আজ মঙ্গলবার, ১৯ জুন ২০১৮ ইং, ০৫ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



সুন্দর সোনার সন্দ্বীপটাকে রক্ষা করুণ (দ্বিতীয় পর্ব)

Published on 12 December 2017 | 11: 01 am

:: আকতারুজ্জামান মোহাম্মদ মোহসীন ::


অত্যন্ত দুঃখের সাথে আগেই বলেছি যে, এত উন্নয়নের জোয়ারে আমাদের জম্মস্থান সন্দ্বীপের গায়ে তার কোন ছোঁয়া পরেনি । নদী শাসনের কোন ব্যবস্থা না থাকায় পুরো সন্দ্বীপকে দিনে দিনে সাগর নদী গিলে খেয়ে ছোট করে ফেলছে । তা এখনো থেমে নেই, নিত্য নদী গর্ভে বিলীন হয়েই চলছে । আবাদী জমি, মানুষের বসতি নদী গর্ভে বিলীন হচ্ছে । সেই সাথে আবাদী জমি বসত বাড়ীতে রুপান্তর হয়ে কৃষি জমি কমছে । তার কারণে কৃষি উৎপাদন দিনে দিনে কমে শুন্যের কোঠার দিকে এগিয়ে চলেছে । মানুষ নিজেদের বাঁচানোর তাগিদে শহর মুখী হয়ে পরছে । সবই কেবল জীবনের নিরাপত্তা আর যাতায়াতের অসুবিধার কারণে । নদীর উপর ভরসা করতে পারছে না, কবে কার বসতি আর আবাদী জমি গ্রাস করে নেবে । চিকিৎসার উপর ভরসা করতে পারছে না কখন উন্নত চিকিৎসা পেতে গিয়ে বাচার বদলে নদীতে ডুবে মরতে হয় । যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আজ অবধি যান চলাচলের রাস্তা তৈরি করা হয়নি । নদী পারাপারের জন্য আজ অবধি সেতু তৈরি করা হয়নি । যদি সমগ্র দেশের উন্নয়নের সাথে এসব হতো, তাহলে হয়ত এখনো আমরা আগের মত পর্যটক, সওদাগরদের পেতাম । অনেক গুনীজনের স্বাক্ষাত পেতাম। তাদের গমনাগমনও সন্দ্বীপের জন্যও কল্যাণ বয়ে আনতে পারতো । আমাদের জম্মস্থানের মানুষগুলোকে যাযাবরের জীবন যাপন করতে হতো না । আপনজন ছেড়ে দেশের বাইরে যেতে হতো না । আমরা আগের মত দুধে ভাতে শান্তিতে থাকতাম ।

আধুনিকতা আর বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় সন্দ্বীপকে চিরকাল অবহেলা করা হয়েছে । এ অবহেলা শত শত বছর ধরে চলে আসছে । নদী শাসনের অভাবে এ দ্বীপ ফসলী জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে । বসতবাড়ি ভাঙ্গার ফলে দিনে দিনে আবাদী জমি কমছে । দিনে দিনে হাট, বাজার, স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, খেলার মাঠ হারিয়ে যাচ্ছে নদীর কারণে । নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে কত শত ঐতিহাসিক নিদর্শন সমূহ । দ্বীপের মানচিত্র দিনে দিনে ছোট থেকে ছোট হয়ে যাচ্ছে তার আয়তন । আগুন সভ্যতা এসেছে সত্য, কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণের সকল আয়োজন ও করা হয়েছে । নদীও সন্দ্বীপের মা, যার গর্ভে সন্দ্বীপের জম্ম । কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণের কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করার কারণে নিজেই ভক্ষন করে উজার করছে নিজের সন্তানকে । অজ্ঞাত কারণে সন্দ্বীপ দীর্ঘদিনেও এগুতে পারেনি । আজ অবধি পিছিয়েই আছে সেই পুরানো দিন থেকে । চরম অবহেলায় আমাদের জম্মস্থান বিদ্যুতের আলো যেমন হারিয়েছে, তেমনি মানুষ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনাও দেখছে না । হারানো মানচিত্র পুনরুদ্ধার করতে দাবী জানিয়ে আসলেও তা পুনঃ উদ্ধার করতে পারছে না । বরং প্রশাসনের উদাসীনতায় দ্বীপের মাটিতে সৃষ্ট চরগুলো এ দ্বীপের বাইরের মানুষের দখলে চলে যাচ্ছে । দিনে দিনে মানুষ নিঃস্ব থেকে আরও নিঃস্বতর হয়ে পরছে । সে দিকে দেশ, জাতি, রাষ্ট্র কারও যেন কোন খেয়াল নেই । অথচ এটা রাষ্ট্র, প্রশাসন, দায়িত্বশীল কেউ এড়িয়ে যেতে পারেন না ।

দ্বীপের বাসীন্দারা সকলে সব সময় নিজেদের সব হারানোর যন্ত্রণা বুকে বয়ে বেড়াচ্ছে । তাদের শান্তনা দেয়ার কোন ব্যবস্থা নেই । শান্তনা দেয়ার চোখে পড়ার মত কোন উদ্যোগও কেউ নেয়নি । দ্বীপের মানুষজন বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির সুবিধার মাঝে দাঁড়িয়েও সকল সুবিধা থেকে বঞ্ছিত । একজন জরুরী চিকিৎসা পাওয়ার রোগী আধুনিক চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্ছিত । স্কুল কলেজগুলো ভাল এবং শিক্ষকের অভাবে আধুনিক মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্ছিত । কোন বিশ্ববিদ্যালয় না থাকায় এ দ্বীপের ছাত্র ছাত্রীরা আধুনিক ও উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্ছিত । বিদ্যুৎ, নিরাপদ সুপেয় পানীয়জল, টেলিযোগাযোগ, সড়ক যোগাযোগ, উন্নত চিকিৎসা, ইত্যাদি সকল সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্ছিত । কর্মসংস্থানের অভাবে দ্বীপের জনশক্তিকে হয়তো বেকার জীবন যাপন করতে হচ্ছে, নয়তো দ্বীপের বাইরে দেশে বিদেশে ছুটে বেড়াতে হচ্ছে । নিজ এলাকার যুবক যুবতীরা কর্মসংস্থান থেকে বঞ্ছিত । দ্বীপটি এমন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, যেন তার কোন অভিভাবক নেই । তাই এমন একটি সুন্দর আর শান্তির জনপদে উন্নয়নের ছোঁয়া আজ অবধি স্পর্শ করেনি ।

অবকাঠামোগত পশ্চাদপদ এই জনপদের মানুষ বার বার দুর্যোগগ্রস্থ হয়ে সারা বিশ্বের সংবাদ শিরোনাম হয়েছে । তাই আন্তর্জাতিক বিশ্বেও এ দ্বীপটি খুব সুপরিচিত । বার বার বন্যা আর জলোচ্ছ্বাসে এ দ্বীপের নিত্য সঙ্গী আর হাজার হাজার মানুষ প্রাণ দিয়ে আসছে । বন্যা, জলোচ্ছ্বাস আর ঘূর্ণিঝড়ে জীবন গেছে লক্ষ লক্ষ গৃহপালিত পশু পাখির । বন্যা, জলোচ্ছ্বাস আর ঘূর্ণিঝড়ে ধ্বংস হয়েছে কোটি কোটি টাকার সরকারী এবং ব্যক্তিগত সম্পদ । নষ্ট হয়েছে অনেক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মন্দির । নিঃস্ব হয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষ । আপনজন হারিয়েছে হাজার হাজার পরিবার । এতিম হয়েছে শত শত শিশু । বিধবা হয়েছে হাজার হাজার নারী । সন্তান হারিয়েছে হাজার হাজার মা বাবা। গৃহহীন হয়েছে অনেক পরিবার । পেশা হারিয়েছে হাজার হাজার মানুষ । কর্মহীন হয়ে হাজার হাজার মানুষকে অসহায় জীবন যাপন করতে হচ্ছে । সন্দ্বীপকে রক্ষা করতে পারলে এসবের হয়তো অনেকটা সুরক্ষা করা যেত, যদি যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নত হতো । একটা সেতু সমৃদ্ধ সড়ক যোগাযোগ থাকলে দ্রুত নিরাপদে দ্বীপান্তর করা স্মভব হতো । নদী শাসন করা হলে ভাঙ্গন রোধ সম্ভব হতো । ভাল করে একটা বেড়ীবাঁধ করা হলে ফসল, গবাদিপশু, মানুষজনকে জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করা যেত । পর্যাপ্ত মান সম্মত নিরাপদ আশ্রয় না থাকায় প্রানহানীর পরিমাণ বেড়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকগুন বেশী ।

বাংলাদেশের মুল ভূখণ্ডের অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাথে আমাদের জম্মস্থান সন্দ্বীপকে যুক্ত করা হলে ঐতিহ্যবাহী দ্বিপটিকে আগের স্থানে ফিরিয়ে আনতে না পারলেও অন্ততঃ বেঁচে যেতে পারে । নদী শাসন করে চরগুলোকে শিল্প নগরীতে রূপান্তর করা হলে দ্বীপের কিছু উন্নয়ন হতে পারে । কর্ম সংস্থানের সৃষ্টি হলে বেকার যুবক যুবতীদের শহরমুখীতা থেকে রক্ষা করা সম্ভব ছিল । দু’ চারটা ফেরীর ব্যবস্থা করা হলে মানুষজন কম কষ্টে যাতায়াত করতে পারে । আর এসব খুব সহজে সম্ভব দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাথে সন্দ্বীপকে যুক্ত করে নেয়ায় । এ দ্বীপটাকে রক্ষা করার এ সামান্য দাবীটুকু দেশবাসী সকলের কাছে । সকলের সু-দৃষ্টি, বিবেচনা করা হলে আপনি যে এলাকার মানুষ হন না কেন, দ্বীপটাকে বাঁচানোর মধ্য দিয়ে দ্বীপের মানুষগুলোর কাছে কৃতজ্ঞ হয়ে থাকার সুযোগ রয়েছে । আর দ্বীপের মানুষগুলোর কাছে অনুরোধ যিনি যেখানে আছেন, যে পর্যায়ে আছেন, যে পদে আছেন তিনি যেন চেষ্টা করেন এমন সুন্দর সোনার দ্বীপটাকে রক্ষা করার ।


লেখক-সাহিত্যিক এবং সমসাময়িক বিষয় লেখক
(www.rokomari.com/book/author/12661/


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন