আজ সোমবার, ২৫ জুন ২০১৮ ইং, ১১ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



মিনিকেট-নাজিরশাইল চালে স্বাস্থ্য ঝুঁকি

Published on 16 March 2018 | 5: 54 am

:: কৃষিবিদ লায়ন মোঃ কামাল উদ্দীন ::
 
 
 
শহুরে মানুষ থেকে শুরু করে গ্রামের ভূমিহীন চাষী, সর্বত্রই বেড়েছে মিনিকেট-নাজিরশাইল চালের চাহিদা। হঠাৎ করে এত জনপ্রিয়তা পাওয়া চালটি নিয়ে তাই দীর্ঘদিন ধরেই চলছে গবেষণা। বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, মিনিকেট বা নাজিরশাইল নামে সত্যিকারের কোন ধান-ই পৃথিবীতে আবিষ্কৃত হয়নি। তাই কোথা হতে আসছে এ চাল এমন প্রশ্ন স্বাস্থ্য সচেতন মানুষদের।
 
সম্প্রতি জানা গেছে, মিনিকেট নামের ওই চিকন-সরু চাল তৈরি করা হয় বি.আর ২৮ এবং ২৯ ধানের চালকে একটি সুক্ষ্ম মেশিনের সাহায্যে কেটে সরু করা হয়। এরপর ওই সরু চালকে পলিশ করে সাদা ধবধবে ও চটকদার করে আর্কষনীয় করে তোলা হয়। রান্না করলে সরু চালের মত ভাত হয় এবং খেতে ভাল লাগে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই প্রযুক্তির ব্যবহার কুষ্টিয়ার এক চাল ব্যবসায়ী প্রথম শুরু করেন। এ চালের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায়, পরবর্তীতে বড় বড় কোম্পানী এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নাম দিয়ে বাজারে মিনিকেট চাউলের বিপণন শুরু করে। বর্তমানে এই চালের রমরমা ব্যবসা চলছে। তবে আমরা কি জানি, এ প্রযুক্তিতে তৈরি করা চাল আমাদের শরীরের জন্য কতটা উপকারী?
 
ভাত বাঙ্গালীর প্রধান শর্করা জাতীয় খাদ্য। শুধু তাই নয়, বিশ্বে ভাত খেয়ে বেঁচে থাকে এমন মানুষের সিংহভাগই বাঙ্গালী। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আমাদের চাল গ্রহণের গড় হার দৈনিক প্রায় আধা কেজি (৪৫৬ গ্রাম)। সৌভাগ্যের কথা, আমাদের স্বল্প জমিতে কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষকের নিরলস প্রচেষ্টায় বিগত কয়েক বছরে প্রায় তিন কোটি টন চাল উৎপাদিত হয়েছে। এতে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্নতা অর্জিত হয়েছে। পাশাপাশি আমরা এখন খাদ্য রপ্তানি করতে শুরু করেছি। গোটা পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশ খাদ্য শস্য উৎপাদনে ৪র্থ স্থানে আছে। মাছ (মিঠা পানি) উৎপাদনে আমরা আছি ৪র্থ স্থানে। এ ছাড়া দেশীয় ফলমূল ও শাক-সবজি উৎপাদনেও ৫ম স্থানে আছি আমরা।
 
তবে দুঃখের বিষয়, বিগত কয়েক বছরে দেশে ধানের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও শহুরে মানুষ এমনকি নিম্নবিত্তদের মধ্যেও মিনিকেট চালের জনপ্রিয়তা বেড়ে গেছে। অন্যান্য চালের দামের চেয়ে এ চালের দাম কেজিতে দশ-বারো টাকা বেশি হলেও ভোক্তারা ছুটছে মিনিকেট-নাজিরশাইলের দিকে। তবে মিনিকেট চালের পেছনে ছুটলেও ভোক্তারা বুঝছেন না দেশীয় চালের মর্ম কতটুকু।
 
মিনিকেট চাল জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর তা বিভিন্ন সংস্থার বিশেষ করে কৃষি গবেষনা ধান গবেষনা ও শেরে- বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষনা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, মেশিনের সাহায্যে চালের উপরিভাগ ছেটে ফেলায় চালের মিনারেল ও ভিটামিন নষ্ট হয়ে যায়। ফলে এ মিনিকেট চালের ভাত বেশিদিন খেলে মানব শরীরের কিডনী ও লিভার ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই উচ্চ মূল্যে মিনিকেটের নামে সরু চাউ ক্রয় করে আমরা কি মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি না? জনস্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে সরকারের এ ব্যাপারে আশু পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করছি।
 
আমাদের দেশে অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে আমন মৌসুমে বহুকাল ধরে নাজিরশাইল দেশী জাতের ধানের আবাদ হয়ে আসছে। এ ধানের চাল অপেক্ষাকৃত সরু এবং খেতে সুস্বাদু বলে এর চাহিদাও আছে বেশ। তবে সম্প্রতি এর ফলন কমে যাওয়ায় চাষিরা এর আবাধ প্রায় কমিয়ে দিয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ধান গবেষনা ইনস্টিটিউট(বিরি) আমন মৌসুমে বি.আর-৪৯ নামক উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেন। এ জাতের ধানের চাল অন্যান্য উফশী জাতের চালের চেয়ে অপেক্ষাকৃত সরু। বর্তমানে আমন মৌসুমে এ জাতের ধানের চাষ হচ্ছে এবং ফলনও ভাল। কিন্তু আমাদের দেশের সুবিধাভোগী কিছু চাল ব্যবসায়ী এ জাতের ধান এক সিদ্ধ করে চাল উৎপাদন করে। যা দেখতে অনেকটা নাজিরশাইল চালের মতো। সুতরাং উচ্চ মূল্যে যে নাজিরশাইল নামক চাল বিক্রি হয় তা সত্যিকার ভাবে নাজিরশাইল নয়। তাই উচ্চমূল্যে মিনিকেট-নাজিরশাইল চাল ক্রয় করে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়াবেন না।
 
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, কবি ও কলামিস্ট


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন