আজ রবিবার, ২২ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৭ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



ডেডলাইন ৮ ফেব্রুয়ারি ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি – শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ স্পট নিয়ে চিন্তিত পুলিশ

Published on 06 February 2018 | 2: 50 am

আট ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার রায়ের পর হামলা হতে পারে এ ধরনের শতাধিক স্পট ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারির পর সারা দেশে যেসব স্থানে বিএনপি- জামায়াত নেতাকর্মীরা নাশকতা চালিয়েছে সেগুলোকেই এবারও ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন কিছু স্থান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শঙ্কা, রায়ের পর এসব স্থানে প্রায় একই কায়দায় হামলা হতে পারে। এজন্য আগের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের তালিকা ধরে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।

একই সঙ্গে স্থানগুলোর নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। জোরদার করা হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। দল বা জোট নেতাকর্মীরা যাতে নাশকতার পরিকল্পনা ছড়িয়ে দিতে না পারে সেজন্য মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে তাদের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। বিশেষ স্থাপনা ও গণপরিবহনে হামলার আশঙ্কায় পরিবহন মালিক সমিতিকে সর্তক করেছে পুলিশ। এছাড়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীসহ সারা দেশের মেস, আবাসিক হোটেল ও মোটরসাইকেল আরোহীদের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। রায়ের আগে ও পরে করণীয় নির্ধারণ করে সদর দফতর থেকে পুলিশ সুপারদের চিঠি দেয়া হয়েছে।৮ ফেব্রুয়ারি যে রাস্তা ধরে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর যাতায়াত করবে সে রাস্তাগুলো ঘিরে রাখবে গোয়েন্দারা। রায়ের পর হরতাল দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। হরতালেও বড় ধরনের নাশকতা চালাতে পারে সেজন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, রায়কে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে দেয়া হবে না। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে জনগণই তা প্রতিহত করবে, আর পুলিশতো আছেই।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীতে পুলিশের ওপর হামলার পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। এ ঘটনার পর সারা দেশে অভিযান চালিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করছে পুলিশ ও র‌্যাব। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। রায়কে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীরা হামলা চালাতে পারে এমন তথ্য রয়েছে গোয়েন্দা বাহিনীর কাছে। বিশেষ করে দলটির আবেগী (ইমোশনাল) কর্মীরা দলের নির্দেশনা ছাড়াও বিভিন্ন স্পটে জড়ো হয়ে কিংবা এককভাবে চোরাগোপ্তা হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন গোয়েন্দারা। ইতিমধ্যে বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের পাঁচ শতাধিক নেতাকর্র্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে দাবি দলটির।

এ বিষয়ে পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, ‘পুলিশের প্রধান দায়িত্ব জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া। পুলিশ দৃঢ়তার সঙ্গে এ কাজ করে যাচ্ছে। যাতে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা থাকে সেজন্য ৮ ফেব্রুয়ারি কঠোর অবস্থানে থাকবে পুলিশ।’

পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, নতুন আইজিপি দায়িত্ব গ্রহণের পর পুলিশ সদর দফতরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার রায় নিয়ে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে বিভিন্ন রেঞ্জের ডিআইজি ও বিভিন্ন ইউনিটের প্রধানদের তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন। সে অনুযায়ী এখন কাজ চলছে। গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, জানুয়ারি থেকেই রাজধানীর মেস ও হোটেলগুলোতে নজরদারি শুরু হয়েছে। পুলিশের দেয়া নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে হোটেলে আগত অতিথিদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে রুম বুকিং দেয়া হচ্ছে কিনা এসব নজরদারি করছেন গোয়েন্দারা। বিএনপি সমর্থকরা রাজধানীর মেসগুলোতে জড়ো হয়ে ৮ ফেব্রুয়ারিতে সহিংসতার চেষ্টা করতে পারেন এমন তথ্যের ভিত্তিতে থানাভিত্তিক অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। থানা পুলিশ নিজ নিজ এলাকার মেসগুলোতে গিয়ে ভাড়াটিয়া ছাড়া অন্য কেউ থাকছে কিনা তা নজরদারি করছে। ইতিমধ্যে রাজধানীর নবাবপুর, হাইকোর্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পল্টন, ফকিরাপুলসহ কয়েকটি এলাকায় চালানো হয়েছে অভিযান। হোটেলগুলোতে অতিথির নাম-ঠিকানা লেখা, ছবি তোলা, এনআইডি, পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের কপি, ফোন নম্বর রাখা ও ফোন দিয়ে নম্বর যাচাই করাসহ ৮টি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। হোটেলগুলো নির্দেশনা মাফিক কাজ করছে কিনা তা নজরদারি করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভাড়াটিয়া নিবন্ধন ফর্মে দেয়া তথ্য অনুযায়ী বাড়িগুলোতে ভাড়াটিয়ারা থাকছেন কিনা সেটিও খেয়াল রাখা হচ্ছে।

এদিকে ৮ ফেব্রুয়ারির নিরাপত্তার বিষয়ে নিয়ে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া সাংবাদিকদের জানান, সেদিন কোনো অরাজকতা সৃষ্টি করতে দেয়া হবে না। যে আগুন সন্ত্রাস একবার শুরু হয়েছিল, সেটি আর পুনরাবৃত্তি হতে দেয়া হবে না।

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, রায়ের আগে ও পরে যে কোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে সারা দেশের পুলিশ সুপারদের (এসপি) নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। পুলিশ সদর দফতর যেসব স্থানে আগে নাশকতার ঘটনা ঘটেছে, ওই স্থানগুলো চিহ্নিত করে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালাতে বলা হয়েছে। থানাসহ পুলিশের সব স্থাপনায় নিরাপত্তা বাড়ানো, পুলিশের সব সিসিটিভি ক্যামেরা সচল রাখা, টহল বা অভিযানে পুলিশ সদস্যরা একা না গিয়ে একসঙ্গে টহল দেয়া। নির্দেশনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে ক্যামেরা রাখতে বলা হয়েছে, যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তারা ছবি তুলে রাখতে পারেন।

পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) সহেলী ফেরদৌস বলেন, ‘৮ ফেব্রুয়ারি কোনো সহিংসতার আশঙ্কা করছি না, তবে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। এদিন যে কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা রোধে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে কোনোভাবেই অবনতি না হয় সেজন্য পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটকে নির্দেশনা দেয়া আছে।’ তিনি বলেন, রায়কে ঘিরে সারা দেশের পুলিশ সুপারদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। চেকপোস্ট, টহল জোরদারের কথা বলা হয়েছে। গণপরিবহনগুলোকেও মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হচ্ছে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ নিজেরা যাতে হামলার শিকার না হোন সে বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুলিশ। বিশেষ করে হাইকোর্ট, মৎস্য ভবন ও পুরান ঢাকার বকশিবাজারসহ সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন থানার ওসি। তার বলেছেন, পুলিশ সদর দফতরের নির্দেশে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। চেকপোস্ট, টহল বাড়ানো হয়েছে।

সূত্রমতে, বাংলাদেশে যে কোনো আন্দোলনে বাস-ট্রাকের মতো পরিবহনগুলো আগুনে পুড়িয়ে প্রতিবাদ করে আন্দোলনকারীরা। ৮ ফেব্রুয়ারির দিন এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে কিনা এ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন যানবাহন মালিকরা। রোববার ডিএমপি কমিশনারের কার্যালয়ে পরিবহন মালিকরা এমন শঙ্কার কথা জানান। পরে ডিএমপি কমিশনার পরিবহনে অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা রাখার নির্দেশ দেন।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন