আজ রবিবার, ২২ এপ্রিল ২০১৮ ইং, ০৯ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



আন্তর্জাতিক আদালতে বুদ্ধিজীবি হত্যার বিচার দাবী

Published on 14 December 2017 | 6: 01 am

একজন বুদ্ধিজীবি এক দিনে তৈরি হয় না । একজন বুদ্ধিজীবি তৈরি হতে যুগের পর যুগ পেরিয়ে যায় । হাজার হাজার মানুষের মধ্যে একজন বুদ্ধিজীবির জম্ম হয় । এরা সারা পৃথিবীর কাছে অসীম মুল্যবান, আর জাতির জন্য হয় অমুল্য সম্পদ । অবহেলায় থাকলেও এ দেশে তৈরি হয়েছিল অনেক সূর্য সন্তানের । সেটা ব্রিটিশ শাসকেরাও বুঝতে পেরেছিল । এই উপমহাদেশের সকল ধরনের স্বাধীনতা কিংবা অধিকার আন্দোলনে বার বার বাংলাদেশের মানুষ তার প্রমান দিয়ে গেছে । সেই তুলনায় পাকিস্তানের ইতিহাস তেমন সমৃদ্ধ নয় । তাঁরা চিরকাল তোষামোদির চরিত্রে অভিনয় করে এ দেশে সুখে শান্তিতে বাস করেছে । তাদের ইতিহাসে অবহেলিত পূর্ব বাংলার মত সূর্য সন্তানের দীর্ঘ তালিকা নেই । ব্রিটিশ যেভাবে এ দেশকে শোষণ করে নিজেরা আয়েশ করেছে, তেমনি পাকিস্তানের শাসকরাও সে পথ অনুসরণ করে গেছে । তাঁরা সব সময় বাঙ্গালীদের দমিয়ে রেখেছে । কিন্তু বাঙ্গালীদের শৌর্য বীর্যের ইতিহাস পাকিস্তানীদের ভাল করে জানা ছিল । মাস্টার দা সূর্য সেন, প্রীতিলতার দেশ বাংলাদেশ । তাঁরা কখনো চাইতো না দেশে কোন মেধাবী, বীর, রাজনীতিক জম্ম হোক, তবুও এ দেশে জম্ম হয়েছে অগুনীত বীর আর বুদ্ধিজীবির ।

প্রভুত্ত আর ঘৃণার মূলমন্ত্র নিয়ে পাকিস্তানীরা এ দেশকে শাসন করতে চেয়েছিল । নির্যাতন, অবহেলা, শোষণ, বঞ্চনার শিকার এই বাঙ্গালী জাতিকে চিরকাল মুল্য দিতে হয়েছে । ক্ষুধা, দারিদ্র ছিল এ দেশের নিত্য সঙ্গী । দুর্ভিক্ষে উপহাস করেছে, “বাঙ্গালী ভাত খেতে পায় না, পোলাও খায় না কেন” ? সেই ভাষা বুঝার মত মানুষ এ দেশে ছিল । এটা তাঁরা বুঝেও না বুঝার ভান করে এ দেশের মানুষকে দাস করে রাখতে চেয়েছিল । সে সব ইতিহাস আমাদের সকলের জানা আছে । কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা ছিল এ দেশের বুদ্ধিজীবিদের । মানুষের মনের কষ্ট সবাই প্রকাশ করতে পারে না । প্রকাশ করতে চাই প্রকাশের অস্ত্র সাংবাদিকের কলম, কবি সাহিত্যিকের লেখা, প্রতিবাদী মানুষ তৈরি করার শিক্ষক, শিল্পীর তুলি, চিকিৎসক – প্রকৌশলীর প্রতিবাদ । অবহেলার পরিবেশেও এ দেশে তাদের জম্ম হয়েছিল । তারাই ছিল জাতির বুদ্ধিজীবি সূর্য সন্তান ।

একটি দেশের রুপাকার হয় দেশের বুদ্ধিজীবিগণ । যে দেশে যত বেশী বুদ্ধিজীবি সে দেশ তত বেশী এগিয়ে যায় । বুদ্ধিজীবি ছাড়া একটি জাতি অন্ধের মত । তাদের চোখ থাকে দেখতে পায় না, মুখ থাকে বলতে পারে না । হাজার শ্রমিকের কায়িক পরিশ্রমের গড়ে উঠে স্থপ্তির অঙ্কিত নকশায় প্রকৌশলীর নির্দেশনায় বিশাল অট্টালিকা । হাজার হাজার শিক্ষকের আন্তরিক ও অক্লান্ত পাঠ দানের সফল হয় শিক্ষাবিদের তৈরি পাঠ, তৈরি হয় আদর্শ মানুষ । গুটি কয় মেধাবী ডাক্তার সুস্থ্য রাখে বিশাল জাতিকে, তৈরি করে শত শত ডাক্তার । গুটি কয় মেধাবী প্রকৌশলী তৈরি করে শত শত প্রকৌশলী । মেধাবী কূটনীতিকরা সম্পর্ক তৈরি করে সারা বিশ্বের সাথে । পরিচিত লাভ করে একটা জাতির । খেটে খাওয়া মানুষগুলো তাদের ঘামে নিশ্চিত করে মানুষের মুখের আহার, বিহার, আরাম, আয়েশ । সবই হয়ে থাকে বুদ্ধিজীবিদের পরিকল্পনা আর নির্দেশনায় । জ্ঞান বুদ্ধি ছাড়া মাথা যেমন মানুষের জন্য বোঝা, তেমনি বুদ্ধিজীবি ছাড়া একটা জাতিও বন্য মানুষের মত । কিন্তু আমাদের সৌভাগ্য হয়েছিল যে সভ্যতার সাথে সাথে আমাদের দেশেও বুদ্ধিজীবি তৈরি হয়েছিল । তাঁরা দেশ, জাতি, মানবতার জন্য সুনামের সাথে এগিয়ে ছিল । অনেক সময় তাঁরা পাকিস্তানীদের ঈর্ষার কারন হয়েছিল । তার জন্য জাতিকে চিরকাল অনেক মুল্য দিতে হয়েছে । তবু আমরা থেমে থাকিনি । আমাদের দেশে জম্মেছে বুদ্ধিজীবির ।

আজ শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস । চিরকাল একটি দেশের উন্নয়নে এবং গঠনে বুদ্ধিজীবিরাই অগ্রনী ভুমিকা রেখে থাকে । তাছাড়া বুদ্ধিজীবিরা শুধু একটি দেশের নয়, তাঁরা সারা বিশ্বের কাজে লাগে । সুতারাং বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবিরাও সারা বিশ্বের সন্তান ছিল । বাংলাদেশের ত্রিশ লাখ মানুষকে শহীদ করে, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে এবং এক লাখ মা বোনের সম্ভ্রম লুণ্ঠন করে তাঁরা ভাল করে বুঝে নিয়েছিল, এ দেশের মানুষকে দমিয়ে রাখা যাবে না । বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীকে ঠেকানো সম্ভব হবে না । এটা পাকিস্তানের রাজনীতিক ও সামরিক কর্তৃপক্ষ খুব সহজেই অনুমান করতে পেরেছিল । অতীত ইতিহাস থেকে তাঁরা পর্যালোচনা করে বুঝে নিয়েছিল এ জাতি অনেক দূর এগিয়ে যাবে । তাদের পথে আটকাতে না পারলে নিজেরাই নিজেদের স্থান দখল করে নেবে । একদিন তাদের পিছনে ফেলে এগিয়ে যাবেই যাবে । সুতারাং তাদের চির হিংসুক মানসিকতা জেগে উঠে । চিরকাল তাঁরা তাদের মনে ইচ্ছা পোষণ করেছে যে করেই হোক বাঙ্গালীদের এগুতে দেয়া হবে না ।

যুদ্ধের সমাপ্তি যুদ্ধেই হওয়ার কথা ছিল । কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ আর বুদ্ধিজীবিদের হত্যা কেন ? তাঁরা কি তাহলে এটা মনে করেছিল যে, এদেশে ফুসে উঠা মানুষগুলো একদিন পাকিস্তানও দখল করে নেবে ? নাকি তাদের অনুতগ দোসরদের এ দেশকে তাদের ইচ্ছামত পরিচালনায় সহজ করে দেয়ার জন্য ? নয়তো এদেশের সাধারণ, নিরপরাধ, নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা কেন ? প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব ধর্ম আছে, সে ধর্মে নিশ্চয় এ ভাবে মানুষ হত্যার দীক্ষা নেই । তাহলে পাকিস্তানের মুসলমান দাবীদার মানুষগুলো কেন বাংলাদেশের সাধারণ, নিরপরাধ, নিরস্ত্র মানুষকে এভাবে হত্যা করেছে ? সারা পৃথিবীতে এখন মানবতা বিরোধী, যুদ্ধাপরাধের বিচার হচ্ছে । তাহলে পাকিস্তানের সে সব খুনী রাজনীতিক এবং সামরিক ব্যক্তিবর্গের সাধারণ, নিরপরাধ, নিরস্ত্র মানুষকে অকারনে হত্যার জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে মানবতা বিরোধী এবং যুদ্ধাপরাধের জন্য কেন বিচার হচ্ছে না কেন ? আজকের এ দিনে আমি একজন সাধারণ বাংলাদেশী হিসাবে সেই সব পাকিস্তানী রাজনীতিক যারা রাজনীতির নামে মানুষ নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল, সে সব সামরিক কর্মকর্তা যারা জেনেভা কনভেশন না জেনে যুদ্ধ করতে এসেছিল এবং তাদের দোসরদের সহায়তায় এভাবে নির্বিচারে সাধারণ মানুষ, প্রকৌশলী, ডাক্তার, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, কবি, সাহিত্যিকসহ বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করেছিল তাদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার প্রার্থনা করছি ।

সকল শহীদ বুদ্ধিজীবিদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি । আল্লাহ তাদের উত্তম পুরস্কার দান করুণ । আমীন ।


লেখক – সাহিত্যিক এবং সমসাময়িক বিষয় লেখক
(www.rokomari.com/book/author/12661/


Advertisement

আরও পড়ুন