রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের শুধু বোঝা নয়, বোঝা থেকে অসুখে পরিণত হবে

:: আকতারুজ্জামান মোহাম্মদ মোহসীন ::

মায়ানমার অধিবাসি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে ইতোপূর্বে বেশ ক’বার লিখেছি । আমার লেখাগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে নেতিবাচক মনে হলেও বর্তমান পর্যন্ত তা যা লিখেছি সেখানেই আছে । আজ আবার তাদের নিয়ে নতুন করে আলোকপাত করতে চেষ্টা করছি । আমাদের দেশের মত ঘন বসতি পূর্ণ দেশে রোহিঙ্গারা বাড়তি বোঝা ছাড়া আর কিছু নয় । মানবতা দেখানো হয়েছে দুর্যোগ মুহূর্তে । কিন্তু তা চিরস্থায়ী পর্যায়ে গেলে মানবতা সেখানে বোবা হয়ে যাওয়ার কথা । তবুও সারা বিশ্ব এখনও তাদের নিয়ে কথা বলছে, তাদের ফিরিয়ে নেয়া নিয়ে সোচ্চার আছেন । পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যেতে পারে এটা এক সময় নিস্তব্দ হবেই । সময়ের বিলম্বের সাথে আবেগও কমে যেতে থাকবে । একদিন হয়তো সব আবেগ হারিয়ে যাবে, কিন্তু বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা থেকে যাবে ।

বিভিন্ন অধিকার সংস্থা, বিবেকবান মানুষেরা তাদের নিয়ে বেশ চিন্তা করছেন বলে বুঝা যায় । তাদের অনেকের ধারনা রোহিঙ্গাদের বর্তমান অবস্থায় মায়ানমার, রাখাইনে পাঠানো মানে আরও দুর্যোগে ঠেলে দেয়া হিসাবে মন্তব্য করেছেন । মায়ানমার তাদের জন্য এমন পরিস্থিতিই রাখবে । বিষয়টা হয়তো ঠিক, কিন্তু গত কয়েকদিন আগে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসি’র প্রীতি ভাজনেসু অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তাদের রাখাইনে নিয়ে গেলেও রাখা হবে নিজ দেশের শরণার্থী শিবিরে । রাখাইনের রোহিঙ্গা শরণার্থীরা তাদের ফিরে যাওয়ার পরিস্থিতি বুঝতে পারছেন, কিন্তু আমরা বুঝতে পারছি না কেন ? তাদের অবস্থা চিরকাল এমন যে, “মাইর দেখে বুঝতে পারছ না – রাখব কি রাখব না” ? আমরা বুঝতে না পারলেও তাঁরা বুঝতে পারছে তাদের এমন মার দেয়া হয়েছে না রাখার জন্য । এমন পরিস্থিতি তাদের জন্য তৈরি করা হবে, যাতে তাঁরা আর কখনও মায়ানমারের রাখাইনে ফিরে যেতে না চায় ।

রোহিঙ্গাদের রাখাইনে নেয়া হলেও তাদের আবাস ভুমি ফিরে পাওয়া অনেকটা অসম্ভব ধরে নেয়া যায় । কারন জায়গাটা যদি কোন মোড়লের পরামর্শে খালি করা হয়ে থাকে, তাদের বিতারিত করার জন্য যত কঠোর আর নিষ্ঠুর হওয়া প্রয়োজন তা হতে পরামর্শ দিয়ে থাকেন, বিতারণকে সুবিধা করার জন্য যদি ধর্মীয় ইস্যুতে পরিণত করেন সেখানে রোহিঙ্গাদের অবস্থা এমনি হওয়ার কথা ছিল । তাছাড়া এখন তাদের সমস্যার ব্যপারে আর নাক না গলাতে পরামর্শ দিচ্ছেন বলে স্পষ্ট, তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়ার ব্যপারে মোড়লরা শক্ত অবস্থান নিয়েছেন । সেখানে মোড়লদের দেশে কিংবা মোড়লরা মানবতা, মানবাধিকার বিষয়ে সোচ্চার হলেও রাখাইনের মানবতার বিপর্যয়, মানবাধিকারের চরম অবণতি/ লঙ্ঘন নিয়ে তাদের কোন সারা শব্দ নেই । রাখাইনের জন্য মানবতা, মানবাধিকার যেন কোন বিষয়ই নয়, তাই নিজেদের স্বার্থে মায়ানমারকে দিয়ে, রাখাইনের বৌদ্ধদের দিয়ে এমন জঘন্য পরিণতি ঘটাতে পেরেছে ।

মোড়লদের নিজেদের জন্য রাখাইন প্রয়োজন, সুতারাং যে কোন মুল্যে রাখাইন খালী করাতে হবে, তাই করিয়েছে । রাখাইনে মানবতা কিংবা মানবাধিকারের যত অবনতি ঘটে ঘটুক, রাখাইনে মোড়লদের বানিজ্য আগে । রোহিঙ্গা তথা মুসলিম জনগোষ্ঠী নিজের আবাস হারাতে হয় হারাক, কিন্তু তাদের খালী রাখাইনের প্রয়োজন আগে । রাখাইনের মানুষ বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে থাকতে হয় থাকুক, তাদের নিরঝঞ্জাট মুক্ত রাখাইন চায়, কোন অবস্থাতে ঝামেলা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন নেই । বর্তমানে রাখাইনের অবস্থা এমনই বলা যায় । সুতারাং রাখাইনের রোহিঙ্গা পরিস্থিতি না বুঝার কিছু নেই ।

রাখাইনে যদি মোড়লদের প্রয়োজনীয় কাজ কর্ম শুরু হয়ে থাকে বা পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়ে থাকে, সেখানে রোহিঙ্গাদের জায়গা হবে কোথায় ? বরং মায়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে যে পদক্ষেপই নিয়ে থাকুক না কেন, তা হবে বিরক্তিকর, যন্ত্রণাদায়ক । ফলে রোহিঙ্গারা নিজেরাই তাদের নিজের ভুমিতে ফিরে যেতে চাইবে না । তাহলে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অবস্থান সম্পর্কে সম্ভাব্য অনুমান এটাই । ফলে বাংলাদেশে তাদের অবস্থান অনেকটা নিশ্চিত হিসাবেই ধরে নেয়া যায় । তাঁর উপর হয়তো তাঁরা ফিরিয়ে নেয়া নাটকের পাণ্ডুলিপি মোড়লদের নির্দেশনায় তৈরি করেছে, সুতারাং তাদের প্রত্যাবাসন নাটকের যবনিকাও নির্দেশনা মোতাবেক হবে । তাঁর ফলাফল কি হতে পারে সেটাও আমাদের তথা সারা বিশ্বকে অনুমান করা উচিত ।

রোহিঙ্গারা এখনও বাংলাদেশের শরণার্থী । সবাই পরম মর্যাদায় অবস্থান করছে । তাদের কারণে শরণার্থী এলাকায় পরিবেশের কি বিপর্যয় ঘটেছে তা বিভিন্ন ভাবে তুলে ধরে হয়েছে । যার ফল ভোগ করতে হবে বাংলাদেশকে । তাঁর উপর তাদের পুনর্বাসন সম্পর্কে পূর্বেই কিছু মতামত পূর্বেই তুলে ধরা হয়েছিল । তা আবারও তুলে ধরছিঃ
১। বিশ্বের যে সমস্থ দেশে জনসংখ্যার আধিক্য নেই, পর্যাপ্ত ভুমি রয়েছে সে সমস্ত দেশে কিছু কিছু রোহিঙ্গাদের জায়গা দিয়ে অভিবাসী/ উদবাস্তু হিসেবে গ্রহণ করে নিতে পারে । এমনিতেই ঐ সমস্থ দেশে বিভিন্ন পথ/ মাধ্যমে জনশক্তি পাচার করছে/ হচ্ছে । সুদুর কালে হলেও নিজেদের ভূখণ্ড উদ্ধার হলে বা করতে পারলে প্রত্যাবর্তন করতে পারবে ।
২। বিশ্বের যে সমস্ত দেশে বাহির থেকে অভিবাসী এনে নিজের দেশের শ্রমিক/ শ্রম বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, সে সমস্ত দেশে শ্রমিক হিসেবে কিছু কিছু রোহিঙ্গাদের অভিবাসী/ উদবাস্তু হিসেবে গ্রহণ করে নিতে পারে । তাতে তাদের দেশের উদারতা যেমন প্রকাশ পাবে, তেমনি কিছু মানুষের মানবতা রক্ষা করা হবে । সুদুর কালে হলেও নিজেদের ভূখণ্ড উদ্ধার হলে বা করতে পারলে প্রত্যাবর্তন করতে পারবে ।
৩। যে সমস্ত দেশ দীর্ঘ মেয়াদে রোহিঙ্গাদের সাহায্য করার মত মতামত দিয়েছে, সে সমস্ত দেশে দয়া পরবশ হয়ে কিছু কিছু রোহিঙ্গাদের অভিবাসী/ উদবাস্তু হিসেবে গ্রহণ করে নিতে পারে । ঐ সমস্ত দেশের এমন কয়েক লক্ষ মানুষের অভিবাসনের ব্যবস্থা করার ক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয়তা রয়েছে । সুদুর কালে হলেও নিজেদের ভূখণ্ড উদ্ধার হলে বা করতে পারলে প্রত্যাবর্তন করতে পারবে ।
৪। ইউরোপ আমেরিকার মত দেশগুলোতে এ ক’জন রোহিঙ্গাদের অভিবাসী/ উদবাস্তু হিসেবে গ্রহণ করা কোন ব্যাপারই নয় । কারন তাদের বিশাল ভূখণ্ড স্বল্প জনসংখ্যার কারনে প্রতি বছর বিশ্বের অনেক দেশ থেকে শ্রমিক/ অভিবাসী আমদানী করে থাকে । সুদুর কালে হলেও নিজেদের ভূখণ্ড উদ্ধার হলে বা করতে পারলে প্রত্যাবর্তন করতে পারবে ।
৫। এ ব্যাপারে জাতিসংঘ কিংবা ইউএনএইচসিআর প্রয়োজনীয় সমন্বয় করতে পারে । তাতে জাতিসংঘের যদি এদের বিমান ভাড়া দিয়ে বিভিন্ন দেশে প্রেরন করতে কিছু অর্থও লাগে, তাতেও জাতিসংঘ কিংবা ইউএনএইচসিআর একটি স্থায়ী সমস্যার সমাধান করতে পারে । সুদুর কালে হলেও নিজেদের ভূখণ্ড উদ্ধার হলে বা করতে পারলে প্রত্যাবর্তন করতে পারবে ।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পুনর্বাসন দায়িত্ব যদি উপরের মত কেউ না নিয়েই থাকে, তবে তাদের নিয়ে বাংলাদেশকে চিরকালই ভাবতে হবে । যদি তেমন কিছু হয়, তবে মনে রাখতে হবে শরণার্থীরা চিরকাল এক রকম থাকবে না । সময়ের সাথে তাঁরা এবং তাদের মণ মানসিকতাও বদলাতে থাকবে । কোন এক সময় তাঁরা অবস্থানকৃত স্থানকে নিজেদের স্থান মনে করা অবাস্তব কিছু নয় । তাই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পুনর্বাসন করার ব্যপারে বাংলাদেশ যে সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে তাঁর ব্যপারে কিছু আপত্তি উত্থাপণ করছিঃ
(১) এতগুলো রোহিঙ্গা এক জায়গায় রাখা হলে তাদের মাঝে ইউনিটি গড়ে উঠতে পারে । এমন পরিস্থিতিতে তাঁরা কোন এক সময় নিজেদের শক্তি প্রয়োগ করার চেষ্টা করতে পারে । তাই ব্যবস্থাপনার কিছু অসুবিধ হলেও তাদের আলাদা আলাদা স্থানে রাখা প্রয়োজন ।
(২) এতগুলো রোহিঙ্গা এক জায়গায় থাকলে সেখানে আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয় । তাই ব্যবস্থাপনার কিছু অসুবিধ হলেও তাদের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে রাখা প্রয়োজন ।
(৩) এতগুলো রোহিঙ্গা এক জায়গায় রাখা হলে সেখানে স্থানীয় জনগণই সংখ্যালঘুতে পরিণত হতে পারে, যা দেশের মানুষের জন্য নতুন কোন সমস্যা তৈরি করতে পারে । তাই ব্যবস্থাপনার কিছু অসুবিধ হলেও তাদের বাংলাদেশের ৬৪ টি জেলায় ভাগ করে দিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত করে রাখা যেতে পারে ।
(৪) প্রশাসন ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী দ্বারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে দেখা শোনা করা এবং তাদের রক্ষনা বেক্ষন করা যেমন সুবিধা হবে তেমনি পরিবেশের চাপও বিভক্ত হয়ে যাবে ।

যুক্তিগুলো কতটা যৌক্তিক জানি না । তবে যৌক্তিক হলে বর্তমানে যদিও বিষয়টি উল্লেখিত ভাবে সমাধান করা সহজ নয়, তথাপি বিষয়টি প্রশাসনের মনে থাকা খুবই প্রয়োজন বলে মনে করছি । পরিকল্পনায় ভুল হলে বাংলাদেশকে এর হয়তো বড় মাশুল গুনতে হতে পারে । নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যপারে যদি আন্তর্জাতিক সম্র্কদায়কে বুঝাতেও হয় তবে বুঝিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে । নয়তো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী একদিন বাংলাদেশে শুধু বোঝা নয় বোঝা থেকে অসুখে পরিণত হতে পারে । সে অসুখ সারতে হয়তো আবার বিশ্বকে জানান দিতে হতে পারে । তখন পরিস্থিতি হয়তো অন্য রুপে রুপ ধারন করতে পারে । রোহিঙ্গাদের নিয়ে সারা বিশ্ব বাংলাদেশকে বাহবা দিলেও তাদের সমস্যা এখনও সমাধান হয়নি, আদৌ সমস্যার সমাধান হবে কিনা তারও সম্ভাবনা খুব কম । সুতারাং সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ খুব জরুরী ।

লেখক – সাহিত্যিক এবং সমসাময়িক বিষয় লেখক

শাহাদাৎ আশরাফ শাহাদাৎ আশরাফ

Leave a Reply

Top
%d bloggers like this:
Web Design BangladeshBangladesh Online Market