সালাতে অমনোযোগ: একটি কারণ ও তার প্রতিকার

সালাতে কেন আমরা মনোযোগী হতে পারি না? আমরা যা সালাত পড়ি তা কী আদৌ হয়?

ধরুন আপনি একটা সম্মেলনে গেলেন। বক্তা একটা বিষয়ের উপর বেশ গলা উঁচু করে কথা বলেই যাচ্ছে। কিন্তু টপিকটা আপনার জন্য বড্ড বোরিং বা আপনার বোধগম্যের বাইরে। তো আপনি সেদিকে খেয়াল না দিয়ে অন্যকিছু করতে শুরু করলেন। আবার ধরুন সেখানে চায়নিজ বা জার্মানভাষী কোনো গণ্যমান্য ব্যক্তি বেশ দামিদামি কথাবার্তা বলছে, বলা যায় একপ্রকার মোটিভেশনাল স্পিচ!

আপনি কি মোটিভেটেড হবেন? না, প্রশ্নই আসে না। কারণ, আপনি তাদের ভাষাটা বোঝেন না। তারা কী বলছে তা যদি আপনি না-ই বোঝেন, তাহলে ওই অনুষ্ঠানটিতে আপনার মনোযোগ থাকবে? বরং আপনি বিরক্ত বোধ করবেন, হা-হুতাশ শুরু করবেন, যত দ্রুত পারেন উঠে চলে যেতে চাইবেন।

ঠিক এই কাজটাই আমরা সালাত পড়ার ক্ষেত্রে করি। আমরা সালাতে কী পড়ছি, মুখ দিয়ে কী বলছি তা কি আদৌ বুঝি? না বুঝি না (গুটিকতক মানুষ ছাড়া)। বুঝলে তো সালাত থেকে আর আমাদের খেয়াল ছুটতো না। শয়তানের প্ররোচনায় দুনিয়াবি চিন্তা আমাদের মাথায় ঘুরপাক খেতো না।

আসলে আমরা সালাতে কী পড়ি জানি না। তাই মন অন্যদিকে চলে যায়। সূরাহ, তাশাহহুদ, দরূদ শরিফ, তাসবিহ সবই ঠিকঠাক পড়ি, তারপরও আমাদের সালাতের প্রতি মনোযোগ থাকে না। কারণ, আমরা যা পড়ছি সেগুলার অর্থ জানি না। আরবির অর্থগুলো জানা থাকলে মন কখনো অন্যদিকে যেতো না।

রূকু আর সেজদাহ-তে প্রতিনিয়ত যে তাসবিহগুলো পড়ছেন, কখনো সেগুলোর অর্থ জানার চেষ্টা করেছেন? সূরাহ ফাতিহা’র অর্থ? বাদবাকি যে অল্প ক’টা সূরাহ পড়েন, সেগুলোর অর্থ? কখনোই কি মনে প্রশ্ন জাগেনি এগুলোর অর্থ কী হতে পারে? আল্লাহকে আমরা কী বলছি প্রতিনিয়ত?

কীভাবে জাগবে প্রশ্ন! আমরা তো এগুলোকে গুরুত্বই দেই না। অথচ যেই না একটা নতুন ইংরেজি শব্দ দেখলাম বা শুনলাম, তখনই হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দিই, ডিকশনারি উল্টেপাল্টে এর অর্থ জানার জন্য মরিয়া হয়ে উঠি। কেন? ওই একটা নাম্বার বেশি পাবেন পরীক্ষার খাতায়, নতুন একটা শব্দ জানলে একটু জ্ঞানের পরিধি বাড়বে, বন্ধুমহলে একটু স্মার্ট হবেন, এজন্যই তো, নাকি?

আমরা দুনিয়াবি কাজকে এতটাই গুরুত্ব দেই যে, আল্লাহ যা বলছেন সেগুলোকে তোয়াক্কাই করি না। যেনতেনভাবে পার করে দিই! আখিরাতে নিশ্চয় এই অবহেলার ফল আপনি পাবেন।

আচ্ছা, বোঝার কথা নাহয় বাদ দিলাম। আমাদের বলার ভঙ্গি (উচ্চারণ) কি শুদ্ধ হচ্ছে? ভেবে দেখেছেন কখনো?

বাংলা শব্দেই আসি, ‘বেপার’ আর ‘কোরা’ এই দুটো শব্দের অর্থ যথাক্রমে- ‘বাণিজ্য’ আর ‘একদম নতুন’। এখন আপনি যদি এর বদলে ‘ব্যাপার’ আর ‘খোঁড়া’ বলেন তাহলে অর্থের বিকৃতি হয় না? যেখানে শব্দ দুটোর উচ্চারণ কাছাকাছি হলেও অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ঠিক একইভাবে আরবিতেও অনেক হরফ আছে যেগুলোর সঠিক উচ্চারণ না জানার কারণে আমরা প্রতিনিয়ত সালাতে বা কুরআন তিলাওয়াতে ভুল পড়ছি। ফলে অর্থে বিকৃতি হচ্ছে।

আপনি যদি ‘Knife’ কে ক্নাইফ পড়েন, তাহলে হবে? এর সঠিক উচ্চারণ হলো ‘নাইফ’।

আরবি ভাষাতে এমন অনেক শব্দ আছে যেগুলোর হরকত বা মাখরাজ একটু এদিক সেদিক হলেই অর্থ বিকৃত হয়ে যায়।

যেমন, “قُلۡ” পড়ার ক্ষেত্রে আমরা ‘কুল’ উচ্চারণ করে থাকি। যেটা সম্পূর্ণ ভুল। ‘ ك ‘ আর ‘ ق ‘ এই দুটি হরফের মাখরাজ সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অর্থও।

“قُلۡ” অর্থ হলো ‘বলো’। আর। ” كُلۡ “ অর্থ হলো ‘ভক্ষিত’ বা ‘খাওয়া’।

সূরা ইখলাসের প্রথম আয়াতে আমরা প্রায় সবাই পড়ি,

قُلْ هُوَ اللّٰهُ اَحَدٌۚ

‘কুলহু আল্লাহু আহাদ’

অর্থ: তুমি বলো/আপনি বলুন, তিনি আল্লাহ, এক অদ্বিতীয়।

কিন্তু আমরা ‘কুল’ বলাতে ‘ ق ‘ এর জায়গায় ‘ ك ‘ উচ্চারণ করি। আর অর্থ বিকৃত হয়ে দাঁড়ায় –

“তুমি খাও, আল্লাহ এক অদ্বিতীয়।”

কত বড় বিকৃত অর্থ! আল্লাহ মাফ করুক।

তো আপনি কীভাবে ভেবে নিচ্ছেন যে আপনার সালাত কবুল হচ্ছে? কুরআন তিলাওয়াত সহীহ হচ্ছে? এত সহজ সবকিছু?

এটা সামান্য একটা উদাহরণ মাত্র। এভাবেই আমরা অজান্তে বা অবহেলার কারণে অহরহ ভুল করছি। অনেক সময় যেটা কবিরা গুনাহ হয়ে যায়। আর কুরআন মাজিদও এর পাঠকারীকে লানত দেয়। সাওয়াবের বদলে আমরা এভাবেই উল্টা গুনাহ কামাই করছি।

আরবি ২৯টি হরফ ১৭টি ভিন্ন ভিন্ন মাখরাজ থেকে উচ্চারিত হয়। এছাড়াও পড়ার সময় তাজউইদ (ইক্বলাব, ইদগাম, ইখফা, গুন্নাহ) এসব ঠিক রেখে পড়তে হয়।

এখন যদি আপনি বলেন আরবি তো আমাদের মাতৃভাষা না। এগুলো তো বুঝি না। তো ইংরেজি, হিন্দি এসব? এগুলো কীভাবে শিখেছেন? আর গণিত, পদার্থবিজ্ঞানের কঠিন সূত্র বা রসায়নের মাথা ঘোরানো বিক্রিয়াগুলো কীভাবে শিখেছেন? নাকি জন্মগতভাবেই এগুলো জানতেন?

আমরা হাজার হাজার টাকা খরচ করে দুনিয়াবি জ্ঞানের জন্য ইংরেজি, চায়নিজ, ফারসি অনেক ভাষা শিখি। পদার্থবিজ্ঞন, রসায়ন শেখার জন্য মোটা অংকের টাকায় কোচিং প্রাইভেট পড়ি।

অথচ যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেটাই শিখি না বা শেখার প্রতি গুরুত্ব দেই না। বাসায় একটা কুরআনের ক্বারি হাফেজ রাখতে পারি না আরবিটা সহিহভাবে শেখার জন্য। একটু কুরআন উল্টে জরুরি সূরাহগুলোর অর্থগুলো মুখস্থ করতে পারি না। এটা আসলে আমাদের দুর্ভাগ্য, অনেক বড় দুর্ভাগ্য!

তাই বলে আরবি ভাষা শিখতেই হবে বলছি না। অন্তত সহিহ ও শুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত শিখুন। সালাতের তাসবিহ, তাশাহহুদ আর প্রয়োজনীয় সূরাহগুলোর অর্থ শিখুন। সালাত পড়ার সময় সেগুলো মনে মনে বলুন, মনোযোগ থাকবে ইনশাআল্লাহ।

আর নাহলে সারাজীবন ধরে কুরআন আর সালাত পড়েই যাবেন, কাজের কাজ কিছুই হবে না।


লেখক: সায়েম সিদ্দিক

Mahabubur Rahman Mahabubur Rahman

Leave a Reply

Top
%d bloggers like this:
Web Design BangladeshBangladesh Online Market