আজ শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৬ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



ইখলাস বাড়ানোর তিনটি উপায়

Published on 11 March 2018 | 2: 46 am

ইখলাস অর্থ একনিষ্ঠতা বা বিশুদ্ধতা। একমাত্র আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করার জন্যই সৎকাজ করা এবং অসৎকাজ থেকে বিরত থাকাকে ইখলাস বলে। নানা কারণে এই একনিষ্ঠতায় ঘাটতি হতে পারে, চলে আসতে পারে মুনাফিকি। আছে সেই ঘাটতি দূরীকরণের উপায়ও!

সুখবর! দারুণ সুখবর!

মুনাফিকি সম্পর্কে ইমাম আল-হাসান আল-বাসরি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন

“শুধুমাত্র মুনাফিকরাই নিজেদেরকে মুনাফিকি থেকে নিরাপদ ভাবে। আর শুধুমাত্র মু’মিনরাই এই মুনাফিকিতে জড়িয়ে পড়ার ভয়ে থাকে।”

আপনি যে এই প্রবন্ধটি আগ্রহ নিয়ে পড়তে শুরু করেছেন, এর অর্থ আপনি মুনাফিকিতে জড়িয়ে পড়ার ভয় করেন। এজন্যই মুনাফিকি থেকে বেঁচে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি হাসিলের নিয়মগুলো জানতে এসেছেন। নিঃসন্দেহে এটি ঈমান ও ইখলাসের লক্ষণ। সঠিক ব্যাপার আল্লাহ্‌ ভালো জানেন।

মনে রাখবেন, আল্লাহ্‌র কাছে আপনার ইবাদাত গ্রহণযোগ্য করতে হলে দুটি শর্ত পূরণ করতে হবে:

■সেই কাজটি অবশ্যই কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী হতে হবে।

■ আর অবশ্যই কাজটি কেবলমাত্র আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্যই হতে হবে।

আল্লাহ্‌ বলেন –

অতএব, যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে। [সূরাহ আল-কাহফ (১৮):১১০]

এখন আসুন  জেনে নিই কীভাবে আমরা আমাদের নেক আমলগুলোকে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্যই সম্পাদন করতে পারি।

আল্লাহ্‌র সাহায্য অনুসন্ধান

আমাদের ২টি জরুরী বিষয় মনে রাখা দরকার:

■ আল্লাহ্‌র সাহায্য ছাড়া যেমনিভাবে আমরা শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারি না, চোখ দিয়ে দেখতে পারি না, কোনোকিছু অনুভব করতে পারি না, এমনকি খেতে বা শুনতেও পারি না, ঠিক তেমনিভাবেই তাঁর সাহায্য ছাড়া নিষ্ঠার সাথে তাঁর ইবাদাত করাও আমাদের পক্ষে সম্ভব না।

■ কখনওই এতটা আত্মবিশ্বাসী হবেন না যে আপনি ঈমান নিয়ে মারা যাবেন। নবী ইব্রাহীম (আলাইহিসসালাম) আল্লাহ্‌র কাছে কত বিনীতভাবে এই অনুরোধ করেছিলেন, সেটি পড়ুন আর এর মর্ম উপলব্ধি করুন

এবং  (স্মরণ করুন, হে মুহাম্মাদ!) যখন ইব্রাহীম বললেন, হে আমার পালনকর্তা! এ শহরকে (মক্কা নগরী) নিরাপদ করে দিন এবং আমাকে আর আমার সন্তান-সন্ততিদেরকে মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখুন। [সূরাহ ইব্রাহীম (১৪):৩৫]

সুধী পাঠক, আপনি কি বুঝতে পেরেছেন তিনি কীসের জন্য আল্লাহ্‌র দরবারে ফরিয়াদ জানিয়েছিলেন? তিনি আল্লাহ্‌র সাহায্য চেয়েছেন যাতে আল্লাহ্ তাঁকে ও তাঁর বংশধরকে মূর্তিপূজা থেকে বিরত রাখেন। ইব্রাহীম (আলাইহিসসালাম) পৃথিবীর অন্যতম মর্যাদাবান একজন মানুষ, যিনি দুনিয়ার সবকিছু ত্যাগ করে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র রাস্তায় আল্লাহ্‌রই জন্য বেরিয়েছিলেন। তিনিও আল্লাহ্‌র কাছে শির্ক-ই-আকবর (আল্লাহ্‌র সাথে শরীক করা) থেকে আশ্রয় চেয়েছেন! তাহলে এক্ষেত্রে আমাদের কী করা উচিৎ?

শুধু তা-ই নয়। শাহর বিন হাওসাব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, “আমি উম্মু সালামাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে উম্মুল মু’মিনিন! যখন আল্লাহ্‌র রাসূল ﷺ আপনার সাথে থাকতেন, তখন তিনি কোন দু’আ বেশি বেশি পাঠ করতেন? উত্তরে তিনি বললেন, ‘তিনি বেশি করে এই দু’আটি পাঠ করতেন ‘ইয়া মুক্বল্লিবাল ক্বুলুব সাব্বিত ক্বলবি ‘আলা দ্বীনিক (হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের পথে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখুন)।’” (আত-তিরমিযী)

সত্যিই অসাধারণ? মুহাম্মাদ ﷺ শ্রেষ্ঠতম সম্মানিত ব্যক্তি। তিনি আসমানে গিয়েছেন, সেখানে আল্লাহ্‌র সাথে কথাও বলেছেন। তিনিও পর্যন্ত আল্লাহ্‌র সাহায্য চাচ্ছেন যেন তাঁর হৃদয় আল্লাহ্‌র দ্বীনের পথে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে। সুতরাং যখনই দেখবেন যে ইবাদাতে আপনার মনোযোগ নেই, তখনি এই দু’আ পড়ে আল্লাহ্‌র কাছে সাহায্য প্রার্থনা করবেন। এই দু’আকে অভ্যাসে পরিণত করুন।

এরকম আরো একটি দু’আ যা নিয়মিত করা উচিৎ, তা হলো সূরাহ বানী ইসরাইলের ৮০ নম্বর আয়াতে প্রিয় নবী মুহাম্মদকে ﷺ দেওয়া আল্লাহ্‌র নির্দেশ:

বলুন, “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে (যেখানেই) প্রবেশ করাও, (সেটা করো) সত্যের সাথে প্রবেশ। আর আমাকে (যেখান থেকেই) বের করো, (সেটা করো) সত্যের সাথে বহির্গমন। আর তোমার নিকট থেকে আমাকে দান করো এক সাহায্যকারী শক্তি।”

এবার আসা যাক এই আয়াতে “সত্যের সাথে প্রবেশ” করানো বলতে কী বোঝানো হয়েছে সেই আলোচনায়। এর ব্যাখ্যায় ড. মুহাম্মদ আল-নাবুলসি বলেন, একজন ব্যক্তি আল্লাহ্‌র কাছে যে কোনো বিষয়ে (যেমন, কোনো চাকরি, ইউনিভার্সিটি, ভ্রমণ বা বিয়ে) দাখিল বা প্রবেশাধিকার চাইবে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করার জন্য। সুবহানআল্লাহ! কতই না চমৎকার।?

কিন্তু এখানেই শেষ না!

কোনো ব্যক্তি হয়তো একাগ্রচিত্তে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য কোনো কাজ শুরু করলো। কিন্তু একসময় দুনিয়াবি চিন্তা-ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে সে তার লক্ষ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।

এখন দু’আর পরবর্তী অংশটি দেখা যাক। প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ আল্লাহ্‌র কাছে দু’আ করেছেন তাঁকে যেন “সত্যের সাথে প্রস্থান”ও করানো হয়। ঠিক এমনিভাবেই যেন আমাদের ইবাদাতগুলো আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি দিয়ে সূচনা করতে পারি আর সমাপ্তিও যেন আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির মাধ্যমেই হয়। আমিন।

সৎকর্মগুলো গোপন করুন

সূরাহ আল-আ’রাফের ৫৫ নং আয়াতে আল্লাহ্‌ (আযযা ওয়াজাল) বলেন

আপনার পালনকর্তাকে স্মরণ করুন বিনয়ের সাথে এবং সংগোপনে। তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না।

ইমাম আশ্-শীনকিতি আদ্বওয়া’ আল-বায়ান-এ বলেছেন, “সৎকর্ম গোপন করা, একে প্রকাশ করা অপেক্ষা তাক্বওয়ার অধিক নিকটবর্তী আর রিয়া (লোক দেখানো) অপেক্ষা অধিক দূরবর্তী।”

সালাফগণ কখনওই তাঁদের ইবাদাত জনসম্মুখে প্রকাশ করতেন না। এ প্রসঙ্গে তাফসির ইবনে কাসীর-এ আছে ইমাম আল-হাসান আল-বাসরী বলেন, “আমরা এমন লোকও চিনি, যারা কোনো নেক আমল গোপনে করতে পারলে কখনওই সেটাকে জনসম্মুখে আনেন না।”

কিন্তু সৎকাজ গোপন করা অসম্ভব হয়ে উঠলে অবশ্যই সেটি জনসম্মুখে প্রকাশ করা যায়। আর এক্ষেত্রে তা গোপন করা থেকে প্রকাশ করাই উত্তম। যেমন- জামা’আতের সাথে ফরয সালাত, হাজ্জ ইত্যাদি ইবাদাত প্রকাশ্যেই করতে হয়।

এই প্রেক্ষিতে আল্লাহ্‌ (আযযা ওয়াজাল) বলেন

যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান-খয়রাত করো, তবে তা কতই না উত্তম। আর যদি দান করো গোপনে এবং অভাবগ্রস্তদের দিয়ে দাও তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম। আল্লাহ্‌ তা’আলা তোমাদের কিছু গুনাহ দূর করে দিবেন। আল্লাহ্‌ তোমাদের কাজ-কর্মের খুবই খবর রাখেন। [সূরাহ আল-বাকারাহ (২):২৭১]

ইবনে কাসীর এই আয়াতের তাফসীরে বলেন, ”এখানে বলা হয়েছে যে, দানশীলতার ব্যাপারে প্রদর্শন অপেক্ষা গোপনীয়তা অতি উত্তম। কারণ, ‘প্রদর্শন’ বিষয়টা রিয়ার (লোক দেখানো কাজ) কাছাকাছি হয়ে যায়। পক্ষান্তরে, গোপনীয়তা রিয়া (লোক দেখানো কাজ) থেকে অধিক দূরে অবস্থান করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় যে, একটা সৎকাজ যতক্ষণ পর্যন্ত অন্য মানুষকে সৎ হতে অনুপ্রেরণা দিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা শরিআ’হ অনুযায়ী সঠিক।”

একদিন এক ভাইয়ের সাথে খুব সকালে হঠাৎ করেই দেখা হলো এক চাকরীর এপোয়েন্টমেন্টের জন্য। দেখামাত্রই জিজ্ঞেস করলাম, “ভাই, মনে হচ্ছে আপনি সারারাত জেগেছিলেন। রাতে কি ঘুমাননি?” তিনি বললেন, ”আমি ঘুমিয়েছিলাম, পরে উঠে ক্বিয়ামে (তাহাজ্জুদ) দাঁড়িয়ে গেলাম। আর সেই থেকে এই পর্যন্ত জেগে আছি।”

ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হলো যে, এই ঘটনা থেকে অনেককিছু শেখার আছে। এমনিতে অন্য একজনের নিয়ত (উদ্দেশ্য) নিয়ে প্রশ্ন তোলা ঠিক নয়। কারণ, এই নিয়তটা শুধুমাত্র সেই ব্যক্তির হৃদয়েই থাকে আর আল্লাহ্‌ই (আযযা ওয়াজাল) তা জানেন। তাই এটাও হতে পারে যে, ঐ ভাই আমাকে রাতে উঠে সালাত পড়তে উদ্বুদ্ধ করতে কৌশলে তাঁর গোপন কাজটির কথা জানালেন। সেই সাথে আমি আমার কিছু চিন্তা-ভাবনা শেয়ার করতে চাই। মানুষের পক্ষে তখনই জনসম্মুখে সৎকাজ করা সহজসাধ্য হয়, যখন তার প্রচুর লুকায়িত সৎকাজ থাকে। অবশ্য সালাফগণের অনেকেই বলতেন যে, পাপকাজগুলোকে যেভাবে গোপনে রাখা হয়, সৎকাজগুলোও সেভাবে গোপন করা উচিৎ।

রিয়ার ইহকালীন ও পরকালীন পরিণাম স্মরণে রাখুন

লোক দেখানোর জন্য যে ব্যক্তি ইবাদাত করে, তার আসল চেহারা একদিন মানুষের সামনে প্রকাশ পেয়েই যাবে। এই প্রসঙ্গে মহানবী মুহাম্মাদ ﷺ বলেন, “যে ব্যক্তি প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে তার সৎকাজ মানুষকে জানায়, আল্লাহ্‌ তা’আলা এক সময় তার প্রকৃত সত্য জনসম্মুখে প্রকাশ করে দিবেন। আর যে ব্যক্তি প্রশংসিত হওয়ার জন্য লোক দেখানো সৎকর্ম করে, আল্লাহ্‌ তা’আলা এক সময় তাকে অপদস্থ করে ছাড়বেন।” (বুখারি)

প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আপনার নিয়তের ব্যাপারে সতর্ক হোন। এমনকি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে কিছু পোস্ট বা শেয়ার করার সময়ও সতর্কতা অবলম্বন করবেন। আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির চেয়ে লাইকসংখ্যা বাড়ানোই যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে আয়াত, হাদীস অথবা যেকোনো ধরনের ইসলামিক রিমাইন্ডার পোস্ট করা থেকেও বিরত থাকুন। আপনি ভাবতে পারেন যে, “লোকজন আমার ‘দাওয়াহ্’ কাজে প্রশংসা করতেই পারে!” কিন্তু এই ‘দাওয়াহ্’র কাজ আমরা কি মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে করেছি নাকি আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য করেছি, এটা প্রকাশ পাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার। আল্লাহ্‌ আযযা ওয়াজাল সবকিছু জানেন।

■ নিষ্ঠাহীন ব্যক্তি শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করবে। কেন? কারণ, ইবাদাত যদি স্রষ্টার বদলে কোনো সৃষ্টির সন্তুষ্টির সাধনের জন্য হয়ে থাকে, তাহলে এটা কখনওই সম্ভব নয় যে সকল সৃষ্টি এই কাজে সন্তুষ্ট থাকবে। সুতরাং, এই নিষ্ঠাহীন ব্যক্তিটি তার মূল্যবান শক্তি, সময় আর সম্পদ এমন এক উদ্দেশ্যে ব্যয় করলো, যা তার উপকারেই আসবে না।

মহানবী মুহাম্মাদ ﷺ নিজেও সবার কাছে সন্তোষভাজন ছিলেন না। লোকজন তাঁকে ‘জাদুকর’, ‘পাগল’, ‘জিনে ধরা’ বলে অপবাদ দিয়েছিলো। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন

এমনিভাবে তাদের পূর্ববর্তীদের কাছে যখনই কোনো রাসূল আগমন করেছে, তারা বলেছে: এ জাদুকর, না হয় উন্মাদ। ”
[সূরাহ আয-যারিয়াত (৫১):৫২]

শুধু তা-ই নয়! এমনকি আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার উপরও অনেকেই সন্তুষ্ট না! কিছু মানুষ আছে যারা আল্লাহ্‌কে কৃপণ ভাবে (না’উযুবিল্লাহ)! আল্লাহ্‌ সূরা মায়িদাহর ৬৪ নং আয়াতে বলেন

আর ইহুদীরা বলে, আল্লাহ্‌র হাত বন্ধ হয়ে গেছে। তাদেরই হাত বন্ধ হোক, এ কথা বলার জন্য তাদের উপর অভিসম্পাত। বরং তাঁর উভয় হাত উন্মুক্ত, তিনি যেরূপ ইচ্ছা সেরূপে ব্যয় করেন।

তবে এখানে একটি বিষয় খেয়াল করুন। যদি কোনো ভালো কাজ এই ভয়ে ত্যাগ করেন যে, লোকে মনে করবে আপনি “লোক দেখানো” কাজই করছেন, তাহলে এটাও এক কথায় “রিয়া” বা লোক দেখানো। আবার আমরা মূল আলাপে ফিরে যাই।

পরকালে অপদস্থ হওয়া। এইসব আন্তরিকতা বিবর্জিত মানুষগুলো বিচারের দিনে অপমানিত হবে এবং তাদেরকেই সর্বপ্রথম শাস্তি দেওয়া হবে।

প্রিয়নবী মুহাম্মাদ ﷺ বলেন, “আমি তোমাদের কাছ থেকে যে জিনিসটার ভয় সব থেকে বেশি করি, তা হলো শিরক-ই-আসগর (ছোট শিরক)।” উপস্থিত সাহাবাগণ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) তখন জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহ্‌র রসূল ﷺ, ছোট শিরক কী?” তিনি বললেন, “লোক দেখানো কাজ করা (রিয়া)। বিচার দিবসে যেদিন মানুষকে তার কর্মের প্রতিফল পূর্ণরূপে দেওয়া হবে, সেদিন আল্লাহ্‌ তা’আলা বলবেন, ‘তাদের কাছে যাও যাদের জন্য তুমি দুনিয়াতে লোক দেখানো কাজ করেছিলে। আর দেখো তারা তোমার কোনো উপকারে আসে কি না!’” (আস-সিলসিলা আস-সহীহাহ)

মহানবী মুহাম্মাদ ﷺ আরও বলেন,

“বিচারের দিনে আল্লাহ্‌ সর্বপ্রথম বিচার করবেন সেই মানুষগুলোর যাদের মধ্যে আছে –

## একজন শহীদ, প্রথমে তাকে আল্লাহ্‌র সামনে হাজির করা হবে। আল্লাহ্‌ (আযযা ওয়াজাল) তাঁর স্বীয় রহমত বর্ণনা করবেন যা তিনি ঐ লোকটিকে দুনিয়ার জীবনে দিয়েছিলেন। সেও আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ স্বীকার করবে। এরপর আল্লাহ্‌ (আযযা ওয়াজাল) তাকে জিজ্ঞেস করবেন, ‘তুমি কী করেছিলে?’

সে বলবে, ‘আমি আপনার জন্য জিহাদ করেছিলাম যতক্ষণ না শহীদ হই।’

আল্লাহ্‌ (আযযা ওয়াজাল) বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলছো। তুমি জিহাদ করেছিলে যাতে দুনিয়ার মানুষ তোমাকে ‘বীরযোদ্ধা’ হিসেবে চেনে আর তুমি তা পেয়ে গেছো।’ তারপর আল্লাহ্‌ তার বিরুদ্ধে শাস্তি ঘোষণা দিবেন। অতঃপর, তাকে নিম্নমুখী করে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

## তারপর একজন আলেমকে ডাকা হবে যে ইলম অর্জন করতো এবং তা মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতো আর সুমধুর সুরে কুরআন তিলাওয়াত করতো। তাকে আল্লাহ্‌র সম্মুখে পেশ করা হবে। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর অনুগ্রহ বর্ণনা করবেন যা তিনি ঐ ব্যক্তিকে দিয়েছিলেন। সেও তা স্বীকার করে নিবে। এরপর আল্লাহ্‌ তা’আলা তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, ‘তুমি কী করেছিলে?’

সে উত্তর দিবে, ‘আমি আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ইলম (জ্ঞান) তলব করেছি আর তা মানুষের মাঝে বিতরণ করেছি এবং সুমধুর সুরে কোরআন তিলাওয়াত করেছি।

আল্লাহ্‌ আযযা ওয়াজাল বলবেন, ‘তুমি মিথ্যাবাদী। তুমি ইলম (জ্ঞান) তলব করেছিলে যাতে লোকে তোমায় ‘বিদ্বান ব্যক্তি ‘ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় আর কুরআন তিলাওয়াত করতে যাতে তুমি ‘স্বনামধন্য ক্বারি’ হিসেবে প্রসিদ্ধ হতে পারো। তার বিরুদ্ধে আল্লাহ্‌ শাস্তি নির্ধারণ করবেন। তাকে অধোমুখী করে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং নিক্ষেপ করা হবে জাহান্নামের আগুনে।

## এরপরে আল্লাহ্‌র সামনে হাজির করা হবে এমন এক ব্যক্তিকে যাকে আল্লাহ্‌ তার স্বীয় রহমত দ্বারা প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক বানিয়েছিলেন। তাকে সব ধরনের সম্পদ দিয়েছিলেন। বিচারের জন্য তাকে ডাকা হবে আল্লাহ্‌র সামনে। আল্লাহ্‌ তার সামনে নিজের অনুগ্রহ একে একে বর্ণনা করবেন। সে ব্যক্তিও আল্লাহ্‌র অনুগ্রহের কথা স্বীকার করবে যা সে তার জীবদ্দশায় ভোগ করেছে। তারপর, আল্লাহ্‌ জিজ্ঞাসা করবেন, ‘দুনিয়ায় তুমি কী কাজ করেছিলে?’ সে উত্তর দিবে, ‘আমি সেই সব ক্ষেত্রে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করেছিলাম যাতে আপনার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি।’ আল্লাহ্‌ বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলছো। তুমি এটা করেছিলে যাতে তুমি ”মহৎ ব্যক্তি” হিসেবে পরিচিত লাভ করো।’ এরপর আল্লাহ্‌ তাকেও শাস্তি দেবেন যে, তাকে যেন নিম্নমুখী করে টেনে হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়।” (সহিহ মুসলিম)

আল্লাহ্‌ যেন আমাদের কে রক্ষা করেন। আমিন।

আপনি কি জানেন কখন আপনি জান্নাতি হওয়ার ব্যাপারে একেবারে নিশ্চিত হতে পারবেন? যখন মৃত্যুর ফেরেশতা উপস্থিত হয়ে আপনাকে শোনাবেন আল্লাহ্‌র বাণী

হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। [সূরাহ আল-ফাজর (৮৯):২৭-২৮]

আল্লাহ্‌ যেন আমাদের এই প্রশান্তিসূচক বাক্যগুলো শোনার তৌফিক দেন। আমিন।

সম্মানিত পাঠক, এই মর্যাদাপূর্ণ বাক্য শ্রবণ করতে হলে অবশ্যই আপনার ইবাদাতগুলো একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার জন্যই হতে হবে। এজন্য আল্লাহ্‌র সাহায্য চাইতে ভুলবেন না আর সৎকর্মগুলোকে লুকিয়ে ফেলুন।


উৎস: মুসলিম ম্যাটার্স ব্লগ (মূল আর্টিকেল লিংক)

অনুবাদক: সূচনা বিনতে বাহার, মুসলিম মিডিয়া প্রতিনিধি

অনুবাদ কপিরাইট মুসলিম মিডিয়া


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন