আজ সোমবার, ২০ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০৫ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



বিদ’আত: সুন্নাহর আদি ও অকৃত্রিম শত্রু (পর্ব – ২)

Published on 10 March 2018 | 3: 22 am

মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াদুদ

এই পর্বে থাকছে- বিদ’আত কেন বর্জনীয়, আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত কিছু বিদ’আতের কথা এবং বিদ’আত থেকে বেঁচে থাকতে আমরা কী করতে পারি- সে ব্যাপারে আলোচনা। 

বিদ’আত কেন বর্জনীয়?

১। দ্বীনের মধ্যে বিকৃতি: বিদ’আত হচ্ছে আল্লাহ্‌র দ্বীনকে বিকৃত করার জন্য শয়তানের একটা মোক্ষম হাতিয়ার। যাদের অন্তরে দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা আছে, তাঁদেরকে শয়তান সরাসরি দ্বীনের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেয় না। বরং আস্তে আস্তে বিদ’আতের মাধ্যমে সুন্নাহ থেকে বিচ্যুত করে ফেলে। এভাবে একসময় মানুষ তার দ্বীনকেই পরিবর্তন করে ফেলে।

মক্কার মুশরিকরা নিজেদের ইব্রাহীম (আলাইহিসসালাম) এর অনুসারী বলে দাবি করতো এবং কা’বাকে অত্যন্ত ভক্তি করতো। ব্যবসার কাজে যখন তারা ইয়েমেন এবং সিরিয়ায় সফর করতো, তখন তাদের অন্তর কা’বার জন্য কাঁদতো। একবার তারা একটা নতুন প্রথা আরম্ভ করলো। দেশের বাইরে গেলে কা’বার একটা পাথরের টুকরাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেত। ধীরে ধীরে তারা সেটাকে তাওয়াফ করার রীতি অরম্ভ করলো। আবার বাইরের দেশে গিয়ে দেখলো, ইব্রাহীম (আলাইহিসসালাম), ইসমাঈল (আলাইহিসসালাম), উজাইর (আলাইহিসসালাম) প্রমুখ নবী এবং আল্লাহ্‌র বুজুর্গ ব্যক্তিদের সম্মানার্থে মানুষ মূর্তি তৈরি করেছে। মক্কার লোকেরা সেসব মূর্তি নিয়ে এসে কা’বায় স্থাপন করলো এবং যুক্তি দেখালো, এসব মূর্তি দেখলে তাদের মন আল্লাহ্‌র প্রতি আকৃষ্ট হবে। তাদের “যুক্তি” ছিলো, ইব্রাহীম (আলাইহিসসালাম) মূর্তি পূজা করতে নিষেধ করেছেন কিন্তু সম্মানার্থে মূর্তি স্থাপনের বিরুদ্ধে তো কিছু বলেননি। এভাবে পবিত্র কা’বায় মূর্তি স্থাপিত হলো এবং একসময় মূর্তিপূজাও আরম্ভ হলো।

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

দেখুন, তারা কেবলমাত্র ইব্রাহীম (আলাইহিসসালাম) এর সুন্নাহ অনুসরণ না করে নিজেদের “যুক্তি” প্রয়োগ করার কারণে কীভাবে দ্বীনকে বিকৃত করে ফেললো। যে ইব্রাহীম (আলাইহিসসালাম) নিজের জনপদের পূজনীয় মূর্তি ভাঙলেন, তাঁর অনুসারী দাবিকারীরা বিচ্যুত হতে হতে একসময় কা’বার মধ্যে মূর্তিপূজা আরম্ভ করলো! এ সবকিছুই শুরু হয়েছিল ইব্রাহীম (আলাইহিসসালাম) এর সুন্নাহ এর বাইরে গিয়ে নিজেদের যুক্তিমতো রীতি তৈরী থেকে, সোজা কথায় বিদ’আত থেকে।

একইভাবে খ্রিষ্টানরা এবং ইয়াহুদীরা যথাক্রমে ঈসা (আলাইহিসসালাম) ও মূসা (আলাইহিসসালাম) এর সুন্নাহ থেকে একটু একটু সরে আসার কারণে ধীরে ধীরে নিজেদের সমগ্র ধর্মকেই পরিবর্তন করে ফেলেছে। আমরা যেন তাদের অনুসারী না হই! আল্লাহ্‌ হিফাযত করুন।

২। রাসূলুল্লাহ এর শাফাআত থেকে বঞ্চিত হওয়া: একজন মু’মিনের জন্য আল্লাহ্‌র রাসূলের শাফাআত থেকে বঞ্চিত হওয়ার চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে? বিদ’আত মানুষকে শাফাআত থেকে বঞ্চিত করে। আল্লাহ্‌র রাসূলﷺ বলেন:

“অনেক মানুষ আমার কাছে (হাউজে পানি পানের জন্য) আসবে, যাদেরকে আমি চিনতে পারবো এবং তারাও আমাকে চিনতে পারবে, কিন্তু তাদেরকে আমার কাছে আসতে দেওয়া হবে না, বাধা দেওয়া হবে। আমি বলবো, ‘এরা তো আমারই উম্মত।’ তখন উত্তরে বলা হবে, ‘আপনি জানেন না, এরা আপনার পরে কী-সব নব উদ্ভাবন করেছিলো।’ তখন আমি বলবো, ‘যারা আমার পরে পরিবর্তন করেছিলো, তারা দূর হয়ে যাক, তারা দূর হয়ে যাক!’” [সহীহ বুখারি, কিতাবুর রিকাক- ৬৫৮৫]

৩। সুন্নাহকে ছোট মনে করা: বিদ’আতের একটা ভয়ঙ্কর দিক হলো, এটা সুন্নাহকে অবজ্ঞা করতে শেখায়। বিদ’আতের মাধ্যমে যেন এরকম মনে হয় যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ, সাহাবা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এবং সালাফগণ আমাদের চেয়ে একটু কম বুঝতেন, কিংবা তাঁদের আমলে কিছুটা কমতি আছে। আমাদের আমলে যেন সেই কমতিটুকু না থাকে তাই আমরা আরেকটু বাড়িয়ে করছি। চিন্তা করুন, এ ধরণের চিন্তা কতটা ভয়াবহ হয়! বিদ’আতের ভেতর এরকম ভয়ঙ্কর চেতনাই প্রস্ফুটিত হয়।

যেমন ধরুন, দরূদ পড়ার সময় দাঁড়ানোর বিদ’আত। রাসূলুল্লাহ ﷺ দরূদের অনেক ফজিলত বর্ণনা করেছেন এবং বেশি বেশি দরূদ পড়তে উৎসাহিত করেছেন। কিন্তু দরূদের জন্য দাঁড়াতে হবে এমন নির্দেশনানি। নামাজের মধ্যেও আমরা দরূদ বসেই পড়ি। কিন্তু আমাদের সমাজের কিছু লোক মনে করেন, বসে দরূদ পড়া নবীর শানে বেয়াদবি। তাই দরূদ পড়া হলেই দাঁড়িয়ে যান।

দেখুন, রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে বসে দরূদ পড়েছেন, যারা আল্লাহ্‌র রাসূলকে সবচেয়ে বেশি সম্মান করতেন, তাঁর জন্য নিজের জীবন দিয়েছেন, সেই সাহাবা রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাইন বসে দরূদ পড়েছেন। তাহলে আমি যদি বসে দরূদ পড়াকে বেয়াদবি মনে করি, তাহলে রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং সাহাবাদেরকে বেয়াদব মনে করা হলো, তাঁদের আমলকে ছোট মনে করা হলো! আস্তাগফিরুল্লাহ। এভাবেই বিদ’আত মানুষকে সুন্নাহকে অবজ্ঞার চোখে দেখতে শেখায়।

৪। শির্কের রাস্তা খুলে যাওয়া: বিদ’আত মানে হলো সুন্নাহ থেকে সরে যাওয়া। আর সুন্নাহ থেকে সরে যাওয়ার ফলে শির্কের দরজা খুলে যায়। মক্কার মুশরিকরা বিদ’আতের হাত ধরেই একসময় কা’বার ভেতর মূর্তিপূজা আরম্ভ করেছিলো, যার উদাহরণ আগে দিয়েছি।

৫। বিদ’আত চালু হলে সুন্নাহ বিদায় নেয়: বিদআতের একটি তাৎক্ষণিক ফলাফল হলো, একটি বিদ’আত একটি সুন্নাহকে মিটিয়ে দেয়। গুদাইফ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, “যখনই কোনো সম্প্রদায় কোনো বিদ’আতের উদ্ভাবন ঘটায়, তখন সেই পরিমাণ সুন্নাহ তাদের মধ্য থেকে বিদায় নেয়।” [ফাতহুল বারী, ১৩/১৫৩-১৫৪]

উদাহরণস্বরূপ, কদমবুসির বিদ’আত। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাহ হলো কোনো মুসলিমের সাথে সাক্ষাত হলে সালাম দেওয়া ও মুসাহাফা করা। কখনো কখনো সাহাবীদের কেউ কেউ তাঁর হাতে ও কপালে চুমু খেয়েছেন। দুয়েকটি অনির্ভরযোগ্য ঘটনা এমন পাওয়া যায় যে কেউ কেউ ভক্তিভরে আল্লাহ্‌র রাসূলের পায়েও চুম্বন করেছেন। কিন্তু এটি কখনোই কদমবুসির পক্ষে দলিল হতে পারে না। কারণ এটা সাহাবীদের মধ্যে প্রচলিত কোনো সাধারণ প্রথা ছিলো না। পরবর্তী প্রজন্মের সালাফদের মধ্যেও এর সাধারণ প্রচলন ছিলো না। দুয়েকটি ঘটনা থাকার প্রেক্ষিতে আলিমদের কেউ কেউ ক্ষেত্রবিশেষে কদমবুসিকে জায়েয বলেছেন, কিন্তু এটাকে রীতি বানিয়ে ফেললে অবশ্যই বিদ’আত হবে। বিশেষত, আমাদের সমাজে যে কদমবুসি বা “পায়ে ধরে সালাম” প্রচলিত, তাতে হিন্দুদের প্রণামের সাথেই অধিক সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়।

এখন দেখুন, কেউ যদি কদমবুসিকে রীতি বানিয়ে ফেলে তার মানে সে সালাম ও মুসাহাফাকে বর্জন করলো। এভাবে বিদ’আত সংঘটিত হবার মাধ্যমে তার মধ্যে থেকে সুন্নাহ বিদায় নিলো।

৬। বিদ’আতির হিদায়াহ পাওয়া কঠিন: বিদ’আতের সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, বিদ’আতির জন্য তওবা নসীব হওয়া কঠিন হয়ে যায়। এর কারণ হলো, সে বিদ’আতটাকে ইবাদাত মনে করে করছে। ফলে তার মধ্যে পাপবোধ আসবে না। যে লোক মদ খায়, ব্যভিচার করে, ঘুষ খায়, সে জানে এগুলো পাপের কাজ। তাই একটা সম্ভাবনা থাকে একদিন সে অনুতপ্ত হবে আর তওবা করবে। কিন্তু যে বিদ’আত করে, সে এটাকে সওয়াবের কাজ ভেবেই করে। ফলে তার মধ্যে অনুতাপ আসার সম্ভাবনা কম।

সমাজে বহুল প্রচলিত কিছু বিদ’আত

মৃতকে কেন্দ্র করে হওয়া বিদ’আত: আমাদের সমাজে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি বিদ’আত হয় মৃত্যু ও মৃতকে কেন্দ্র করে। কোনো মুসলিম মারা গেলে কী করতে হবে, সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রাসূলুল্লাহ ﷺ দিয়ে গেছেন। তাঁর জন্য সাদাকাহ জারিয়াহ করা, দুআ করা ইত্যাদি আমল এবং আমলের পদ্ধতি- সবই শিখিয়ে গেছেন। কিন্তু মানুষ তা ভুলে গিয়ে নিজেদের মত কিছু রেওয়াজ-রসম তৈরি করে একে দ্বীনের অংশ ভাবছে। কুলখানি, চল্লিশা, ইসালে সওয়াবের জন্য টাকার বিনিময়ে খতম ইত্যাদি জঘন্য সব বিদ’আত চালু করছে। এর মাধ্যমে মৃতের উপকার তো হয়ই না, উল্টো ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি। আল্লাহ্‌র রাসূল ﷺ শিখিয়েছেন কেউ মারা গেলে তিন দিন পর্যন্ত তার পরিবারকে প্রতিবেশীরা রান্না করে খাওয়াবে, কারণ সেসময় রান্না করার মতো মানসিকতা মৃতের পরিবারের থাকে না। সুবহানাল্লাহ্‌, কত মানবিক প্রথা। আর মানুষের বানানো নিয়মে উল্টো মৃতের পরিবারকে সামাজিকভাবে একরকম বাধ্য করা হয় মানুষকে খাওয়াতে! কত বড় অমানবিক, ভাবা যায়!

আর কবরকে কেন্দ্র করে হাজারো বিদ’আত তো আছেই। কবরকে মাজার বানানো, মৃতের কাছে প্রার্থনা, কবরকে আগরবাতি, বাল্ব দিয়ে সাজানো ইত্যাদি বিদ’আত এত ভয়ঙ্কর যে এর হাত ধরে অজস্র শির্ক ঢুকে পড়েছে।

শবে মেরাজ উদযাপন: মি’রাজ ইসলামের ইতিহাসে এক অপরিসীম গুরুত্ববাহী ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এর মাধ্যমে আমরা পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাত পেয়েছি, আল্লাহ্‌র রাসূল ﷺকে জান্নাত জাহান্নাম দেখানো হয়েছে, আল্লাহ্‌ স্বয়ং তাঁর রাসূলের সাথে সরাসরি কথা বলেছেন। কিন্তু প্রতিবছর নিয়ম করে মি’রাজের বার্ষিকী পালনের রীতি সাহাবা, তাবেয়ীন এবং সালাফদের যুগে কখনোই পাওয়া যায় না।

প্রথমত, মি’রাজ ঠিক কোন তারিখে হয়েছে সে ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের ভিন্নমত আছে। ২৭ শে রজবকে নিশ্চিতভাবে কখনোই বলা যায় না। দ্বিতীয়ত, প্রতিবছর ২৭শে রজবের রাতে ইবাদাতের কোনো বিশেষ ফজিলাত আছে বলে কুরআন-সুন্নাহতে কিছুই আসেনি। সবচেয়ে বড় কথা, সাহাবা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এবং অন্যান্য সালাফবৃন্দ, যারা নেক আমলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অগ্রগামী ছিলেন, তাঁরা ২৭শে রজব পালন করেননি। মি’রাজের রাত মূলত একটিই, যে রাতে এ ঘটনা ঘটেছিলো। বছর ঘুরে ঐ তারিখ এলে মি’রাজের “বার্ষিকী পালন”এর বিশেষ ফজিলাত থাকলে তাঁরাই সবার আগে করে যেতেন। নেই বলেই এমনকি তারিখটিও সংরক্ষণ করা হয়নি।

এজন্য ‘শবে মেরাজ’ নাম দিয়ে ২৭শে রজবে নামাজ ও পরদিন রোজাকে “বিশেষ ফজিলাত”এর মনে করলে তা বিদ’আতে পরিণত হবে বলে উলামাগণ মত দিয়েছেন। তবে বিশেষ ফজিলাতের মনে না করে নফল সালাত ও সাওম পালন করলে তাতে অসুবিধা নেই, অন্যান্য দিনের মতোই সওয়াব হবে। (অর্থাৎ, অভ্যাসবশত কেউ নিয়মিত নফল সালাত পড়ে ও নফল সাওম পালন করে, ঘটনাক্রমে ২৭শে রজবেও সে এসকল আমল করেছে। তাতে কোনো সমস্যা নেই।- সম্পাদক)

শবে বরাতের নামে বাড়াবাড়ি: ১৪ শা’বান দিবাগত রাত্রি, যা লাইলাতুল বারাআত (শব্দটা বারাআত বা মুক্তি, বরাত বা ভাগ্যের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই) নামে বেশি পরিচিত, সে রাতে আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দাদের মাফ করে দেন বলে হাদীসে এসেছে। কিন্তু এ রাতকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে প্রচলিত বাজারে সুলভ বইয়ের অনুকরণে “বিশেষ পদ্ধতিতে” নামাজ, আগরবাতি, আলোকসজ্জা ইত্যাদি সুস্পষ্ট বিদ’আত ও হারাম।

ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন: রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ওফাত দিবস হিসেবে ১২ রবিউল আউয়াল ঐতিহাসিকগণ লিপিবদ্ধ করলেও তাঁর জন্মদিবস নিয়ে নিশ্চিত নন। কেউ বলেছেন ৮ তারিখ, কেউ বলেছেন ৯, কেউ ১১। আমরা ১২ তারিখকে নির্দিষ্ট করে ফেলেছি। এটা যদি ঠিক হয়েও থাকে, তবু তো একথা নিশ্চিত যে, খ্রিষ্টানদের অনুকরণে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্মদিন উদযাপনের যে প্রথা আমরা সমাজে দেখি, তা আল্লাহ্‌র রাসূল ﷺকে যারা সবচেয়ে ভালোবাসতেন, সেই সাহাবা এবং পরবর্তী সালাফগণ কখনোই করেননি। আর বিদ’আতপন্থীরা একে “সকল ঈদের সেরা ঈদ” বলে “জসনে জুলুস” ইত্যাদির আয়োজন করে থাকে যার সাথে সুন্নাহ এর দূরতম সম্পর্কও নেই।

সমবেতভাবে উচ্চস্বরে যিকর করা: যিকর একটি অতি ফজিলাতপূর্ণ ইবাদাত। কিন্তু যিকরের শব্দ, পদ্ধতি সবই রাসূলুল্লাহ ﷺ শিখিয়ে গেছেন। সমবেতভাবে উচ্চস্বরে যিকর তাঁর সুন্নাহ নয়। এ ব্যাপারে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ এর হাদীস আমরা আগের পর্বে উল্লেখ করেছি। এছাড়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, নেচে নেচে, লাফিয়ে লাফিয়ে যিকরের প্রথাও আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। এগুলো যে বিদ’আত, তা বলার দরকার আছে বলেও মনে হয় না।

বিদ’আত থেকে বাঁচতে করণীয় কী?

প্রথমত, কুরআন এবং সুন্নাহর মধ্যেই মুক্তি- এই বিশ্বাস অন্তরের মধ্যে বসানো। কুরআন এবং সুন্নাহর কাছেই আশ্রয় নিতে হবে। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কালাম এবং তাঁর রাসূলের আদর্শ তথা সুন্নাহ, এগুলো কিয়ামত পর্যন্ত প্রযোজ্য এবং সর্বোত্তম আদর্শ। সুতরাং এতে সামান্য পরিবর্তন করেও আল্লাহ্‌র পূর্ণ সন্তুষ্টি অর্জিত হবে না। এমন বিশ্বাস গড়ে তুলতে পারলে রাসূলুল্লাহﷺএর সুন্নাহ থেকে কিছু বাড়ালে সাওয়াব বেশি হবে, এই চিন্তা থেকে দূরে আসা সহজ হবে।

দ্বিতীয়ত, যাচাই বাছাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা। আমাদের সমাজে বাজারে কিছু বই খুব প্রচলিত, যেমন মকসুদুল মমিনিন, নিয়ামুল কুরআন ইত্যাদি। এসব বই প্রচুর জাল হাদীস এবং বিদ’আতি আমলে পূর্ণ। আমাদের এইসব বই ফলো করা বন্ধ করতে হবে।

তাছাড়া ফেসবুক এবং অন্যান্য অনলাইন মিডিয়ায় ইসলামের নামে প্রচুর বিভ্রান্তিকর তথ্য, জাল ও বানোয়াট বর্ণনা ও আমল দেখা যায়। অনেকেই এসব দেখামাত্র শেয়ার করে থাকেন এবং এগুলোকে নির্ভাবনায় গ্রহণ করে থাকেন। এই অভ্যাস অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক। এর মাধ্যমে কেবল আমলই নয়, অনেকক্ষেত্রে ঈমানের পর্যন্ত ঝুঁকি থাকে।

সেজন্য অবশ্যই এইসব ফেসবুক পেজ বা অনির্ভরযোগ্য সাইটের পরিবর্তে ইসলাম জানার জন্য আলেমদের সাথে যোগাযোগের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। যেকোনো মাস’আলা বা ফতোয়া জানার জন্য মুফতীগণের কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে। তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী ইসলামিক বইপত্র পড়ার অভ্যাস করতে হবে। অনির্ভরযোগ্য বইপত্র বা অনলাইনের ইসলামিক তথ্যাদি আলিমদের দ্বারা যাচাই করে নিতে হবে। যাচাই ব্যতীত সেগুলো বিশ্বাস করা বা তার ওপর আমল করা যাবে না।

তৃতীয়ত,পরিপূর্ণ সুন্নাহর অনুসরণে ব্রতী হতে হবে। বিদ’আত হচ্ছে সুন্নাহর শত্রু। তাই যত ভালোভাবে আমরা সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরতে পারবো, বিদ’আত থেকে দূরে থাকা ততই সহজ হবে। রাসূলুল্লাহﷺ যেসব কাজ যেভাবে করতে আদেশ করেছেন সেগুলো সেভাবে করার পাশাপাশি তাঁর অভ্যাসগত যেসব সুন্নাহ আছে, যেমন তিনি কীভাবে খেতেন, কীভাবে ঘুমাতেন, কীভাবে কথা বলতেন ইত্যাদি হুবহু অনুকরণের প্রতি যদি আমরা সচেষ্ট হই তবে বিদ’আত এমনিতেই আমাদের থেকে দূরে পালাবে ইনশা আল্লাহ্‌।

সতর্কতার ব্যাপারে সতর্কতা: দ্বীনের পথে নতুন আসা অনেক ভাইকে দেখা যায় কিছু ইজতেহাদি বিষয় এবং ইখতিলাফি মাস’আলা নিয়ে অসহিষ্ণু হয়ে যেতে। তাঁদের কেউ কেউ বিদআতের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে অনেক সময় এমন কিছু কাজকে বিদ’আত বলে বসেন, যেগুলোকে সরাসরি বিদ’আত বলা যায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তো অন্য কোনো হাদীস দ্বারা প্রমাণিত সুন্নাহকেও বিদ’আত বলে বসতে দেখা যায়। এটা অত্যন্ত দূষণীয়। বিদ’আত যেমন মারাত্মক অপরাধ, তেমনি আমি জানি না অথচ কোনো হাদীসে আছে এমন কোনো আমলকে বিদ’আত বলাও জঘন্য। এসব ব্যাপার থেকে আমরা যেন দূরে থাকি। বিদ’আত বিষয়ে মন্তব্য করার পূর্বে নির্ভরযোগ্য আলিমদের সাথে পরামর্শ করে নিই।

আল্লাহ্‌ আমাদের সীরাতুল মুস্তাকীমের ওপর অটল থাকার তৌফিক দান করুন। তাঁর আদেশ পালনে এবং তাঁর রাসূলের (ﷺ) সুন্নাহ পরিপূর্ণভাবে অনুসরণের তৌফিক দান করুন। আমীন।

 

 


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন