আজ শনিবার, ১৮ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০৩ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



জনশক্তি রফতানি খাতে ৪১ বছরের মধ্যে রেকর্ড

Published on 02 January 2018 | 4: 16 am

২০১৭ সালে জনশক্তি রফতানিতে ৪১ বছরের রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় সদ্য সমাপ্ত বছরে বিদেশে কর্মী পাঠানোর হার ৩৩ শতাংশ বেড়ে ১০ লাখ ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশে ১৬ কোটির অধিক জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ কর্মক্ষম। প্রতি বছর ২০-২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে ঢুকছে।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সুষ্ঠু অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় বিদেশের শ্রমবাজারে কর্মক্ষম জনবলের একটি বড় অংশের কর্মসংস্থান হয়েছে। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ লাখ আট হাজার ৫২৫ জন বাংলাদেশির বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থান হয়। এটি সরকারের বড় সাফল্য। এর আগে ২০০৮ সালে সর্বোচ্চ সংখ্যক কর্মী বিদেশ যায়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি দিকনির্দেশনা এবং দক্ষ শ্রম কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বিগত ৯ বছরে (জানুয়ারি ২০০৯ থেকে ডিসেম্বর ২০১৭) মোট প্রায় ৫২ লাখ কর্মী কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশ যায়। এর মধ্যে ২০১৭ সালেই বিদেশ যায় ১০ লাখের বেশি কর্মী। এর মধ্যে সৌদি আরবেই যায় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ, মালয়েশিয়া এক লাখ, ওমান ৯০ হাজার এবং কাতারে ৮২ হাজার জন। নারী কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে এক লাখ ২২ হাজার। এর মধ্যে সৌদি আরবে যায় প্রায় ৮৩ হাজার, জর্ডানে ২০ হাজার এবং ওমানে ৯ হাজার জন।

জানুয়ারি ২০০৯ থেকে ডিসেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত কর্মীদের পাঠানো রেমিটেন্সের পরিমাণ এক লাখ ১৮ হাজার ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত রেমিটেন্সের পরিমাণ ১২ হাজার ৩৫৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। জনশক্তি রফতানির এ ধারা বছরের শেষ পর্যন্ত বহাল থাকে। ২০১৭ সালে সরকারের শ্রম কূটনৈতিক সাফল্য অনেক বেশি। জি-টু-জি প্লাস প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো শুরু হয়েছে।

সৌদি সরকার ২০১৬ সালের ১০ আগষ্ট বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন খাতে কর্মী পাঠানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে ২০১৭ সালে সৌদি আরবে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ নারী ও পুরুষ কর্মী পাঠানো হয়। ২০১৭ সালের মার্চ মাসে আইএম জাপান এর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক করে টেকনিক্যাল ইন্টার্ন কর্মী পাঠাতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, জাপানের সঙ্গে মেমোরেন্ডাম অব কো-অপারেশন (এমওসি) এবং রাশিয়ার সঙ্গেও কর্মী প্রেরণ সংক্রান্ত চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায় রয়েছে। এসব চুক্তি অল্প সময়ের মধ্যে হয়ে যাবে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কম্বোডিয়া সফরের সময় সে দেশের সঙ্গে দক্ষতা সহযোগিতা সংক্রান্ত চুক্তি সই হয়েছে।

সূত্র বলছে, ২০১৭ সালে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও অন্য কর্মকর্তারা সেসব দেশে সফর করেছেন সেখানেই শ্রমবাজার সম্প্রসারণ ও কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আলোচনা করেছেন। সব আলোচনাই সফল হয়েছে। শ্রম কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকায় গত ৯ বছরে ১৮টি দেশে ১৯টি নতুন শ্রমকল্যাণ উইং খোলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালেই লেবানন ও মরিশাসে দুটি শ্রমকল্যাণ উইং চালু করা হয়েছে। বর্তমানে ২৭টি দেশের মিশনগুলো ৩০টি শ্রমকল্যাণ উইং অভিবাসন সমর্থিত কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করছে।

সূত্র মতে, ২০১৭ সালে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বড় সাফল্য হল রেকর্ড সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারা। বর্তমানে ৭০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ৪৮টি ট্রেডে দেশের তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সার্বক্ষণিক নজরে রাখা হচ্ছে যাতে সরকারের উদ্দেশ্য ব্যাহত না হয়। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মাধ্যমে সরকার কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কার্যক্রম ই-মনিটরিং ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ফলে সব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণের মান আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। ২০১৭ (জানুয়ারি-নভেম্বর) সালে বিএমইটি’র আওতায় পরিচালিত কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) ও আইএমটিগুলোতে দক্ষতা উন্নয়ন (ডিপ্লোমা-ইন-মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং, এসএসসি ভোক, দুই বছর মেয়াদি সার্টিফিকেট ইন মেরিন ট্রেড ও অন্যান্য স্বল্পমেয়াদি কোর্স), হাউজকিপিং কোর্স ও প্রি-ডিপার্চার প্রশিক্ষণ কোর্সে সর্বমোট সাত লাখ ৪২ হাজার ৫১৬ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

বছরের শুরুতে রেমিটেন্সে কিছুটা কমতি ছিল। পরে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়। মন্ত্রণালয় বলছে, প্রতিটি জেলায় জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিস এবং বিদেশে শ্রমকল্যাণ উইংয়ের মাধ্যমে বৈধ পথে রেমিটেন্স পাঠানোর বিষয়ে প্রচার চালানোর পর রেমিটেন্স প্রেরণে গতি আসে।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ১০.৭ এর আলোকে নিরাপদ, নিয়মিত ও দায়িত্বশীল অভিবাসন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে মন্ত্রণালয় কাজ করছে। ২০১৭ সালে সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াসহ ১৫টি দেশের অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করা হয় এবং সার্বক্ষণিক তদারকি করা হচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের মাধ্যমে বিদেশ গমনের ক্ষেত্রে কর্মীরা বেশি প্রতারিত হচ্ছে। সরাসরি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মীদের বিদেশ গমনের জন্য ব্যাপক প্রচার চালায় সরকার। বেশি সংখ্যক কর্মী বিদেশ যাওয়ার এটিও একটি কারণ।

হাউসকিপিং কোর্স প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনা আরও সহজ ও ফলপ্রসূ করতে ই-লার্নিং প্রশিক্ষণের আওতায় মোবাইল অ্যাপস তৈরি করা হয়েছে। কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে ই-মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে। দেশের বিমানবন্দরগুলোতে প্রবাসীকল্যাণ হেল্প ডেস্কে কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের আলাদা পোশাক দেয়া হয়েছে। ঢাকাসহ ২৯টি জেলায় বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীদের সেবা সহজীকরণের লক্ষ্যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে। ফলে ২৯টি জেলার কর্মীদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট কার্যক্রমের জন্য ঢাকায় আসতে হয় না।

নিরাপদ ও স্বচ্ছ অভিবাসন নিশ্চিত করতে জেলা জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিস ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে মহিলা গৃহকর্মী বাছাই করা হচ্ছে। নির্বাচিতদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। বিদেশে নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য জনশক্তি, কর্মসংস্থান নামে সেল গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়াও নারীকর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের যে কোনো অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হয়। এ যাবৎ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সংস্থার কাছে যতগুলো অভিযোগ এসেছে তা সবই নিষ্পন্ন হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অভিবাসী কর্মীদের বাধ্যতামূলক শতভাগ বীমা পলিসি গ্রহণ কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ব্যবস্থাপনায় প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কল্যাণার্থে ডিজিটাল হেল্প ডেস্ক সেবা চালু করা হয়েছে। বিদেশে বসবাসরত অনাবাসী বাংলাদেশিদের (ডায়াসপোরা) দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের ২০১৭ সাল থেকে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সদস্য পদ দেয়া হচ্ছে।

এর ফলে তারা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের প্রদত্ত সব সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্ত হচ্ছেন। প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংককে তফসিলি ব্যাংকে রূপান্তরের সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। যে কোনো সময় তফসিলি ব্যাংক হিসেবে এর কার্যক্রম শুরু হবে। উল্লেখ্য, সরকার কর্তৃক (অর্থ মন্ত্রণালয়) ৫ শতাংশ শেয়ার এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ৯৫ শতাংশ শেয়ার দেয়ার ভিত্তিতে ব্যাংকটি পরিচালিত হবে। উভয়ে (সরকার ও কল্যাণ বোর্ড) তাদের অংশের শেয়ার দিয়েছে।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন