আজ বৃহঃপতিবার, ১৬ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০১ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



ভুয়া ঠিকানায় এলসি পাচার হচ্ছে হাজার কোটি টাকা

Published on 20 January 2018 | 4: 31 am

পণ্য আমদানির ঋণপত্রে (এলসি) ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে বিদেশে অর্থ পাচার করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর, চট্টগ্রাম কাস্টম ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের একটি চক্রের যোগসাজশে এই অর্থ পাচার বাড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সম্প্রতি পণ্য আনা দুটি প্রতিষ্ঠানের ঋণপত্র পর্যালোচনা করতে গিয়ে হাজার কোটি টাকা পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন করেছে শুল্ক্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। তাদের ধারণা, পরস্পরের যোগসাজশে সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে একাধিক চক্র গত এক বছরে পাচার করেছে আরও কয়েক হাজার কোটি টাকা।

সূত্র জানাচ্ছে, টাকা পাচারের লক্ষ্যে চক্রটির সদস্যরা প্রথমে প্রকৃত প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলছেন। কয়েক মাস বড় ধরনের লেনদেন করছেন। এরপর ভ্যাট নিবন্ধন থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের সব ঠিকানাই বেনামে বা ভুয়া তৈরি করছেন। পরের ধাপে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে দামি পণ্য আমদানির কথা বলে নিয়ে আসছেন অনেক কম দামি পণ্য। এভাবে তারা টাকা বিদেশে রেখে দিচ্ছেন, অর্থাৎ টাকা পাচার করছেন।

নিয়ম অনুযায়ী এলসি খোলার সময় প্রতিষ্ঠানের ঠিকানাসহ যাবতীয় তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখার কথা ব্যাংক কর্মকর্তাদের। আবার ঘোষণা অনুযায়ী পণ্য এসেছে কি-না, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান অতীতেও এমন পণ্য এনেছে কি-না এসব খতিয়ে দেখার কথা শুল্ক্ক কর্মকর্তাদের। আবার বন্দর থেকে অবৈধ প্রক্রিয়ায় কোনো পণ্য খালাস হচ্ছে কি-না, এসব দেখার কথা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের। কিন্তু পরস্পরের মধ্যে যোগসাজশ থাকায় এড়িয়ে যাওয়া হয় এসব যাচাই প্রক্রিয়া। চালান ধরা পড়লেও তাই নাম-ঠিকানা ভুয়া থাকায় শনাক্ত করা যায় না প্রকৃত অপরাধীকে। আড়ালে থেকে যান যোগসাজশকারী। দায়ও নেন না কেউ। আবার আইনগত পদক্ষেপ নিতে গেলে অনেক প্রতিবন্ধকতা পেরুতে হচ্ছে সংশ্নিষ্ট সংস্থাকে।

সম্প্রতি এগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপি ও হেনান আনহুই এগ্রো নামের ভুয়া ঠিকানাধারী দুই প্রতিষ্ঠানের ১২ কনটেইনার পণ্যের এলসি পর্যালোচনা করতে গিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে ৯০ কনটেইনার পণ্য খালাসের তথ্য পেয়েছে শুল্ক্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। তাদের ধারণা, শুধু এ দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই বিদেশে পাচার হয়েছে অন্তত এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এদের জালিয়াতির সুযোগ করে দিয়েছেন শুল্ক্ক ও ব্যাংক কর্মকর্তারা। এর বিনিময়ে তারা পেয়েছেন মোটা অঙ্কের কমিশন।

ঘটনা উদ্ঘাটনের পর শুল্ক্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বলেন, ‘এগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপি ও হেনান আনহুই এগ্রোর স্বত্বাধিকারী আবদুল মোতালেব বেসরকারি একটি ব্যাংকের দুটি শাখায় চলতি হিসাব খোলেন। পরে ব্যাংকটির নয়াপল্টন শাখা থেকে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য মোট ১৭টি এলসি উন্মুক্ত করেন। ভুয়া ঠিকানা ও স্বাক্ষরে এলসি খোলায় তাকে সহায়তা করেন সংশ্নিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। আর অর্থ পাচারকারী দুটি প্রতিষ্ঠান, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের স্বত্বাধিকারীসহ মোট সাতজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যাংক কর্মকর্তাদেরও আসামি করা হবে।’

শুল্ক্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অনুসন্ধান অনুযায়ী, পোলট্রি ফিডের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ঘোষণা দিয়ে হেনান আনহুই এগ্রো ও এগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপি ১২টি কনটেইনারে করে চীন থেকে ১৬ হাজার ১৭০ বোতল মদ, তিন কোটি ৮৪ লাখ শলাকা সিগারেট, চার হাজার ৭৪টি এলইডি টেলিভিশন ও ২৮১টি আমদানি নিষিদ্ধ পুরনো ফটোকপি মেশিন নিয়ে আসে। মার্চ মাসে এসব পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে জব্দ করেন শুল্ক্ক গোয়েন্দারা। এরপর দীর্ঘ তদন্ত শেষে জানতে পারেন, ১২টি কনটেইনার ধরা পড়লেও একই আমদানিকারক এরই মধ্যে আরও ৭৮টি কনটেইনার পণ্য খালাস করেছেন। ১২টি কনটেইনারে আনা পণ্যের ঘোষিত মূল্য ছিল ৫০ লাখ টাকা। আটক এসব পণ্যের প্রকৃত বাজারমূল্য প্রায় ১৩৪ কোটি টাকা। মোট ৯০ কনটেইনার পণ্য হিসাবে নিলে এদের বিদেশে লেনদেন করা টাকার পরিমাণ এক হাজার ৫০ কোটি টাকা হবে বলে ধারণা করছে শুল্ক্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এখনও চলমান আছে এ তদন্ত। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ অনুযায়ী গত ২৯ নভেম্বর এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে।

এ ঘটনায় আসামি আবদুল মোতালেব তার নিজের নাম ও ব্যবসায়িক পরিচয় গোপন করে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার খোরশেদ আলমের নাম ও ছবি ব্যবহার করে মূল্য সংযোজন কর নিবন্ধন গ্রহণ করেন বলে সূত্র জানিয়েছে। সেখানে তিনি নিজের ছবি ও স্বাক্ষরের জায়গায় খোরশেদ আলমের ছবি ও স্বাক্ষর ব্যবহার করেছেন। অন্যরা তার এ কাজে সহযোগিতা করেছেন। এর আগে একইভাবে ভুয়া নাম-ঠিকানা দিয়ে ২২ কনটেইনার পণ্য আনে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ক্যাপ ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল। বিপি শিট ঘোষণা দিয়ে এ চালানে আনা হয় নকল কয়েল। সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল কুইক সার্ভিস কনটেইনারগুলো খালাসের জন্য কাস্টমসে বিল অব এন্ট্রিও দাখিল করে। একইভাবে অর্থ পাচার করতে সম্প্রতি পোলট্রি খাদ্য ঘোষণা দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আনা হয় ৫০৪ টন চুনাপাথর ও ক্যালসিয়াম কার্বনেট পাউডার। মিথ্যা ঘোষণায় ১৮ কনটেইনারের এ পণ্য আনে কোয়ালিটি ব্রাদার্স নামের একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান। চালানটি খালাস নিতে সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান স্বাধীন এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে কাস্টমে দাখিল করা হয় বিল অব এন্ট্রি।

শুল্ক্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের ধারণা, চট্টগ্রাম বন্দর, ব্যাংক ও শুল্ক্ক বিভাগের যোগসাজশ না থাকলে পণ্য আমদানির আড়ালে বিদেশে অর্থ পাচারের এত ঝুঁকি নিতেন না অসাধু ব্যক্তিরা। নাম-ঠিকানা ভুয়া হওয়ার পরও একের পর এক চালান আনার ঘটনাও প্রমাণ করে যোগসাজশের কথা। তবে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘সন্দেহভাজন পণ্য চালান পেলে সঙ্গে সঙ্গে তা আটকের ব্যবস্থা করা হয়। পণ্য সন্দেহভাজন কি-না কিংবা আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার হয়েছে কি-না তা তদারকির দায়িত্ব শুল্ক্ক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের। তাদের গাফিলতির কারণেই বন্দর দিয়ে মিথ্যা ঘোষণার পণ্য কিংবা অর্থ পাচারের ঘটনা বেড়েছে।’


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন