আজ মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৮ ইং, ০২ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



সিংগাপুরে কয়েকদিন

Published on 30 December 2017 | 9: 29 am

কাজী মিনহাজ উদ্দিন রুদবী

রিপাবলিক অব সিঙ্গাপুর মূলত ৬৩ টি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত একটি দ্বীপরাষ্ট্র এবং পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম নগররাষ্ট্র। মালে উপদ্বীপের প্রান্তে অবস্থিত সিঙ্গাপুরের অবস্থান বিষুব রেখার ১৩৭ কিলোমিটার উত্তরে। এটি উত্তরে স্টেটস অব জোহর দ্বার মালয়েশিয়া থেকে এবং দক্ষিণে রিয়াউ আইল্যান্ড দ্বারা ইন্দোনেশিয়া থেকে পৃথক হয়ে আছে। সিঙ্গাপুরের অধিকাংশ অঞ্চল নাগরিক ছোঁয়া পেলেও এত রয়েছে বিপুল সবুজের সমারোহ। বিভিন্ন স্থানে ভূমি উদ্ধার করে সিঙ্গাপুরের প্রচুর এলাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় প্রাচীনকালে সিঙ্গাপুরের মানুষ মূলত মৎস আহরন করে জীবিকা নির্বাহ করত এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজা কর্তৃক তারা শাসিত হতো। ১৮১৯ খৃষ্টাব্দে জোহের সালতানাতের আমলে স্যার স্ট্যামফোর্ড র‌্যাফেলস বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর প্রতিনিধি হিসেবে সিঙ্গাপুরে ব্যবসা করার অনুমতি পান। ১৮২৪ থেকে ১৮২৬ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুর আভ্যন্তরীন স্বায়ত্বশাসনের অধিকার পায়। ১৯৬৩ সালে সিঙ্গাপুর মালযেশিয়ার একটি প্রদেশ হিসেবে স্বাধীনতা লাভ করে এবং দু’বৎসর পর আলোচনা সাপেক্ষে মালয়েশিয়া থেকে পৃথক হয়ে সম্পুর্ণ স্বাধীন রাাষ্ট্র হিসেবে আত্বপ্রকাশ করে।
এর পর সিঙ্গাপুরকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ক্রমান্বয়ে ঘটে উন্নয়নের এক মহাবিপ্লব। এশিয়ার চার ব্যঘ্রের এক বাঘ্র এখন এই ছোট্ট সিঙ্গাপুর। সিঙ্গাপুর বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থস্থানীয় অর্থনৈতিক কেন্দ্র, বিশে^র দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্যাসিনো গ্যাম্বলিং মার্কেট এবং বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেলশোধনাগার কেন্দ্র। বিশ্বের অন্যতম ৫টি পোর্টের মধ্যে সিঙ্গাপুর একটি অন্যতম কর্মব্যস্ত পোর্ট।ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মতানুযায়ী বিশে^ ব্যবসা করার সব চেয়ে নিরাপদ স্থান সিঙ্গাপুর।
সিঙ্গাপুর মন্ত্রীপরিষদ শাসিত রাষ্ট্র হলেও প্রথম থেকে এ পর্যন্ত সিঙ্গাপুরের ক্ষমতায় রয়েছে পিপলস একশন পার্টি। দূরদর্শিতা এবং সুশৃংখল প্রশাসন-ব্যবস্থাপনার জন্য পি.এ.পি দীর্ঘ দিন সিঙ্গাপুরের ক্ষমতায় রয়েছে। সিঙ্গাপুরের মোট জনসংখ্যা মাত্র ৫০ লক্ষ। এর মধ্যে ২৮ থেকে ২৯ লক্ষ স্থানীয়। বাকি ২১ লক্ষ চাইনিজ, ভারতীয়, ইংরেজ, মালয়ি এবং তামিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে সিঙ্গাপুরের মানুষ ইংলিশকে সিংলিশ বলে। অর্থাৎ ইংরেজীকে তারা বলার সময় একটু পরির্বতন করে বলে। যেমন ’ইয়েস’ কে ইংরেজীতে উচ্চরনের সময় ”ইয়া” বলে। সিঙ্গাপুরীরা এটার সাথে ”লা” যোগ করে বলে ”ইয়ালা’।
এবার আসা যাক মূল পর্বে। একটি রিয়েল এস্টেট মেলায় অংশ গ্রহণ করার জন্য তাকওয়া প্রপার্টিজের পক্ষ থেকে গত ২৯শে ডিসেম্বর রাত ১০:১৫ মিনিটে আমি এবং বন্ধু নাজিম উদ্দিন টাকা এয়ারপোর্ট থেকে সিঙ্গাপুর এয়ার লাইন্সে উঠে বসলাম। তুলনামূলকববাবে সিঙ্গাপুর এয়ার লাইন্সের বিমানটিকে খুবই অত্যাধুনিক মনে হলো।পুরো বিমান যাত্রাটাতে একটা উৎসব উৎসব ভাব অনুভূত হলো। লোকজন বিমান বালাদের নিকট থেকে কখনো জুস কখনো সফট ড্রিংকস কখনোবা হার্ড ড্রিংকস চেয়ে নিচ্ছে। শত ব্যাস্ততার মাঝেও প্রিয়দর্শিনী বিমানবালাদের মুখে হাসির ছটা। এদের চেহারার ধাঁচ চাইনিজদের মত, অনেকটা আমাদের দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী চাকমাদের মতো।
প্রতিটি হাই কমর্ফোটেবল সিটের পিছনে ফø্যাট টিভিতে সবাই বিভিন্ন ধাঁচের মুভি দেখছে। বিমানের বিভিন্ন ইনফরমেশন ভেসে আসছে স্ক্রীনে। চৌত্রিশ হাজার ফুট উপর দিয়ে আমরা ছুটে চলছি। বাহিরের তাপমাত্রা মাইনাস তেতাল্লিশ ডিগ্রী সেলসিয়াস।
এক সময় রাতের খাবার দেয়া হলো। মেনু ছিল আ্যপেটাইজার ও মেইন কোর্স হিসেবে ভিনেগ্রেট দেওয় গ্রিন বিন, পটেটো, টমেটোর সালাদ, মশলাদার ভেড়ার মাংস, সবজির সাথে বাঁশমতি চালের ভাত, রোল ও বাটার। ডেজার্ট হিসেবে আপেল ও কমলা। শেষে কফি ও ড্রিংকস।
বাংলাদেশ সময় রাত দুইটা এবং সিঙ্গাপুর সময রাত চারটায় সিঙ্গাপুরের চেংগী বিমানবন্দরে বিমান ল্যান্ড করল। ইমেগ্রেশন সেরে দুই বন্ধু বিমানবন্দরের এক পাশের টেক্সি স্ট্যান্ডে গেলাম। টেক্সি ড্রাইভারকে বললাম ১৬৬ কিচেনারি রোডের হোটেল গ্রান্ডসিতে যাব, ভাড়া কত, ড্রাইভার একটু অবাক হয়ে বলল মিটারে যা আসে তা দিবে, তবে রাত বারটার পর থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত দশ পার্সেন্ট বেশী। একটু লজ্জা পেয়ে টেক্সির পিছনে লাগেজ দিয়ে সিটে উঠে বসলাম। ১২০ মাইল গতিতে ক্যাব চলতে শুরু করল। স্টার্টের সাথে সাথে সিঙ্গাপুরের গান শুরু হয়ে গেল। গভীর রাতের বিশাল খালি রাস্তায় গাড়ী ঘোড়া তেমন কিছু নেই। গানের তালে তালে আমাদের লিমোজিন ছুটে চলল।রাস্তায় লাল বাতি জ¦লে ওঠার সাথে সাথে গাড়ী থেমে পড়ল এবং সাবুজ আলো জ¦লার সাথে সাথে আবার ছুটে চলল। ড্রাইভারের আইন মেনে চলা দেখে মুগ্ধ হলাম।অবশ্য পরে জেনেছি আইন না মেনেও উপায় নেই, সবখানেই সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে সব ভিডিও হয়ে যাচ্ছে। মসজিদের ভিতরেও সিসি ক্যামেরা চোখে পড়েছে। রাতের সিঙ্গাপুর অপূর্ব সাজে সজ্জিত। একটি গানে শুনেছিলাম ” আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় অই”। মনে হচ্ছে বিশাল স্কাইস্ক্র্যাপার গুলো যেন আকাশে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে।
অল্প সময়ে আমরা গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। হোটেল গ্রান্ডসির রিসেপশনে একটি মেয়ে বসে আছে সম্ভবত চাইনিজ বংশোদ্ভূত। কারণ তার ইংরেজি অত্যন্ত অস্পষ্ট ও কাঁচা। আমাদেরকে মেলার আয়োজকরা জানিয়েছিলেন আগেই রুম বরাদ্দ করে রাখা হয়েছে। মেয়েটির সাথে কথা বলে বুঝলাম আয়োজক কমিটি কথা রাখেনি। আয়োজক মেহেদিকে ফোন দিলাম। অল্পক্ষণেই সে হাজির হলো। সাথে বেল মাথা এক বাঙালি। তারা বলল মানি সেভ করার জন্য তারা আগে থেকে হোটেল বুক করেনি তবে ইনফর্ম করে রেখেছে। কারণ এ হোটেলে ভাড়া ঘন্টা অনুযায়ী হয়।
অবশেষে হোটেল স্যুটে গিয়ে উঠলাম। ক্লান্তি দুর করার জন্য একটা হট শাওয়ার নিলাম। সিঙ্গাপুরে নামাজের কেবলা উত্তর-পশ্চিম দিকে। কম্পাস লাগানো জায়নামাজে কোন রকমে এশার কছর পড়ে শুয়ে পড়লাম। উঠতে উঠতে বেলা অনেক হল। ফ্রেশ হয়ে নামাজ সেরে নাস্তার সন্ধানে বের হলাম। হোটেলের সম্মুখে ঝকঝকে তকতকে বিশাল রাস্তা। অপজিটে বৃহদাকার সুরম্য সিটি শপিংমল। সেখানে ¯েœকস জাতীয় কিছু পাব এ আশায় রাস্তা পার হলাম। একটা দোকানে ঢুকতেই ক্যাশে বসা মহিলা পরিষ্কার ইংলিশে বলল এখানে হালাল ফুড নেই। মহিলা আমার চেহারা ও মাথায় টুপি দেখে বুঝতে পেরেছিল আমি মুসলমান এবং নিউ কামার। আল্লাহকে ধন্যবাদ জানিয়ে হালাল নাস্তার সন্ধানে বের হলাম। দু’এক জনকে জিজ্ঞেস করে ভারতীয় একটা হোটেলে নাস্তা সারলাম। মেয়নিজ মাখানো রুটি এক গ্লাস গরম চা এবং এক লিটার পানির বোতলের মূল্য সাড়ে আট ডলার, বাংলাদেশী টাকায় পাঁচশত চুয়াল্লিশ টাকা। আমাদের হোটেল গ্রান্ড-সি’র পাশে সুবিশাল পার্ক রয়েল হোটেল। মেলা হবে এ হোটেলের হল রুমে। এলাকাতে বেশ কিছু বাংগালী ও বিভিন্ন দেশের মুসলমান রয়েছে। রয়েছে এক ধনী মোহাম্মাদ মোস্তাফার বিশাল সুপার শপিংমল মোস্তাফা সেন্টার। পাশে রয়েছে আঙ্গুলিয়া মসজিদ।
আমরা মোস্তাফা সেন্টারে ঢুকে এর বিশাল সম্ভার দেখে অবাক হলাম। মাটির নিচে তিন এবং উপরে তিন মোট ৬টি বৃহদায়তন ফ্লোরে কিনতে পাওয়া যায় না এমন কিছু নেই। পান-সুপারি, মাছ-মাংস, টয়লেট্রিজ, প্রসাধনী, জুতা, থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক্স,খেলনা সবই রয়েছে এই মোস্তফা সেন্টারে। ৩০ তারিখ পুরা দিনই আমরা দু’জন মোস্তফা সেন্টার এবং এর আশ পাশ ঘুরে আঙ্গুলিয়া জামে মসজিদে নামাজ পড়ে কাটিয়ে দিলাম। রাস্তা-ঘাটগুলো এত সুন্দর আর পরিছন্ন যে হাঁটতে বেশ ভাল লাগে। ইতোমধ্যে আমরা বাঙালি হোটেলের সন্ধান পেয়ে গেছি। রাতে বাঙালি হোটেলে কোরাল মাছ, ডাল, সবজি, ভর্তা, ডিম ইত্যাাদি দিয়ে ভরপেট খেয়ে হোটেলে ফিরলাম। রুমের বিশাল ওয়াল এলসিডি টিভিতে রিমোট টিপে টিপে আটটি চ্যানেলের সন্ধান পেলাম। একটা ভারতীয় আর একটা অস্ট্রেলিয় ছাড়া বাকি সবগুলো সিঙ্গাপুরের নিজস্ব চ্যানেল।
বলা হয়নি আমরা ইতোমধ্যে সিংগাপুরের দু’টি সিম মোবাইলে লাগিয়ে নিয়েছি। দু’জনেই বাড়িতে স্ত্রী-স্বজনদের সাথে কথা বললাম। কথা বললাম ব্যাবসায়িক বন্ধু তাকওয়ার চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান ফরহাদের সাথে। এশার নামাজ সেরে আসলাম আঙ্গুলিয়া জামে মসজিদ থেকে। এই মসজিদটি আঙ্গুলিয়া নামক জনৈক ভারতীয় মুসলমান নির্মাণ করেছিলেন। তথ্যটি মসজিদের কর্নারের ফটকে লিখা আছে। মোস্তাফা সেন্টারের মোহাম্মাদ মোস্তফা যিনি বর্তমানে সিঙ্গাপুরের একজন বিশাল ধনী, তার আদিনিবাস ছিল ভারতে, তিনি ও তার পিতা এই এলাকায় এক সময় একটি মুদি দোকান পরিচালনা করতেন বলে জানা যায়। সততা ও নিষ্ঠা আজ মোস্তাফাকে এ বিশাল প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার করেছে। পার্ক রয়েল হোটেলে শুরু হলো ”প্রান্তিক রিয়েল এস্টেট এন্ড রেমিটেন্স ফেয়ার”। আমাদের তাকওয়া প্রপার্টিজ ছাড়াও আরো ১৬টি কোম্পানী মেলায় অংশগ্রহন করেছে। বাংগালী দর্শনার্থীদের সাথে রিয়েল এস্টেট বিষয়ে আলাপ আলোচনায় সারাদিন পার্ক রয়েল হোটেলে কেটে গেল। রাত সাড়ে আটটায় ¯্রস্টার ডাকে সাড়া দিতে মসজিদে গেলাম অতঃপর বাংগালি হোটেলে গিয়ে মাছ, ডাল, সবজি দিয়ে নিশিভোজ সম্পন্ন করলাম।
রাত প্রায় ৯:৩০ মিনিটের দিকে আঙ্গুলিয়া মসজিদের সামনে একজন বঙালি আলাপ প্রসঙ্গে বললেন সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে তে আজ রাত ১২টা এক মিনিটে নাতুন বর্ষবরণের এক জমকালো অনুষ্ঠান হবে। ”থার্টিফাস্ট নাইটে’র এই অনুষ্ঠানে আকাশে ফায়ার ফাইটিং এর মাধ্যমে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে যে অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা করা হয় তা দেখার জন্য এখানে ইউরোপ অস্ট্রেলিয়া থেকেও প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটে। বন্ধু নাজিম ভাই প্রস্তাব করলেন-এই সময়ে যখন সিঙ্গাপুরে আছি এই সুযোগ মিস করা ঠিক হবে না। নাজিম ভাই এর প্রস্তাবে সম্মত না হয়ে পারলাম না। একটি টেক্সি নিয়ে সোজা ফায়ার ফাইটিং স্পট মেরিনা-বে তে চলে গেলাম। লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশের কারণে গাড়ী ভিতরে যেতে পারছেনা।
গাড়ী বিদায় করে জন¯্রােতের সাথে হাঁটা শুরু করলাম। আলো ঝলমর রাতের সিঙ্গাপুরে এ যেন এক অনন্তÍ হন্টন। এক সময় মেরিনা বের সেই কেন্দ্রে পৌঁছে গেলাম যেখান থেকে কালারফুল ফায়ার ফাইটিং সরাসরি উপভোগ করা যায়। লক্ষ লক্ষ ক্যামেরা হাতে মানুষের রুদ্ধশ^াস অপেক্ষা। ১২:০১ মিনিটে শুরু হলো সেই আর্শ্চয সুন্দর ফায়ার ফাইটিং। নিমিষে আকাশে সৃষ্টি হলো লাল নাীল হলুদ বিশাল বিশাল কদম ফুল। ভয়াবহ শব্দে কানে তালা লাগল। লক্ষ কন্ঠে ধ্বনিত হলো ঐধঢ়ঢ়ু ঘবি ণবধৎ, সে এক অকল্পনীয় আলো আর শব্দে গাঁথা অর্পূব দৃশ্য।
ঠা ঠা শব্দ ,কম্পন ,আকাশে রঙ্গীন আলোর ঝলকানীর সাথে লক্ষ মানুয়ের নতুন বর্ষ বরণের এ দৃশ্য সরাসরি না দেখলে উপলব্ধি করা যাবে না সিঙ্গাপুরিয়ানরা এ কিসের আয়োজন করেছে যা দেখতে উইরোপিয়ানরাও হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। এখানে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল, ফারলিন নামে একটি কলেজ পড়ুয়া মেয়ে ভীড়ের মধ্যে তার সাথের বন্ধুকে হারিয়ে ফেলেছে এবং তার মোবাইলে র্চাজ না থাকায় তাকে ফোন করতেও পারছিলনা, সে কাঁদতে কাঁদতে আমাকে বলল তাকে মোবাইল করতে দিয়ে একটু হেল্প করার জন্য, আমি তাকে মোবাইল এগিযে দিয়ে বললাম তুমি ফোন করে তোমার ফ্রেন্ডের সাথে কথা বল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সে তার বন্ধুকে খুঁজে পেল এবং হাসিমুখে আমাদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেল । আমাদের অবাক লাগল সেখানে প্রচুর সিঙ্গাপুরি ও উইরোপিয়ান থাকা সত্বেও আমাদের মত শশ্রুধারী দু’জন বাঙালীকে ফারলিন কেন সাহায্য চাওয়ার জন্য বেছে নিল?
রাত ১টার দিকে শুরু হলো ঘরে ফেরার পালা। কাছ থেকে গাড়ী পাওয়ার কোন ব্যবস্থা সে রাতে সেখানে ছিল না।লক্ষ জনতার ¯্রােতের সাথে ২/৩ মাইল হেঁটে অবশেষে টেক্সি স্ট্যান্ডে এস দাঁড়ালাম। বিশাল লম্বা লাইন। সিঙ্গাপুরের মানুষ আইনের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। কিছুক্ষন পর পর একটি বা দু’টি টেক্সি আসছে এবং একজন দুইজন করে টেক্সিতে উঠে চলে যাচ্ছে। কেউ লাইন ভঙ্গ করার চেষ্টা করছে না বা আগে যাওযার জন্য হুড়াহুড়িও করছেনা। বিভিন্ন ধর্মের , বিভিন্ন ভাষার, বিচিত্র বেশভুষার মানুষের বিশাল এক লাইন। লাইনের মধ্যেই তরুণ তরুণীরা এক অপরকে ঐধঢ়ঢ়ু ঘবি ণবধৎ বলে আবলিলায় চুমু খাচ্ছে। আবেগে জড়িয়ে আছে একে অপরের শরীর। দু’জনকে দেখলাম মদ খেয়ে রাস্তার পাশে শুয়ে পড়েছে কেউ কারো দিকে ভ্রুক্ষেপ করছে না। র্দীঘক্ষণ হাঁটার কারণে কøান্তি আর অবসাদে শরীর বিশ্রাম চাচ্ছে। ঘুমে চোখ বুজে আসছে। কিন্তু নিয়ম লংঘন করে আগে বাড়ার কোন নিয়ম এখানে নেই।
হঠাৎ রাস্তায় চোখে পড়ল এক অভিনব ত্রি-চক্রযান, অনেকটা আমাদের দেশের রিক্সার মত। বলতে গেলে রিক্সাই তবে ড্রাইভারের সিট যাত্রীদের সামনে না থেকে এক সাইডে। ড্রাইভারের সিটের নীচে স্টেরিও বসানো। সেখান থেকে গানের সুর ভেসে আসছে। দু’জনকে দেখলাম লাইন থেকে বেরিয়ে ত্রি-চক্রযানে উঠে চলে গেল। চার দিকে আলোর ঝলকানি আর বর্ষবরণরত তরুণ-তরুনীদের উচ্ছাসে রাতটিকে রাত মনে হচ্ছেনা এ যেন এক উৎসবমুখর প্রহর যেখানে আনন্দের সাথে মিশে রাতদিন একাকার হয়ে গেছে। একটু পর আর একটি রিক্সা এল, আমি লাইন থেকে বেরিয়ে দৌড়ে ড্রাইভারের সামনে গিয়ে বললাম ব্রাদার আমরা খুব ক্লান্ত তুমি কি আমাদেরকে কিচেনারী রোডের গ্রান্ড-সি হোটেলে পৌঁছে দিতে পারবে, কত নিবে? বেশ হাসিখুশি ড্রাইভার, ফুরফুরে মেজাজে আছে। সে বলল কেন নয়। উঠে পড়, তবে ১০০ ডলার দিবে। আমি তার ভাড়া শুনে একটু মুষড়ে পড়লাম। এদিকে কøান্তিতে শরীরের জোড়াগুলো যেন বিদ্রোহ শুরু করেছে। আমি তাকে বললাম ভাই, আমরা বাংলাদেশ থেকে তোমাদের দেশ দেখতে এসিছি। আমরা নিউ কামার। ৫০ ডলার দেব আমাদেরকে হোটেলে পৌঁছে দাও। এক পর্যায়ে ড্রাইভার রাজী হলো। আমি আর নাজিম ভাই অত্যাধুনিক শহরের রাস্তায় অভিনব এক রিকশায় চড়ে গান শুনতে শুনতে হোটেলের দিকে এগুতে লাগলাম।
রিকশা ভাড়া বাংলাদেশী টাকায় ৩২০০ টাকা, দূরত্ব ৫/৬ কিলোমিটার, ৩২০০ টাকা রিকশা ভাড়া দেয়ার এ স্মৃতি ইতিহাস হয়ে থাকবে। ড্রাইভারের নাম উইলিয়াম দুই সন্তান ও স্ত্রীসহ সে সরকার প্রদত্ত ডরমেটরিতে থাকে। উইলিয়াম হাই ভলিউমে গান ছেড়ে দিয়েছে। সিঙ্গাপুরের লোক যে কোন জার্নিতে গান শুনতে পছন্দ করে রিক্সায় উঠে আবার বুঝতে পারলাম। আমাদেরকে অবাক করে দিযে উইলিয়াম মার্লবোরো সিগারেট ধরালো। গভীর রাতে অচেনা দেশের অচেনা রাস্তায় ত্রি-চক্রযানে বসে আমরাও এক সময় উইলিয়ামের বাড়িয়ে দেওয়া মার্লবোরোতে মৃদু টান দিয়ে নববর্ষকে উইশ করলাম। এক সময় উইলিয়াম আমাদেরকে হোটেল গ্রান্ড-সি’র সামনে নিয়ে এল। মজার ব্যাপার হচ্ছে সে রিকশা থেকে নেমেই বলল খুব কষ্ট হয়েছে ১০০ ডলার দিয়ে দাও। আমরা তাকে বুঝালাম যে এর বেশি দিলে আমাদের অসুবিধা হবে। কারণ আমরা লিমিটেড ডলার নিয়ে এসেছি, টেক্সিতে এলে আমাদের সর্বোচ্চ ১৫ ডলার লাগত। উইলিয়াম হাসিমুখে বিদায় নিল। হোটেলে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকাল ৯টায় নতুন বৎসর ২০১২ এর ১ জানুয়ারী আমার ঘুম ভাঙল অচেনা দ্বীপের সিঙ্গাপুরে। হোটেলের নীচে একটা দোকান আছে। সেখানে নাস্তা আর চা খেলাম। তাড়াতাড়ি সিঁড়ি আর লিফট বেয়ে পার্ক রয়েল হোটেলের ফেয়ার স্টলে পৌঁছালাম। আজ রবিবার সিঙ্গাপুরে সাপ্তাহিক ছুটির দিন। মেলায় প্রচুর লোক সমাগম হলো। তবে সিঙ্গাপুরে এককভাবে ফ্ল্যাট কেনার লোকের সংখ্যা কম। কয়েকজন যৌথভাবে বিনিয়োগের জন্য ফø্যাট বা স্টুডিও ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী । মেলায় সিঙ্গাপুর বাংগালী সমাজের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠিত ব্যাক্তি এলেন। সিঙ্গাপুরে বাঙালি মেয়েরাও দেখলাম সেদেশের কালচারের সাথে একেবারে মিশে গেছে। হাই হিল জুতো, জিন্স ও শার্ট বা টপস পরে অবলীলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।
মসজিদে মেয়েরা পুরুষদের সাথে জামাতে শরীক হচ্ছে তবে তারা নামাজ আদায় করে উপরের তলায়। জিন্স প্যান্ট আর জামার সাথে মাথায় স্কার্ফ পরে দু একজন বোরকা পরিধান করে মসজিদের নীচের তলা দেয়ে উপরে উঠছে যা আমাদের দেশে দৃষ্টিকটু হলেও সেখানে স্বাভাবিক। মসজিদে মহিলাদের এ অবাধ গমনে কারো কোনো মাথা ব্যাথা নেই। মধ্যপ্রাচ্যে দেখেছি নামাজের শেষে মোনাজাত করা হয় না। সিঙ্গাপুরে নামাজের শেষে আমাদের দেশের মতো লম্বা মোনাজাত হয়। মসজিদে দাওয়াতে তাবলীগের কাজ চালু আচে। সম্মিলিতভাবে কয়েকজনকে বসে তাবলীগের তালীম করতে দেখলাম । সারা পৃথিবীতে আল্লাহপাক দাওয়াতের কাজ চালু করে দিয়েছেন। তৈরী হচ্ছে আমাদের নেতা মাহদীর সংশপ্তক অনুসারীবৃন্দ। সেদিন আর বেশী দূরে নেই যেদিন প্রিয়নবী (সঃ) এর পবিত্র হাদীস অনুযায়ী ঈসা (আ:) এবং ইমাম মাহদীর প্রচেস্টায় পৃথিবীর সকল কাঁচা ও পাকা ঘরে ইসলাম প্রবেশ করবে ইনশাআল্লাহ।
মেলার শেষ দিকে সিঙ্গাপুরে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত কামরুল হাসান সাহেব এলেন। তিনি ঘুরে ঘুরে সকল স্টলে গেলেন এবং সবার সাথে মেলার বুকিং ,বিক্রয় ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করলেন। সব শেষে শুরু হলো র‌্যাফেল ড্র। মেলার উদ্বোধনী দিনে অনুষ্ঠিত বাচ্চাদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিশু এবং র‌্যাফেল ড্র বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করলেন বাংলাদেশের শ্রদ্ধেয় রাষ্ট্রদূত। রাত ১০টায় মেলার সমাপিÍ ঘটল। নাজিম ভাই আর আমি হোটেল পার্ক রয়েলের স্টল থেকে বেরিয়ে মসজিদে আঙ্গুলিয়াতে গিয়ে এশা পড়লাম। এর পর বাংগালী রেস্তোঁরায় রাতের খাবার শেষ করলাম। হোটেলে যখন পৌঁছালাম রাত তখন ১২টা। কøান্তি অবসানের নিমিত্তে একটা হট শাওয়ার নিয়ে শুয়ে পড়লাম।
জানুয়ারীর দুই তারিখ ঘুম থেকে উঠলাম সকাল ৯টায়। নামজ পড়ে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম। চীনা হোটেল বসে নাস্তা সারলাম। পানি, সসেজ মাখানো রুটি আর এক কাপ চা সর্বমোট ১২ ডলার, বাংলাদেশী ৭৬৮ টাকা। নাস্তা সেরে হাঁটতে হাঁটতে সিটি শপিংমল সংলগ্ন পাতাল রেলের স্টেশনে নেমে পড়লাম। কাউন্টারে কোন লোকজন নেই। সুইচ টিপলে সিঙ্গাপুরের দর্শনীয় স্থান সমূহের ম্যাপ ভেসে উঠে। যে জায়গায় বেড়াতে যেতে চাই সেখানে হাত রাখলে সেখানকার রেলভাড়া কত তা স্ক্রীনে ভেসে উঠে। সেই পরিমান অর্থ মেশিনবাক্সে পুশ করলে মেশিনের ছিদ্র দিয়ে টিকেট বিরিয়ে আসে। আমরা বেভো সিটির টিকেট নিয়ে আন্ডার-গ্রাউন্ড ট্রেনে উঠে বসলাম।বিদ্যুতের গতিতে ট্রেন ছুটে চলল। পরিষ্কার পরিছন্ন সুন্দর সিট। যারা সিট পাননি তারা দাঁড়িয়ে রইলেন, কোন হইচই বা শব্দ নেই। ট্রেন বেভো সিটিতে আসার পর আমরা নেমে পড়লাম। হেঁটে কাছাকাছি স্পট হারবার ভিউতে চলে এলাম। সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম অদ্ভুত সুন্দও এক দৃশ্য, সাজানো গোছানো সুন্দর পরিপাটি পোতাশ্রয়ের নীল সমুদ্র তীরে বিশাল বিশাল মাদার ভেসেল দাঁড়িয়ে আছে। যেদিকে চোখ যায় সেদিকে সুন্দর। একজন হংকং এর লোক নিজ থেকে এগিয়ে এস আমাদের দু’জনের কয়েকটি ছবি তুলে দিল। নাজিম ভাই আগের দিন মোস্তফা সেন্টার থেকে একটি ক্যামেরা কিনেছেন ; সেটির উত্তম ব্যবহার হতে লাগল।
ঘারবার ভিউ থেকে মনো রেলে চড়ে সেনতোসায় পৌঁছালাম। সেখান থেকে বীচ সিটি। বিচি সিটিতে নেমেই সী-বীচে চলে গেলাম। ছোট্ট বীচ, আমাদের কক্সবাজারের ৫০ভাগের এক ভাগ হবে। ইউরোপিয়ানরা প্রায় উলঙ্গ অবস্থায় সারি সারি শুয়ে আছে। তাদের নামমাত্র পোষাক দেখে মনে হলো লাজ লজ্জা বিষয়টি এখানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। তাড়াতাড়ি সমুদ্রে নেমে দু-একটা ছবি তোলে সেখান থেকে চলে এলাম।
আভ্যন্তরীন বাসে চড়ে চলে এলাম ওয়াটার ওয়ার্ল্ডে। এখানে কৃত্রিমভাবে সমুদ্রের তলদেশের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। অকল্পনীয় বিশাল একুরিয়ামে সমুদ্রের সকল প্রাণী এমনভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে দেখে মনে হয় আমরা যেন সমূদ্রের তলদেশে চলে এসেছি। মনে হচ্ছে সমূদ্রের নীচে আমরা যেন ভেসে চলেছি কারণ আমাদের হাঁটতে হচ্ছেনা। বিশেষ এক ধরনের ফø্যাট এসকেলেটর আমাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দু’পাশ দিয়ে, মাথার উপর দিয়ে কাঁকড়া ,বিভিন্ন প্রজাতীর মাছ , অক্টোপাস, হাঙ্গর ছানা, ঘোড়া মাছ সহ আরো আনেক অচেনা সামুদ্রিক প্রাণী জীবন্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে ; আমরা দেখছি কিন্তু ছুঁতে পারছিনা সে এক অপূর্ব দৃশ্য।
ইতোমধ্যে ফোনে যোগাযোগ করে আমাদের সাথে দেখা করতে এলেন বেশ কয়েকজন বাংগালী । সবার বাড়ি সন্দ্বীপে। তারা আমাদের জন্য বেশ কিছু ফলমূল, জুস ও চিপস নিয়ে এসেছেন। ক্ষুধা লেগেছিল প্রচুর। সবাই মিলে খাদ্যদ্রব্যগুলি শেষ করে দিলাম নিমিষে। আমার নিকট কম্পাস লাগানো জায়নামাজ ছিল,কেবলা বের করে এক ফাঁকে জোহর পড়ে নিলাম। বাংগালী বন্ধুরা আমাদের পরামর্শ দিলেন পকেটের স্বাস্থ্য ভালো থাকলে এখানকার ইউনিভার্সেল স্টুডিওটা দেখে যেতে কারন এটা নাকি ওয়ার্ল্ডফেমাস একটি দর্শনীয় জায়গা। যেই কথা সেই কাজ্ আমি আর নাজিম ভাই ঢুকে পড়লাম। সিঙ্গাপুরের সব চেয়ে আকর্ষণীয় ও দর্শনীয় ইউনিভার্সেল স্টুডিও তে ঢুকার আগে পর্যন্ত বোঝা যাবে না সিঙ্গাপুরিয়ানরা এটা কি বানিয়ে রেখেছে। ইউরোপ থেকে অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রচুর পর্যটক এসেছে এ বিশাল বৈচিত্রে ভরপুর পার্কটি ভিজিট করতে। বাচ্চাদের কার্টুনের প্রায় সকল মজার চরিত্রগুলো এখানে জীবন্ত ঘুরে বেড়াচ্ছ্ েলোকজন লাইন ধরে তাদের সাথে ছবি তুলছে। শেরেক নামক কার্টুনের কল্পিত রাজ্যকে বাস্তবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
একদিকে তৈরী করা হয়েছে প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবী জুরসিকপার্ক। ডাইনোসার আর হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন পৃথিবীর সব প্রাণী যেন জীবন্ত দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ফিরআউনের আমলের নকল মিসর পিরামিড স্ফিংক্স দেখে মুগ্ধ হলাম। এ বিশালায়াতন পার্কটি পায়েদলে ঘুরতে আমরা যতই না কা¬ন্ত হয়েছি তার চেয়ে বেশী বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়েছি এর নির্মান শৈলী আর বৈচিত্রের মুন্সিয়ানা দেখে। টিকেট কেটে ঢুকলাম পরাবাস্তব নৃত্য দেখতে। পিলে চমকে গেল ভুতপ্রেতের নৃত্য দেখে। এক সময় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল।
সন্ধ্যার পর আবার টিকেট কেটে ঢুকলাম হলিউডের পাইরেইটস জাতীয় একটা ছবির চাক্ষুষ মঞ্চায়ন দেখতে। চোখের সামনে ভয়াবহ বম্বিং আর ফায়ারিং এর এ দৃশ্য দেখে ভয় পায়নি এমন একটি লোকও সেখানে ছিলনা। মহিলাদের তীক্ষ চিৎকারে কানে তালা লাগছিল,একটি পুরোনো যুদ্ধবিমান যখন উড়ে এস আমাদের সম্মুখে আছড়ে পড়ল তখন সত্যিই ভয়ংকর ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ছবির ভয়ংকর যুদ্ধদৃশ্য এভাবে ফিজিক্যালী ফুটিয়ে তোলা যায় এটা আমার কল্পনার বাহিরে ছিল। ইউনিভার্সেল স্টুডিও থেকে বিরিয়ে মনে হলো এখানে ঢোকার জন্য খরচ প্রায় পঁজিশ হাজার টাকা বৃথা যায়নি। পুরো টাকাটাই খরচ করলেন আমার দিলদরিয়া বন্ধু নাজিম ভাই তার ব্যক্তিগত কোষাগার থেকে।
নাজিম সাহেব আমাদের তাকওয়া প্রপার্টিজ এর ই.ডি হলেও অনেক গুলো ব্যবসার সাতে জড়িত ; অল্পবয়সে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বলা যায় তাঁকে।আরবি শিক্ষিত হলেও অল্প সময়ে তিনি ইংরেজি রপ্ত করে ফেলেছেন।তাঁর আনন্দময় সঙ্গ, বিভিন্ন স্পটের নাম আর অবস্থান মনে রাখার অদ্ভুত পারদর্শিতা, আর নতুন জায়গা দেখার অপার আগ্রহ সিঙ্গাপুরে আমার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ উপহার ছিল। সেনেতোসা, বেভোসিটি হয়ে পাতাল রেলে চড়ে কিচনারী রোডে পৌঁছতে আমাদের রাত নয়টা বেজে গেল। বাংগালী রেষ্টুরেন্টে ”খানা বাঁশমতিতে” রাতের খাবার এবং ”আঙ্গুলিয়া মসজিদে” এশা পড়ে হোটেলে এসে শুয়ে পড়লাম। সকালে নাস্তা সেরে মোস্তাফা সেন্টারে গিয়ে আপনজনদের জন্যকিছু শপিং করলাম। নাজিম ভাই শপিং করে রুম ভর্তি করে ফেললেন। বিশাল এক ৪২ ইঞ্চি ফ্ল্যাট টিভি কিনে ঘোষণা দিলেন নিরাপত্তার জন্য এটি তিনি বিমানে তার সাথেই রাখবেন। অবশ্য পরবর্তীতে অনেক চেষ্টা করেও টিভি টি তিনি সাথে রাখতে পারেননি, লাগেজ হিসেবে বিমানের কর্মীদের নিকট সমর্পন করতে হয়।
বিকেল চারটায় মেরিনাবে তে অবস্থিত ৫৮০ ফিট উঁচু ৫৮ তলা তিনটি ভবনের উপরে নির্মিত বিশাল বাগান ও পার্ক দেখতে গেলাম এটাকে বলা হয় ”স্কাইর্পাক”। ৭০ ডলার দিয়ে লিফটে প্রবেশ করলাম। ৫৮০ ফিট উচ্চতা পার হয়ে গন্তব্যে পৌছলাম ৩০ সেকেন্ডে । ইতিহাসে পড়েছিলাম সপ্তাশ্চার্যের এক আশ্চার্য ব্যাবিলনের শুন্যোদ্যান , আমরা এখন কাঁচঘেরা সিংগাপুরের শুন্যোদানে। এখান থেকে গোটা সিঙ্গাপুর দৃশ্যমান। রাত ঘনিয়ে এল। অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে দেখলাম আলোক মালায় সজ্জিত রাতের সিঙ্গাপুর, ভয়ংকর সুন্দর এই দৃশ্য জীবনে ভোলা যাবে না। প্যাকেট থেকে জায়নামাজ বের করে পৃথিবী থেকে ৫৮০ ফিট উচ্চতার কৃত্রিম উদ্যানে মাগরিবের নামাজে দাঁড়ালাম। নাজিম ভাইয়ের সাথে এক লম্বা পাকিস্তানী এসে জামাতে দাঁড়ালো। সিঙ্গাপুরিয়ান ও ফরেনাররা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, সম্ভবত এখানে এমন দৃশ্য তারা আর দেখেনি। নামাজের মধ্যে মনে হলো মহান আল্লাহর সৃষ্ট মানুষ যদি এত সুন্দর কোন নগর গড়তে পারে স্বয়ং আল্লাহর সৃষ্ট স্বর্গোদ্যান না জানি কত মনোমুগ্ধকর হবে! জানাœাতের কথা ভেবে দু’চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। কানে ভেসে এল ¯্রষ্টার বাণী” জান্নাতুন তাজরি মিন তাহ তিহাল আনহার, খালেদিনা ফিহা আবাদান আবাদা।” সেই সকল স্বর্গ যার নিন্মে প্রবাহিত ¯্রােতস্বিনী যেখানে রবে অনন্তকাল”। নামাজ শেষে নাজিম ভাই জিজ্ঞেস করলেন কাঁদছেন কেন ? বললাম- পরে বলব। রাত ৯টার দিকে ডেরায় ফিরলাম।
পরদিন ৪ জানুয়ারী ২০১২ ঘুম থেকে উঠে প্রাতরাশ সেরে দুজনে মিলে মালপত্র গোছাতে বসলাম। লাগেজ গোছানোতেও নাজিম সাহেব ওস্তাদ। যেখানে আমি আমার মালের জন্য আরো একটি ব্যাগের প্রয়োজন হবে মনে করেছিলাম সেখানে নাজিম ভাই গিফটগুলোর সব প্যাকেট ফেলে দিয়ে একটার মধ্যেই সব আঁটিয়ে ফেললেন। তাঁর বুদ্ধির ভূয়সী প্রশংসা করলাম।
বেলা সাড়ে চারটায় আমাদের ফিরতি ফ্লাইট। চারটায় এয়ার পোর্টে ঢুকে প্রয়োজনীয় কার্যাবলী শেষ করে প্লেনে উঠে বসলাম। প্রথম নামার সময় রাত থাকতে ভাল করে বুঝতে পারিনি চেংগি এয়ার পোর্টটি যে এত বিশাল। বিদায় সিঙ্গাপুর, বিদায়।
সিঙ্গাপুরী সময় সন্ধ্যা ৫টায় এবং বাংলাদেশী সময় রাত আটটায় প্লেন ছাড়ল। রাতের খাবার দেয়া হলো এক ঘন্টা পর। মেনু ছিল অ্যাপেটাইজর ও মেইনকোর্স হিসাবে ম্যারিনেটেড সবজি সালাদের সাথে রোস্টেড চিকেন,মশলাদার সবজি, পোলাও, পনির,ক্রেকারস, রোল, মাখন এবং ডের্জাট হিসেবে পাইনএপেল ও কোকোনাট কেক। সব শেষে কফি আর কোক।
টিভি স্ক্রীনে বিমানের অবস্থানের নির্দেশনা দেখে, নাজিম ভাইয়ের সাথে গল্প গুজব করে আর হেড ফোনে কোরান তেলওয়াত শুনে তিন ঘন্টা ত্রিশ মিনিট পার হয়ে গেল। রাত সাড়ে দশটায় আমাদের প্লেন প্রিয় মাতৃভূমি স্পর্শ করল। ছোট ভাই শাওকি এয়ারপোর্টে গাড়ী পাঠিয়েছে। নাজিম ভাইকে রাতের বাসে তুলে দিয়ে রাজারবাগ পুলিশ হেডকোর্য়াটারে ভাইয়ের বাসায় পৌঁছালাম। রাতে ভাতৃবধু শারমিন ভাইঝি নুহার সাথে গল্প করলাম, তারা জোর করে ভাত খাওয়ালো, তাদের জন্য সামান্য গিফট ছিল, তা দিলাম। পরদিন সকালে ছোট ভাই জাকির বাসায় গেলাম, ওদের গিফটগুলো দিলাম, জাকির বউ শামিমার চা অসাধারন, তার যতেœ তৈরি করা চা-নাস্তা খেলাম। ইতিমধ্যে উত্তরা থেকে একমাত্র বোন সালমা গাড়ি এসে উপস্থিত। বোনের গাড়ীতে করে উত্তরা ১৩নং সেক্টরে তার বিশাল এর্পাটমেন্টে গিয়ে উঠলাম। আমি যা যা পছন্দ করি তার অনেক কিছুই সালমা রান্না করেছে। দুপুরের খাওয়াটা বেশ ভাল হলো। রাতে সালমার গাড়ি এয়ার পোর্টে পৌঁছে দিয়ে গেল। ড্রাইভারকে টিপস দিয়ে লাউঞ্জে ঢুকে পড়লাম। রিজেন্ট এয়ারওয়েজে রাত সাড়ে নয়টায় চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমান বন্দরে পৌঁছালাম। বিমান বন্দর থেকে সাদা মাইক্রো ছুটে চলল আমার স্থায়ী অথচ অস্থায়ী ঠিকানার দিকে। সাঙ্গ হলো আমার স্বল্প সময়ের সিঙ্গাপুর পরিব্রাজন।

লেখক : প্রধান সম্পাদক এবং প্রধান নির্বাহী সোনালী মিডিয়া এন্ড পাবলিকেশন্স ( মাসিক সোনালী সন্দ্বীপ, www.sonalinews24.com,Sonali TV online)


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন