আজ সোমবার, ২৩ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৮ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



নেপাল থেকে মরদেহ আসছে আজ

Published on 19 March 2018 | 2: 07 am

নেপালে ইউএস-বাংলার বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে যাদের মরদেহ ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়াই শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে তাদের লাশ আজ দেশে আসছে। সকালে নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাসে তাদের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। তারপর দুপুরে তাদের দেশে আনা হবে এবং বিকাল ৪টায় বিএএফ ঘাঁটি বঙ্গবন্ধু কুর্মিটোলায় মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

অন্যদিকে বিমান দুর্ঘটনায় আহতরা সবাই শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন। তবে তাদের কিছুটা মানসিক অসুস্থতা রয়েছে, যার চিকিৎসা চলছে। দু’সপ্তাহের মধ্যে বাড়ি ফিরতে পারবেন তারা।রোববার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। এ সময় মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম,সচিব সিরাজুল হক খান, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ, আহতদের চিকিৎসক দলের প্রধান ডা. সামন্ত লাল সেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, ঢামেক হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সোহেল মাহমুদ নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাসে কাজ করছেন। তিনি জানিয়েছেন, শনিবার পর্যন্ত তারা ৩৩টি মরদেহ চিহ্নিত করতে পেরেছেন। আরও ৪ থেকে ৫টি মরদেহ চিহ্নিত করার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি, ১৪ জন নেপালি এক একজন চীনের নাগরিক রয়েছেন। বাংলাদেশি মরদেহ মোট ২৬টি। বাকি আটজনকে এখনও চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। তারা ধারণা করছেন, ডিএনএ টেস্ট ছাড়াই ওই আটজনের মধ্যে তিন থেকে চারজনকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। যাদের শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে তাদের ক্ষেত্রে সেটাই করা হবে। আমাদের দূতাবাসের পক্ষ থেকে নেপাল সরকারকে মরদেহ চিহ্নিত ও হস্তান্তর সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেয়া হয়েছে। ওই চিঠি অনুমোদনের পর তাদের ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ করা হবে।

তিনি বলেন, যাদের ইতিমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সোমবারের (আজ) মধ্যে যাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে তাদের সোমবারই দেশে আনা হবে। ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ সেখানে অবস্থানকারী বাংলাদেশিদের নিয়ে আসবে। বিমান বাহিনীর সি-১৩০ বিমানে লাশ আনা হবে।

এ বিষয়ে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইমরান আফিফ নেপালের ইউনিভার্সিটি টিচিং হাসপাতালে সাংবাদিকদের বলেছেন, রোববার বিকাল ৪টার মধ্যে শনাক্ত হওয়া ১৮টি লাশসহ অন্য যেগুলো শনাক্ত করা হবে সেগুলোসহ সব মরদেহের গোসল সম্পন্ন করে কফিনে তোলা হবে। সোমবার (আজ) সকাল ৬টায় নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাসে জানাজা সম্পন্ন হবে। তারপর বিমান বাহিনীর বিমানে করে লাশ দেশে আনা হবে। নিহতদের স্বজনদের বিষয়ে তিনি বলেন, শনাক্ত হওয়া লাশের স্বজন ও বাংলাদেশি চিকিৎসকরা ইউএস-বাংলার ফ্লাইটে ঢাকা ফিরবেন।

রোববার নেপালের টিইউটিএইচ হাসপাতালে মরদেহ গ্রহণের বিষয়ে নিহতদের স্বজনদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মরদেহ হস্তান্তর কিন্তু আমরা (ইউএস-বাংলা) করব না। ইউএস-বাংলার কাছ থেকে মরদেহ দূতাবাস গ্রহণ করে পুলিশকে দেবে। পুলিশ আপনাদের দেবে। তিনি বলেন, সোমবার (আজ) ঢাকায় বিমানবন্দরে মন্ত্রীরা থাকার কথা, ফলে নিরাপত্তা কড়াকড়ি থাকবে। তাই প্রতি পরিবারকে তাদের সদস্যদের নাম দিয়ে দিতে হবে আগে।

নিহতদের স্বজনরা সোমবার ভোর ৬টায় এসে কাগজপত্রসহ মরদেহ নিয়ে অ্যাম্ব^াসিতে (দূতাবাসে) যাবেন। সেখানে প্রথম জানাজা হবে। এরপর সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে মরদেহগুলো বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হবে। মরদেহের স্বজনদের নিয়ে একটি বিমান বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেবে বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে। এর আধা ঘণ্টা পর মরদেহ নিয়ে রওনা হবে দুটি বিমান।

একটি ইউএস-বাংলার বিমান এবং আরেকটি এয়ারফোর্সের বিমান। এয়ারপোর্টে দু’জন করে স্বজন ভেতরে ঢোকার সুযোগ পাবেন। নেপাল থেকে যে স্বজনরা বাংলাদেশ ফিরবেন তারা ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করার পর অপেক্ষা করবেন। কে কোথায় মরদেহ নিতে চান ইউএস-বাংলাকে জানালে মরদেহ সেখানে পৌঁছে দেয়া হবে। মরদেহের হিসেবে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা বিমানবন্দরে করা থাকবে।নেপালের ত্রিভুবন ইউনিভার্সিটি টিচিং হাসপাতালে ১৮ বাংলাদেশির মরদেহ শনাক্তের কথা জানানো হয়েছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান বিধ্বস্তের পাঁচ দিন পর ফরেনসিক পরীক্ষা শেষে এসব মরদেহ উপস্থিত নিকটাত্মীয়দের দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। শনিবার সন্ধ্যায় ওই হাসপাতালের মহারাজগঞ্জ ক্যাম্পাসের ইন্সটিটিউট অব মেডিসিনের সামনে ফরেনসিক বিভাগের পক্ষ থেকে ১৪টি মরদেহের পরিচয় জানান হাসপাতালটির ফরেনসিক বিভাগের প্রধান প্রমোদ শ্রেষ্ঠ। এ সময় বাংলাদেশি মেডিকেল টিমের সদস্য ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। পরে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে আরও চারজনের পরিচয় জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ মেডিকেল টিমের সদস্য ডা. ইমাম হোসাইন এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

এই ১৮ জনের মধ্যে রয়েছেন- পাইলট আবিদ সুলতান, কো-পাইলট পৃথুলা রশীদ, কেবিন ক্রু খাজা হোসেন মো. শফি এবং যাত্রী ফয়সাল আহমেদ, বিলকিস আরা, মোসাম্মৎ আখতারা বেগম, মো. রকিবুল হাসান, সানজিদা হক, মো. হাসান ইমাম, মিনহাজ বিন নাসির, শিশু তামারা প্রিয়ন্ময়ী, মো. মতিউর রহমান, এসএম মাহমুদুর রহমান, তাহিরা তানভীন শশী রেজা, শিশু অনিরুদ্ধ জামান, মো. নুরুজ্জামান ও মো. রফিকুজ জামান। এছাড়া রোববার বিকালে ওই বিমানের ক্রু শারমিন আক্তার নাবিলার লাশ শনাক্ত হয়।

এদিকে সংবাদ সম্মেলনে আহতদের চিকিৎসায় গঠিত বোর্ডের প্রধান ডা. সামন্ত লাল সেন জানান, বিমান দুর্ঘটনায় আহত ৫ জনকে দেশে এনে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে তাদের চিকিৎসা চলছে। এছাড়া শাহীন বেপারী নামে আহত আরেকজন রোববার দেশে এসেছেন। বার্ন ইউনিটে অন্যান্য রোগীর মতো তাকেও ভর্তি করা হবে। সোমবার (আজ) কবির হোসেন নামে আরেকজন দেশে আসবেন।

তিনি জানান, বিমান দুর্ঘটনায় আহত দু’জন রোগী সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তারা হলেন- ড. রেজওয়ান ও ইমরানা কবির। এছাড়া ইয়াকুব আলী নামে আরেকজন রোগীকে রোববার বিকালে একটি বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুুলেন্সে দিল্লির এ্যাপোলো হাসপাতালে নেয়া হবে। তার পরিবারের ইচ্ছাতে তাকে সেখানে নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, মেডিকেল টিমের সবাই একে একে সব রোগীকে দেখেছেন। রোগীদের মধ্যে একমাত্র শেহরিনের পায়ের তিনটি আঙুল ভাঙা। তাই তার একটি ছোট অপারেশন করতে হবে। তার মানসিক অবস্থা আরেকটু স্থিতিশীল হলেই আমরা সার্জারিতে যাব। অন্যরা সবাই ভালো আছেন। তাদের স্বাভাবিক চিকিৎসা চলছে।

সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, আমাদের একটি মেডিকেল টিম নেপালে কাজ করছে। এছাড়া এখানে সামন্ত লাল সেনের নেতৃত্বে একটি মেডিকেল টিম চিকিৎসা করছে। অন্যান্য সংকটের মতো এটা আমরা সফলভাবে মোকাবেলা করছি। তিনি হাসপাতালে রোগীদের দেখতে বিভিন্ন দফতরের মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, আহতদের বিষয়ে কারও কিছু জানার থাকলে তার কাছ থেকে যেন জেনে নেন। হাসপাতালে গিয়ে ভিড় করে রোগীদের চিকিৎসা যেন ব্যাহত না করেন। ঢামেক হাসপাতালের অর্থপেডিক বিভাগের চিকিৎসক ডা. শহিদুল ইসলাম এ সময় চিকিৎসাধীন রোগীদের বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তিনি জানান, শেহরিনের (৩০) ডান পায়ে তিনটি আঙুল ভাঙা, পিঠে সামান্য স্কিন লস আছে। পায়ে প্লাস্টার করা হয়েছে। মেহেদীর (২৯) হাঁটুতে আঘাত আছে কিন্তু হাড় ভাঙা নেই। আশা করছি দুই সপ্তাহ পর তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন। স্বর্ণার (২২) তেমন কোনো সমস্যা নেই, তার তলপেটে সামান্য আঘাত রয়েছে। অ্যানির (২২) ডান গোড়ালিতে ব্যথা, কিন্তু হাড় ভাঙা নেই, লিগামেন্টে একটু সমস্যা রয়েছে। রুবায়েতের (৩২) সবই ভালো, বুকের ডানদিকে সামান্য চোট আছে।

ঢামেক হাসপাতালের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ফারুক আলম বলেন, আমরা চারজন রোগীকে দেখেছি, তাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা, দুঃস্বপ্ন, ভয়ভীতি কাজ করছে। আমরা তাদের সাইকোলজিক্যাল ফ্রাস্টেড চিকিৎসা দিয়েছি। তাদের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হতে পারে। পোস্ট ট্রমাটিক ডিজঅর্ডার হলে অনেক সময় মানুষের আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয়। সেজন্য তাদের দীর্ঘমেয়াদি কাউন্সিলিংয়ে রাখতে হবে। এজন্য আমরা তাদের বিস্তারিত ঠিকানা রাখব। এছাড়া যে মেয়েটি স্বামী-সন্তান হারিয়েছে তাকে ‘ব্রেকিং দ্য ব্যাড নিউজ’ পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেয়া হবে।

এদিকে নেপালে ইউএস-বাংলার দুর্ঘটনায় নিহত সাতটি পরিবারের ১৫ জনের নমুনা সংগ্রহ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ডিএনএ ল্যাব। রোববার সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) শারমিন জাহান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মরদেহগুলো যেন সঠিকভাবে শনাক্ত করা যায় সেজন্য স্বজনদের এই নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এএসপি শারমিন জাহান বলেন, গত দু’দিনে সিআইডির ডিএনএ ল্যাবে স্বজনদের নমুনা নেয়া হয়েছে। বাবা-মা আর ভাইবোন ছাড়াও পরিবারের স্বজনদের কাছ থেকে এই নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ডিএনএ টেস্টের পর নিহতদের সঙ্গে তা ম্যাচিং করা হবে।

নিহত বৈমানিক আবিদের স্ত্রী হাসপাতালে : নেপালের কাঠমান্ডুতে বিধ্বস্ত ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজটির প্রধান বৈমানিক আবিদ সুলতানের শোকার্ত স্ত্রী আফসানা খানম গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তার পরিবারিক সূত্রে জানা গেছে, রোববার সকালে তাকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে ভর্তি করা হয়। ওই হাসপাতালের ইনফরমেশন ডেস্কের কর্মকর্তা মো. শিহাব উদ্দিন বলেন, আফসানা খানমের ব্রেইন স্ট্রোক হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি করার পর একটি মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তে তার অপারেশন হয়েছে। এখন তিনি আইসিইউতে আছেন। হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলমের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছে।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন