আজ বুধবার, ১৫ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



বেলাল বেগ : দশকভেদী এক চির সবুজ “মুক্তপ্রাণ”

Published on 22 February 2018 | 5: 21 pm

:: সবুজ আনোয়ার ::

বছর দশেক আগেও আমার কাছে যে নামটি ছিল অবগুণ্ঠিত এক রমনীয় অবয়ব। যার মোহনীয় তারণ্য আর হৃদয় উদ্বেলিত করার মতো গুণের বহর মন্ত্রমুগ্ধের মতো ভাবাবিষ্ট করে তুলেছিল পার্শ্বের বাড়ীর এক নিরঙ্কুশ প্রেমাবিষ্ট পড়শীকে।

লেখালেখির জগতে আঁতুর ঘরের বাসিন্দা হিসেবে কাটগড় গোলামনবী হাই স্কুলের আশি বছর ফুর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত একটি স্মারক গ্রন্থ আমার দৃষ্টিগোচর হয়। সেই গ্রন্থের ‘হারানো দিনের স্মৃতি’ নামের নিবন্ধটির প্রতিটি চরণ আমার মনে এমন অভাবনীয়ভাবে প্রোথিত হয়,অনেকটা রাতারাতি গোগ্রাসে সাবাড় করার পনে আমি লেখকের আদ্যান্ত উদ্ধারে উঠে পড়ে লাগি-কে এই লোক? তারপর দৈনিক সমকালের শুক্রবারের সাময়িকী কালের খেয়ায় প্রকাশিত ‘জিবের ডগায় চা’র জাদুকরি ঝাঁজ অচিরে আমাকে অক্টোপাশের মতন কাবু করে ফেলে। অনুসন্ধিৎসু পাঠক বনে যেতে জোরজবরদস্তি করে,তাকতের সাথে লেখক ও লেখার প্রেমে পড়তে প্রেরণা যোগায়। তখন ভাবনার ক্যানভাসে একটি শরীরি অবয়ব আঁকতাম,ইয়াদ করতাম-লোকটি দেখতে কেমন হবে!নিশ্চয় রসিক!

সহসা একদিন দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক সন্দ্বীপ প্রতিনিধি, প্রিয়জন চারুমিল্লাত আমার আকবর হাটস্থ কর্মস্হলে মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মতো কাংখিত মানুষটিকে নিয়ে বলা কওয়া ছাড়া হাজির।মিল্লাত ভাই সম্মুখের চেয়ারে টেনে বসতে বসতে আমাকে দারুণ এক গোলাক ধাঁধাঁয় ফেলে-বলো তো ইনি কে?

সেইদিন নাতিদীর্ঘ আলাপ চারিতায় বেলাল বেগের সাথে যে মধুর সদ্ভাব রচিত হয়েছিল সুদুর মার্কিন মুল্লুকে প্রত্যাগমনের পরও বিরহ ভুলে হৃদ্যিক বাঁধনটাকে তরতাজা করে রেখেছি সানন্দে। আর কালক্ষেপন না করে সেই সমস্ত সাবেকী গুলতানির পাঠ চুকিয়ে আগে বাড়ি।

কবিসত্তার বেলাল বেগ-ঠুনকো আবেগের বানে ভেসে বেড়ানো নিরুদ্দিষ্ট কোন তথা কথিত কবি নন। চটকদার শিরোনাম চয়ন করে, দুর্বোধ্য শব্দে বোনা অসংলগ্ন বাক্যের গাঁথুনিতে রচিত কথার ফুলঝুরি সর্বস্ব লেখনীকে কবিতার দাবীতে বাজারি কবিদের কাতারে শামিল হন নি কস্মিনকালেও। নচেৎ তাঁর ন্যায় একজন নমস্যজন,বিদগ্ধ পড়ুয়, শ্রোতা সন্মোহরী কথক সাতাত্তরতম জন্ম তিথি ডিঙ্গানোর পুর্বেই শততম গ্রন্থ প্রসব করতে পারতেন অনায়াসে।

কবিতার প্রকরণ অলংকার, ব্যাকরন ও ব্যঞ্জনে, প্রত্যাশা ও প্রত্যয়ে নিয়ত স্বভাবজাত রুচি ও পছন্দকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন বরাবর। তাইতো তার কবিতার পরতে পরতে বিরাজ করে আবাহমান বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাসের নিখুঁত পতিপাঠ। ঔজ্জল্যে স্মৃতি রোমন্থনের অন্তরালে পশ্চাদগামী ধর্মীয় গোড়ামী,স্বৈরাচার অপশাসন,ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার তাঁর রচনা সম্ভার। এই পড়ন্ত বেলায় উপনীত হয়েও নিজেকে গগনচুম্বী জনপ্রিয়তা, তারুণ্যের কাতারে সমাসীন রাখার ফিকির রপ্ত করা চাট্টিখানি কথা!

জীবদ্দশায় ক’জন কীতিমান কিংবদন্তীর বেলায় জুটে এমন শ্রদ্ধা প্রণতি, নানান অভিধায় অভিষিক্ত হবার মতো সুপ্রসন্ন বরাত!”দশকভেদী” বললে গড়পড়তা অত্যুক্তি হয় না, কিংবা অপরিপক্ক গুণগাহীর ন্যায় বুলি স্বর্বস্ব বালখিল্য প্রগলভতা জাহিরও নয়। কারণ তার মনের মাধুরী মিশানো বলিষ্ট লিখনী নিবিষ্টচিত্তে অধ্যয়ন করলে, তাঁকে দশকের বৃত্তে বন্দী করাকে ‘প্রীতির মোড়কে নিজের নিঃসীম দৈন্যতা প্রকাশের নামান্তর’ মানতে হবে ।

বেলাল বেগের জন্ম ১১ জৈষ্ঠ, ১৩৪৫ বঙ্গাব্দে চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ থানায় সন্তোষপুর গ্রামের ‘মিয়া বাড়ীতে’। বাবার নাম সফিক আহমেদ। মায়ের নাম রিযিয়া বেগম। শৈশবের পাঠ চুকিয়ে সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রামে আসেন।পাকিস্তান আমলে পূর্বপাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চালু ইন্টারউইং স্কলারশিপ প্রোগ্রামের প্রথম ব্যাচে লাহোরে যান এবং ১৯৬২ সনে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এম এ ডিগ্রী লাভ করেন। লাহোর সেন্ট্রাল ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড ডিপ্লোমা নিয়ে পূর্বপাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন করেন।

ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে কয়েক বছর শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রযোজক হিসেবে যোগদান করেন,বিটিভির জনপ্রিয় শিক্ষামুলক অনুষ্ঠান “কিন্ত এবং কেন” উপস্হাপনা তাঁকে তারকা খ্যাতি এনে দেয়। এ ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য জাতীয় পুরস্কারও লাভ করেন। এছাড়া বিবিসিতে উচ্চতর টেলিভিশন প্রডাকশন প্রশিক্ষন নেন। তেহরানে এডুকেশনাল প্রডাকশন্স ওয়ার্কশপ করেন । জুটমিলস কর্পোরেশনে জনসংযোগ প্রধান হিসেবেও কৃর্তৃত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম আলোর হয়ে ভ্রাম্যমান সাংবাদিকতা, বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত উপসম্পাদকীয় লেখা ছাড়াও অগ্রন্থিত লেখার সংখ্যা নেহাৎ কম নয়।

নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ প্রতিষ্ঠায় যার অক্লান্ত শ্রম ও সফলতার কথা হুমায়ুন আহমেদ তার বিভিন্ন লেখনীতে অকপটে স্বীকার করেছেন,সেইসব স্মৃতিকথায় হুমায়ুন ভক্তদের হৃদয়েও বেলাল বেগ নামটিকে স্হায়ীভাবে খোদাই হয়ে গেছে।এই বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী সহাস্যে মানুষটি যতটাই না প্রচারবিমুখ তারচে বেশি তুখোড় আড্ডাবাজ।

দীর্ঘকালের একাকিত্ব ও অভিমানে যবনিকাপাত টানতে পরিবারের সংগে নিউইয়র্কে বসবাস আরম্ভ করেন ১৯৯৯।

সম্প্রতি পেয়েছেন ঘুংঘুর সাহিত্য পত্রিকা কর্তৃক গুণী সংবর্ধনা-১৭। শিক্ষকতা পেশায় জীবনের সিংহভাগ সময় অতিবাহিত করা মানুষটি বসে নেই এই পড়ন্ত বেলার আলোরদূত, নিউইয়র্ক উদীচী স্কুলে সৌখিনতার বশে শিক্ষাকতাকে অবকাশ যাপনের উৎকৃষ্ট অনুসঙ্গ হিসেবে বেছে নেন।

শক্তিমান ও পরিশীলিত লেখক হিসেবে বেলাল বেগের সমুদয় প্রকাশনাকে যৎসামান্য বলা চলে।প্রবাসে ইংরেজি জানা বাঙালি ছেলেমেয়েদের জন্যে ইংরেজিতে বাংলা শেখার বই, ‘বাংলা পড়া’। প্রবন্ধের বই, ‘একাত্তরহীন বাংলাদেশ’ তার রচিত সুপরিপাঠ্য পুস্তক বাংলা সাহিত্যে কালের দলিল হয়ে টিকে থাকবে এ কথা হলপ করে বলা যায়।

সংসার জীবনে বেলাল বেগ স্ত্রী, এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক।ছেলের চারজন আর মেয়ের একজন সাকুল্য পাঁচ নাত নাতনীকে নিয়ে প্রবাস জীবনেও তরুনদের সাথে তাঁর নিবিড় সখ্যতা প্রবাহমান।নিত্যকার আচার আয়োজন, চলন সংলাপের সিংহ ভাগ জুড়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে অন্তন্দ্র প্রহরীর ন্যায় কলম সৈনিকের ভুমিকায় অবতীর্ণ আজও।

হে! তরুন হৃদয়ের প্রাণভ্রমরা জন্মদিনে ফুলেল শুভেচ্ছা সহ হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা আপনাকে। কালের খেয়ায় নবীনের কেতন হয়ে বাঁচুন এই কামনা অবশেষে।(ঈষৎ সংক্ষেপিত)


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন