আজ সোমবার, ১৬ জুলাই ২০১৮ ইং, ০১ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



নিউইয়র্কে সন্দ্বীপের আকাইদুল্লার বোমা হামলাতে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হচ্ছে  আরো কঠোর অভিবাসী আইন চান ট্রাম্প

Published on 13 December 2017 | 9: 22 am

নিউইয়র্কের ম্যানহাটন বাস টার্মিনালে বিস্ফোরণে জড়িত সন্দেহে আটক বাংলাদেশি আকায়েদ উল্লাহর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস জুঁই (২৪) ও শ্বশুর-শাশুড়িকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে গেছে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্র্যান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। গতকাল মঙ্গলবার বিকাল সোয়া তিনটার দিকে রাজধানীর জিগাতলার মনেশ্বর রোডের একটি বাসা থেকে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সিটিটিসির অতিরিক্ত উপ কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, আমরা আকায়েদের স্ত্রী ও শ্বশুর-শাশুড়িকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে এসেছি। তাদের কাছ থেকে আকায়েদ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আকায়েদের শ্বশুরের নাম জুলফিকার হায়দার এবং শাশুড়ির নাম মাহফুজা আক্তার। গত বছর জান্নাতুল ফেরদৌস জুঁইয়ের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। এ বছরের ১০ জুন সন্তানের জনক হয় আকায়েদ। আকায়েদের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আকায়েদ সন্তান হওয়ার খবর পেয়ে এ বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর দেশে এসেছিল। এক মাস অবস্থানের পর ২২ অক্টোবর সে আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যায়। সূত্র আরো জানায়, এর আগে ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে আকায়েদ দেশে এসে জুঁইকে বিয়ে করে। আকায়েদ উল্লাহর শ্যালক হাফিজ মাহমুদ বলেন, এ বছর আকায়েদ দেশে আসার পর তার সঙ্গে দেখা হয়েছে। তবে তারা কোনভাবেই টের পাননি সে এ ধরনের কাজে জড়িত হয়েছে কি-না। সে সাধারণ মুসল্লির মতো মসজিদে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত।
গত সোমবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারের কাছে পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনালে বিস্ফোরণ ঘটে। এর সঙ্গে আকায়েদ উল্লাহ নামে এক বাংলাদেশি যুবকের সংশ্লিষ্টতা পায় নিউইয়র্ক পুলিশ। বিস্ফোরণে তার শরীর পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি জখম হয়েছে। এখন সে হাসপাতালে রয়েছে। আকায়েদের বাড়ি বাংলাদেশের চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাবা-মায়ের সঙ্গে সে যুক্তরাষ্ট্রে যায়। পরে স্থায়ী মার্কিন নাগরিক হিসেবে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে বসবাস করতে শুরু করে।
সিটির উপ-কমিশনার সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনজনকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের ছেড়ে দেয়া হবে। আকায়েদের তথ্য জানার জন্য তাদের নিয়ে আসা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমে ট্যাক্সিক্যাব চালালেও ২০১৫ সালের পর থেকে সে একটি আবাসন কোম্পানিতে বিদ্যুত্ মিস্ত্রির কাজ করতো বলে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আকায়েদ তার দেহের সঙ্গে বাঁধা বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন। জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে আকায়েদ ওই ঘটনা ঘটিয়েছিল বলে নিউইয়র্ক পুলিশের কর্মকর্তাদের দাবি। সিটি কর্মকর্তা সাইফুল বলেন, আকায়েদের নাম প্রকাশের পর বাংলাদেশে তার স্বজনদের অবস্থান নিশ্চিত করতে পুলিশ মাঠে নামে। তারা দুপুরের দিকে আকায়েদের শ্বশুড় বাড়ির ঠিকানা পান। ওই বাড়িতে আকায়েদের শ্বশুর জুলফিকার হায়দার, শাশুড়ি মাহফুজা আকতার ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ভাড়া থাকেন। পরে সেখান থেকে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে সে কী করতো বা তার গতিবিধি কেমন ছিল সে ব্যাপারে স্পষ্ট কোনও ধারণা নেই তার স্বজনদের। এরকমই দাবি করেছেন আকায়েদের চাচাতো ভাই সোহরাব। আকায়েদের সঙ্গে তার গ্রামের বাড়ির লোকজনের কোনও যোগাযোগ ছিল না বলেও স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন তিনি। আকায়েদ ও তার পরিবার নিয়ে কথা বলেছেন সোহরাব। তিনি বলেন, ‘আমার চাচা (সানাউল্লাহ) ঢাকার হাজারীবাগে থাকতেন। সেখানে চাচা একটি মুদি দোকান চালাতেন। সেখান থেকে তারা আমেরিকা গেছেন। আকায়েদ আমাদের চাচাতো ভাই। ওরা ঢাকায় থাকতো, গ্রামে তেমন একটা আসে না। ছোটবেলাতেই ওরা ঢাকা চলে যায়। যোগাযোগ তেমন একটা নাই, আসা-যাওয়া নাই। তাই আমরা খুব বেশি কিছু জানি না। সোমবার টিভিতে দেখেছি। পরে থানা থেকে আমাকে ফোন দিয়েছিল। আমি যা যা জানি তাদের বলেছি। পরে তারা আমাকে থানায় যেতে বলেছে। আমি তো চট্টগ্রাম থাকি, তাই আজ মঙ্গলবার সন্দ্বীপ যাচ্ছি। সেখানে গিয়ে থানা পুলিশের সঙ্গে কথা বলব।’
সোহরাব বলেন, ‘আকায়েদরা চার ভাইবোন। সে বিয়ে করছে চাঁদপুরে। বিয়ের পরে আমরা জানতে পেরেছি এ কথা। তার একটি ছেলে আছে বলে শুনেছি। তবে বয়স কতদিন বলতে পারি না। তার বড় বোনের শ্বশুরবাড়িও চাঁদপুরে।’ তিনি বলেন, ‘আমার চাচা ফ্রিডম ফাইটার (মুক্তিযোদ্ধা) ছিলেন। ২০০৯ বা ২০১০ সালের দিকে তারা যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন। ২০১১ সালের শেষ দিকে আমি কয়েকদিন দেশে থেকে আসি। তার আগেই আমার চাচা আমেরিকা চলে গেছেন। তিনি সেখানেই মারা গেছেন। আকায়েদ তার বড় সন্তান। সেখানে সে কী কাজ করতো জানি না। তার বাকি তিন ভাইবোন কী করে জানি না। যোগাযোগ তেমন একটা নাই। ওরাও তেমন যোগাযোগ করে না, আমরাও করি না।’ পুলিশ তার কাছে আকায়েদের সম্পর্কে কি জানতে চেয়েছে সে সম্পর্কে সোহরাব বলেন, ‘আকায়েদের শ্বশ্বরবাড়ি কোথায়, সন্দ্বীপে তাদের সম্পত্তি আছে কিনা, থাকলে সেগুলো কারা দেখে এসব।’
আকায়েদের বাড়ি সন্দ্বীপের মুসাপুর ইউনিয়নে ভুটান বা বোতান তালুকদারের বাড়ি হিসেবে পরিচিত। আর নানাবাড়ি সন্দ্বীপের গাছুয়া আলম ডাক্তারের বাড়ি। সেখানে এখন শুধু তার খালু তুসান কোম্পানি থাকেন। তাদের সঙ্গে সোহরাবের কোনও যোগাযোগ নেই। আকায়েদের পরিবারের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া প্রসঙ্গে সোহরাব বলেন, ‘নোয়াখালীর সাবেক এমপি ওবায়দুল হক তার চাচার ভায়রা। তাদের মাধ্যমেই তার চাচা ও তার পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন।’
 মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরো কঠোর অভিবাসী আইন আশা করছেন কংগ্রেসের কাছ থেকে। তিনি আত্মীয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী আনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। সোমবার নিউইয়র্কে বাস স্টেশনে হামলার পর তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমেই অভিবাসী আইন কঠোর করতে হবে। আর এটা নিউইয়র্কে হামলায় প্রমাণিত হলো। সোমবার হোয়াইট হাউস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, কংগ্রেসকে অভিবাসী নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। বিশেষ করে আত্মীয়ের ক্ষেত্রে। ট্রাম্প বলেন, সোমবার যে ব্যক্তিটি আমাদের দেশে হামলা করেছে সে আত্মীয়তার বন্ধন দেখিয়ে এই দেশে প্রবেশ করেছে। এটা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। ট্রাম্প বলেন, অবৈধ অভিবাসীদের গ্রেপ্তারে অভিবাসন কর্মকর্তাদের ক্ষমতা আরো বাড়ানোর ক্ষেত্রে কংগ্রেসকে সমর্থন দিতে হবে। যেসব অভিবাসী সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে যুক্ত হবে তাদেরকে কঠোর শাস্তি দিতে হবে, সেটা মৃত্যুদণ্ড হলেই ভাল হয়, বলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। হামলাকারী আকায়েদ উল্লাহ এফ-৪৩ ক্যাটাগরিতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। মা, বাবা, ভাই-বোন কেউ যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাস করলে এই ভিসায় যাওয়া যায়। আকায়েদ উল্লাহ দেশটিতে বৈধ অভিবাসী ছিল বলে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি নিশ্চিত করেছে।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন