আজ বুধবার, ১৮ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৩ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



যোগ্যতা অর্জনের স্বীকৃতিপত্র পেল বাংলাদেশ – স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ ‘মাইলফলক’

Published on 18 March 2018 | 2: 06 am

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে ওঠার যোগ্যতা অর্জনের স্বীকৃতিপত্র পেয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) এই স্বীকৃতিপত্র জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেনের কাছে হস্তান্তর করেছে।

নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যায় এ স্বীকৃতিপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেয়া হয়। নিউইয়র্কে ত্রিবার্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে সিডিপি। সব ধাপ অতিক্রম করায় ২২ মার্চ বৃহস্পতিবার সাফল্য উদযাপন করবে বাংলাদেশ। স্বীকৃতিপত্র গ্রহণ করে রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ ‘দেশের জন্য মাইলফলক’।জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের (ইকোসক) মানদণ্ড অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে বছরে একটি দেশের মাথাপিছু আয় কমপক্ষে ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার হতে হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলার। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ ৭২.৯ অর্জন করেছে। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক ৩২ ভাগের কম হতে হয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের রয়েছে ২৪.৮ ভাগ।

সিডিপি জানায়, এর আগে বাংলাদেশ তিন দফা ব্যর্থ হলেও এবার উন্নয়ন সূচকের সব যোগ্যতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশের অগ্রগতি ২০২১ সালে দ্বিতীয় দফায় পর্যালোচনা করা হবে। সে সময় উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বীকৃতির বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। বাংলাদেশের পাশাপাশি এবার লাওস ও মিয়ানমারও স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ হয়েছে।

প্রথমবারের মতো এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করায় নিউইয়র্কে শুক্রবার সন্ধ্যায় (বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোর) জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সিডিপি প্রধান রোনাল্ড মোলেরাস এ সংক্রান্ত চিঠি বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেনের কাছে হস্তান্তর করেন। এর আগে বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সদর দফতরে এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন সংক্রান্ত ঘোষণা দেয়া হয়। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের ঘোষণাকে বাংলাদেশ কাক্সিক্ষত সাফল্য হিসেবে দেখছে। এ সাফল্য উদযাপনে অংশ নিতে বাংলাদেশের আমন্ত্রণে রোনাল্ড মোলেরাস ঢাকায় যাচ্ছেন বলেও জানান। উদযাপন অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও উন্নত বিশ্বের প্রতিনিধিরা ঢাকায় যাচ্ছেন।

রোনাল্ড মোলেরাস বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণে বাংলাদেশ মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা- এই তিন সূচকের সব ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করেছে। এটিকে ‘ঐতিহাসিক’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় আমরা সন্তুষ্ট। এজন্য স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের কাক্সিক্ষত বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ সামাজিক খাতগুলোর ব্যাপক উন্নয়ন তাদের সিদ্ধান্ত নিতে সহজ করেছে।

জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ ‘দেশের জন্য মাইলফলক’। তিনি বলেন, আজ আমাদের সবার জন্য এক ঐতিহাসিক দিন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সিপিডি এক্সপার্ট গ্রুপের চেয়ার হোজে অ্যান্তোনিও ওকাম্পো, জাতিসংঘের এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ), এলএলডিসি (ভূ-বেষ্টিত স্বল্পোন্নত দেশ) ও সিডস (উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলো) সংক্রান্ত জাতিসংঘের উচ্চতর প্রতিনিধি ও আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ফেকিতামইলোয়া কাতোয়া উটইকামানু, জাতিসংঘে নিযুক্ত বেলজিয়ামের স্থায়ী প্রতিনিধি মার্ক পিস্টিন, তুরস্কের স্থায়ী প্রতিনিধি ফেরিদুন হাদী সিনিরলিওলু, ইউএনডিপির এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের আঞ্চলিক ব্যুরোর পরিচালক ও জাতিসংঘের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হাওলিয়াং ঝু এবং ইউএনডিপির মানবিক উন্নয়ন রিপোর্ট অফিসের পরিচালক ড. সেলিম জাহান। এছাড়া বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন, নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেট ও জাতিসংঘ সদর দফতরে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার ওপর একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়। এতে দ্রুতগতিসম্পন্ন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। এরপর একে একে এমডিজি অর্জন, এসডিজি বাস্তবায়নসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গ সমতা, কৃষি, দারিদ্র্যসীমা হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, রফতানিমুখী শিল্পায়ন, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পোশাক শিল্প, ওষুধ শিল্প, রফতানি আয় বৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক সূচক ধরা হয়। পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকা মেট্রো রেলসহ দেশের মেগা প্রকল্পগুলো তুলে ধরা হয়।

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন বক্তারা। তারা আশা করেন, ২০২১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। ইউএনডিপির পরিচালক ড. সেলিম জাহান বলেন, বাংলাদেশের গড় আয়ু ৭২ বছর। ভারত ও পাকিস্তানের গড় আয়ু ৬৬ বছর। অন্যদিকে পাঁচ বছর পর্যন্ত শিশুমৃত্যুর হার বাংলাদেশে প্রতি হাজারে ৩৫ জন। ভারতে তা প্রতি হাজারে ৫৫ জন ও পাকিস্তানে ৬৬ জন।

বিশেষজ্ঞরা জানায়, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে কোনো দেশ বেরিয়ে আসতে সক্ষম হলে ওই দেশ আর দরিদ্র নয়- এমন ধারণা রয়েছে। ফলে ওইসব দেশ সাধারণত দাতা দেশ ও উন্নত দেশের সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পায় না।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন