আজ বৃহঃপতিবার, ১৯ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৪ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



খেলাপি ঋণ নিয়ে উত্তপ্ত সংসদ- বেক্সিমকোকে বিশেষ সুবিধা দেয়ায় ক্ষোভ

Published on 24 January 2018 | 3: 58 am

ব্যাংক খাতের অনিয়ম নিয়ে মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে উত্তাপ ছড়িয়েছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। এ সময় তারা খেলাপি ঋণ পরিশোধে বেক্সিমকো গ্রুপকে বিশেষ সুবিধা দেয়া নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সংসদ সদস্যরা অভিযোগ করেন, দেশের অধিকাংশ ব্যাংক নিয়ম না মেনে প্রচুর পরিমাণ ঋণ দিয়ে এখন আদায় করতে না পেরে দেউলিয়া অবস্থায় পৌঁছেছে। জনগণের অর্থ লুটপাট করেছে। ফারমার্স ব্যাংক জলবায়ু ট্রাস্টের ৫০৮ কোটি টাকা নিয়েও ফেরত দিতে পারছে না। এর মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যাংক খাত শেষ হয়ে যাবে। মানুষ আর ব্যাংকে টাকা রাখবে না। সংসদ সদস্যরা এ সময় দেশের ৪৮টি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা কী, তা জানাতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বিবৃতি দাবি করেন।

মঙ্গলবার পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে আলোচনার সূচনা করেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বাবলু। তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে ভুগছে। অধিকাংশ ব্যাংক প্রচুর পরিমাণ অর্থ অনাদায় থাকায় (ঋণখেলাপির) দেউলিয়া দশায় পড়েছে, তারা জনগণের অর্থ লুটপাট করেছে। তারা টাকা দিয়ে তুলতে পারছে না। ফলে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দ্য ফারমার্স ব্যাংক জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ৫০৮ কোটি টাকা নিয়ে ফেরত দিতে পারছে না। অধিকাংশ ব্যাংক জনগণের অর্থ নিয়ে আর দিতে পারছে না। এর দায়-দায়িত্ব কে নেবে। এজন্য অর্থমন্ত্রীর বিবৃতি চাই।

বাবলু আরও বলেন, ঋণ আদায় করতে না পেরে এখন তারা (ব্যাংক) শুধু সুদটুকু দিতে পার্টিকে (ঋণগ্রহীতা) অনুরোধ করছে। কেননা তারা ঋণ রিসিডিউল করতে চায়। এখন জনগণের অর্থ আর ব্যাংকে সুরক্ষিত নয়। তারা জনগণের অর্থও ফেরত দিতে পারছে না। এ যদি ব্যাংকগুলোর বর্তমান অবস্থা হয়, তাহলে আমরা জিডিপি (প্রবৃদ্ধি) ৭.২ কীভাবে অর্জন করব। জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, আজ যারা ঋণখেলাপি, তারা বহু তাগাদা সত্ত্বেও টাকা ফেরত দিচ্ছে না। এমনকি সুদও দিচ্ছে না। এখন রিসিডিউল করে কোনোমতে ব্যাংকগুলো তাদের রিপোর্ট ভালো দেখাতে চাইছে। এভাবে নিয়ম ভেঙে ঋণ দেয়ার সঙ্গে ব্যাংকের এমডিসহ অনেকই জড়িত। এভাবে ব্যাংকের অর্থ লুটপাট হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন কোম্পানি হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। কিন্তু দিচ্ছে না। আদায় হচ্ছে না। বেক্সিমকোসহ কয়েকটি ঋণখেলাপি কোম্পানির নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের এসব বড় কোম্পানির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। দেশের ৪৮টি ব্যাংকের কোনটির কী অবস্থা, তা আমরা জানতে চাই। বাবলু বলেন, অর্থমন্ত্রী আমরা কি ডুবন্ত নৌকায় নাকি ভাসন্ত নৌকায়, তা জানা প্রয়োজন। আমি এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর বিবৃতি দাবি করছি।

পরে জাতীয় পার্টির আরেক সদস্য ফকরুল ইমাম বলেন, বিশ্বব্যাংক আমাদের ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আটকে দিয়েছে। ‘ইউনিয়ন পরিষদ উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্প চলমান ছিল, যা ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়েছে। এ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ৩ হাজার ৫০০ কোটি দিয়েছিল। প্রকল্পটি শেষ হওয়ার পর দেখা যায় মাত্র ১১ কোটি টাকা বেঁচে গেছে, যা বিশ্বব্যাংকে ফেরত দেয়ার কথা। কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় মাত্র ১১ কোটি উদ্বৃত্ত ফেরত না দেয়ায় বিশ্বব্যাংক সব টাকা অর্থাৎ ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছাড় বন্ধ করে দিয়েছে। এভাবে যদি চলে তবে ভবিষ্যতে বিশ্বব্যাংক তাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অর্থ দেয়া বন্ধ করে দেবে। বিষয়টি অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

পরে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি ও দেউলিয়াপনার বিষয়ে আমরা বসে নেই, সরকার তৎপর রয়েছে। তবে এ বিষয়ে আমাদের আরও যত্নবান হতে হবে। কেননা ব্যাংকিং খাত উন্নয়নের শরিক। এ বিষয়ে আমাদের অবশ্যই সতর্ক হতে হবে। তিনি বলেন, ব্যাংক লুটপাটের বিষয়টি এর আগেও হয়েছে। আমাদের সরকার এ বিষয়ে আরও সতর্ক হয়েছে। ফলে আমাদের উন্নয়ন কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হবে না।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, তবে উন্নয়নের সব সূচকে আমরা এগিয়ে আছি। আমরা খুব দ্রত উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশ করব। এ বিষয়ে তিনটি ক্রাইটেরিয়ায় শর্ত পূরণে সমর্থ হয়েছি। আমাদের মাথাপিছু আয় গড়ে ১২৮০-১২৯০ ডলারসহ আরও দুটি সূচকে অনেক এগিয়ে। আমরা আর দরিদ্র দেশ নই।

ব্যাংক ও আর্থিক খাতের বিষয়ে সরকারকে আরও সতর্ক হতে হবে বলে মন্তব্য করে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আমাদের উন্নয়নের সব সূচক পজিটিভ। তবে ব্যাংকের ব্যাপারে আমাদের আরও যত্নশীল হতে হবে। আরও সতর্ক হতে হবে। কারণ ব্যাংকিং খাত আমাদের অর্থনীতিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে।’

মাগরিবের নামাজের বিরতির পর প্রশ্নোত্তর পর্বের শেষে জিয়াউদ্দিন বাবলু পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নেন। পরে তোফায়েল আহমেদসহ আরও দুইজন সদস্য ফ্লোর নেন। মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে সব কথা বলতে পারবেন না উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ব্যাংকিং খাত নিয়ে জিয়াউদ্দিন বাবলু যে প্রশ্নটি তুলেছেন আমি নিজেও তার সঙ্গে একমত। তবে সরকার নীরবে বসে নেই। এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, নেয়া হবে।’

এর আগে জিয়াউদ্দিন বাবলু বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেছেন বেসিক, সোনালী, অগ্রণী ও জনতা- এ চারটি ব্যাংক অত্যন্ত রুগ্ন। তাদের নিজস্ব মূলধন নেই। আগে শুনতাম ঋণখেলাপি, এখন শুনছি ব্যাংক খেলাপি। ব্যাংক গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। এর দায়-দায়িত্ব কে নেবে। আমরা নানা উন্নয়নের কথা শুনি। প্রবৃদ্ধির কথা শুনি। কিন্তু আমাদের ব্যাংকগুলো খালি হয়ে যাচ্ছে। মানুষের টাকা চলে যাচ্ছে। সামান্য ঋণখেলাপির জন্য কৃষক, রিকশাচালক ও নিন্মবিত্তদের জেল খাটতে হচ্ছে, কিন্তু যারা ব্যাংককে খেলাপিতে পরিণত করেছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।’

বেক্সিমকো গ্রুপকে ঋণ পরিশোধ করার জন্য ২০২৭ সাল পর্যন্ত নতুন করে সুবিধা দেয়ার সমালোচনা করেন জিয়াউদ্দীন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘বেক্সিমকোর জন্য কী বিশেষ আইন? না হলে তারা কেন বিশেষ সুবিধা পাবে?’ ফারমার্স ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, ফারমার্স ব্যাংক জলবায়ু ফান্ডের ৫০৮ কোটি টাকা ফেরত দিতে পারছে না। তারা এফডিআরের টাকা দিতে পারছে না, নিয়মিত অ্যাকাউন্টের টাকা দিতে পারছে না। এর দায় কে নেবে- এর দায় সরকারকেই নিতে হবে। কারণ এটি তফসিলি ব্যাংক।

অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বাবলু বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতিকে বাঁচান, শেয়ারবাজারকে বাঁচান, ব্যাংকিং খাতকে বাঁচান। দেশের মানুষ যাতে বেঁচে থাকতে পারে সেই ব্যবস্থা নিন। তা না হলে আমরা কোনো দিনই মধ্যম আয়ের দেশে যেতে পারব না।’


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন