আজ শুক্রবার, ২৭ এপ্রিল ২০১৮ ইং, ১৪ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



ব্যাংক পরিচালকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন

Published on 07 March 2018 | 3: 39 am

ব্যাংক পরিচালকদের যোগ্যতা, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। যে কোনো ব্যক্তিই পুঁজি বিনিয়োগ করে বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালক হয়ে যাচ্ছেন। এটিকে দেশের ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের অন্তরায় হিসেবে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিস্থিতি উন্নয়নে পরিচালক নিয়োগের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণসহ তাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার প্রস্তাব করেছেন তারা। এছাড়া ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের (সামর্থ্য থাকার পরও ঋণের অর্থ পরিশোধ করেন না যারা) নাম প্রকাশেরও দাবি জানান বিশেষজ্ঞরা।

সোমবার রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) অডিটোরিয়ামে দু’দিনব্যাপী আঞ্চলিক ব্যাংকিং সম্মেলনের সমাপনী দিনে বক্তারা এসব কথা বলেন।দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণের সর্বনিম্ন হার এ মুহূর্তে নেপালের। দেশটির ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ১ দশমিক ৭১ শতাংশ। বিআইবিএমের সম্মেলনের সমাপনি দিনের বড় অংশজুড়ে আলোচনা ছিল খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে নেপালের কৌশল নিয়ে।

সম্মেলনে নেপাল সানিমা ব্যাংকের সিইও ভুবন কুমার দাহাল জানান, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার ও নেপাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক যৌথভাবে কাজ করছে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের পাসপোর্ট জব্দ করার পাশাপাশি দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে গ্রাহকরা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছে।

তিনি জানান, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য পরিচালকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রত্যেকটি ব্যাংকের নিট মুনফার ৩ শতাংশ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য ব্যয় করা হচ্ছে।

সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের উপদেষ্টা এস কে সুর চৌধুরী। তার কাছে, প্রশ্ন ছিল বাংলাদেশে ব্যাংক পরিচালকদের প্রশিক্ষণের কোন উদ্যোগ নেয়া হবে কি না? জবাবে তিনি বলেন, পরিচালকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনাধীন রয়েছে। এক্ষেত্রে বিআইবিএম এগিয়ে আসতে পারে। সম্মেলনের শেষ দিনের প্রথম সেশনে সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ( সিইও) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মুহাম্মাদ এ (রুমী) আলী।

তিনি বলেন, বর্তমান সময়ের চেয়েও আগামীতে ব্যাংকাররা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তবে এই চ্যালেঞ্জ শুধু বাংলাদেশেই নয়। সারা বিশ্বের ব্যাংকারদের জন্যই আগামীতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। তাই এখনই ব্যাংকারদের সচেতন হতে হবে। নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে তাদের ভালো জ্ঞান থাকতে হবে। ব্যাংকিং ব্যবসায় নতুন নতুন মডেল তৈরি করতে হবে।

ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক মঈনুদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে খেলাপি ঋণ। ভারতে সাধারণ খেলাপি থেকে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের পৃথক করা হয়ে তাকে। আমাদের দেশের ইচ্ছকৃত খেলাপিদেরও পৃথক করা উচিত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছাতে প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। মোবাইল ব্যাংকিং এবং এজেন্ট ব্যাংকিংসহ নতুন নতুন সেবার মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার বাইরের মানুষকে ব্যাংক সেবার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।

বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক এবং পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, আগামীতে ব্যাংকের ঝুঁকিসংক্রান্ত যেসব চ্যালেঞ্জ আসবে, তা মোকাবেলায় পরিচালনা পরিষদকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসকল বিধিবিধান রয়েছে, তা সঠিকভাবে মেনে চললে ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে। কিন্তু অধিকাংশ পরিচালনা পরিষদের সদস্যদের এ সম্পর্কে সম্মক জ্ঞান নেই।

তিনি বলেন, ব্যাংকের প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তাদের (সিআরও) কার্যক্রম সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। এ কারণে সঠিকভাবে ঝুঁকির বিষয়টি উঠে আসে না। আগামী দিনে যে ঝুঁকি তৈরি হবে এই ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্যাংকে যোগ্যতাসম্পন্ন পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে পরিচালকদের একটা ফিট লিস্ট তৈরি করতে হবে। এ ধরণের ফিট লিস্ট থাকলে অযোগ্য ব্যক্তিরা ব্যাংকের পরিচালনা পর্যদে বসতে পারবে না। একই সঙ্গে বোর্ডকে নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। তা না হলে ঝুঁকি মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, পরিচালকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হলে সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন।

সম্মেলনে অন্য বক্তারা বলেন, নেপালে ঋণখেলাপিদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হয়না। তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করা হয় এবং তাদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। এর ফলে দেশটিতে খেলাপি ঋণের হার একেবারেই শূন্যের কোঠায়। আমাদের স্বপ্নটা তারা বাস্তবায়ন করেছে। নিয়ন্ত্রণহীন খেলাপি ঋণ, হ্যাকিং, নতুন প্রযুক্তির আগমন, তারল্য সংকট, অদক্ষ মানবসম্পদ, পরিচালনা পর্ষদের অদক্ষতা, বাছ-বিচারহীন ঋণ প্রদান, প্রশিক্ষণের অভাব এবং ব্যাঙের ছাতার মতো ব্যাংকের প্রসারের কারণে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের ঝুঁকি তৈরি হলে দেশের আর্থসামাজিকসহ সবক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই এখনই এ অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে একটি রোডম্যাপের আলোকে উত্তরণের ছক তৈরি করতে হবে বলে মনে করেন তারা।

‘দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকিং খাতের মানবসম্পদ উন্নয়ন’ শীর্ষক দ্বিতীয় অধিবেশনটি সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং খাত সংস্কারবিষয়ক উপদেষ্টা এবং সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী। এতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী, সোনালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এ চৌধুরী, ভারতের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (এনআইবিএম) পরিচালক ড. কে. এল. ধিঙ্গারা, নেপালের ন্যাশনাল ব্যাংকিং ইনস্টিটিউটের (এনবিআই) প্রধান নির্বাহী সানজিত সুব্বা, ভুটানের ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (এফআইটিআই) প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা পিনজোর জিলিটসন, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের কান্ট্রি ম্যানেজার ভারুনা প্রিয়শান্তা কোলামুন্না দ্বিতীয় অধিবেশনের আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।

সম্মেলনের সমাপনী সেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এবং বিআইবিএমের এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান। এই সেশনের সঞ্চালকের দায়িত্বপালন করেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড.তৌফিক আহমেদ চৌধুরী।


Advertisement

আরও পড়ুন