হবে। ৪২৬ ধারা নয়। রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় দয়া এবং বারবার অনুকম্পা দেখানো ঠিক হবে না। কোনো রাষ্ট্রেই এটা দেখানো হয়নি। এরপর পাকিস্তানের এক মামলার নজির তুলে ধরেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, আমাদের দেশে সাবেক রাষ্ট্রপতির সাড়ে তিন বছর মামলায় সাজা হয়েছিল। উনি জেলও খেটেছেন। এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, লালুপ্রসাদের সঙ্গে কি এ ঘটনার মিল আছে? জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, লালুপ্রসাদের মামলা সুপ্রিমকোর্টেও তার জামিন খারিজ হয়েছিল। খালেদা জিয়াকে অসুস্থ বলা হচ্ছে; কিন্তু তিনি মিটিং, সমাবেশ করছেন, বিদেশ যাচ্ছেন, সবকিছু করছেন। আজ যদি জামিন দেয়া হয়, তাহলে আপিলের শুনানি অনিশ্চিত হয়ে যাবে। এ পর্যায়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবী এজে মোহাম্মদ আলী বলেন, আপিল বিচারাধীন থাকাবস্থায় হাইকোর্ট জামিন দিতে পারেন, না-ও দিতে পারেন। তবে জামিন দেয়াটাই স্বাভাবিক। লঘুদণ্ডের কারণে হাইকোর্ট জামিন দিয়েছেন। জামিন না দেয়ার নজির খুবই কম। সাধারণত দেখা যায়, আপিল বিভাগ হাইকোর্টের জামিনের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেননি। সীমিত ক্ষেত্রে আপিল বিভাগকে হস্তক্ষেপ করতে দেখা গেছে। যদি ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হয়, সেক্ষেত্রে আপিল বিভাগ হস্তক্ষেপ করতে পারেন। হাইকোর্ট এ ধরনের মামলায় জামিন দেয়া বা না দেয়ার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক কর্তৃপক্ষ। এরপর আধা ঘণ্টার বিরতিতে যান আদালত।

এজে মোহাম্মদ আলী তার শুনানির শুরুতে বলেন, ৪২৬ ধারায় মামলার সারবত্তা যাচাই করা হাইকোর্টের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। হাইকোর্টে আবেদন আসবে, তারা এটা পুরোটাই দেখবেন। তারপর তারা জামিন দেবেন কি দেবেন না, সিদ্ধান্ত জানাবেন। আপিল বিভাগ হস্তক্ষেপ করেন না, যদি না এখানে বিচারের বিচ্যুতি না ঘটে। এ সময় বিচারপতি ইমান আলী জানতে চান, বিচারিক আদালত ও হাইকোর্ট দণ্ড দিলে সেক্ষেত্রে আপিল বিভাগ কি হস্তক্ষেপ করতে পারে না? জবাবে এজে মোহাম্মদ আলী বলেন, অনেক মামলায় হাইকোর্ট জামিন দিয়েছেন। মুষ্টিমেয় মামলায় আপিল বিভাগ হস্তক্ষেপ করেননি। মামলার কাগজপত্র বা রায়ের কোথাও বলা হয়নি খালেদা জিয়া অর্থ আত্মসাতে জড়িত। তার স্বাক্ষর ছিল কোথাও বলা হয়নি। এটা পরিষ্কার যে, এ ধরনের জামিনের ক্ষেত্রে আপিল বিভাগ হস্তক্ষেপ করেননি। এজে মোহাম্মদ আলী বলেন, লাখ লাখ সাধারণ মামলা ছেড়ে দিয়ে এটাকে সামনে আনা হচ্ছে। এটাকেই আগে শুনতে হবে। উনি (অ্যাটর্নি জেনারেল) অনেক বড় গল্প বললেন। আমি এটার জবাব দেয়া সমীচীন মনে করি না। মামলাটি আদালতের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চলুক। আমি মনে করি, হাইকোর্টের জামিনের সিদ্ধান্ত সঠিক। এ পর্যায়ে খালেদা জিয়ার আরেক আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, এটা খালেদা জিয়ার মামলা। তাই এ মামলার গুরুত্ব অনেক। তিনি না হলে আমরাও আসতাম না। সরকারও এত উৎসাহী হতো না। হাইকোর্টের ক্ষমতা আছে জামিন দেয়ার। এ সময়ে এজে মোহাম্মদ আলী বলেন, দশ বছরের সাজার দু-একটি মামলা আছে যেগুলোয় জামিন মিলেছে। কিন্ত আপিল বিভাগ হস্তক্ষেপ করেননি।

উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত এ বিষয়ে আদেশের জন্য আজ দিন ধার্য করেন।

এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, গত সপ্তাহে একটি রায়ে নির্মিত ১৮তলা ভবন এতিমখানাকে বুঝিয়ে দিতে বলেছেন হাইকোর্ট। অতএব খালেদা জিয়ার মামলাতেও এতিমদের টাকা উধাও হয়েছে। এ সময় মাহবুব উদ্দিন খোকন অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ করে বলেন, শেখ হাসিনার মামলায় সরকার বা দুদককে এভাবে আসতে দেখিনি। যতটা না এ মামলায় দেখেছি।

শুনানি শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্ট যে যুক্তিতে খালেদা জিয়াকে জামিন দিয়েছেন, সেটা সঠিক হয়নি। যেখানে এতিমদের অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে, সেখানে জামিন দেয়া সঠিক হবে না। দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান সাংবাদিকদের বলেন, খালেদা জিয়া জামিনে ছিলেন; কিন্তু তিনি জামিনের অপব্যবহার করেননি- এ বিষয়ে বিচারিক আদালতের আদেশ থেকে দেখিয়েছি উনি আদালতের অনুমতি (পারমিশন) না নিয়ে বিদেশে গিয়েছেন। এটা বলা যাবে না যে, উনি জামিনের অপব্যবহার করেননি।

অন্যদিকে খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন সাংবাদিকদের বলেন, আইনগত যে দিকগুলো আমরা আদালতে তুলে ধরেছি ইনশাআল্লাহ সবই আমাদের পক্ষে। ফলে আমরা আশা করি, হাইকোর্ট যে জামিন আদেশটি দিয়েছেন, সেটি বহাল রাখবেন আপিল বিভাগ।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক ড. আক্তারুজ্জামানের আদালত খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে আদালত খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয় আসামির সবাইকে মোট ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন। এরপর থেকেই খালেদা জিয়া পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কারাগারে আছেন। এরপর খালেদা জিয়ার পক্ষে জামিন আবেদন করা হলে হাইকোর্ট গত ১২ মার্চ তাকে চার মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। পরদিনই আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালতে তা স্থগিত চেয়ে আবেদন করেন রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদক। ওইদিন আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর জামিন আদেশ স্থগিত না করে আবেদন দুটি শুনানির জন্য আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন। ১৪ মার্চ আপিল বিভাগ চার মাসের জামিন দিয়ে হাইকোর্টের দেয়া আদেশ ১৮ মার্চ পর্যন্ত স্থগিত করেন। ওই সময়ের মধ্যে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষকে নিয়মিত আপিলের আবেদন (লিভ টু আপিল) করার নির্দেশ দেন সর্বোচ্চ আদালত। ওইদিন বিকালে খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া জামিনের ওপর আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার চেয়ে তার আইনজীবী চেম্বার জজ আদালতে আবেদন করলে তা শুনানির জন্য আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এদিকে বৃহস্পতিবার লিভ টু আপিল করে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষ।


Advertisement

আরও পড়ুন