আজ সোমবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৮ ইং, ১০ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



আমার সন্দ্বীপ টাউন : ঘোর যেন কাটছেইনা।

Published on 24 February 2018 | 5: 17 pm

:: আবদুল হালিম নাসির :: 

রূপকথার মায়ার রাজ্যে মোহাবিষ্ট প্রহর।
অজস্র প্রিয়জনের সান্নিধ্যে অবর্ণনীয় অনুভূতি।
অনেক সাধনায় পাওয়া ভালোবাসা-মায়া-আবেগ-আনন্দের ক্ষণ।
২৩ ফেব্রুয়ারীর কথা বলছি। মুসলিম হলের কথা বলছি। সন্দ্বীপ টাউন সোসাইটির প্রথম মিলনমেলা ‘আমার সন্দ্বীপ টাউন’-এর কথা বলছি।
সকাল থেকে মুসলিম হলটা মিনি সন্দ্বীপ টাউনে রূপ নেয়। মেলার স্টলগুলো একে একে সাজতে থাকে। বাড়তে থাকে প্রিয়জনদের উপস্থিতি। দুপুরের আগে মানুষের উপস্থিতি ভাবনাকে ছাড়িয়ে গেছে। বিকেল নাগাদ উচ্ছ্বসিত আবেগের জটলায় দোকানীদের বিক্রি প্রায় বন্ধ। দোতলায় ভীড়ের জন্য এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া হয়ে ওঠে দায়।
৩টায় বেলুন উড়িয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। তারপর দেয়াল পত্রিকা, মেলা উদ্বোধন। উদ্বোধনী কার্যক্রমে অংশ নেন হেদায়েতুল ইসলাম মিন্টু, মহিউদ্দিন শিবলী, নুরুল আকতার, আলী হায়দার চৌধুরী বাবলু প্রমুখ। তারপর স্মৃতি চারণের মাঝে চলে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। নজরুল ইসলাম ও আলমগীর শাহনেওয়াজ সাগরের সঞ্চালনায় স্মৃতিচারণ করেন বেলাল বেগ, মোঃ আবুল কাশেম, মোঃ শাহজাহান, নুরুল আকতার, নিজাম উদ্দিন শামুন, দিলদার হোসেন পল্টু, নুুরুল মোস্তফা খোকন, বাকের ভুঁইয়া, সুরাইয়া বাকের, অ্যাডভোকেট নিজাম উদ্দিন তালুকদার, অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ, মোশারফ হোসেন আলমগীর, ডাঃ সুরাইয়া মনা, মনিরুল হুদা বাবন, মোক্তাদের মাওলা সেলিম, সাখাওয়াত হোসেন নাসির, আনোযার হোসেন প্রমুখ। এরপর সংস্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গনে অবদানের জন্য কৃতি ব্যক্তিত্বদের (মরনোত্তর) সম্মাননা প্রদান করা হয়। চলে আবৃত্তি, গান, নৃত্য, মাইমো ড্রামার চমৎকার সব আয়োজন। হেদায়েতুল ইসলাম মিন্টুর সমাপনী বক্তব্য এবং র‍্যাফেল ড্রয়ের মাধ্যমে শেষ হয় প্রাণের উৎসব। অনুষ্ঠানের মূল সঞ্চালক ছিলেন সোসাইটির প্রধান সমন্বয়ক জামাল হোসেন মঞ্জু।
আমরা যা চেয়েছি তার অনেকখানি করতে পেরেছি। এটা ছিল সন্দ্বীপ টাউন সোসাইটির সাথে জড়িত সবার সম্মিলিত প্রয়াসের ফসল। এর বাইরেও অনেক সন্দ্বীপ টাউনবাসী তথা সন্দ্বীপবাসীর দোয়া ও সহযোগিতা আমাদের সাথে ছিল। কৃতজ্ঞতা অনুষ্ঠানে আগত সবার প্রতি এবং দূরত্ব ও ব্যস্ততার জন্য যারা আসতে পারেনি কিন্তু দোয়া ও পরামর্শ দিয়েছেন তাদের প্রতিও।

এই সেই সন্দ্বীপ টাউন –
এখানে জন্ম কত শিল্পী কবি সাহিত্যিকের।
এখানে জন্ম কত ব্যবসায়ী খেলোয়াড়ের।
এখানে জন্ম কত শিক্ষক সাংবাদিকের।
এখানে জন্ম শত গুনীজনের। সবাই কিন্তু সন্দ্বীপের টাউনের যে ভৌগলিক সীমা ভাবনায় আসতো তার মধ্যে জন্মে ছিলেন তা না। অনেকের জন্ম হয়েছিল উত্তর সন্দ্বীপ, দক্ষিণ সন্দ্বীপ কিংবা পূর্ব সন্দ্বীপে। কারো জন্ম সন্দ্বীপের বাইরে অন্যকোথাও। কিন্তু মানুষগুলো শিক্ষা-সংস্কৃতি, খেলাধূলায়, ব্যবসা-বানিজ্যে বিকশিত হয়েছিলেন সন্দ্বীপ টাউনে। তাই তাদের হৃদয়ে সবসময় সন্দ্বীপ টাউন ছিল – আছে। এরা সবাই সন্দ্বীপ টাউন্যা।
সন্দ্বীপ টাউন ছিল সন্দ্বীপেরই টাউন। তাই সন্দ্বীপ টাউন সন্দ্বীপের প্রতিটি মানুষের গর্বের অংশ। তাই আসুন তার অভূতপূর্ব কোন আয়োজন , তার এগিয়ে যাওয়াতে গর্বিত হয়ে অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করি। বর্তমান প্রজন্মের অনেককে দেখেছি সন্দ্বীপের অন্য অংশে জন্ম নিয়ে-বেড়ে উঠেও টাউনের আয়োজনে নিজেকে সম্পৃক্ত করে ফেলেছেন। আন্তরিক সাধুবাদ জানাই তাদের প্রতি।

সন্দ্বীপ টাইন সোসাইটি গঠিত হওয়ার কারণ –
ভাঙন কেড়ে নিয়েছে কার্গিল হাই স্কুলের মাঠ, গাইড্যার ফিল্ড, আদালতের দীঘি ও মাঠ, পাবলিক লাইব্রেরী, কলা ভবন, গণ উন্নয়ন গ্রন্থাগার, জামে মসজিদ, বাজার মসজিদ, জগন্নাথ বাড়ি, কালি বাড়ি, ডাক বাংলো, এতিম খানার পুকুর, সেকান্দর মহল সিনেমা হল, বিচিত্রা ফোরাম,দ্বীপ সাহিত্য গোষ্ঠী, প্রভাতী চক্র, পি পি সি, আবাহনী, মোহামেডান, ব্রাদার্স ইউনিয়ন, প্রিয় লালের দোকান, বাংলাদেশ হোটেল, আজমীর হোটেল, হোটেল ফেরদৌস, মোস্তফা হোটেল, মা হোটেল, কুদ্দুস হোটেল, হরিকিতের দোকান, পিপাসা কুলিং কর্ণার,পাঁচ রাস্তার মোড়সহ আরো অনেক মিলনস্থল।
সেদিন টাউনবাসীরা বাড়ি-ঘর, সহায়-সম্পদ হারিয়ে যতটা না বিমর্ষ ছিল, তারচেয়ে বেশী ব্যথিত ছিল তাদের এসব প্রিয়স্থানগুলো হারিয়ে।
ভাঙন এসব মানুষগুলোকে ভৌগলিকভাবে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করতে পারলেও, তাঁদের মাঝে যোগাযোগটা কমিয়ে দিতে পারলেও, পারেনি তাদের হৃদয়ের বন্ধন ছিন্ন করতে। সেই সহপাঠীকে, সেই খেলার সাথীকে, সেই প্রিয় প্রতিবেশীকে মনে করে এখনো তাদের হৃদয় আপ্লুত হয়।পরস্পরকে দেখতে আকুলতা সৃষ্টি হয়।
হুম, কদাচিৎ কারো কারো সাথে দেখা হয় – কথা হয়, স্মৃতি রোমন্থন হয়।
মনের মাঝে ভাবনারা ভর করে, আহা, যদি বেশী সংখ্যায় স্মৃতির শহরের মানুষকে একত্রিত করা যেত!
সে ভাবনাকে বাস্তবে ছুঁতে মোহনা টিভি’র ব্যুরো চিফ জামাল হোসেন মনজু’র উদ্যোগে দিলদার হোসেন পল্টু, সুরাইয়া বাকের, নজরুল ইসলাম, আবদুল কাদের মানিক, মোঃ সাইফুর রহমান লিংকন, হাসিমুল কবির লোটন, ইকবাল বাহার, রঞ্জিত বণিক, কৃষ্ণ দত্ত, শাখাওয়াত নাসির, আবু ইউসুফ রিপন, ভব রঞ্জন, সাগর শাহেনেওয়াজ, তৈমুর মিটু, মোহাররম সুলতানা সিক্তা, আবদুল হামিদ, এস.কে.এম মারূফ, আলতাফ হোসেন প্রমুখের উপস্থিতিতে মেহনা টিভি’র চট্টগ্রাম অফিসে ‘সন্দ্বীপ টাউন্যাদের বৈঠক’ নামের বৈঠকটি দেশ-বিদেশে বিপুল সাড়া ফেলে।
কেন ডাকা হয়নি, আমি কি টাঊন্যা না – সেকি মধুর অভিমানী প্রশ্ন! কারো কারো নাম নিয়ে আপত্তি। সন্দ্বীপ টাউন্যা নামটা পরিবর্তন করা যায় কিনা – ভেবে দেখতে বলা। হয়তো উদ্যোক্তাদের মনেও আসেনি বিষয়টা এত সাড়া ফেলতে পারে।
সাধারণত প্রথম উদ্যোগটা একজনের মাথা থেকে আসে এবং অল্প কয়েকজনের সাথে আলোচনা করে এগিয়ে যায়। তারপর কলেবর বাড়ে, অংশগ্রহনকারীর সংখ্যা বাড়ে। তাইতো দ্বিতীয় বৈঠকে অংশগ্রহনকারীর সংখ্যা বেশ বেড়ে যায়। নতুনভাবে হাজির হয় আবু তাহের, রিপন তালুকদার, দাউদ খালেদ চৌধুরী, আলমগীর মোশারফ,আকতার হোসেন সাহাব, রাজিউল উসলাম সুমন, হেলাল উদ্দিন, ইয়াছিন মামুন, শওকত তালুকদার, আলাউদ্দিন বাবলু, আবদুল হালিম নাসির প্রমুখ।
দ্বিতীয় সভায় প্রধান সমন্বয়ক জামাল হোসেন মনজু নাম নিয়ে কারো কারো আপত্তির বিষয়টি তুলে ধরে নতুন দুটি নাম প্রস্তাব করেন, তার মধ্য থেকে ‘সন্দ্বীপ টাউন সোসাইটি’ নামটি গৃহিত হয়।
বৈঠকে কারা এই সোসাইটির সভ্য হবেন সে বিষয়েও আলোচনা হয়। সীমানার বেড়াজালে আবদ্ধ রাখা হয়নি তা। যাদের বাড়ি ছিল সন্দ্বীপ টাউনের যে সীমানা ভৌগলিকভাবে ভাবা হতো তার বাইরে – অন্য কোনো ইউনিয়নে কিন্তু লেখা-পড়া, খেলা-ধূলা. সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, রাজনীতি বা ব্যবসা-বানিজ্যের কারণে ছিল টাউনে নিত্য আসা যাওয়া কিংবা নিত্যবাস। মোটকথা যারা হৃদয়ে সন্দ্বীপ টাউনকে ধারণ ও লালন করে তারাই সন্দ্বীপ টাউন সোসাইটির সদস্য।
সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে পারস্পরিক বন্ধন সুদৃঢ় করাই হবে এ সোসাইটির প্রধান কাজ।

এরই ধারাবহিকতায় ১জানুয়ারী চট্টগ্রাম নগরীর মাতৃভূমি কমিনিউটি সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয় সন্দ্বীপ টাউন সোসাইটির তৃতীয় মতবিনিময় সভা। প্রথম দুটি সভার চেয়ে এর পরিসর ছিল অনেকখানি বড়। সবশেষ ২৩ফেব্রুয়ারী, শুক্রবার চট্টগ্রাম নগরীর ঐতিহ্যবাহী মুসলিম ইনস্টিটিউটে আরো অনেক বড় পরিসরে হযে গেলো প্রথম আনুষ্ঠানিক মিলনমেলা ‘আমার সন্দ্বীপ টাউন’।

যেসব সংস্কৃতিমনা, পরিশীলিত মানুষের উদ্যোগে এবং পরিচালনায় ‘সন্দ্বীপ টাউন সোসা্ইটি’ পরিচালিত হচ্ছে আশাকরা যায সন্দ্বীপ টাউন তথা সন্দ্বীপের অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কার্গিল সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী পরিষদের মত এটিও আলোচিত, আলোকিত, সুশৃংখল, আদর্শ সংগঠনে পরিণত হবে। তার স্বাক্ষর অনেকটা এরই মধ্যে রেখেছে।

== ====
২৪.০২.২০১৮


Advertisement

আরও পড়ুন