আজ বুধবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৮ ইং, ১২ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



আদালতে খালেদা জিয়ার আইনজীবী – আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে ফায়দা লুটতে চায় সরকার

Published on 29 December 2017 | 4: 22 am

খালেদা জিয়ার আইনজীবী সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এজে মোহাম্মদ আলী বলেছেন, আমরা ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার থেকে বেরিয়ে এসেছি।

এরপর আমরা অনেক উন্নয়নের রাস্তা পেরিয়েছি। তারপরও বাংলাদেশে এতই দৈন্যদশা হল যে, পুরনো, ছেঁড়া, টুকরা কাগজ দিয়ে একটা নথি তৈরি করতে হবে?

রাষ্ট্রপতির ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলের কাগজ ব্যবহার করছে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর দফতর- এটা আমাদের মানতে হবে? তিনি বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় রাষ্ট্রপতির কল্যাণ তহবিলের পাতা কেটে কেটে অতিরিক্ত নথি বানানো হয়েছে। ছেঁড়া পুরনো নথি দিয়ে মামলা সাজানো হয়েছে। এ মামলার উদ্দেশ্য হচ্ছে- খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করা।

রাজধানীর বকশীবাজারে স্থাপিত ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামানের আদালতে বৃহস্পতিবার খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় তার আইনজীবী এজে মোহাম্মদ আলী এসব কথা বলেন।

যুক্তি তুলে ধরে খালেদা জিয়ার অপর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, এ মামলায় আদালতের কঁাধে বন্দুক রেখে রাজনৈকি ফায়দা লুটতে চায় সরকার। এ জন্য সরকার দুদককে ব্যবহার করছে। মামলাটি রাজনৈতিক কালিমাযুক্ত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ না হওয়ায় আদালত ৩ ও ৪ জানুয়ারি পরবর্তী যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য করেন। ওইদিন একই আদালতে জিয়া চ্যারিটেবল মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্কের জন্যও দিন ধার্য করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুই মামলায় হাজিরা দিতে খালেদা জিয়া বেলা সাড়ে ১১টায় এজলাসে প্রবেশ করেন। বেলা ১১টা ৩৭ মিনিটের দিকে বিচারক এজলাসে প্রবেশের পর অনুমতি নিয়ে তিনি নির্ধারিত আসন গ্রহণ করেন। এরপরই খালেদা জিয়ার পক্ষে পঞ্চম দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন কার্যক্রম শুরু হয়।

যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে একটি টাকাও তছরুপের কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই। এই টাকা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান এনেছিলেন। ওই টাকা জিয়া মেমোরিয়াল ট্রাস্টেও গিয়েছিল। অথচ সেখানে কোনো মামলা হয়নি। একই যাত্রায় কেন দু’রকম ফল- প্রশ্ন রাখেন তিনি। একই চেক, একই ব্যক্তি দিয়েছেন।

একটা হারাম, আরেকটা হালাল। তদন্ত কর্মকর্তা হারুন-অর-রশিদ যেভাবে নির্দেশনা পেয়েছিলেন সেভাবেই চার্জশিট দিয়েছেন। এই মামলা রাজনৈতিক গন্ধযুক্ত। আমরা বিশ্বাস করি, এখনও কিছু বিচারক আছেন, যারা আল্লাহকে হাজির-নাজির রেখে বিচার করেন। ন্যায়বিচার মানেই খালাস নয়, সঠিক বিচার।

তিনি আরও বলেন, সা্বাক্ষরবিহীন, ঘষামাজা, সৃষ্ট ডকুমেন্টের ওপর ভিত্তি করে দায়ের করা মামলায় সাজা দিলে বিচার ও বিচারকের ওপর মানুষের আস্থার পরিবর্তন হবে। তিনি বলেন, ট্রাস্টের টাকা কুয়েতের আমীর পাঠিয়েছিলেন। এটা স্টেট টু স্টেট নয়, এটা অনুদান। জিয়াউর রহমানের এক অদ্ভুত ইমেজ ছিল। এই ইমেজের জন্য জিয়াউর রহমানের আত্মার মাগফিরাত করতে টাকাটা পাঠানো হয়েছিল। কোনো শর্তই ছিল না যে, টাকাটা কীভাবে কোথায় খরচ করতে হবে। তিনি বলেন, ট্রাস্টের কোনো অর্থ আত্মসাত্ হয়নি। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি। ঘটনার ১৭ বছর পর এ মামলা দেয়া হয়েছে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে।

বাংলার জনগণ একদিন জানতে পারবে আমরা এতিমের টাকা আত্মসাত্ করিনি। বরং টাকা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। খালেদা জিয়ার পক্ষে তিনি বলেন, ২০০৬ সালের পর থেকে আমাকে (খালেদা জিয়া) ধাওয়া করে বেড়াচ্ছে। খালেদা জিয়া ধীরচিত্তের নেত্রী। মাথা গরমের নেত্রী হলে দেশে অনেক অস্থিরতা দেখা দিত।

এ মামলাটি ঐতিহাসিক মামলা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে উলে্লখ করে তিনি বলেন, এই মামলার সাক্ষী আদালতেই সীমাবদ্ধ নয়, সারা দেশের মানুষ জেনে গেছে কোনো টাকা খোয়া যায়নি। এর ফলাফলও বাংলার মানুষ জানবে।

খন্দকার মাহবুব হোসেন যুক্তিতর্ক শুনানিতে আরও বলেন, এ মামলাটি রাজনৈতিক কালিমাযুক্ত। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা করার জন্য মামলা তৈরি করা হয়েছে। খালেদা জিয়া তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন উলে্লখ করে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া ভোটারবিহীন প্রধানমন্ত্রী হননি। ইতিহাস একদিন বিচার করবে তাকে কীভাবে এখানে (আদালত) আনা হয়েছে।

বিচারকের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনি ন্যায়বিচার করবেন। সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করবেন। এটা ইতিহাস হয়ে থাকবে। আপনার কাছে একটা নিবেদন থাকবে- এই মামলায় যে ছায়া নথি আনা হয়েছে সেটি ঘষামাজা, স্বাক্ষরবিহীন কাগজপত্র, যা ব্যবহার করে মামলাটি করা হয়েছে। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে যদি ঘষামাজা কাগজ দিয়ে করা মামলায় সাজা দেয়া হয় সারা জাতি এর বিচার করবে।

খন্দকার মাহবুব হোসেনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলে দুপুর ১টা ১৮ মিনিটের দিকে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন সিনিয়র আইনজীবী এজে মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, এ মামলাটি ‘মাইনাস টু থিউরির’ সেই মামলা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের ধ্রুবতারা, ৩ বারের প্রধানমন্ত্রীর ‘পলিটিক্যাল ক্যারিয়ার’ ধ্বংস করার জন্য এ মামলার সৃষ্টি হয়েছে।

দুদকের প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা নূর আহম্মেদ যেখানে রিপোর্ট দিয়ে বলেছেন, খালেদা জিয়ার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সেখানে তার চেয়েও জুনিয়র তদন্ত কর্মকর্তা হারুন-অর-রশিদ অভিযোগ এনে বলেছেন, খালেদা জিয়ার সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি বলেন, মিথ্যা কাগজপত্র প্রস্তুত করে এ মামলায় চার্জ গঠন করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, যারা মিথ্যা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে জাল কাগজপত্র সৃষ্টি করেছেন তাদেরও বিচার হবে। আইনে স্পষ্ট বলা আছে∏ মিথ্যা তথ্য দিয়ে সাজা দিলে, জাল সৃষ্টিকারীদের বিচার হবে। মামলার ডকুমেন্ট পুরনো তেলচিটচিটে কাগজপত্র, ছিন্নপত্র ও ছঁেড়া পাতা, ঘষামাজা, ওভাররাইটিং। এটা কি মুদির দোকান। ক্রিমিনাল মামলায় এসব দিয়ে সাজা হতে পারে না। তিনি বলেন, মামলার তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, যে তারিখে ট্রাস্টের হিসাবে টাকা জমা হয়েছে তার ১০ মাস আগের তারিখ দিয়ে বলা হচ্ছে টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। এটাও কি আমাদের বিশ্বাস করতে হবে?

দুদক কৌঁসুলিকে উত্তেজিত হতে বারণ করলেন খালেদা জিয়া : এজে মোহাম্মদ আলীর যুক্তিতর্কে এর আগে দেয়া খালেদা জিয়ার আত্মপক্ষ সমর্থনের কথাগুলোই ব্যাখ্যা করা হচ্ছে বলে দাবি করে আদালতে প্রতিবাদ জানান দুদক কঁেৌসুলি মোশাররফ হোসেন কাজল।

তিনি মোহাম্মদ আলীকে ৩২ সাক্ষী ও কিছু ডকুমেন্টের ওপর ভিত্তি করে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতে বলেন। অপরদিকে মোহাম্মদ আলী তার বক্তব্যে বিঘ্ন ঘটাতে বাধা দেয়া হচ্ছে বলে আদালতের কাছে অভিযোগ করেন।

এরপর কিছুটা হট্টগোল সৃষ্টি হলে আদালতের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। বিকাল সোয়া ৩টার দিকে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন খালেদা জিয়া। শুনানির সময় খালেদা জিয়ার পক্ষে আদালতে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, অ্যাডভোকেট আবদুর রেজাক খান, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, অ্যাডভোকেট সানা উল্লাহ মিয়া, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, বোরহান উদ্দিন প্রমুখ।

এছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, মির্জা আব্বাস ও আফরোজা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, শহীদ উদ্দিন চেৌধুরী এ্যানীসহ দলের বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতাও উপস্থিত ছিলেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রাজধানীর রমনা থানায় প্রথম মামলাটি করা হয়।

আর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানায় দ্বিতীয় মামলাটিও করে দুদক।


Advertisement

আরও পড়ুন