আজ রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ ইং, ১০ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



কেন কোটা সংস্কার জরুরি? কেন সমর্থন করা উচিত?

Published on 18 March 2018 | 7: 04 pm

:: রাজিয়া সুলতানা ::

কোটা সংস্কার আন্দোলন আজ জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিয়েছে, প্রতিটি বিভাগেই শিক্ষার্থী ও চাকরী প্রত্যাশীরা দলে দলে আন্দোলনে নেমেছে, সচেতন করে তুলছে সর্বস্তরের মানুষকে।শুরুটা কয়েকজনের হাতে হলেও মাত্র ২ দিনে সংখ্যাটা ৫ লাখ ছাড়িয়ে গেছে! ইতিমধ্যে কোটাধারীদেরও একটা গ্রুপ কোটা বহাল রাখার আন্দোলন শুরু করেছে…

কিন্তু এতগুলো সার্টিফিকেটধারী সচেতন-শিক্ষিত নাগরিক হিসেবে আপনার /আমার নৈতিক অবস্থান কি হওয়া উচিত? ১৪ মার্চ পুলিশের লাঠিপেটা খেয়ে,আহত হয়ে,গ্রেফতার হয়ে ৫৫জন দীর্ঘ সাড়ে সাত ঘন্টা অবরুদ্ধ থেকে, শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মির্জা মো: বদরুল হাসানের দ্বারা ৭০০+ বেনামি আন্দোলনকারী মামলা খেয়েও দমে না গিয়ে বরং কয়েকগুণ চাকরী প্রার্থী ও শিক্ষার্থী স্বপ্রণোদিত হয়ে কেন আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, কতটা পুঞ্জিভূত ক্ষোভ জমা আছে… ভাবতে হবে।

কেউ কেউ নির্বাচনের আগেই আন্দোলন হচ্ছে বলে ষড়যন্ত্রের আভাষ খুঁজছেন বাস্তবতা যাচাই না করেই, যদিও আন্দোলনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সহ রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ। নির্বাচনের আগে বিরোধীদল, চাপ সৃষ্টিকারী গুষ্ঠিসহ সবাই দাবি পেশ করতে পারলে বছরের পর বছর ধরে উপেক্ষিত মেধাবীরা কেন পারবে না?

পৃথিবীর আর কোন দেশে আছে সরকারী চাকরি (১ম শ্রেণী)তে ৫৬% কোটায় নিয়োগ বিধি?

এই পায়ে কুড়াল মারা সিদ্ধান্ত কি জাতির জন্য ক্ষতিকর নয়?

গত কয়েকটি বিসিএস পরীক্ষায় দেখা গেছে কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পেয়ে ৬০০০ পদ খালি রাখা হয়েছে, ফলে অন্তত ৬০০০ সাধারণ প্রার্থী যোগ্যতা থাকা স্বত্বেও বঞ্চিত হয়েছে যাদের অনেকেরই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের মেয়াদ শেষ!

কোটাধারীদের জন্য এতবেশি সুযোগ আছে অথচ প্রার্থী নেই, তার মানে এত বেশি কোটার দরকারই নেই।

আজকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলায় কোটার নামে যা হচ্ছে তা ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সরকারের অন্যায়-অবিচারের সমানুপাতিক। নিচে ক্ষুদ্র নমুনা দেওয়া হলো:

১। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ৬৯ জন রাষ্ট্রদূতের মাঝে ৬০ জন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আর মাত্র ৯ জন পূ:পাকিস্তান থেকে নেয়া হয়েছিলো,প্রায় একই চিত্র দেখা যায়-৩৬তম বিসিএস এ পররাষ্ট্র ক্যাডারে নিযুক্ত ২০ জনের ১২ জন কোটা থেকে আর মাত্র ৮ জন সাধারণ থেকে!

২। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের ৪৬ জন যুগ্মসচিবের – ৩৯ জন পশ্চিম পাকিস্তানি আর মাত্র ৭জন পূর্ব পাকিস্তান থেকে! তদ্রূপ দেখি ৩৬তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে ১১৭জনের ৬৪জন কোটায়, মাত্র ৫৩ জন সাধারণ প্রার্থী থেকে!

৩। ১৯৬২সালে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের উপ-সচিব ১২৬ জনের মাঝে ১০২ জন পশ্চিম পাকিস্তানি এবং মাত্র ২৪ জন পূর্ব পাকিস্তানি! ৩৬তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে ২৯২ জনের মধ্যে ১৬০ জন কোটাধারী এবং মাত্র ১৩২ জন সাধারণ!

উল্লেখ্য, পাকিস্তান আমলে শুধু পশ্চিম পাকিস্তানিদের নিয়োগের জন্য কোন বিশেষ পরীক্ষা না হলেও স্বাধীন বাংলায় শুধু কোটাধারীদের জন্য ৩২ তম বিসিএস পরীক্ষা, বাংলাদেশ ব্যাংকে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় বিশেষ নিয়োগ পরীক্ষা, অগ্রণী ব্যাংকে কোটাধারীদের জন্য স্পেশাল নিয়োগ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে! যে শোষণ-বৈষম্য থেকে একদিন জাতির পিতা বাঙালীকে মুক্ত করতে আন্দোলন করেছেন, স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে এনেছেন তাঁরই অবর্তমানে ৪৭ বছর পরেও সেসব জঘন্য বৈষমের শিকার কোটি জনতা!

কোটা ব্যবস্থা অনেক দেশেই আছে, এখানেও প্রয়োজন বোধে রাখা যায় তবে সে কারণে কোনভাবেই মেধার অবমূল্যায়ন হওয়া উচিত নয়। মুক্তিযোদ্ধা কোটা (নাতিপুতিসহ!), পোষ্য কোটা সহ এত বেশি কোটা সুবিধা না থাকলে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে কোটার সুবিধা লাভে সার্টিফিকেটধারী নামের তালিকা পরিবর্তনের এত নির্লজ্জ রীতি আমাদেরকে দেখতে হতো না। আলেমের ছেলে আলেম হয় এমন কোন নিশ্চয়তা নেই, আবার মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হলেই দেশ প্রেমিক হবে এমন কোন কথা নেই, ক’দিন আগেই ত পত্রিকায় প্রমাণ এলো মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত পুলিশ মাদক-ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত!

মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, সুবিধা-সম্মান যা দেওয়ার সরাসরি তাঁদেরকেই দেয়া হোক, বড়জোর তাঁদের সন্তান পর্যন্ত কিন্তু নাতি-নাতনি পর্যন্ত নয়। আবার একই কোটার একাধিকবার ব্যবহারও লক্ষ্যণীয়! ফলে মেধার মাত্রারিক্ত অবমূল্যায়ন রোধে পাঁচ দফা দাবি নিয়ে চলছে কোটা সংস্কার আন্দোলন। দাবিসমূহ হলো:

১। কোটা ব্যবস্থায় সংস্কার এনে ৫৬% থেকে কমিয়ে সর্বোচ্চ ১০% করতে হবে।

২। কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পেলে মেধা থেকে শূন্য পদে নিয়োগ দিতে হবে।

৩। কোটায় কোন ধরণের বিশেষ নিয়োগ পরীক্ষা না নেওয়া

৪। সরকারি চাকরিতে সবার জন্য অভিন্ন বয়সসীমা এবং

৫। চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার না করা।

সরকার পক্ষের কাছে অনুরোধ এই আন্দোলনকারীদের প্রতিপক্ষ না ভেবে তাদের কথাগুলো শুনুন, ন্যায্য দাবিদাওয়া মেনে নিয়ে অহিংস আন্দোলনকে সম্মান জানান। লক্ষ লক্ষ মেধাবীর মূল্যায়ন যদি এই সরকারের আমলে হয় তাতে আখেরে আওয়ামীলীগেরই জয় হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন