আজ বৃহঃপতিবার, ২১ জুন ২০১৮ ইং, ০৭ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



রোমান সাম্রাজ্যের বিজয় ও কোরআনে ভবিষ্যতবাণী

Published on 13 December 2017 | 5: 31 am

৭ম শতাব্দীতে বিশ্বের দুই পরাশক্তি ছিল, পার্সিয়ান আর রোমান। আনুমানিক ৬০৩ খ্রিস্টাব্দের দিকে রোমানদের সাথে পার্সিয়ানদের যুদ্ধ শুরু হয়। পার্সিয়ানরা এক এক করে রোমান সাম্রাজ্য দখল করে নিচ্ছিল। রোমানরা ছিল খ্রিস্টান, অন্যদিকে পার্সিয়ানরা ছিল অগ্নিপূজক। এক পর্যায়ে যুদ্ধটা ধর্মীয় যুদ্ধে রুপ নেয়। যাই হোক, ৬১৫ খ্রিস্টাব্দে পার্সিয়ানরা দামেশক, বায়তুল মাকদিস পর্যন্ত দখল করে নেয়। পার্সিয়ান সম্রাট খসরু পারভেজ কায়সায় হেরাক্লিয়াস এর নিকট যে পত্রটি লিখেছিল, তাতে স্পষ্টই বুঝা যায়, যুদ্ধটা ধর্মীয় যুদ্ধে রুপ নিয়েছিল।

সকল খোদার বড় খোদা, সমগ্র পৃথিবীর অধিকারী খসরুর পক্ষ থেকে, তার নীচ ও মূর্খ বান্দা হেরাক্লিয়াস এর নামে- তুমি বলে থাকো তোমার খোদার প্রতি তোমার আস্থা আছে, তোমার খোদা আমার হাত থেকে জেরুশালেম রক্ষা করলেন না কেন?”

যাই হোক, সেসময় মক্কায় চলছিল, রাসূল সাঃ এর সাথে মুশরিকদের নতুন এক প্রকার যুদ্ধ। রোমানদের পরাজয়ের খবর শুনে মক্কার মুশরিকরা খুশী হয়েছিল, কারণ পার্সিয়ানরাও তাদের মতো পৌত্তলিক, অন্যদিকে মুসলিমদের সাথে রোমানদের আছে অনেক মিল, উভয়েই রেসালাত, আসমানী গ্রন্থ, আখিরাত ইত্যাদিতে বিশ্বাসী ছিল। তাই রোমানদের এই বিজয়ে মুসলিমরা দুঃখিত হয়েছিল। মুশরিকরা এই নিয়ে মুসলিমদের সাথে ঠাট্টা করতে লাগল।

আল্লাহ তখন কোরআনে নাযিল করলেন-

غُلِبَتِ الرُّومُ

রোমকরা পরাজিত হয়েছে” (সূরা রুমঃ ২)

পরের লাইনে রোমানদের বিজয়ের ভবিষ্যতবাণী করা হয়েছে। ভবিষ্যতবাণীটি এমন সময় করা হয়েছে যখন রোমান সাম্রাজ্যের আর উঠে দাঁড়ানোর কোন শক্তি নেই।

فِي أَدْنَى الْأَرْضِ وَهُم مِّن بَعْدِ غَلَبِهِمْ سَيَغْلِبُونَ

নিকটবর্তী এলাকায় এবং তারা তাদের পরাজয়ের পর অতিসত্বর বিজয়ী হবে,

فِي بِضْعِ سِنِينَ ۗ لِلَّهِ الْأَمْرُ مِن قَبْلُ وَمِن بَعْدُ ۚ وَيَوْمَئِذٍ يَفْرَحُ الْمُؤْمِنُونَ

কয়েক বছরের মধ্যে। অগ্র-পশ্চাতের কাজ আল্লাহর হাতেই। সেদিন মুমিনগণ আনন্দিত হবে। (সূরা রুমঃ ৩-৪)

কোরআনে এখানে অনেকগুলো ভবিষ্যতবাণি করা হয়েছে। একটা হল, রোমানরা বিজয় লাভ করবে কয়েক বছরের মধ্যে। এরাবিক যেই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে তা হলো, بِضْعِ শব্দটি তিন থেকে নয় বছরের জন্য ব্যবহৃত হয়। আবু বকর রাঃ যখন মুশরিকদের সাথে ১০ টি উটের বাজি ধরলেন যে, তিন বছরের মধ্যে রোমানরা জয়লাভ করবে, তখন রাসূল সাঃ তাঁকে বলেছিলেন, সতর্কতার জন্য তোমার এই বাজি রাখা উচিত ছিল ১০ বছরের জন্যে। কেননা  بِضْعِ শব্দের প্রয়োগ হয়ে তিন থেকে নয় বছরের উপর”

আমি নিচে কয়েকটি অনুবাদ দিলাম।

  • Within three to nine years. To Allah belongs the command before and after. And that day the believers will rejoice. [Sahih International]
  • Within three to nine years. The decision of the matter, before and after (these events) is only with Allah, (before the defeat of Romans by the Persians, and after, i.e. the defeat of the Persians by the Romans). And on that Day, the believers (i.e. Muslims) will rejoice (at the victory given by Allah to the Romans against the Persians). [Muhsin Khan]
  • Within ten years– Allah’s is the command in the former case and in the latter – and in that day believers will rejoice. [Pickthall]
  • (তিন থেকে নয় -এ) বিজোড় বছরের মধ্যেই (এ ঘটনা ঘটবে) [হাফেজ মুনীর উদ্দীন 8]

আল-হামদুলিল্লাহ। কোরআনের এই বাণী সত্য হয়েছিল। রোমানরা পার্সিয়ানদের থেকে জেরুযালেম এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চল হেরাক্লিয়াস এর নেতৃত্বে দখল করে। ৬২৪ সালে রোমানদের জরথ্রুষ্টের জন্মস্থান আরমিয়াহ (Clorumia) ধ্বংস করে এবং ইরানীদের সবচেয়ে বড় অগ্নিকুন্ড ভেঙ্গে ফেলে। অর্থাৎ ৯ বছরের মধ্যেই রোমানরা পার্সিয়ানদের উপর বিজয় লাভ করে চূড়ান্তভাবে।

কোরআনে আরোও বলা হয়েছে, ‘নিকটবর্তী অঞ্চলে’, এরাবিক أَدْنَى (আদনা)। এই শব্দটির দুটি অর্থ হয়। ১। নিকটবর্তী ২। সর্বনিম্ন । হাফেজ মুনীর উদ্দীন অনুবাদ করেছেন-

“রোম (জাতি) পরাজিত হয়ে গেছে, (পরাজিত হয়েছে) ভূমন্ডলের সবচাইতে নিচু অঞ্চলে”। (সূরা রুম ২-৩)

আল হামদুলিল্লাহ। কোরআনের এটা একটা সাইন্টিফিক মিরাক্কেল। রোমানদের সাথে পার্সিয়ান দের যুদ্ধটি হয়েছিল, ডেড সী এলাকায়। আজ আমরা জানি, ডেড সী পৃথিবীর সবচাইতে নিচু এলাকা, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে  ৪২৩ মিটার বা ১৩৮৮ ফিট নিছে অবস্থিত!

৩য় ভবিষ্যতবাণীটি হল, ঐ সময় মুমিনরা আনন্দ করবে। আগে ও পরের ঘটনা ও আয়াত গুলোতে এটা প্রকাশ্যই ধরা পড়ে, রোমানদের বিজয়ে মুমিনরা খুশী হবে। কিন্তু, যেই সময় রোমানরা পার্সিয়ান দের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করে, ঠিক একই বছর মক্কার মুশরিকদের বিরুদ্ধে মুসলিমরা বদরে মুখোমুখি হয়। এবং সুবহানাল্লাহ, বিজয় লাভ করে।  

সেদিন মুমিনগণ আনন্দিত হবে। আল্লাহর সাহায্যে। তিনি যাকে ইচ্ছা সাহায্য করেন এবং তিনি পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।” (সূরা রুমঃ ৩-৪)

“And that day the believers will rejoice. In the victory of Allah . He gives victory to whom He wills, and He is the Exalted in Might, the Merciful.” (Sura Rum: 3-4)

কোরআনের এই ভবিষ্যতবানি সত্য হওয়ার পর, মক্কার অনেক মুশরিক ইসলাম গ্রহণ করে। আল হামদুলিল্লাহ। এটাই কোরআন, আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত, যা কোন মানুষের পক্ষে এই রকম কিছু রচনা করা সম্ভব নয়। আল্লাহ্‌ অবশ্যই অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সম্পর্কে অবগত। আল্লাহ্‌ দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান সব কিছুই জানেন।


সহায়িকাঃ

১। সাইয়্যেদ আবু আ’লা মওদুদী, তাফহীমুল কোরআন, ভলিউম-১১, সূরা রূম এর তাফসীর।
২। ইমাম ইবনে কাসীর, তাফসীরে ইবনে কাসীর, পঞ্চদশ খন্ড (ডঃ মোহাম্মদ মুজীবুর রহমান কর্তৃক অনূদিত), পৃষ্ঠা ৬২১।
৩। http://quran.com/30
৪। কোরআন মাজীদ, আল কোরআন একাডেমী লন্ডন কর্তৃক প্রকাশিত।
৫। http://www.speed-light.info/miracles_of_quran/earth.htm


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন