শাহজালাল বিমানবন্দরের প্রবেশমুখে যানজট -প্রতিদিন ২শ’ যাত্রীর ফ্লাইট মিস

বন্দরের প্রবেশমুখে তীব্র যানজটে আটকা পড়ে প্রতিদিন গড়ে ২০০ যাত্রী ফ্লাইট মিস করছেন। সাধারণ যাত্রী থেকে শুরু করে অনেক ভিআইপি, সিআইপি ও বিদেশি যাত্রীও আছেন এ তালিকায়।

ফ্লাইট মিস করা যাত্রীদের অভিযোগ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত।

সম্প্রতি দুই কানাডীয় নাগরিক যানজটের কারণে ফ্লাইট মিস করায় বিমানবন্দর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন। তারা ক্ষতিপূরণ দাবি করে মন্ত্রণালয়েও চিঠি দিয়েছেন। ভুক্তভোগী অনেক যাত্রী এরই মধ্যে ক্ষতিপূরণ চেয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয় ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে আবেদন করেছেন।

মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স ও বেবিচকের কাছে ব্যাখ্যা তলব করেছে। এয়ারলাইন্সগুলো জানিয়েছে, এ বিষয়ে তাদের কিছুই করার নেই। যানজটের জন্য দায়ী এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষ। এ অবস্থায় তোলপাড় উঠেছে বিমানবন্দরজুড়ে।

বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম নাইম হাসান বিমানবন্দর এলাকায় তীব্র যানজটের কথা স্বীকার করেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তারা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ট্রাফিক উত্তর, এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সঙ্গে যৌথ সভা করেছেন। সভায় প্রতি ৫ মিনিট পর পর টঙ্গী ঢাকা মহাসড়ক বন্ধ করে ২ মিনিটের জন্য এয়ারপোর্ট সড়কটি চালু রাখার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ট্রাফিক বিভাগ এ সিদ্ধান্ত এখনও কার্যকর করেনি। উল্টো বিমানবন্দর এলাকার যান চলাচলে ট্রাফিক বিভাগের বেশ কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে প্রতিদিন গড়ে ২ বার পুরো বিমানবন্দর যানবাহনে স্থবির হয়ে যায়। ওই সময় যাত্রীদের লাগেজ মাথায় নিয়ে বিমানবন্দরে প্রবেশ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। চেয়ারম্যান বলেন, ইতিমধ্যে বেশ কিছু ভুক্তভোগী ফ্লাইট মিস করার কারণ উল্লেখ করে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। এদের সধ্যে একাধিক বিদেশি নাগরিকও আছেন বলে তিনি জানান।

অভিযোগ, অপরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থা, অজ্ঞতাসহ অবৈধ বাণিজ্যের কারণে শাহজালাল বিমানবন্দরে ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যার দিকে বিমানবন্দরের ভিতরে যানজটে পুরো এলাকা স্থবির হয়ে পড়ে। অভিযোগ উঠেছে, বিমানবন্দর থেকে যাত্রী নিয়ে কোনো মাইক্রোবাস বের হলেই অসৎ ট্রাফিক পুলিশকে ১শ’ থেকে ২শ’ টাকা দিতে হয়। মাইক্রোবাস আটকাতে গিয়ে প্রায়ই এ ধরনের ট্রাফিক পুলিশ বিমানবন্দর থেকে আসা গাড়ি আটকে দিচ্ছে। এ কারণেও যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, শাহজালাল বিমানবন্দর এলাকায় ডিউটি পাওয়ার জন্য বড় অঙ্কের টাকা ঘুষ দিতে হয়। আর ঘুষের এ টাকা তুলতে গিয়ে অসাধু ট্রাফিক পুলিশরা যানজটের কোনো তোয়াক্কা করে না। অভিযোগ আছে, দুর্নীতিবাজ ট্রাফিক পুলিশের প্রতিনিধি হিসেবে একদল যুবক দিনের বেলায় প্রকাশ্যে এ টাকা উঠায়। আর রাতের বেলায় নিজেরাই মাইক্রোবাসের চালকদের কাছ থেকে টাকা তোলে। এ কারণেই মূলত বিমানবন্দর এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ট্রাফিক উত্তর বিভাগের উপ-কমিশনার প্রবীর কুমার রায় সাংবাদিকদের বলেন, বিমানবন্দর এলাকায় কোনো যানজট হচ্ছে না। উল্টো তার প্রশ্ন- কোথায় দেখলেন যানজট। আমি তো কোনো যানজট দেখি না। আর ঘুষ বাণিজ্যের তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

বিমানবন্দরে প্রবেশমুখে বেসরকারি বহুতল ভবন যানজটের অন্যতম কারণ : সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে সরকারি জমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে লিজ দেয়া হয়েছে। সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমতি দেয়ায় বিমানবন্দরের প্রবেশের রাস্তা সরু হয়ে গেছে। এ কারণে যানজট তৈরি হচ্ছে। ওই বহুতল ভবনে মার্কেট, হোটেলসহ অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু হলে পুরো এয়ারপোর্ট অচল হয়ে পড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যানজট কমাতে সরকারের উচিত হবে বিমানবন্দরে প্রবেশের মুখে ডান দিকের রাস্তাসংলগ্ন ভবনের লিজ বাতিল করে প্রয়োজনে ভবনটি ভেঙে সেখানে রাস্তা তৈরি করা। এটা করা সম্ভব না হলে ভবিষ্যতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যানজট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। তখন সামাল দেয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। বিশ্বের কোনো বিমানবন্দরের প্রবেশমুখে এ ধরনের বহুতল ভবন নেই।

ফ্লাইট মিস করে ক্ষতিপূরণ দাবি : পেশায় অধ্যাপক স্মিথ নামের একজন কানাডিয়ান নাগরিক সম্প্রতি ঢাকায় এসে বিমানবন্দরসংলগ্ন গোলচক্করে যানজটের শিকার হয়ে ফ্লাইট মিস করেন। এরপর আন্তর্জাতিক এভিয়েশন আইনানুযায়ী তিনি শাহজালাল বিমানবন্দরের ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে ক্ষতিপূরণ চেয়ে আবেদন করেছেন। কিন্তু কোর্ট না পারছে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে, না পারছে তা অস্বীকার করতে।

এ অবস্থায় বিপাকে পড়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ ইউসুফের ঘুম হারাম। শুধু স্মিথ নয়, তার মতো প্রতিদিন এমন কমপক্ষে দু’শতাধিক যাত্রী হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট মিসের শিকার হচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, শুধু বিমানবন্দরসংলগ্ন গোলচক্করের যানজটের কারণে এমনটি ঘটছে। এ বিষয়ে বারবার ঢাকা মহানগর পুলিশের সঙ্গে দেনদরবার করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। সিভিল এভিয়েশনের যৌক্তিক মতামতকে ট্রাফিক পুলিশ আমলেই নিচ্ছে না।

শাহজালাল বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন কাজী ইকবাল করিম বলেন, শুধু গোলচক্করের ট্রাফিক পুলিশ যদি উত্তর-দক্ষিণে যাতায়াতকারী যানবাহনগুলো প্রতি পাঁচ মিনিট পর পর সিগন্যাল দিয়ে থামায় তাহলে উপকার হবে। তিনি বলেন, উত্তর-দক্ষিণে যাতায়াতকারী যানবাহনগুলো থামিয়ে দু’মিনিটের জন্য এয়ারপোর্ট টার্মিনাল থেকে বের হওয়া গাড়িগুলোকে রাস্তা পার করার সুযোগ দিতে হবে। তবে যানজট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। কিন্তু এখন ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে।

বিশ্বরোডের দোহাই দিয়ে ট্রাফিক পুলিশ উত্তর-দক্ষিণে চলাচলকারী যানবাহনগুলোকে থামানো হয় টানা ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর। এ সময়ের মধ্যে টার্মিনালের ভিআইপি গেট থেকে কিংবা ক্যানপি থেকে বিদেশ ফেরত যাত্রীরা আটকা পড়েন। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েই তাদেরকে যানজটের মধ্যে গাড়িতে বসে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দুটো সিগন্যাল মিস করলেই কমপক্ষে আধাঘণ্টা শেষ।শাহজালাল বিমানবন্দরের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, প্রতিদিনই ফ্লাইট মিসের অভিযোগ আসছে। যাত্রীরা কে কিভাবে যানজটের শিকার হয় তার অসংখ্য লিখিত অভিযোগও রয়েছে। যারা দেশীয় যাত্রী তারা ফ্লাইট মিসের জন্য কাউন্টারের সামনে কিছুক্ষণ চিৎকার-চেঁচামেচি করেন।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, সম্প্রতি নাসরীন নামের একজন মহিলা যানজটের শিকার হয়ে ফ্লাইট মিস করে তার কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়ে লিখিত আবেদন করেছেন। কানাডার নাগরিক নাসরীন ইতিহাদের ফ্লাইট ধরার প্রয়োজনীয় সময় নিয়েই এয়ারপোর্টের দিকে রওনা হন। কিন্তু যানজটের কারণে তিনি গোলচক্করের কাছে এসে আটকা পড়েন। তার সঙ্গে ছিল ৬টি লাগেজ। উত্তরার দিক থেকে গোলচক্কর এসে পৌঁছার পরও তাকে এদিক দিয়ে বিমানবন্দরে ঢুকতে দেয়নি কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশ। তাকে রেডিসনের সামনে দিয়ে ঘুরে আসতে হয়েছে।

সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান এয়ারভাইস মার্শাল নাইম হাসান বলেন, অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের এয়ারপোর্টে প্রবেশে যানজট এড়াতে বলাকা ভবনের আগের ভিআইপি সড়কটি খুলে দেয়া হয়েছে। এতে যানজট কিছুটা সহনীয় হয়েছে। কিন্তু গোলচক্করের যানজট এড়াতে আমরা প্রতি ৫ মিনিট পর পর অন্তত এক থেকে দেড় মিনিট সময় চাচ্ছি। এর মধ্যে যাতে গাড়িগুলো টার্মিনাল থেকে বের হয়ে রাস্তায় চলার সুযোগ পায়। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশ সেটা মানছে না। নানা অজুহাত দেখাচ্ছে। এ নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের সঙ্গে একাধিক বৈঠকও হয়েছে। এখন আরও উচ্চ পর্যায়ের অর্থাৎ আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে এ ইস্যুটি তোলা হবে বলে জানান।

Mahabubur Rahman Mahabubur Rahman

Leave a Reply

Top
%d bloggers like this:
Web Design BangladeshBangladesh Online Market