মহিউদ্দিন চৌধুরীর কুলখানি – পদদলিত হয়ে নিহত ১০

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর কুলখানি অনুষ্ঠানে পদদলিত হয়ে ১০ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৫০ জন। ১৪ জন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এদের মধ্যে ৪ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সোমবার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরীর জামালখানে রীমা কনভেনশন সেন্টারে এ ঘটনা ঘটে।

সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহার জানিয়েছেন, অতিরিক্ত ভিড় এবং কনভেনশন সেন্টারের ঢালু প্রবেশপথে বিশৃঙ্খলা ও হুড়োহুড়ির কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। তবে স্থানীয়দের কেউ কেউ এজন্য পুলিশের ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন। তারা বলছেন, সেখানে পুলিশের কোনো তদারকি ছিল না।

নিহতদের মধ্যে ৯ জনই হিন্দু সম্প্রদায়ের। একজন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের। তারা হলেন- ঝন্টু দাস (৪৫), কৃষ্ণপদ দাশ (৪০), দীপঙ্কর দাশ বাটুল (২৫), অলক ভৌমিক (৩৬), সুবির দাশ (৫০), লিটন দে (৫৩), টিটু (৩২), ধনাশীল (৬৫), প্রদীপ দাশ (৬৫) ও সত্যব্রত ভট্টাচার্য (৪২)। এর মধ্যে কৃষ্ণপদ দাশ জেলে ছিলেন। তার বাড়ি নগরীর উত্তর কাট্টলী এলাকায়। সুবীর দাশের বাড়ি নগরীর পাথরঘাটা এলাকায়। তিনি মাছ ব্যবসায়ী। অন্যদের বিস্তারিত পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

জনপ্রিয় জননেতা চট্টলবীর মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর চট্টগ্রামজুড়ে এক প্রকার শোকের মাতম চলছিল। শোকাবহ কুলখানিতে এসে পদদলিত হয়ে ১০টি তরতাজা প্রাণহানির ঘটনা শহরে আরেক শোকের জন্ম দিয়েছে। যা নগরবাসী এবং মহিউদ্দিন চৌধুরীর পরিবার কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত এ ঘটনায় হতভম্ব এবং বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। তিনি ঘটনার পরপরই চমেক হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে স্বজনহারাদের সান্ত্বনা দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেন।

জানা যায়, মহিউদ্দিন চৌধুরীর কুলখানির জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে নগরীর ১৪টি কমিউনিটি সেন্টারে মেজবানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অমুসলিম এবং যারা গরুর গোস্ত খান না, তাদের জন্য মেজবানের ব্যবস্থা হয়েছিল ওই রীমা কনভেনশন সেন্টারে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনের খাবার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা আন্দরকিল্লা ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী বলেন, রীমা কনভেনশন সেন্টারে ৭ হাজার লোকের আয়োজন করা হয়। প্রতি ব্যাচে ১ হাজার ২০০ করে লোক খাওয়ানো হচ্ছিল। ৩ থেকে ৪ ব্যাচ খাওয়ানোর পর হঠাৎ করেই কনভেনশনের মূল গেট দিয়ে প্রবেশ করার সময় হুড়োহুড়িতে অনেকেই মাটিতে পড়ে যান। তাদের ওপর দিয়ে অন্যরা ভেতরে প্রবেশ করেন। এতে পিষ্ট হয়েই হতাহতের ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা : নগরীর জামালখান শহীদ সাইফুদ্দিন খালেদ রোডে রীমা কনভেনশন সেন্টারে বেলা ১১টা থেকে খাওয়া শুরু হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ভিড় বাড়তে থাকে। তখন দায়িত্বপ্রাপ্তদের নির্দেশে স্বেচ্ছাসেবকরা দুটি গেট বন্ধ করে দেন। ফলে গেটে জেয়াফতে আসা মানুষের ভিড় তীব্র আকার ধারণ করে। এরই মধ্যে কনভেনশন সেন্টারের ভেতরে থাকা লোকজন খাওয়া শেষ করলে দায়িত্বপ্রাপ্তরা আরেক দফা লোক ঢোকানোর জন্য একটি গেট খুলে দেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড হুড়োহুড়ি ও ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। এ সময় গেটে দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবকরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। কনভেনশন সেন্টারের গেট থেকে অনুষ্ঠানস্থলের জায়গাটি অপেক্ষাকৃত ঢালু হওয়ায় লোকজন ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিতে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং অনেকেই মাটিতে পড়ে যান। অন্যরা তাদের পদদলিত করে সামনে এগোতে থাকেন। ঘটনাস্থলে কিছু পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক উপস্থিত থাকলেও তাদের পক্ষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে হতাহতদের উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। এ ঘটনায় আহত সুনীল দত্ত যুগান্তরকে বলেন, কোনো বিশৃঙ্খলা ছিল না। সুশৃঙ্খলভাবেই সবাই খাবার খেয়ে একে একে বের হয়ে আসছিলেন। ভেতরে প্রবেশের জন্য মূল গেটে অবস্থান করছিলেন কয়েক হাজার লোক। গেট খোলার সঙ্গে সঙ্গে সবাই একযোগে ঢোকার চেষ্টা করেন। পেছন থেকে ধাক্কায় আমি পড়ে যাই। আরেকজন আমাকে টেনে তোলেন। কিন্তু অনেকেই উঠতে পারেননি। আমার পা, কপাল, হাত ও পিঠে রক্তাক্ত জখম হয়েছে।

পটিয়া থেকে আসা রিপন দে বলেন- ‘এখানে এমন লোক নেই যে না খেয়ে থাকেন। এখানে আসার একমাত্র কারণ মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রতি ভালোবাসা। কিন্তু এসে এমন ঘটনার মুখোমুখি হতে হবে কল্পনাই করিনি।’

তিনি বলেন, মূল গেট পার হতেই রাস্তাটি একবারে ঢালু। এ কারণে পেছন থেকে ধাক্কা খেয়ে অনেকেই ভারসাম্য ঠিক রাখতে পারেননি। সেখানে প্রতিরোধ দেয়াল থাকলে হতাহতের এমন ঘটনা ঘটত না। হতাহতের ঘটনার পর এ কনভেনশন সেন্টারে আর কেউ খাবার গ্রহণ করেননি বলেও জানান তিনি।

বেলা আড়াইটায় ঘটনাস্থলে আসেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার। তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, এটা অনাকাক্সিক্ষত ও দুঃখজনক ঘটনা। নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি ছিল না। মূল রাস্তা থেকে অন্তত ১০ ফিট নিচু প্রবেশ পথ। সবাই একযোগে ঢোকার চেষ্টা করতে গিয়ে ঢালু পথে কিছু মানুষ পড়ে যান। এ কারণে পদদলিত হয়ে মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা ও পুলিশের তৎপরতার অভাব : প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার জন্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করেছেন। তাদের অভিযোগ, নগরীতে বিপুলসংখ্যক অমুসলিম বসবাস করলেও তাদের জন্য মেজবানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল মাত্র একটি কমিউনিটি সেন্টারে। একাধিক স্থানে খাওয়ার আয়োজন থাকলে হয়তো এমন ঘটনা নাও ঘটতে পারত।

রীমা কনভেনশন সেন্টারে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী চবি ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সহ-সম্পাদক নৃপেন সরকার বলেন, যে পরিমাণ লোক জড়ো হয়েছিলেন তাতে বিশৃঙ্খলা চরমে পৌঁছে। আমরা কুলিয়ে উঠতে পারছিলাম না। যখন ঘটনাটি ঘটে তখন পুলিশ ঘটনাস্থলে ছিল। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লাঠি নিয়ে উদ্ধত হলে হুড়োহুড়ি আরও বেড়ে যায়। শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়ে পুলিশ ও আয়োজকদের আরও জোর দেয়া উচিত ছিল।

তবে ঘটনাস্থলে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, শোকের অনুষ্ঠানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লাঠিচার্জ করার অবকাশ নেই। এরপরও ঘটনা যাতে আরও বড় না হতে পারে সে লক্ষ্যে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসেন।

নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা : নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। আন্দরকিল্লা ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহর লাল হাজারী জানান, মহিউদ্দিন চৌধুরীর পরিবারের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে ৫ হাজার টাকা করে লাশ সৎকারের জন্য দেয়া হয়েছে। পরে ১ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে। আহতদের চিকিৎসার ব্যয়ভারও বহন করা হবে। এছাড়া নিহতদের দেখতে এসে সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ১ লাখ টাকা করে দেয়া হবে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে এবং আহতদের ৫ হাজার টাকা করে দেয়া হবে। ১৫ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের জনপ্রিয় আওয়ামী লীগ নেতা ও তিন বারের সিটি মেয়র চট্টলবীর খ্যাত মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যু হয়। এর আগে বাংলাদেশে পদদলনে হতাহতের দুটো বড় ঘটনা ঘটেছিল ২০১৫ সালে। ওই বছর জুলাইয়ে ময়মনসিংহে জাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে হুড়োহুড়িতে ২৭ নারী ও শিশুর মৃত্যু হয়। তার আগে মার্চ মাসে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দে ব্রহ্মপুত্র নদে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অষ্টমী পুণ্যস্নানের সময় পদদলিত হয়ে ১০ জনের মৃত্যু হয়।

এক দিনের শোক কর্মসূচি : এদিকে কুলখানি অনুষ্ঠানে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে বলেছেন, অনাকাক্সিক্ষত ও দুঃখজনক এ ট্র্যাজেডির জন্য চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা গভীরভাবে মর্মাহত। তিনি মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্মরণে নগর আওয়ামী লীগ ঘোষিত ৩ দিনব্যাপী শোক দিবসের কর্মসূচি আরও ১ দিন বর্ধিত করার ঘোষণা দেন। মহিউদ্দিন চৌধুরীর জন্য নিবেদিত প্রাণ মৃত্যুবরণকারীদের স্মরণে এ বর্ধিত কর্মসূচি নেয়া হল বলে জানান তিনি। নিহতদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় ২০ ডিসেম্বর বুধবার বেলা ৩টায় শ্রীশ্রী চট্টেশ্বরী কালীমন্দিরে প্রার্থনা সভার আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

Mahabubur Rahman Mahabubur Rahman

Leave a Reply

Top
%d bloggers like this:
Web Design BangladeshBangladesh Online Market