আজ বুধবার, ১৮ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৩ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



দু’ফোঁটা অশ্রুজল

Published on 09 December 2017 | 7: 57 pm

:: রঞ্জন বণিক ::


দুদিন আগেই মঞ্জু ভাই নক করলেন ইনবক্সে। রঞ্জন, ফোন নাম্বার দাও। দিলাম তৎক্ষণাৎ। একটু পরে তাঁর ফোন। রঞ্জন, এসো মোহনা টিভির অফিসে। বসব আমার এখানে। নয় তারিখ, শনিবার। ঠিক পাঁচটায়। কারণ জিজ্ঞেস করবার আগেই তিনি নিজেই বলে দিলেন, আমরা সন্দ্বীপ টাউন্যারা বসব একসাথে । আপাতত কয়েকজন। কিছু একটা করার কথা ভাবছি। বলেই তিনি থামলেন।

আমি ভাল করেই জানি। সন্দ্বীপ টাউন্যারা কিছু একটা ভাবলে তার সফল বাস্তবায়ন হবেই হবে। কোন দ্বিধা না করেই তাই তাঁকে বললাম, মঞ্জুভাই আসব সিউর। তিনিও আর কথা না বাড়িয়ে ভাল থেকো বলে ফোন রেখে দিলেন। জানতেন তিনিও–আসবই। আবেগের কোন জায়গাটায় খোঁচা দিয়েছেন তা ভাল করেই জানেন। সেই থেকে অপেক্ষা করছি কখন নয় ডিসেম্বর আসবে। কখন পাঁচটা বাজবে ঘড়িতে।

মঞ্জু ভাই মোহনা টেলিভিশনের চট্টগ্রাম অফিসের ব্যুরো চীফ। ওনার অফিসে প্রাথমিক বৈঠকের আয়োজন করলেন আমাদের জন্য। যাদের বলেছেন, একজন ছাড়া সবাই হাজির। যিনি আসেননি তিনিও ফোনে তার অপারগতার কারণ জানিয়েছেন ওই মুহূর্তে। তারও আবেগের কমতি ছিল না। ঠিক সাড়ে পাঁচটায় আমাদের বৈঠক শুরু হল।

সন্দ্বীপ টাউন্যাদের বৈঠক।

শিরোনামেই আবেগে আপ্লুত সবাই। সবাই পরিচিত মুখ। আশির দশকে থেকে শুরু করে সন্দ্বীপ টাউন ভাঙ্গা অব্দি ওই পরিমন্ডলে বেড়ে উঠা আমরা কয়জনা। সবার বয়স যেন বিশ একুশের কোটায় নেমে হল। হাজারো স্মৃতি। নানা ঘটনা। সবাই নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত। আবেগাপ্লুত আগোছালো কথাবার্তা। কখনো পরিমিত, কখনো আঞ্চলিক ভাষায় যে যার মনের কথা তুলে ধরছেন। টানা তিন ঘণ্টার বৈঠক! সময় কোথা দিয়ে কিভাবে বয়ে গেলো টের পাইনি কেউই! আমদের হারিয়ে যাওয়া শৈশব, কৈশোর আর কারো কারো যৌবনের সেই সোনালি দিনগুলোর স্মৃতি সিনেমার পর্দায় ভেসে উঠা গল্পের মত মোহাবিষ্ট করে রেখেছিল সকলকে।

সবশেষে! সভাপতির বক্তব্য রাখতে গিয়ে দিলদার ভাই এতোটাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন–কান্না আর ধরে রাখতে পারেননি। তিনি নিজে কাঁদলেন। সবাইকে কাঁদালেন। নদী ভাঙ্গনের ফলে সন্দ্বীপ টাউনের এই ঐতিহ্যবাহী পরিবারটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পাকা দালান বাড়ি, জোড়া পুকুর, অসংখ্য দোকানপাট সহ সন্দ্বীপের তখনকার একমাত্র সিনেমা হল সবই সাগরে বিলীন হয়েছিল একে একে। নারী শিক্ষার গৌরবান্বিত বিদ্যাপীঠ–মোমেনা সেকান্দর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়টিও তাদের পূর্বপুরুষ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। তারঁ দুচোখের জল সবার চোখের কোণায় জল এনে দিয়েছিল। এ অশ্রু কিছুটা বেদনার! কিছুটা আনন্দের। কিছুটা হারানো স্মৃতির। কিছুটা স্মৃতিময় অতীতকে ফিরে পাবার।
এতিহ্যমন্ডিত সন্দ্বীপ টাউন আমাদের। প্রতিযোগিতামূলক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের তীর্থভূমি এটি। নাচ, গান, খেলাধুলা, সবকিছুতেই ছিল তুমুল প্রতিযোগিতা। আবাহনী সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, বিচিত্রা ফোরাম ক্লাব, দ্বীপ সাহিত্য গোষ্ঠী, ঝংকার সহ আরো যেসব সাংস্কৃতিক ক্লাব ছিল। সারা বছর ধরে চলত এদের মধ্যে প্রতিযোগিতা। কে কারচে ভাল নাটক দর্শকদের উপহার দিতে পারে। কারা ভাল বিচিত্রানুষ্ঠান করে চমক সৃষ্টি করতে পারে। এসব চিন্তা যাদের মাথায় ঘুরপাক খেতো সবসময়– সেই ঘরানার কিছু মানুষ আজ একত্রিত হল তাদের বুকে জমে থাকা আবেগ আর দুচোখে আঁকা স্বপ্ন বাস্তবায়নের স্বপ্ন পূরণ করতে। যদিও অনেককেই ডাকা হয়নি আজ। ক্ষুদ্র পরিসরে প্রাথমিক আলোচনা বলেই। বাকি যারা আছেন তাঁদের সবার সাথেও যোগাযোগ হবে সহসা।

আমি নিশ্চিত– সাফল্য আসবেই। আজ যারা এখানে এসেছেন। যারা সামনে আসবেন–তারাও সবাই সন্দ্বীপ টাউনকে তাদের অস্তিত্বে ধারণ করেন। সন্দ্বীপ টাউন নিয়ে তাদের আবেগ হৃদয়ে লালন করেন। পশ্চিমে জেগে উঠা নতুন চর। যাতে জড়িয়ে আছে আমাদের ঐতিহ্য, অতীত, অহংকার। আবার ফিরিয়ে দেবে একদিন আমাদের সবকিছু–আমাদের বসত ভিটে, যা কিছু হারিয়েছি একে একে সব। আজ সবার চোখের কোণে চিকচিক করা দুফোঁটা জল- সেটাই প্রমাণ করল আবারও ।

আমরা হারিয়ে ফেলিনি নিজেদেরকে। সময়ের চলমান স্রোতের তোড়ে। আমরা হারিনি। আমরা হার মানতে শিখিনি। আমরা হারব না। সন্দ্বীপ টাউন সমহিমায় একদিন সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে আবার আগামী প্রজন্মের সামনে। আমাদেরই হাত ধরে। ( সংক্ষেপিত)


০৯ ডিসেম্বর ২০১৭


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন