আজ রবিবার, ২২ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৭ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



কী জানি কী হয় জনমনে আতঙ্ক

Published on 08 February 2018 | 2: 07 am

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার রায় ঘিরে ঢাকাসহ সারা দেশ নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলার রায় হবে আজ। বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় দেশের বিভিন্ন স্থানে বুধবার বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে পুলিশ, র‌্যাবের পাশাপাশি টহলে নেমেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ফায়ার সার্ভিস। ঢাকার প্রবেশপথসহ সড়ক ও রেলপথে পদে পদে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ‘সন্দেহভাজন ও মামলার আসামি’ হিসেবে বুধবার গ্রেফতার হয়েছে বিএনপি নেতাকর্মীসহ ১৩ শতাধিক। গত নয় দিনে গ্রেফতারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার। সম্পদ রক্ষায় বাস টার্মিনাল ও রেলওয়ে স্টেশনগুলোয় পুলিশের পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিকরা অবস্থান নিয়েছে। রায় ঘিরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে তা কঠোরভাবে দমন করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে সরকার। রায়কে আইনি ও রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও মাঠের বিরোধী দল বিএনপি মুখোমুখি অবস্থান নেয়ায় সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

রায় কেন্দ্র করে পুলিশের নিরাপত্তা নিয়ে বুধবার বিকালে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি)। আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেছেন, ভীত হবেন না, স্বাভাবিক থাকুন। ৮ ফেব্রুয়ারি কিছু হবে না। কোনো গোষ্ঠী জননিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার অবনতির অপচেষ্টা করলে তা আইনগতভাবে মোকাবেলা করা হবে। কোনো ধরনের গুজবে কান না দেয়ারও অনুরোধ জানান আইজিপি। এদিকে ডিএমপি কমিশনার বলেছেন, নিরাপত্তার প্রশ্নে বিন্দুমাত্র ছাড় নয়।

রায়কে ঘিরে যাতে জনজীবন ও জনশৃঙ্খলায় বিঘ্ন না ঘটে, সেজন্য পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা গত দু’দিন দফায় দফায় বৈঠক করে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। নাশকতার আশঙ্কায় সন্দেহভাজন, গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত, তদন্তাধীন ও বিচারাধীন মামলার আসামিদের গ্রেফতারে সারা দেশের থানা ও গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটকে নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। ঢাকার প্রবেশপথে চেকপোস্ট বসিয়ে ব্যাপক তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ ও র‌্যাব। এদিকে দেশবাসীর নিরাপত্তায় বুধবার থেকে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় টহলে নেমেছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরা। ঢাকায় বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে ২০ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন থাকবে। বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহম্মদ মহসিন রেজা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া সিরাজগঞ্জে ৩ প্লাটুন, বগুড়ায় ৩ প্লাটুন, নারায়ণগঞ্জে ৩ প্লাটুন, নোয়াখালীতে ১ প্লাটুন, লক্ষ্মীপুরে ১ প্লাটুন এবং চাঁদপুরে ১ প্লাটুন, কিশোরগঞ্জে ১, ফেনী ২, বরিশাল ১, পিরোজপুর ১, সাতক্ষীরা ২, বাগেরহাট ১, নাটোর ১, রংপুরে ৫ প্লাটুন, রাজশাহীতে ৪ প্লাটুন, পাবনা ২সহ মোট ৭৬ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ঢাকাসহ ২০ জেলার জন্য ৫৮ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

ঢাকায় বিএনপি সমর্থকদের গণগ্রেফতার করা হচ্ছে না বলে দাবি করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জমান মিয়া। তিনি বলেন, পুলিশের ওপর হামলাকারী ও যারা অতীতে জ্বালাও-পোড়াও করেছে ভিডিও ফুটেজ দেখে তাদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা হচ্ছে। এটা গণগ্রেফতার নয়।

রাজধানীর পথে পথে তল্লাশি : রাজধানীর প্রবেশপথগুলোসহ বিভিন্ন পয়েন্টে তল্লাশি চালিয়েছে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা। কোথাও কোথাও গাড়িতে উঠে যাত্রীদের ব্যাগ ও লাগেজ চেক করা হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও যাত্রীদের গাড়ি থেকে নামিয়ে শরীর ও ব্যাগ মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে চেকপোস্টের সংখ্যাও। পাশাপাশি রাজধানীর টার্মিনাল ও মহাসড়কে কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে। নাশকতার আশঙ্কায় বাস ও ট্রাক টার্মিনালগুলোতে পুলিশের পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিকেরা অবস্থান নিয়েছে। বুধবার সকালে রাজধানীর সড়কগুলোতে যাত্রী চলাচল স্বাভাবিক দেখা গেছে। বিকালের দিকে কমতে থাকে। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। নৌপথে যাত্রীসংখ্যা কম দেখা গেছে। সরেজমিনে এসব চিত্র দেখা গেছে।

যাত্রীরা জানিয়েছেন, শুধু ঢাকায় নয়, মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে দূরপাল্লার গাড়ি থামিয়ে চেক করা হয়েছে। এতে সিরাজগঞ্জ, সাইনবোর্ড, টঙ্গী ও আশপাশ এলাকায় থেমে থেমে যানজটের সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রায়কে কেন্দ্র করে বিএনপি সমর্থকরা জড়ো হয়ে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে যানবাহনে ব্যাপক তল্লাশির ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজধানীতে নিরাপত্তা চৌকির সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। অপরদিকে পরিবহন মালিকেরা জানান, রায় নিয়ে নানামুখী চাপে রয়েছেন তারা। একদিকে হামলা আশঙ্কা ও অন্যদিকে পথে পথে হয়রানি। কয়েকজন পরিবহন মালিক জানান, পরিস্থিতি অবনতি ঘটলে আজ বৃহস্পতিবার দূরপাল্লার রুটে গাড়ি নামাবেন না।

দেখা গেছে, গাবতলী টার্মিনালে গাড়ি থেকে যাত্রী নামার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ ও শরীর মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিগত গাড়ি থামিয়ে চেক করা হয়েছে। রংপুর থেকে আসা হানিফ পরিবহনের যাত্রী আবদুল কুদ্দুস বলেন, সিরাজগঞ্জেও গাড়ি চেক করা হয়েছে। ঢাকার প্রবেশমুখেও চেক করা হল। তিনি বলেন, সিরাজগঞ্জে চেক করার কারণে সেখানে যানজট সৃষ্টি হয়। একই অভিযোগ পরিবহন শ্রমিকদেরও। তারা বলেন, চেকপোস্টের কারণে মহাসড়কগুলোর বিভিন্ন স্থানে যানজট সৃষ্টি হয়েছে। এতে ঢাকায় ঢুকতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি লেগেছে। দারুসসালাম থানার ওসি সেলিমুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, রায় ঘিরে তারা গাবতলী এলাকায় বাড়তি জনবল নিয়োজিত করেছেন। সন্দেহ হলে যে কোনো বাস, ট্রাক বা পথচারীদের তল্লাশি করা হচ্ছে।

কুমিল্লা থেকে ঢাকায় আসা আরেক যাত্রী মো. ইমরান হোসেন জানান, তাদের গাড়ি সাইনবোর্ড ও যাত্রাবাড়ীতে তল্লাশি করা হয়েছে। পুলিশ গাড়িতে উঠে যাত্রীদের পরিচয়পত্র ও ঢাকায় আসার কারণ জানতে চেয়েছেন। যাদের সন্দেহ হয়েছে তাদের দেহ তল্লাশি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে পড়ব তা বুঝতে পারিনি। এতে ভয় লাগছে। আগে জানলে ঢাকায় আসতাম না।

ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইলসহ কয়েকটি জেলার গাড়ি টঙ্গী ও আশুলিয়া হয়ে ঢাকায় প্রবেশ করে। এসব গাড়ি তল্লাশি করতে উত্তরায় চেকপোস্ট বসানো হয়। ওই চেকপোস্টে সন্দেহভাজন গাড়ি থামিয়ে চেক করা হয়েছে। বিশেষ করে হেঁটে চলা যাত্রীদের বেশি চেক করা হয়েছে। এ ছাড়া গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জেও বাড়তি সতর্কতা নিয়েছে পুলিশ। সন্দেহ হলেই যানবাহনে চালানো হয় তল্লাশি। রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী, গুলিস্তান ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে বুধবার রাতে পাহারা দেন পরিবহন শ্রমিকেরা। এসব টার্মিনালে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোকে পাহারা দেয়ার জন্য আগ থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়। তারা পুলিশের পাশাপাশি টার্মিনালগুলোতে অবস্থান নেন। এ বিষয়ে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল কালাম যুগান্তরকে বলেন, বাস আমাদের সম্পদ, আমাদের রুটি-রোজগারের মাধ্যম। এ বাস পাহারা দেয়ার জন্য পুলিশের পাশাপাশি আমরাও রয়েছি।

রেলপথে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা : রেলওয়েতে স্মরণকালের সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রতিটি রেলস্টেশন ও রেলওয়ে ব্রিজ এবং রেললাইনে কঠোর নিরাপত্তার আওতায় আনা হয়। ঢাকার কমলাপুর, বিমানবন্দর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলো নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়া হয়েছে। স্টেশন ও ট্রেনের ভেতরে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হচ্ছে। প্রতিটি ট্রেনের ইঞ্জিন ও গার্ডরুমে অস্ত্রধারী পুলিশ প্রহরা নিশ্চিত করা হয়েছে। রেলওয়ে ওয়ার্কশপসহ গুরুত্বপূর্ণ ভবনসমূহে পুলিশ প্রহরা বসানো হয়েছে। যাত্রীদের জীবন ও রেলের সম্পদ রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রয়োজনে গুলির নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। রেলওয়ে শ্রমিক লীগের ৬০টি শাখার নেতাকর্মীরা মাঠে নেমেছে বলে জানা গেছে।

বুধবার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পুরো স্টেশন এলাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। স্টেশনের প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে টিকিট কাউন্টার, প্লাটফর্মসহ ওয়ার্কশপ এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কন্ট্রোল রুম থেকে শুরু করে স্টেশন মাস্টার, বুকিং ও সিগন্যালিং রুমগুলোর সামনে অস্ত্রধারী পুলিশ প্রহরা দিচ্ছে। রেলওয়ে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল থেকে আসা ট্রেনগুলোর ইঞ্জিন ও গার্ডরুমে পুলিশের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। একই সঙ্গে কমলাপুর থেকে যেসব ট্রেন ছেড়ে যাচ্ছে সেসব ট্রেনের ইঞ্জিন, গার্ডরুম ও ট্রেনে অস্ত্রধারী রেলওয়ে পুলিশ ও নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা সতর্কাবস্থায় থাকতে দেখা গেছে। সাধারণ গেট দিয়ে ট্রেন যাত্রীদের প্রবেশ ও বের হতে দেখা গেছে। ব্যাগ, মালামাল বহনকারী যাত্রীদের সবচেয়ে বেশি তল্লাশির কবলে পড়তে হয়। দুপুরের পর বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ নিজেদের দখলে নেয় র‌্যাব। স্টেশন এলাকাও হকারমুক্ত করা হয়েছে। বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোহাম্মদ আলী আকবর জানান, তিন দিন ধরে এখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

ঢাকা রেলওয়ে থানার ওসি মো. ইয়াসিন ফারুকী যুগান্তরকে জানান, কমলাপুর ও বিমানবন্দরসহ ঢাকা রেঞ্জের সব ক’টি রেলওয়ে স্টেশন নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা হয়েছে। বাংকারে সতর্কাবস্থায় রয়েছে পুলিশ সদস্যরা। তিনি বলেন, আগে নাশকতাকারীরা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেন ও ইঞ্জিনে অগ্নিসংযোগ করেছিল। এবার পুরো স্টেশন এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা রয়েছে- যে কোনো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে, যাত্রীদের জীবন বাঁচানোর লক্ষ্যে প্রয়োজেন গুলি চালানোও হবে। এ বিষয়ে রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন যুগান্তরকে জানান, রেল সরকারি সম্পদ, জনগণের সম্পদ। এ সম্পদ রক্ষা করতে যা যা প্রয়োজন তাই করা হবে। সাময়িক সময়ের জন্য সাধারণ যাত্রীদের কষ্ট কিংবা দুর্ভোগ হচ্ছে স্বীকার করে তিনি বলেন, যাত্রীদের জানমাল রক্ষা করতেই এমন অবস্থানে যেতে হয়েছে।

 


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন