আজ শুক্রবার, ২৭ এপ্রিল ২০১৮ ইং, ১৪ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



শাহ বাঙালিকে যথাযথ সম্মান এবং তাঁর সৃষ্টি ও স্মৃতির সংরক্ষন সরকারের নৈতিক দায়িত্ব

Published on 12 December 2017 | 7: 22 pm

বাংলার চারণ কবি শাহ বাঙালি খ্যাত মরহুম শফি উল্লাহকে যথাযথ সম্মান দিয়ে তাঁকে (একুশে পদক, স্বাধীনতা পদকসহ) জাতিয় পুরস্কারে ভূষিত করা, তাঁর সৃষ্টি ও স্মৃতির যথাযথ সংরক্ষন নিশ্চিত করা কোন দাবির বিষয় নয় বরং জাতি হিসেবে বাঙালীর এবং রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জাতীয় কর্তব্য কর্ম বটে। 

:: এম.এ. হাশেম আকাশ ::



বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া এ মহাণ ব্যক্তিত্বের ব্যক্তি জীবন ও দেশমাতৃকার প্রতি তাঁর অবদানের সংক্ষিপ্ত কিছু বিষয় নতুন প্রজন্মের অবগতির জন্য তুলে ধরা হলঃ

বাঙলা ও বাঙালির স্বাধীকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অথচ অবহেলিত নাম শাহ বাঙালি ওরফে শফি উল্লাহ। দেশ মাতৃকার স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্বমুহুর্তে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহযোগী ও সার্বক্ষনিক সহচর ছিলেন তৎকালীন দুই বাংলার চারণ কবি মো. শাহ বাঙালি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় প্রীতিলতা সেন ও মাষ্টারদা সূর্য্যসেনের অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পূর্ব থেকে গান গাইতেন এ শব্দ সৈনিক। ভাষা আন্দোলনকে চাঙ্গা করার জন্য যিনি অনেকগুলো গান রচনা করেছিলেন এবং নিজ সুরে ও নিজ কন্ঠে সেসব গান গেয়ে এদেশের মানুষকে উজ্জীবিত করেছিলেন। ভাষা আন্দোলনের তেমনি একটি জাগরণী গান ছিল-ওরে বাঙালি/ভাষার তরে ঢাকার শহর/বুকের রক্তে রাঙ্গালি / আর কত দুঃখ সইবে বাঙালি । শাহ বাঙালি ছিলেন একাধারে চারণ কবি, গনসঙ্গীত শিল্পী, ভাষা সৈনিক, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত শিল্পী, বঙ্গবন্ধুর জনসভা মঞ্চের নিয়মিত গায়ক ও গণজাগরনের নেতা। তিনি সুশাসন, গণতন্ত্র ও বাঙালি জাতির প্রকৃত মুক্তির জন্য আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন।
মেধাবী এ গীতি কবি মুহুর্তের মধ্যে গান রচনা করতে পারতেন যা ছিল এক অভাবনীয় ঘটনা। রেডিও এবং টিভিতে কখনো ক্রিপ্ট জমা দেয়ার প্রয়োজন হতো না তাঁর। নিজের কথা ও সূরে অবিরাম গাইতে পারতেন এ গুণী শিল্পী। বঙ্গবন্ধুর কমপক্ষে প্রায় ৭০টির অধিক জনসভার মঞ্চে গান পরিবেশন করেছিলেন বলে জানা যায়। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র মাতিয়ে রাখতেন পুঁথি পাঠ ও জাগরনের গান গেয়ে। দেশাত্মবোধক গান আর জারি গান গেয়ে জাতিকে জাগাতেন সন্দ্বীপে জন্ম নেয়া এই সুর্য সন্তান। বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তার গান ও জারিগানগুলো সে সময় সকল মুক্তিযাদ্ধা সহ পুরো জাতিকে অনু প্রানিত করার ক্ষেত্রে অনবদ্য অবদান রেখেছিল এবং বিশ্ব বিবেক কে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছিল।
স্টেজে বা জনসভায় হাজার হাজার দর্শক কে মাতিয়ে তুলতেন তার যাদুকরি গান আর ছন্দের তালে । যুদ্ধের আগে ও পরে তিনি বঙ্গবন্ধুর সাথে সারা বাংলাদেশ চষে বেডিয়েছেন ।
তার গানের চরন আর সুরের মিলনে যাদুকরি মাতোয়ারায় মুগ্ধ হয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বয়ং যাকে উপাধী দিয়েছিলেন” বাংলার চারনকবি “। শুধু তাই নয় তিনি যুদ্ধের সময় লিখেছিলেন অসাধারন কিছু দেশাত্মবোধক গান এবং সেগুলোর সুর ও দিয়েছিলেন তিনি নিজেই । আর এ সমস্ত গান গুলো গেয়ে শিল্পী আব্দুল জব্বার সহ তখন কার স্বাধীন বাংলার বেতার কেন্দ্রের শিল্পীরা দেশ জোড়া খ্যাতি অর্জন করেছিলেন । ” মুজিব বাইয়া যাও রে , নির্যাতিত দেশের মাঝে জনগনের নাও রে মাঝি ” আব্দুল জব্বারের গলায় তার এই গানটি তো তখন বাংলার মানুষের মুখে মুখে ছিল । এছাড়াও তার আরও অনবদ্য কিছু সৃষ্টির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল, বিশ্ববাসীর কাছে রইল আবেদন বন্ধ কর বাঙালির উপর খানের নিযার্তন”, “ছলে বলে ২৪ বছর বাংলা খাইলা চুষি- জাতিরে বাঁচাইতে গিয়ে মুজিব হইল দোষী”, ” আমরা ছাডবোনা ছাডবোনা, মুক্তিযাদ্ধের সংগ্রাম আমরা ছাডবোনা “, ” ও রে এ বাংগালী ভাষার তরে ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি ” যেসব গান ছিল তখন বাংলার মানুষের মুখে মুখে । বৃটিশ বিরোধী যে গানটি দিয়ে তিন প্রথম পরিচিতি পান সেটি ছিল- ‘ব্রিটিশ চলিলরে গাট্রি বোচকা লইয়া- বীর বাঙালি আসো সবাই তৈরী হইয়া’। এ রকম আরও অসংখ্য গান যার বেশীর ভাগই যথাযথ সংরক্ষনের অভাবে কালের স্রোতে হারিয়ে গেছে।
১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে সন্দ্বীপ ম্যাজিষ্ট্রেট কোর্টের সামনে আয়োজিত এক সঙ্গীত প্রতিযোগীতায় তিনি প্রথম হয়েছিলেন বলে জানা যায়, যে প্রতিয়োগীতায় উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন ছাতা, হারিকেন ও টর্চলাইট। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে সন্দ্বীপ কার্গিল হাই স্কুল মাঠে নির্বাচনী জনসভায় গান গেয়ে আওয়ামী লীগের নেতা এম এ আজিজের দৃষ্টি কাড়েন। একই নির্বাচনে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে গান গেয়ে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মনোযোগ আকর্ষন করেন এবং সোহরাওয়ার্দী তাকে নগদ ২ শ টাকা পুরষ্কার প্রদান করেন। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম হলের অনুষ্ঠানে গান পরিবেশনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সাথে পরিচয় হয় তাঁর। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ৬ দফার সমর্থনে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্থান জুড়ে প্রচারনা চালান তিনি। বেতারের নিয়মিত শিল্পী হিসাবে সর্বশেষ প্রতিটি গানের জন্য ৩ হাজার ৬ শ টাকা সম্মানি পেতেন, যা ছিল বেতারের সর্বোচ্চ সম্মানি। পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের রোষানল ও নির্যাতন হতে রক্ষার কৌশল হিসেবে দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও দূরদর্শী সাংবাদিক মো. তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এ শব্দ সৈনিকের নাম শফি উল্লাহ থেকে পরিবর্তন করে ছদ্ম নাম দেন “শাহ বাঙালি”। সেই থেকে তিনি বাঙালীর প্রিয় “শাহ বাঙালি”। ।
১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের প্রলয়ংকরী ঘুর্ণিঝড়ে তাঁর বাড়িঘর সহ সহায় সম্পদ বন্যায় ভেসে যায়। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের পট পরিবর্তনের পরও সরব ছিলেন এই সাহসি সৈনিক। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বস্ত্র মন্ত্রী আবদুল লতিফ ছিদ্দিকির মাধ্যমে গনভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করেছিলেন তিনি। ফেরার সময় প্রধানমন্ত্রী শাহ বাঙালিকে ৫০ হাজার টাকাও দিয়েছিলেন। মন্ত্রী লতিফ ছিদ্দিকিও তাঁর পকেটে গুজে দিয়েছিলেন কিছু টাকার একটি প্যাকেট। কিন্তু টাকা দিয়ে এ গুণী ব্যক্তির দায় যে পরিশোধের নয় তা বলাই বাহুল্য।
মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে এই ত্যাগী মানুষের একুশে পদক পাওয়ার কথা বিভিন্ন মহলে ব্যাপক ভাবে আলোচিত হয়। বিষয়টি তাঁর কানে গেলেও তিনি কোন মন্তব্য করেননি। তবে মনে মনে হয়তো আশা করেছিলেন জীবদ্দশায় নিজের প্রাপ্য সম্মাননা নিজেই গ্রহণ করতে পারবেন। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তিনি পদকটি পাননি। নাম বাদ পড়ার পর কিছুটা ক্ষোভ যে কাজ করেছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় সন্দ্বীপ লেখক ফোরাম এর কার্যনির্বাহী পরিষদের সম্মানিত সদস্য কাজী শামছুল আহসান খোকনকে যখন তিনি বলেন যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুজিব কন্যা শেখ হাসিনা চূড়ান্ত তালিকা প্রনয়নের সময় বাংলাদেশে থাকলে আমি নিশ্চয়ই মনোনীত হতাম। প্রাপ্য সম্মান না পাওয়ায় কিছুটা ক্ষোভ ও হতাশা থাকলেও তা কারো কাছ প্রকাশ করতে চাইতেন না তিনি।
মো. শাহ বাঙালি সন্দ্বীপে জীবন কাটাতেন চরম অভাব অনটনে। ইজ্জতপুরের বাড়ি সাগর গর্ভে বিলীনের পর হরিশপুর লেমু হোসেনের বাড়ী সংলগ্ন রশিদ পেশকারের বাগিচাইয় দেড় কড়া জায়গা কিনে সেখানেই থাকতেন। কবিরাজি করে, বেতারে গান গেয়ে এবং মাস শেষে পাওয়া মুক্তিযোদ্ধা ভাতা দিয়ে চলত তার জীবন। বড় সংসার ছিল বলে অভাব ছিল সেখানে নিত্য সঙ্গী। অভাবের কারণে ছেলে মেয়েদের তেমন পড়ালেখা করাতে পারেননি। মৃত্যুর সময় ২ মেয়ে অবিবাহিত ছিলো। ছেলেরাও বেকার সর্বশেষ অবস্থা অবশ্য জানা নেই। শেষ জীবনে কানে একটু কম শোনতেন এবং চোখেও সামন্য সমস্যা ছিল। এছাড়া তেমন কোনো অসুখ বিসুখ ছিল না। মৃত্যুর পূর্বে রমজান মাসে সন্দ্বীপের বিছিন্ন ইউনিয়ন উড়িরচরে সড়ক দুঘর্টনায় বড় ছেলে হুমায়ুন বাঙালির তৎক্ষনাত মৃত্যুতে ভেঙে পড়েন তিনি। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তায় হঠাৎ করে তিনি অসুস্থতা অনুভব করেন। ১৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে যাওয়ার পর সিএসসিআরে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জামাল আহমদের কাছে নিয়ে যান তার বন্ধু প্রাবন্ধিক মহসিন কাজী ।
ডা. জামাল আহম্মেদ তার পরিচয় পেয়ে যথাযথ সম্মান করেন এবং বিনা ফিতে চিকিৎসা করেন। পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে পরদিন ডাক্তার দেখিয়ে তিনি সন্দ্বীপ ফিরে যান। ১২ অক্টোবর আবার অসুস্থ হয়ে পড়লে মো. শাহ বাঙালিকে সন্দ্বীপ সেন্ট্রাল ক্লিনিকে নিয়ে যান সন্দ্বীপ পৌরসভা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাফর উল্যা টিটু । সেখানে অবস্থা আরও খারাপ হলে ১৫ অক্টোবর দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে ভর্তি করা হয় ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে। সেখানেই অনেকটা বিনা চিকিৎসায় ২০১০ সালের ১৬ অক্টোবর রাত প্রায় সাড়ে ১২ টার সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বাঙালি জাতির অন্যতম এ শ্রেষ্ঠ সন্তান মো. শাহ বাঙালি। যতদূর জানা যায়, তাঁকে কবর দেয়া হয়েছিল মেয়ের বাড়ী মুছাপুরে । কিন্তু তাঁর স্মৃতি রক্ষায়ও উল্লেখযোগ্য কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি অদ্যাবধি।
দেশ বিদেশ খ্যাত এ গুণী শিল্পী মো. শাহ বাঙালির আসল নাম ছিল মো. শফি উল্লাহ তা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ১৯৮২ সালে চট্টগ্রাম জেলার মূল ভূখন্ড হতে নদী দ্বারা বিছিন্ন দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের ইজ্জতপুর ইউনিয়নের রূহিনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মো. খুরশীদ আলম মিয়া। তিনি সংগীত অনুরাগী ছিলেন এবং স্বরচিত গান গাইতেন। ২ ভাই ২ বোনের মধ্যে মো. শফি উল্লাহ ছিলেন তৃতীয়। তাঁর অপর ভাই নৌ বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. এনায়েত উল্লাহ। ৬ ছেলে ও ৭ মেয়ের জনক ছিলেন মো. শাহ বাঙালি। ব্যক্তিগত জীবনে বিয়ে করেছিলেন ৩ টি। প্রথম স্ত্রী মৃত্যুবরণ করেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন ছিল বলে জানা যায়। জীবনের শেষ সময় কেটে ছিল তৃতীয় স্ত্রীর সাথে। ইজ্জতপুর বোর্ড স্কুলে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেন তিনি। দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময় বাবার উৎসাহে ছন্দ মিলিয়ে গান রচনা এবং নিজের সুরে গাওয়ার বিষয়টি আয়ত্ব করেন। দেশের এই বিশিষ্ট শিল্পী চট্টগ্রাম গেলে থাকতেন পুরাতন গীর্জার ৫০ টাকা ভাড়ার গির্জা বোর্ডিংয়ে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব বেশীদূর আগাতে না পারলেও বিশাল মনের অধিকারী এবং বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। জীবিত কালে বংগবনধু তাকে একটা বাড়ী উপহার দিয়েছিলেন । কিন্তু বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ার পর বড়ই অসহায় হয়ে পরেন তিনি । শেষ জীবনে শারীরীক অসুস্থতা ও দুখ কষ্টে এবং দরিদ্রের কষাঘাতের মধ্য দিয়েই এ জীবনের ওপারে চলে গেলেন । শেষ জীবনে জাতির এই বীর সন্তানের খবর রাখেন নি কেউ । পাননি কোন বিশেষ সম্মাননা বা জাতীয় কোন পদকও। কয়েক বছর আগে ক্যাথরিন মাসুদ ওনাকে নিয়ে অসাধারন একটা প্রামান্য চিত্র তৈরী করেছিলেন মুক্তি যুদ্ধের উপর । এছাড়াও কেউ কেউ নাকি মুক্তিযাদ্ধের চলচিত্রের উপর নির্মিত কিছু ছবিতে তার সেই যুদ্ধের সময় গাওয়া জারী , পুঁথি ও সংগ্রামী গান গুলো স্থান দিয়েছিলেন। কিন্তু সেগুলোতেও তার অনুমতি নেয়া হয়েছে এবং তাকেঁ কোন রয়্যালটি দেয়া হয়েছে এমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না ।
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মো. শাহ বাঙালির আকস্মিক মৃত্যুতে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র-সন্দ্বীপ শাখা ও সন্দ্বীপ সাহিত্য সংসদের যৌথ উদ্যোগে শোক ও আলোচনা সভা ২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়। সন্দ্বীপ উপজেলার এনাম নাহার হাই স্কুল মোড় মোহাম্মদ মিয়া কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন ও স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র সন্দ্বীপ শাখার প্রধান সংগঠক মাষ্টার আবুল কাসেম শিল্পী। বক্তব্য রাখেন সাবেক ছাত্রনেতা উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক মো. আলী খসরু, দেলোয়ার হোসেন সন্দ্বীপি, পৌরসভা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাফর উল্যা টিটু, কবি কাজী শামছুল আহসান খোকন এবং সন্দ্বীপ লেখক ফোরাম এর চেয়ারম্যানগণজাগরণের নেতা মো. শফি ওরফে শাহ বাঙালি স্মরনে অপর এক শোক সভা ২৭ অক্টোবর বিকেলে পূর্ব সন্দ্বীপ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
সভায়, বঙ্গবন্ধুর জনসভার নিয়মিত গায়ক মো. শাহ বাঙালির বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন প্রবীন কবিয়াল ও শিক্ষক কে এম আজিজ উল্যা, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র সন্দ্বীপ শাখার প্রধান সংগঠক মাষ্টার আবুল কাসেম শিল্পী, প্রাবন্ধিক ডা. আতাউল হাকিম, কবি কাজী শামছুল আহসান খোকন, সন্দ্বীপ পৌরসভা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাফর উল্যা টিটু, পূর্ব সন্দ্বীপ হাই স্কুল পরিচালনা পরিষদ সদস্য মাষ্টার কামাল উদ্দীন তালুকদার, সন্দ্বীপ সাহিত্য সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক বাদল রায় স্বাধীন, সোনালী সন্দ্বীপ পাঠক ফোরাম সন্দ্বীপ শাখার সভাপতি আসিফ আকতার, প্রভাষক ফসিউল আলম, সন্দ্বীপ লেখক ফোরাম এর যুগ॥ মহাসচিব নূরুন নবী রুমী, মাসিক সোনালী সন্দ্বীপ সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন মনি প্রমুখ। একুশে পদকের জন্য মনোনিত মো. শাহ বাঙালি স্মরনে শোক সভাটি পরিচালনা করেন শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সন্দ্বীপ লেখক ফোরাম এর মহাসচিব সাইফুল ইসলাম ইনসাফ।
শোক সভায় বক্তরা বলেন, মো. শাহ বাঙালি বঙ্গবন্ধুৃর ৬৬ টি জনসভার মঞ্চে নিয়মিত গান পরিবেশন করেছিলেন। বক্তরা আরো বলেন, ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার শান্তি নিকেতনে আয়োজিত প্রতিযোগীতায় তিনি প্রথম হয়েছিলেন। ঐ সময় কলকাতার ৪ টি স্থানে তাঁকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রামের ডিসি হিল পার্কে ও সম্প্রতি সিলেটের শাহজাহান উল্যাহ পাওয়ার জেনারেশন নামের একটি কোম্পানি তাঁকে সংবর্ধনা দেয়। এছাড়া ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে এপার ওপার বাংলার শিল্পীদের যৌথ উদ্যোগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত লোক উৎসবে ওপার বাংলার শিল্পীরা মুলতঃ শাহ বাঙালির গান পরিবেশন করেছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্বরচিত পুঁথি পাঠক মো. শাহ বাঙালি স্মরনে আয়োজিত শোক সভাটি পৃষ্ঠপোষকতা করে সন্দ্বীপের অভিজাত পুস্তক বিপনী কেন্দ্র মেসার্স শিক্ষক লাইব্রেরী।
সন্দ্বীপের সাবেক সংসদ সদস্য আলহা্জ্ব মুস্তাফিজুর রহমান জীবিত থাকাকালে প্রতি মাসে তাঁকে ২ হাজার টাকা সম্মানি দিতেন। মুস্তাফিজের মৃত্যুর পর কাতার প্রবাসী সমাজকর্মী নুরুল মোস্তফা খোকনও তাঁকে প্রতি মাসে ২ হাজার টাকা সম্মানি দিতেন। বাঙালি জাতি সত্ত্বার মূল ভিত্তিই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করতে শাহ বাঙালির অবদান অপরিমেয়।
বাঙালি জাতি ও দেশ মাতৃকার কল্যানে যিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। দেশের স্বাধীকার আন্দোলন ও এদেশের মুক্তি সংগ্রামে যার এত অপরিসীম অবদান এবং বিশেষভাবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দ সৈনিক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের যে জাগরনী বার্তা তিনি সবার মাঝে জাগিয়েছিলেন সে তুলনায় এ জাতি তাকে কোন বিশেষ সম্মান বা মর্যাদা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে তা বলাই বাহুল্য।
তাই জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সেই ” বাংলার চারনকবি ” ও বাঙালি জাতির এক সাহসী বীর ও শব্দ সৈনিক শাহ বাঙালি ওরফে শফি উল্লাহর নিকট এ জাতির ঋণ তথা দায় অসীম। আর এ অসীম ঋণের বোঝা হালকা করতে তার প্রতি যথাযথ সম্মান দিয়ে তাঁকে (একুশে পদক, স্বাধীনতা পদকসহ) জাতিয় পুরস্কারে ভূষিত করা, তাঁর সৃষ্টি ও স্মৃতির যথাযথ সংরক্ষন নিশ্চিত করা কোন দাবির বিষয় নয় বরং জাতি হিসেবে বাঙালীর এবং রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জাতীয় কর্তব্য কর্ম এতে কোন সন্দেহ নেই। জাতি ও রাষ্ট্রের কর্ণধারগণ অনতিবিলম্বে এ সত্য উপলদ্ধি করবেন এবং যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবেন, সেটাই কাম্য।


Advertisement

আরও পড়ুন