আজ সোমবার, ১৮ জুন ২০১৮ ইং, ০৪ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা – রাষ্ট্রপক্ষের ৭ সাক্ষীর বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করবেন খালেদা জিয়া

Published on 04 January 2018 | 3: 36 am

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে থাকা বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি হয়েছে। এ সময় বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে আটক করে পুলিশ। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বুধবার পুরান ঢাকার বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতে হাজিরা দেন খালেদা জিয়া। হাজিরা শেষে বিকাল ৩টার দিকে তার গাড়িবহর হাইকোর্টের সামনে পৌঁছলে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

এদিকে বকশীবাজারে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামানের আদালতে আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জানান, ‘জাল-জালিয়াতি’ করে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার নথিপত্র সৃষ্টির অভিযোগে তদন্তকারী কর্মকর্তা হারুন অর রশিদসহ রাষ্ট্রপক্ষের সাত সাক্ষীর বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করবেন খালেদা জিয়া।

এদিন আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ না হলে আদালত বৃহস্পতিবার (আজ) পরবর্তী যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য করেন। আজ একই আদালতে জিয়া চ্যারিটেবল মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্কের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।

বুধবার দুই মামলায় হাজিরা দিতে খালেদা জিয়া বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটে এজলাসে প্রবেশ করেন। ১১টা ৪২ মিনিটের দিকে বিচারক এজলাসে প্রবেশের পর অনুমতি নিয়ে তিনি নির্ধারিত আসন গ্রহণ করেন। এরপরই খালেদা জিয়ার পক্ষে ষষ্ঠ দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন কার্যক্রম শুরু হয়। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে খালেদা জিয়া বিকাল ৩টার দিকে আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন।

যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে খালেদা জিয়ার আইনজীবী এজে মোহাম্মদ আলী বলেন, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে এ মামলা সৃষ্টি করা হয়েছে। আর এ জাল-জালিয়াতির সঙ্গে সম্পৃক্ত রাষ্ট্রপক্ষের সাত সাক্ষী। তারা হলেন- মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ (পিডব্লিউ-১ ও পিডব্লিউ-৩১), মাজেদ আলী (পিডব্লিউ-৯), আল ফাসানী (পিডব্লিউ-১০), সৈয়দ জগলুল পাশা (পিডব্লিউ-১৪), মো. মোস্তফা কামাল মজুমদার (পিডব্লিউ-১৯), তৌহিদুর রহমান খান (পিডব্লিউ-২০) ও বারেক ভূঁইয়া (পিডব্লিউ-২১)। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যড়যন্ত্র করে তাকে সাজা দেয়ার জন্য তারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে ও মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে এ মামলা সৃষ্টি করেছে। তাদের উদ্দেশ্যে ছিল- ফান্ডটাকে সরকারি ফান্ড বানাতে হবে। তা না হলে খালেদা জিয়াকে ফাঁসানো যাবে না।

মামলার এজাহার, অনুসন্ধান ও তদন্তের তারিখ এবং সময় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইন অনুসারে মামলার তদন্তে সর্বোচ্চ ৬০ কার্যদিবস পাওয়ার কথা। কিন্তু এ মামলার তদন্ত ৩৯৫ কার্যদিবসে সম্পন্ন করা হয়েছে। ২০০৮ সালের জুলাই থেকে ২০০৯ সালের ৫ জুলাই সময়ের মধ্যে জাল-জালিয়াতি করে এসব কাগজপত্র সৃষ্টি করা হয়েছে।

সচিবালয় নির্দেশমালা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অর্গানোগ্রাম ও কার্যবিবরণী তুলে ধরে তিনি বলেন, আইনের বিধান অনুসারে যেভাবে অতিরিক্ত নথি তৈরি করার কথা, সেভাবে হয়নি। নথির গতিবিধি সংক্রান্ত বিধিমালাও অনুসরণ করা হয়নি। মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী সাবেক মুখ্য সচিব কামালউদ্দিন সিদ্দিকীর ব্যক্তিগত সচিব সৈয়দ জগলুল পাশার প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল সংক্রান্ত নথি দেখা বা হাত দেয়ার কোনো এখতিয়ারই ছিল না।

এদিকে মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থান শেষে খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, মামলাটি একটি বানোয়াট মামলা। এ মামলায় মূল নথি না পাওয়া যাওয়ায় তারা নতুন করে নথিপত্র সৃজন করেছেন। অর্থাৎ জাল-জালিয়াতি করে নথিপত্র সৃষ্টি করা হয়েছে। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে এজে মোহাম্মদ আলী আদালতকে বলেছেন, এমন মিথ্যা ও জালিয়াতির মাধ্যমে সৃষ্টি নথিপত্রের ওপর ভিত্তি করে মামলা হতে পারে না।

বরং যারা এ জালিয়াতি করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা প্রয়োজন। আইন অনুসারে কেউ যদি মিথ্যা তথ্য দেয় কিংবা মিথ্যা কোনো তথ্য আদালতে উপস্থাপন করেন, তাহলে ওই ব্যক্তির শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। এটা একটা অন্তসারশূন্য মামলা। নকল করে, জালিয়াতি করে, কাজগপত্র সৃষ্টি করে এ মামলা দাঁড় হয়েছে। আমরা নিশ্চিত, এ মামলা আইনের সামনে দাঁড়াতে পারে না এবং এ মামলায় খালেদা জিয়া খালাস পাবেন। তাকে কোনোভাবেই সাজা দেয়ার সুযোগ নেই। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যারা জাল-জালিয়াতি করে নথিপত্র সৃষ্টি করেছেন, আমরা তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আদালতে একটি দরখাস্ত জমা দেব।

এর আগে চলতি মাসের ২০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন আবদুর রেজ্জাক খান। তার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর খন্দকার মাহবুব হোসেন যুক্তিতর্ক উপস্থান শেষ করেছেন। আর এ কে মোহাম্মদ আলী তার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন অব্যাহত রেখেছেন। এরও আগে ১৯ ডিসেম্বর জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াসহ সব আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে মর্মে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে দুদক প্রসিকিউশন।

বরাবরের মতো খালেদা জিয়ার হাজিরা উপলক্ষে এদিনও আদালত চত্বরে বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। আদালতের প্রবেশমুখেই ছিল আর্চওয়ে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। এদিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আবদুল আউয়াল মিন্টু, রুহুল কবির রিজভী, আফরোজা আব্বাস প্রমুখ। এছাড়া খালেদা জিয়ার আইনজীবী হিসেবে আবদুর রেজ্জাক খান, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন, সানাউল্লাহ মিয়া, মো. মাসুদ আহমেদ তালুকদারসহ শতাধিক আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রাজধানীর রমনা থানায় প্রথম মামলা করা হয়। আর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানায় দ্বিতীয় মামলাটিও করে দুদক।

বিএনপি নেতাকর্মী-পুলিশ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া : প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হাজিরা শেষে খালেদা জিয়া গুলশানে তার বাসভবনের উদ্দেশে রওনা হলে গাড়িবহরের সঙ্গে যোগ দেন বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী। জাতীয় প্রেস ক্লাব ও সুপ্রিমকোর্ট এলাকায় গাড়িবহর পৌঁছলে আগে থেকেই সেখানে অবস্থান নেয়া নেতাকর্মীরাও বিএনপি চেয়ারপারসনের গাড়িবহরে যোগ দেন। গাড়িবহর হাইকোর্ট মাজার গেট অতিক্রম করলে পেছন থেকে বিএনপি নেতাকর্মীদের ধাওয়া করে পুলিশ।

এ সময় বিএনপি নেতাকর্মীরাও পুলিশকে লক্ষ করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। বেশ কিছু সময় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েকজন পুলিশ লাঠিপেটাও করে। এ সময় পুলিশ কয়েকজনকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে চাইলে নেতাকর্মীরা বাধা দেন। ওই সময় শিক্ষা ভবনের সামনে শিক্ষা চত্বরে উত্তেজনা দেখা দেয়ায় এ এলাকায় বেশ কিছুক্ষণ যান চলাচল বন্ধ থাকে। একপর্যায়ে প্রেস ক্লাবের সামনের নেতাকর্মীরা কদম ফোয়ারা, মৎস্য ভবন মোড় হয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের দিকে চলে যান।

পরে বিকালে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নেতৃবৃন্দ থেকে আলাদা করতে পরিকল্পিতভাবে বারবার বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর সরকারের নির্দেশে এ হামলা চালাচ্ছে পুলিশ।

পুলিশি হামলায় বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের বেশ কিছু নেতাকর্মী আহত এবং আটক হয়েছেন।’ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে কোনো নীলনকশাই সফল হবে না জানিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘জালিয়াতি করে সাজানো মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনকে হয়রানির উপযুক্ত জবাব একদিন জনগণ ঠিকই দেবে।’ তিনি নেতাকর্মীদের ওপর ‘হামলা’র নিন্দা জানিয়ে গ্রেফতারদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি জানান।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন