আজ বুধবার, ২০ জুন ২০১৮ ইং, ০৬ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



মধ্যরাতে শেষ হচ্ছে নির্বাচনী প্রচার – মাঠে কেন্দ্রীয় নেতারা, উৎসবের নগরী রংপুর

Published on 19 December 2017 | 2: 55 am

রংপুর সিটি কর্পোরেশন (রসিক) নির্বাচনে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রচার। নির্বাচন কমিশনের কঠোর নজরদারিতে দ্বিতীয়বারের মতো এ নির্বাচনে বিভিন্ন দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে রংপুর এখন উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে।

এলাকাজুড়ে এখন প্রার্থীদের পোস্টার ব্যানারে ছেয়ে গেছে। আজ মঙ্গলবার মধ্যরাতে শেষ হচ্ছে নির্বাচনী প্রচার। দলীয় প্রার্থীকে সাহস জোগাতে গতকাল সোমবার ঢাকা থেকে বিমানযোগে ছুটে এসেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

তিনি বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। ঢাকা থেকে একই বিমানে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে সৈয়দপুর হয়ে দুপুরেই রংপুরে পৌঁছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি নির্বাচন নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়ে দলের নেতাকর্মীদের ভোটকেন্দ্র পাহারা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেনের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি গ্রুপ এখন রংপুরে দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে নিয়োজিত।

তিনি বলেছেন, রংপুরে লড়াই হবে আসল আর নকলের। আওয়ামী লীগ হচ্ছে আসল। একই সঙ্গে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা দিনরাত মাঠে কাজ করছেন। যাচ্ছেন প্রার্থীদের দ্বারে দ্বারে। করছেন পথসভা-জনসভা।

এদিকে নির্বাচন কমিশনও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার ব্যাপারে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুর উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরে ১৪ মিনিটের ভিডিও ক্লিপ নির্বাচন কমিশনের জব্দ করার বিষয়টি অনেকেরই নজরে এসেছে। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সব প্রস্তুতি এরই মধ্যে সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন।

পাঁচ দিনের সফরে রংপুর এসেই সোমবার দুপুরে এরশাদ তার পল্লী নিবাসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। এ নিয়ে শঙ্কার কিছু নেই। সেনা মোতায়েনেরও প্রয়োজন নেই।

নির্বাচন কমিশনও সেনা মোতায়েনের বিষয় নিয়ে ভাবছে না। আমিও মনে করি সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন নেই। লাঙ্গলে ভোট না দিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর লিফলেট বিরতণের বিষয়ে জানতে চাইলে এরশাদ বলেন, লিফলেট বিতরণ করে কী হবে। জনগণের রায়ই হবে আসল কথা।

আমি যতটুকু জানি, জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তফার মতো ভালো লোক নেই। নির্বাচনে তারই জয় হবে। জাতীয় পার্টি সরকার ও জোটে থাকলেও রসিক নির্বাচনে কোনো ছাড় নেই- আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এমন মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে এরশাদ বলেন, আওয়ামী লীগ কী বলেছে জানি না।

ছাড় দিক বা না দিক। আমি জানি এখানে লাঙলেরই জয় হবে। এবারের নির্বাচনে জনগণ লাঙল প্রতীকে নাকি ব্যক্তি মোস্তফাকে ভোট দেবেন? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে এরশাদ বলেন, দুটোই সমান। শুধু প্রতীকে নয়, ব্যক্তি মোস্তফাকেও মানুষ ভোট দেবে।

বিমানে ঢাকা থেকে সৈয়দপুর হয়ে সড়কপথে এরশাদ পল্লী নিবাসে পৌঁছলে দলের নেতাকর্মীরা তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। এ সময় এরশাদের ছোটভাই দলের কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদেরসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় জাপার নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে, বিএনপি প্রার্থী কাওসার জামান বাবলার পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে গতকালই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রংপুরে আসেন।

শুরুতেই তিনি নগরীর সিও বাজারে এক পথসভায় বক্তব্য রাখেন। মির্জা ফখরুল অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, আওয়ামী লীগ হল চোরের দল। তারা ভোট চুরি করবে।

সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আমাদের সংশয় আছে। তাই বিএনপি নেতাকর্মীদের ভোট কেন্দ্র পাহারা দিতে হবে। তিনি বলেন, রসিক নির্বাচনের মাধ্যমে এবার রংপুরের মানুষ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে বিজয়ী হবে।

আওয়ামী লীগের দুঃশাসন ভোটের মাধ্যমে জবাব দেবে মানুষ। এবার ধানের শীষ প্রতীককে বিজয়ী করতে প্রস্তুত রংপুরবাসী। আওয়ামী লীগের শাসনামলে মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

এ থেকে রেহাই পেতে হলে ধানের শীষে ভোট দিতে নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান মির্জা ফখরুল। এ সময় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক, ভাইস চেয়ারম্যান ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সাংগঠনিক সম্পাদক ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব আসাদুল হাবিব দুলুসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় বিএনপির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

পথসভার পর মেডিকেল মোড় থেকে স্টেশন পর্যন্ত জনসংযোগ করেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। নগরীর বেতপট্টি দলীয় কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে বিকেল সাড়ে ৫টায় জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়।

সম্মেলনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেছেন, রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ঘিরে বিএনপি যে অভিযোগ তুলছে তা তাদের মুখস্থ কথা। হেরে গেলে বিএনপি কী বলবে তা তাদের আগে থেকেই ঠিক করা থাকে। ২১ ডিসেম্বর লড়াই হবে আসল আর নকলের। আমরাই আসল আর বিএনপি নকল।

সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর আচরণবিধি লঙ্ঘনের কারণে সতর্ক করে নোটিশ দেয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আহমদ হোসেন বলেন, সরকার নির্বাচন কমিশনের কাজে কখনই হস্তক্ষেপ করে না। নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ অবাধ ও স্বাধীন। রংপুরে নৌকার জয় হলে সারা দেশ জানবে রংপুরের মানুষ শান্তির পক্ষে, উন্নয়নের পক্ষে। তারা পেট্রুলবোমার পক্ষে নয়।

হেরে গেলে বিএনপি আন্দোলনের ইস্যু পাবে কিনা? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিসের আন্দোলন, পেট্রুলবোমা মেরে মানুষ মারার আন্দোলন? যদি তাই হয় তাহলে জনগণ তা মেনে নেবে না।

রংপুরসহ সারা দেশে বর্তমান সরকার ও শেখ হাসিনার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং সাফল্যের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে উন্নয়ন ও শান্তির এ ধারা অব্যাহত রাখতে নৌকা মার্কায় ভোট দিতে নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা।

এ সময় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রাজু, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিয়ার রহমান সফি, সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডলসহ দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সঙ্গে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগও কিছুটা রয়েছে। রয়েছে প্রার্থীদের নানা প্রতিশ্রুতিও। নির্বাচনী এই ডামাডোলের মধ্যে পরবর্তী নগরপিতা কে হচ্ছেন তা নিয়ে হিসাব মেলাতে শুরু করেছেন ভোটাররা। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে অফিস আদালত, মাঠঘাটে একটাই প্রশ্ন কে হচ্ছেন রংপুরের পরবর্তী নগরপিতা?

নির্বাচন কমিশনের কঠোর মনোভাবের কারণে ভোট নিয়ে শঙ্কা আছে ভোটারদের মধ্যে কমই। ২১ ডিসেম্বরের ভোটে সাতজন মেয়র প্রার্থী ও ২৭৬ জন কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

মেয়র প্রার্থীরা হচ্ছেন- জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা লাঙ্গল, বিএনপির কাওসার জামান বাবলা ধানের শীষ, আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু নৌকা, জাতীয় পার্টির বিদ্রোহী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হুসেইন মকবুল শাহরিয়ার হাতি, বাসদের আবদুল কুদ্দুস মই, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের এটিএম গোলাম মোস্তফা হাতপাখা ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. সেলিম আকতার আম।

‘শেখ হাসিনাকে নৌকার বিজয় উপহার দিতে চাই, সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়নের অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে চাই’- এই স্লোগান নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু নির্বাচনী প্রচারণার মাঠে কাজ করছেন।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, রংপুর সদরে নৌকা কখনও হানা দিতে না পারলেও এবার তার ব্যতিক্রম কিছু ঘটবে। তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কার বিজয় নিশ্চিত।

নগরবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রংপুরবাসী নৌকাকে বিজয়ী করতে চান। রংপুরের ভোটাররা নৌকার পক্ষেই আছেন। নৌকার জোয়ার বইছে রংপুরে। জনগণ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করবেন না।

প্রধানমন্ত্রী আমাকে বিশ্বাস করে নৌকা প্রতীক দিয়েছেন, আমি আশাবাদী তার সম্মান রক্ষা করতে পারব। সোমবার নির্বাচনী মাঠে কথা হয় জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার সঙ্গে।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আধুনিক নগরী গড়ার প্রত্যয় নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। মেয়র নির্বাচিত হলে আধুনিক নগরী গড়ার জন্য যা করা দরকার তাই করব।

নগরবাসীর জন্য জনদুর্ভোগের কারণ অনুসন্ধান করে তা প্রতিকারের জন্য কাজ করে যাব। নগরবাসীকে লাঙ্গল প্রতীকে ভোট দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কথা হয় বিএনপি প্রার্থী কাওছার জামান বাবলার সঙ্গে। সাংবাদিকদের তিনি জানান, বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের নেতারা আমার জন্য মাঠে কাজ করছেন। বর্তমান সরকারের পায়ের নিচে মাটি নেই।

রংপুরের মানুষও বিএনপির পক্ষে আছেন। সরকারের অন্যায় অত্যাচার ও জুলেমের বিরুদ্ধে সোচ্চার সবাই। সুন্দর নগরী গড়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে কাজ করতে বিপুল ভোটে জনগণ তাকে নির্বাচিত করবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

স্বতন্ত্র প্রার্থী হুসেইন মকবুল শাহরিয়ার বলেন, জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি ছিলাম, নিজের পরিচিতির পাশাপাশি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যেমন এই পরিবারের সন্তান তেমনি আমিও এই পরিবারের সদস্য।

আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে খুব সাবধান আছি। আমি নবগঠিত সিটি কর্পোরেশনের সব উন্নয়নমুখী কাজ করার অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনে নেমেছি। আমি মনে করি মেয়র নির্বাচিত হলে সততার সঙ্গে কাজ করে যাব।

আমার মনে হয় রংপুরের মানুষ একজন ভালো মেয়র প্রার্থী নির্বাচন করবেন। আমি সেই দাবি নিয়ে বলতে পারি আমার প্রতীক হাতি মার্কায় রংপুরের মানুষ ভোট দেবেন। আমি জয়যুক্ত হব।

রিটার্নিং অফিসার সুভাষ চন্দ্র সরকার জানান, রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সাত মেয়র প্রার্থীসহ ৩৩টি ওয়ার্ডের নির্বাচনে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২১১ ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ৬৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন