আজ রবিবার, ২৭ মে ২০১৮ ইং, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



মায়াবিনী সন্দ্বীপ

Published on 04 January 2018 | 10: 51 am

:: মোঃ হাসানুজ্জামান সন্দ্বীপি ::
“মেঘনা ঢেউয়ে উচ্ছ্বাস চরণে তোর কদমবুসি,
উত্তাল জলরাশি ফণা তোলে গায় তোর প্রেমের কাব্যকথা,
গাংচিল ভেসে ভেসে মিশে একাকার যেন ডিঙ্গির মেলা।
রাশি রাশি বৃক্ষসারি যেন একখণ্ড সবুজ গালিচা,
দূর মেঘনার বুকে ভেসে থাকা একটি কচুরিপানা !
মেঘনার মেয়ে তোকে বড্ড ভালবাসি।”
কবিতার রূপকথার মতো-ই অামাদের সন্দ্বীপ যেন সাজানো গোছানো পল্লী কবির কল্পনার কোন এক গ্রামের প্রতিচ্ছবি।ভ্রমণপিপাসু যে কেউ সেন্টমার্টিনের পরিবর্তে ঘুরে যেতে পারেন সন্দ্বীপ।অামি বাজি ধরে বলতে পারি অাপনার সেন্টমার্টিন ভ্রমণ থেকে অনেক বেশি অানন্দময় হবে “মায়াবিনী সন্দ্বীপ” ভ্রমণ। শীতের সময়টা বেছে নিতে পারেন ভ্রমণকে অানন্দময় করে নিতে।বিশেষ করে জানুয়ারীর সময়টা।তীব্র শীতে অানন্দের তৃষ্ণার্ততা অাপনাকে পরিপূর্ণতা দিবেই।প্রথমে ভ্রমণের পরিকল্পনা যেমন অর্থ, পোশাক পরিচ্ছেদ মানে শীতের কাপড়-চোপড় সংগ্রহ করে নিন। তারপর তীব্র শীতের সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের সীতাকুণ্ডের বড় কুমিরা বাজারে নেমে পড়ুন। জনপ্রতি ১০টাকা দিয়ে রিক্সা যোগে চলে অাসুন কুমিরাঘাটে। কুয়াশার চাদরে ঢাকা সমুদ্রের ওপাড়ে যে কোন এক মায়াবিনী অাপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে ততক্ষণে অাপনি বুঝে যাবেন।
সমুদ্রের শীতলতায় জনপ্রতি ২৫০টাকার স্পীডবোট যখন অাপনাকে নিয়ে ভোঁদৌড় দিবে অাপনি মনের অজান্তে হারিয়ে যাবেন মায়াবিনী সন্দ্বীপের প্রথম রূপের রহস্যে।সমুদ্রস্নান করতে করতে অাপনি যখন দ্বীপের কাছাকাছি পৌঁছে যাবেন ততক্ষণে অাপনার মনে হতে শুরু করবে সবুজ গালিচায় অাপনাকে বরণ করে নিচ্ছে মায়াবিনী।তারপর ঘাটে পোঁছে অাপনি পরখ করে নিন নয়নভরা সরকারী বনায়ন অার জেটীর তুলির অাচড়।স্কুল জীবনে লেখা একটি শীতের সকাল যে মায়াবিনী সন্দ্বীপের শীতের সকাল নিয়ে রচিত ধীরে ধীরে অাপনার সে রহস্য কেটে যাবে।মায়ার ঘোরে দু’ধারের রাশি রাশি বৃক্ষসারি পেরিয়ে অাপনি পৌঁছে যাবেন সন্দ্বীপ কমপ্লেক্সের কোন এক অাবাসিক হোটেলে।
অাপনি সন্দ্বীপ ভ্রমণে এসেছেন জানালে হোটেল ম্যানেজার থেকে বয় সবার অাত্মীয় বণে যাবেন অাপনি।অাপনার হোটেলে থাকাটা হয়ে যাবে অাত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে অাসার মতো।যাহোক সারারাতের ঘুমের ক্লান্তি দূর করতে বিশ্রাম করে নিন।তারপর বিকেলে বেরিয়ে পড়ুন সমুদ্রপাড়ে।জনপ্রতি ৩০টাকায় কমপ্লেক্স থেকে সাগরপাড়ে পৌঁছে সূর্যডুবা বিকেল অার সন্ধ্যাটা উপভোগ করুন জেগে উঠাচরের রহস্য উন্মোচন করতে করতে। চলবে… সন্ধ্যার নাস্তা শেষে দেশী গরুর খাঁটি দুধেরসরের চা পরখ করে নিতে পারেন হোটেলের পাশের কোন দোকানে।ভ্রমণের সময় কমাতে বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারেন।দক্ষিণ সন্দ্বীপের বীনা সাহার মিষ্টি,কাজি পাড়া তেমাথা,সারিকাইতের বাংলাবাজার ঘাট হয়ে অালোচিত ভাসানচরে দূরদৃষ্টি দিয়ে অাসতে পারেন।সময় পেলে ভাসানচরটা ভ্রমণ করে অাসতে পারেন দিন দেখে।
কুয়াশাভরা গ্রামের মেঠোপথ বেয়ে রাত অাটটার অাগে হোটেল কক্ষে এসে অাগামীদিন ভ্রমণের পরিকল্পনা করে নিন।অাপনার পরিকল্পনা সাজাতে পারেন -ভোরে ইসলাম সাহেবের খামার,তারপর সবুজচরখ্যাত দীর্ঘাপাড় গ্রাম,অাকবরহাট,সন্তোষপুর ইদ্রিস সাহেবের মাদ্রাসা,বেড়ীপাড়,কালাপানিয়া চৌধুরী দীঘি, শতবছরের চৌধুরী মসজিদ,গাছুয়ার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমপ্লেক্সের সরকারী বিভিন্ন অফিস,সরকারী এ বি কলেজ,সরকারী কার্গিল স্কুল,সাগরপাড়ের ইটভাটা,উরিরচর ইত্যাদি। 

ফজরের নামায শেষ করে অাপনি অালো-অাঁধার খেলার মাঝে ঢুকে পড়ুন ইসলাম সাহেবের খামারে।গেট ক্রস করার পর পুকুরের দু’ধারে রাস্তা বেয়ে গেছে।অাপনি যেকোন এক ধার হয়ে যাত্রা শুরু দিলে অবাক হয়ে ন্যাচারাল পার্কের মতো সৌন্দর্য উপলব্ধি করবেন।সকালের কুয়াশায় অাপনি দূরে নারকেল গাছের সারিগুলোকে কুয়াশাদেবী মনে করবেন।৮০ একর ভূমির উপর নির্মিত ৩৩টি পুকুর ভিজিট করতে গিয়ে অাপনি দেখবেন পানকৌড়ি অার সাদাবকের দল কখনও কখনও অাপনাকে উদাসী করে তুলছে। সংগী ছাড়া এমন সৌন্দর্য অাপনাকে বারবার অাবেগাপ্লুত করবেই।মেঠোপথ অার নারকেল গাছের সাড়ি পেরিয়ে অাপনি যখন অন্যপথ হয়ে ফিরবেন তখন অাপনার ক্লান্তি দূর করবে হাম্বা হাম্বা ডেকে শতটি গাভী। প্রায় ২০০কেজি দুধ, ১টন মাছ প্রতিদিন বিক্রি হয় এ খামার থেকে।সবশেষে ৪৫টি ছাগলের পাল অার মাছ প্রজননের কৃত্রিক পদ্ধতিটি দেখে অাপনি অবাক না হয়ে পারবেন না ইসলাম সাহেবের দূরদর্শী ৩০ বছর অাগের এ খামার নিয়ে।

সবুজচরখ্যাত দীর্ঘাপাড় গ্রামে গিয়ে অাপনি গ্রাম বাংলার চিত্রটি কাছ থেকে উপলব্ধি করবেন।হাঁড়িবাধা খেজুর গাছের সাড়ি থেকে খেজুর রস, মহিষের খাঁটি দই সংগ্রহ করতে পারেন এ যাত্রায়।দু’চোখে সবুজ গ্রাম নিয়ে মাও.ইদ্রিস সাহেবের সন্তোষপুরের মাদ্রাসা হয়ে বিখ্যাত অাকবরহাটের সৌন্দর্যটা দেখতে পারেন হাটবারের দিন।

তারপর কালাপানিয়া দীঘিরপাড় দাড়িয়ে শতবছরের মসজিদ অার অদূরে জাহাইজ্জারচর খ্যাত স্বর্ণদ্বীপের সৌন্দর্য অাপনাকে মোটেও ক্লান্ত হতে দেবে না।
অাপনার পুরো যাত্রাটি মাটি হবে যদি না বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উরিরচর না দেখে অাসেন।খুব কমদামে খেজুররস,দুধ,দই সংগ্রহ করতে পারবেন এ যাত্রায়।চাইলে নোয়াখালী হয়ে দেশের যেকোন জায়গায় ফিরতে পারবেন।

অামার বিশ্বাস এতক্ষণে অাপনি প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন এ মায়াবিনী দ্বীপ ভ্রমণের।সন্দ্বীপের পর্যটকরা ভ্রমণের স্বাদ পেতে বাড়ি না গিয়ে হোটেল ব্যবহার করলে সত্যি অবাক হবেন একজন টুরিস্ট হিসাবে কত সৌন্দর্যের মায়া কেড়ে নেয়ার রয়েছে এ দ্বীপে।

শুভকামনা।অাপনার ভ্রমণ অানন্দময় হোক।

ভোর ৪টা, ৪ জানুয়ারী, ২০১৮ খ্রিঃ


Advertisement

আরও পড়ুন