আজ বুধবার, ১৮ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৩ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



সন্দ্বীপের বীর সন্তান : স্মরন ও মূল্যায়ন

Published on 21 January 2018 | 1: 28 pm

কাজী মিনহাজ উদ্দিন রুদবী

বন্ধুবর শাহাদাৎ হেসেন আশরাফের সাথে পরিচয় হওয়ার মাধ্যমে আমি মাসিক সোনালী সন্দ্বীপের সান্নিধ্যে আসি এবং সোনালী সন্দ্বীপে টুকটাক লেখালেখি শুরু করি ; এক পর্যায়ে শাহাদাৎ ভাই আমাকে বললেন আমাদের নির্বাহী সম্পাদক সাহেব বিদেশে চলে গেছেন আপনি দায়িত্বটা নিতে পারেন,আমি সানন্দে তা গ্রহন করলাম। অল্প কিছুদিনের মধ্যে আমি আমাদের আবাসন কোম্পানি তাকওয়া প্রপটর্টিজের মাধ্যমে সোনালী সন্দ্বীপের স্বত্ব এবং সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহন করি যার সবই শাহাদাৎ ভাইকে সহযোগীতা করা এবং সোনালী সন্দ¦ীপকে বাঁচিয়ে রাখার নিমিত্তে তাঁর অনুরোধেই হয়েছিল।এক পর্যায়ে আমি জানলাম যিনি সোনালী সন্দ্বীপের নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতেন তার নাম প্রকৌশলী শামছুল আরেফিন শাকিল ।পরবর্তীতে আমি তার লেখালেখির সাথে পরিচিত হই এবং বুঝতে পারি তিনি একজন প্রগতিশীল মুক্তমনা লেখক এবং তার মাঝে ধমের্র প্রতি কোন বিদ্বেষ নেই ; তার সবচেয়ে বড় গুন হিসেবে আমার নিকট যা ধরা পড়েছে তা হচ্ছে তার জন্মভূমিপ্রেম এক কথায় সন্দ্বীপপ্রেম। আমি মনেকরি এ পর্যন্ত আমাদের নদীবিধৌত অবহেলিত বঞ্চিত সন্দ্বীপের অধিকার নিয়ে সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে যে কটা গ্রহনযোগ্য, যুক্তিযুক্ত ও মননশিল স্ট্যাটাস আমার চোখে পড়েছে তার মধ্যে দিলাল রাজার সঠিক উত্তরসুরী শামছুল আরেফিনের গুলো অন্যতম। তিনি স্বদেশপ্রেমের তাড়নায় বর্তমানে ” প্রজন্মে ভাবনায় সন্দ্বীপ” নামের একটি সংকলন ,কোন বিজ্ঞাপন ব্যাতিরেকে নিজ অর্থায়নে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার এই মহৎ প্রচেস্টাকে আমি সাধুবাদ জানাই। সন্দ্বীপ নিয়ে তার আনকোরা নতুন চিন্তা আর সম্ভাবনার এই অভিনব প্রকাশনাটিকে তিনি আবেগ দিয়ে বিবেকের কথা প্রকাশের ক্ষুদ্র মঞ্চ হিসাবে পরিচিত করার প্রয়াস পেয়েছেন যা সন্দ্বীপ নিয়ে প্রগাড় সত্য, সুন্দর আর ইতিবাচক চিন্তা চেতনার কেতন উড়িয়ে নবীন প্রবীনের ঋদ্ধ চেতনার সমন্বয় ঘটাবে বলে আমার বিশ^াস।
শামছুল আরেফিন শাকিল সাহেব তার এই মুক্তমঞ্চের শে^তপত্রে কলমের ঘোড়া ছুটিয়ে দিবার যে উদাত্ত আহবান সন্দ্বীপের নবীন-প্রবীন প্রজন্মের নিকট রেখেছেন আমিও তার অন্তর্ভক্তু ছিলাম বা আছি ,তবে জীবন জীবিকার ব্যাস্ততার জন্য কিছু একটা লিখতে পারব এই আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। আমি অনেকটা পাখী স্বভাবের ,পাখি যেমন যখন ভালো লাগে তখন গান গায় আমিও যখন মন চায় তখন হঠাৎ কিছু লিখি, বিষয় নিয়ে বা তাগাদার কারনে কখনো লিখিনি বা লিখতে পারিনা। কিন্ত শাকিল সাহেব যখন আমি অধম লিখকের নিকট সরাররি আহবান জানালেন তখন আর না করতে পরলাম না ,ব্যাস্ততার মাঝেই কম্পিউটার নিয়ে বসে বিজয় কি বোর্ডে প্রবেশ করে টাইপিং শুরু করলাম, জানিনা এটা লিখা না অনুরোধে ঢেঁকি গেলা হচ্ছে।
আমাদের সন্দ্বীপের প্রচুর সমস্যা যা বর্ননা করে শেষ করা দুষ্কর। নদী ভাংগন,নৌপথে যাতায়তের বিড়ম্বনা-মৃত্যুভয় ,বেড়ীবাঁধ নির্মানে ফাঁকিবাজি,আভ্যন্তরীন রাস্তা ঘাটের বেহাল দশা, অমিমাংসিত সীমানা নির্ধারন বিতর্ক,যানবাহন-দুর্ঘটনা, সার্বিক চিকিৎসার করুন অবস্থা ,প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষার অব্যাবস্থাপনা,ঘাট ইজারাদারেদের অবৈধ দৌরাত্ব ইত্যাদির সাথে যোগ হয়েছে যুবসমাজের মাদকাসক্তি,ধর্ষন,রাজনৈতিক ও অনৈতিক হত্যাকান্ড , গোলাগুলি সংঘর্ষ। উল্লেখিত ব্যাপার গুলো নিয়ে পত্রপত্রিকায় ,অনলাইন পোর্টালে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে মূলত এলাকার জনপ্রতিনিধিরাই সঠিক ভূমিকা রাখতে সক্ষম। তাঁরা যদি উদার মন নিয়ে এগিয়ে আসেন এবং সরকারের নিকট থেকে সন্দ্বীপের প্রাপ্য অধিকার আদায়ের ব্যাপারে সচেস্ট হন তাহলে এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান হওয়া সম্ভব তবে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে শরিষাতে যেন ভুত না থাকে। আর এউ ভুত তাড়াতেই মূলত বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনকে এব্যাপারে অহিংস পন্থায় আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে এবং কলম সৈনিকদের কলমের ঘোড়াও ছুটাতে হবে অবিরত তবে সেখানে যেন হলদে ছোপ না পড়ে।
শাকিল সাহেবের ভাষায় আবেগ দিয়ে বিবেকের কথা লিখতে গিয়ে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে ইতিহাসকেই বেছে নিলাম কারন আমি ইতিহাসে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নেয়ার জন্যই চট্টগ্রাম ভার্সিটির সবুজ চত্বরে জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছি। আর যে জাতি তার সঠিক ইতিহাস জানেনা,জানেনা তার বীর পূর্বপুরুষদের বীরত্বগাঁথা ,সেজাতি কখনো নিজেকে চিনতে পারেনা ,পারেনা সন্মুখে এগুতে। বাংগালীর ইতিহাস বীরত্বের ইতিহাস ,সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৪৭ সালে ধর্মের নামে উর্দুভাষী পাকিস্তানীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করে হতভাগা বাংগাীল যে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল ধর্মেরমুখোশধারী পকিস্তানিরা তার সুফল বাংগালীকে ভোগ করতে তো দিলই না বরং তাদের উপর চালালো পৈশাচিক নিপীড়ন – নির্যাতন। কেড়ে নিতে চাইল তাদের মাতৃভাষা বাংলা ভাষার সম্মান। গর্জে উঠল বাংগালী, রক্ত ঝরল, জীবন দিল সালাম বরকত রফিক সহ অনেকে, ৫২ তে মাথা উঁচু করে দাঁড়াল শহীদ মিনার ,অবশেষে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেল বাংলা কিন্তু বাংগালীর উপর চালানো স্টীমরোলারের স্টার্ট বন্ধ করলোনা পাকিস্তানি সারমেয়রা।এবার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব নিয়ে বীরদর্পে এগিয়ে এলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাংগালী স¦াধীন বাংগালী জাতির পিতা বংগবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তার রেসকোর্সের সেই মহাকাব্যের মত স্বাধীনতার ঘোষনা লক্ষ প্রানের দরে এনে দিল রক্তমাখা- শোকগাঁথা বিজয় ৭১,স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা।
বাংগালীর সকল আন্দেলন সংগ্রামে সন্দ্বীপবাসীদের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহন ও অবদান ছিল প্রনিধানযোগ্য।স্বাধীনতা সংগ্রামে সন্দ্বীপের প্রচুর লোক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিল। যে স্বাধীন বাঙলা বেতার কেন্দ্র থেকে স¦াধীনতার পক্ষে অনুষ্ঠান ও সংবাদ প্রচার করে সারা বাংলার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরনা যোগাত তার প্রতিষ্ঠাতাই ছিলেন সন্দ্বীপের সন্তান শব্দসৈনিক বেলাল মোহাম্মদ ,বংগবন্ধুর পক্ষ থেকে মেজর জিয়ার পঠিত বানীটি বেলাল মোহাম্মদই লিখে জিয়াকে অনুরোধ করে পড়িয়েছিলেন বলে এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বয়ং আমাকে বলেছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আরো ভূমিকা রেখেছিলেন সন্দ্বীপের আবুল কাসেম সন্দ্বীপ,মোহাম্মদ শাহ বাংগালী,শামসুল হুদা প্রমুখ।আমরা অনেকে জানিনা ঢাকায় শহীদ বুদ্ধিজিবীদের তালিকায় সন্দ্বীপের মোহাম্মদ মোস্তফার নাম লিখা আছে ,তিনি ঢাকা সায়েন্স ল্যবরেটরীর কেমিস্ট ছিলেন।
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের কবি আব্দুল হাকিম সন্দ্বীপের অধিবাসী ছিলেন তাঁর অনিবার্য উচ্চারন ছিল ” বংগেত জন্মি যে জন হিংসে বংগবানী/ সেসব কাহার জন্ম নির্নয় ন জানি”।এই মহৎ উচ্চারনের মধ্যে রক্ত ঝরা ৫২সালের ভাষা আন্দোলনের বীজ বপন করা হয়েছিল।ভাষা আন্দোলনের সময় সন্দ্বীপের অন্যতম কৃতি সন্তান পাকিস্তান গনপরিষদের বিরোধী দলীয় সম্পাদক রাজকুমার চক্রবর্তী গনপরিষদে ভাষাসংগ্রামের পক্ষে এক আগুনঝরা ভাষন দিয়েছিলেন; যা রাজপথের আন্দেলনকে আরো বেগবান এবং শানিত করেছিল। সন্দ্বীপের নতুন প্রজন্ম এসব ভাষাসৈনিক সম্বন্ধে প্রায় তথ্যশূন্য বলা যায়।
সন্দ্বীপের বীর শহীদ , শহীদ বুদ্ধিজিবী ,মুক্তিযোদ্ধা ,ভাষাসৈনিক কারা ছিলেন আমাদের উচিত তাদের পরিচিতি ও সন্ধান বের করা তদের উপর গবেষনা করে তাদের বীরত্বের কথা নতুন প্রজন্মকে অবগত করা। যেখানে বিদ্বানের কদর হয়না সেখানে বিদ্বাান জন্মগ্রহন করেনা।যারা সম্মানিতকে সম্মান দিতে জানেনা তার কখনো সম্মান পায় না।বীরগাঁথা শাহনামা পারস্যবাসীদের বীর হওয়ার প্রেরনা যুগিয়েছিল। যে জাতি তার বীরগাঁথা জানেনা সে জাতি কখনো সাহসী হতে পারে না,পারেনা অধিকার আদায় করতে।
আমি আমার আজকের এই সংক্ষিপ্ত ইতিহাসকেন্দ্রিক লেখা থেকে স্বাধীনতার স্বপক্ষের সরকার তথা জনপ্রতিনিধিদের নিকট উদাত্ত আহবান জানাব আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে ও ভাষা আন্দোলনে বীরপ্রসবিনী সন্দ্বীপের যে সব সাহসীসন্তান বীরত্বপূর্ন অবদান রেখে ইতিহাসে নিজেদের স্থান করে নিয়েছেন ,নতুন প্রজন্মের কাছে তাদের পরিচিতি ও বীরত্বগাঁথা তুলে ধরার জন্য তাদের স্মরনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রচলন,বৃত্তির প্রচলন,তাদের নামে লাইব্রেরী,বিদ্যালয়,মাদ্রাসা স্থাপন বা স্থাপিত স্থাপনা এবং সড়কের নামকরন করে এবং বিভিন্ন ফলকে তাদের বীরত্বকথা খোদাই করে বা লিখে তাঁদেরকে সম্মানিত করুন, তাঁদের স্মৃতিকে অমলিন করে রাখুন।এতে অনাগত ও নতুন প্রজন্ম অনুপ্রানিত হবে এবং জন্মভূমিকে ভালবাসতে শিখবে।

(লিখাটি শামসুল আরেফিন শাকিল সম্পাদিত সন্দ্বীপ প্রজন্ম ভাবনায় প্রথম প্রকাশিত হয়)

লিখক: প্রধান সম্পাদক মাসিক সোনালী সন্দ্বীপ-www.sonalinews24.com-sonali online TV


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন