আজ বুধবার, ২০ জুন ২০১৮ ইং, ০৬ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



অমর প্রতিভা : এ.বি.এম সিদ্দিক চৌধুরী স্মরণে

Published on 09 December 2017 | 10: 40 am

: অধ্যাপক আ.ম.ম. আবদুর রহিম :


সন্দ্বীপ জন্ম দিয়েছে হাজারো কৃতি সন্তানের। এরা শুধু সন্দ্বীপের মুখ উজ্জ্বল করে নাই, এরা বাংলাদেশের ও গৌরব। কমরেড মুজাফফর আহাম্মদ, কবি আবদুল হাকিম, স্বাধীনাতার পদকধারী কবি বেলাল মোহাম্মদ, সর্বপ্রথমে স্বাধীনতার ঘোষনার পাঠক ও স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক আবুল কাসেম সন্দ্বীপ, ডক্টর সুলায়মানুল মেহেদী, ডাক্তার সামসুল আলম, এফ.সি.পি.এইচ, প্রকৌশলী আবদুর মালেক, অধ্যাপক রাজকুমার চক্রবর্তী, মোহাম্মদ ওয়ালী উল্লাহ (ওয়ালীগান্ধী) প্রধান শিক্ষক আবুল খায়ের খান বিএ বি.টি, প্রধান শিক্ষক আলি আকবর বিএ বি.টি সহ আরো অকেনক নন্দিত সন্তান এ দ্বীপে জন্ম গ্রহণ করেছেন। জনাব এ.বি.এম. সিদ্দিক চৌধুরী তাদের সার্থক উত্তরসুরী। তাকে আমি লেখক, গবেষক, ইতিহাসবেত্তা, সর্বোপরি সন্দ্বীপ প্রেমিক একজন আর্দশ মানুষ হিসেবে উল্লেখ করব।স্বমহিমায় তিনি উজ্জ্বল, প্রতিভায় দীপ্তিময়। সিদ্দিক চৌধুরী সন্দ্বীপের স্বাধীন রাজা দেলওয়ার খাঁনের মেয়ের মেয়ে মুছা বিবি, স্বামী চাঁদখার ছেলে সোরোল্লাহ খাঁর সপ্তম অধস্তন পুরুষ। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ ইসমাইল চৌধুরী, মাতার নাম আফরোজা চৌধুরী।

১৯৩৫ সালে ১২ নভেম্বর বাউরিয়া গ্রামে তার জন্ম হয়। তার প্রাইমারী স্কুল বাউরিয়া প্রাইমারী, হাইস্কাল সন্দ্বীপ মডেল হাইস্কুল হতে সাফল্যের সহিত মেট্রিক পাস করেন। ১৯৫৩ সালে ঢাকা জগন্নাথ কলেজ হতে আই.এ পাশ করেন। স্কুল জীবন হতে রাজনৈতিক সচেতনতা তার মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। স্কুল জীবনে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে, ৫২ সালে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে লড়াকু সৈনিক ছিলেন। তিনি ১৯৫৪ সালে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫৭ সনে বি.এ পাশ করেন। বি.এ পাশ করার পর তিনি সেনের হাট মাধ্যমিক ইংরেজী বিদ্যালয়ে কিছু দিন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪ নির্বাচনে তিনি সৈয়দ আবদুল মজিদের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার বক্তৃতা শুনার জন্য জনগণের মদ্যে বিশেষ উৎসুক্য ছিল। অতপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ল’কোর্স সমাপ্ত করেন।

১৯৬০ সনে তিনি পাকিস্তান অডিট বিভাগে চাকরী গ্রহণ করেন। অতীব সততা ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সনে তিনি গাছুয়া গ্রামের ওয়াহিদুল মওলা চৌধুরী কন্যা সাবিতা খুরশীদা চৌঃ সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তাদের সুযোগ্য এক ছেলে ও দু’মেয়ে। বড় মেয়ে সিফাত শারমিন চৌঃ চট্টগামের একটি ডিগ্রি কলেজে রাষ্ট্র বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক। একমাত্র ছেলে ডাঃ কর্ণেল ইমরুল কায়েস বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আছেন। ছোট মেয়ে ইফরাত শারমিন চৌঃ আমেরিকায় পি.এইচ.ডি গবেষণা সম্পন্ন করেছেন। সত্যিকার অর্থে জনাব সিদ্দিক চৌধুরী খুবই সমাজ সচেতন মানুষ। কোন দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের অপরিহার্যতা রয়েছে। সত্যিকার অর্থে সিদ্দিক চৌধুরী ছিলেন একজন মুক্ত বুদ্ধিজীবী।

৪৭, ৫২, ৭১ সালে তার ভূমিকা ছিল সত্যিকারে দেশ প্রেমিকের। ”মুক্তিযুদ্ধে সন্দ্বীপ” বইটি তাঁর সে স্বাক্ষর বহন করে। জনাব সিদ্দিক চৌধুরী একটি নাম একটি ইতিহাস। সর্বপ্রথম সোনালী সন্দ্বীপ পত্রিকায় তার লিখা। ‘‘সন্দ্বীপে মডেল হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস” পড়ে তাঁর সম্পর্কে আমি অবগত হই। জানিনা তিনি এতসব তথ্য উপাত্ত কিভাবে সংরক্ষণ করলেন।

স্কুল প্রতিষ্ঠান ১ম সভা স্কুলের জন্য প্রদত্ত ভূমির দলিলসহ স্কুলের প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক প্রধান শিক্ষকের তালিকা সম্পর্কে লিখাটি বিশাল ও গবেষণা ধর্মী। সন্দ্বীপ হাইস্কুলে আমার আব্বা মরহুম আলি আকবর বি.এ.বি.টি দীর্ঘ একযুগ কাল একজন সফল প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি ছিলেন আমার আব্বার অত্যাধিক প্রিয় ছাত্র। বহুকষ্ট করে আমি তার মোবাইল নম্বর জোগাড় করলাম। কথা বললাম, ঠিকানা নিলাম, অবশেষে চিঠি লিখলাম। এভাবে তাঁর সাথে আমার পরিচয়।

জনাব সিদ্দিক চৌধুরী আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব। সন্দ্বীপ হাইস্কুলের ৭০, ৭৫, ৮৫ বৎসর স্মারক গ্রন্থ তারই সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। ৭০ বছরের গ্রন্থে ইঞ্জিনিয়ার শাহজাহান সাহেবের লেখা একটি ’অবিস্মরণীয় মৃত্যু’ পড়ে বার বার আমি কেঁদেছি। লেখাটি আমার আব্বার অকাল হৃদয়বিদারক মৃত্যু সম্পর্কে লিখা হয়েছিল। বাবার নাম শিক্ষাদীক্ষার কথা শুনে আমরা উজ্জীবিত হয়েছি। সমুখপানে এগিয়ে গেছি। আমার দুর্ভাগ্য, যে মা আমাদের মাথার উপর ছায়ার মত পাখনা মেলে এতদিন আগলিয়ে রেখেছিলেন, সে প্রাণ প্রিয় মা গত ১লা মার্চ ২০১৫ ইং ইন্তেকাল করেন। বাবা চলে গেলেন সে স্মৃতি মনে নেই, মায়ের মৃত্যুর স্মৃতি ক্ষনিকে যেন হৃদয় ছিড়ে যায়।

এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। বলছিলাম জনাব সিদ্দিক চৌধুরীর কথা। তারই ’সম্পাদনায় ইতোমধ্যে’ ”মৌলভী মোহাম্মদআলি আকবর বিএ.বি.টি জন্মশত বর্ষ স্মারক গ্রন্থটি” প্রকাশিত হয়েছে যাতে প্রায় ৩৬৫ পৃষ্ঠা রয়েছে। যে বইতে ছাত্রদের লিখা দুর্লভ স্মৃতিচারণ করা হয়েছে। সহসম্পাদনার দায়িত্বে ছিলাম আমি। বইটি আমরা সন্দ্বীপের সুধি মহলে পৌঁছাতে চেষ্টা করেছি। তিনি অনেক বই লিখেছেন, অনেক বইয়ের সম্পাদনা করেছেন। তাঁর কলমি প্রচেষ্টা প্রশংসা বহুল। তাঁর অনবদ্য লেখা ’শ্বাশত সন্দ্বীপ’ একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ। বইটি সন্দ্বীপ সর্ম্পকে গবেষণা ধর্মী একটি মূল্যবান দলিল।

‘মুক্তিযুদ্ধে সন্দ্বীপ’, ‘বাউরিয়ার ইতিহাস’, ‘ইতিহাস ঐতিহ্যের কালাপানিয়া’, ‘অতীতের একটুকরা’, ‘উড়িরচর’, ‘সন্দ্বীপে ইসলাম প্রচার’ ইত্যাদি। সুদুর অতীত, সমসাময়িক কালে সন্দ্বীপ হতে যত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, সবগুলোতে জনাব সিদ্দিক চৌধুরী লিখা নিজগুনে স্থান করে নিয়েছেন। তার লিখা সমূহ হৃদয়াগ্রাহী, ইতিহাস সমৃদ্ধ, তথ্যভিত্তিক ও সাহিত্য রসেভরা। আমার দৃষ্টিতে সন্দ্বীপকে নিয়ে তাঁর লিখা সমূহ ঐতিহাসিক বিচার বিশ্লেষণে অনন্য অসাধারণ স্থান দখল করে আছে থাকবে চিরকাল। সন্দ্বীপকে নিয়ে এত বেশি লিখা সন্দ্বীপের অন্য কেউ লিখছেন বলে আমার জানা নেই। অনেকে লিখেছেন খন্ডিতভাবে, নিজস্ব দৃষ্টি কোন হতে কিন্তু সিদ্দিক চৌধুরীর লেখা সব সংকীর্ণতার প্রাচীর ভেদ করে অনেক উর্ধ্বে স্থান করে নিয়েছে। অডিট বিভাগের একজন সৎ সরকারী উর্ধ্বতন কর্মকর্তা যিনি শতভাগ সফলতা, সততা ও দক্ষতার সাথে কর্মসম্পাদন করেন। চাকরি হতে অবসর নেন কয়েক বছর আগে।

আমার কাছে আশ্চর্য লাগে অবসর জীবনে সন্দ্বীপের ইতিহাস ঐতিহ্য সর্ম্পকে দ্বীপের গোষ্ঠি, সমাজ, ব্যক্তিত্ব, লোকজ সাহিত্য সম্পর্কে এত উপাত্ত কিভাবে তিনি সংগ্রহ করলেন তা ভাবতে আমার কাছে বিস্ময়কর বলে মনে হয়েছে। তাঁর সাথে আলাপ করে মনে হয়েছিল তাঁর স্মৃতিশক্তি প্রখর, মন উদার, চরিত্র নিখুত, আচরণ সুন্দর ও মার্জিত, লেখাপড়ায় অনন্য, ধর্ম বিশ্বাসে অটল সর্বোপরি মানব সেবা ও দেশ প্রেমে উজ্জীবিত শতাব্দীর এক মহান সাক্ষী। এ দ্বীপের এ নন্দিত সন্তান মহান ভাষা সৈনিক যার জন্য তিনি বিভিন্ন সংগঠন হতে ইতোমধ্যে পুরস্কৃত হয়েছেন। আমরা আশাকরি তিনি অনতি বিলম্বে সরকার কতৃক পুরষ্কৃত হবেন। “মুক্তিযুদ্ধে সন্দ্বীপ” বইটির আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় দ্বীপবাসীদের স্বাধীনতা যুদ্ধের দুঃসাহসী কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। ”সন্দ্বীপের বৈচিত্রময় লোক সাহিত্য” আরেকটি ঐতিহ্য মন্ডিত বই। এ বইতে সন্দ্বীপের ভাষা সংস্কৃতি ও সমাজের বিষয় বিষদভাবে আলোচনা হয়েছে। এটি জনাব চৌধুরীর একটি দুর্লভ লেখা গ্রন্থ। ’সন্দ্বীপের কৃতি সন্তান আজ যারা নেই’, বইটিতে তার বিশাল জ্ঞান পিপাসার ফসল। দ্বীপের কৃতি সন্তানদেরকে অমর করে রাখতে সহায়ক হবে। যা পরবর্তিতে সন্দ্বীপের সুধিজনের ইতিহাস লিখতে উপাত্ত হিসাবে বিবেচিত হবে। এটি জনাব সিদ্দিক চৌধুরীর অসাধারণ প্রচেষ্টার ফসল। তার বইয়ের মাধ্যমে সন্দ্বীপে যেসব মহান ব্যক্তি জন্ম গ্রহণ করেছেন তাদেরকে তিনি অমর করে রেখেছেন। না হয় কালের স্রোতে তারা হারিয়ে যেত। জনাব চৌধুরীকে সন্দ্বীপের অতীত ইতিহাস সর্ম্পকে জিজ্ঞাস করলে তিনি সহজে জবাব দিতে পারতেন। আশ্চার্য লাগে তার ৮০ উর্ধ্ব বয়সে আলাপ করে মনে হয়েছে তার বয়স ৩০ এর কোটায়। আমি দেখছি তার কাছে অনেক পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন, পেপার কার্টিন ও বিভিন্ন দুর্লভ পুস্তক রয়েছে। ঐতিহাসিক গ্রন্থে পাঠে তিনি খুবই আগ্রহী। সেদিন ২০১৪ ইং সন্দ্বীপ মডেল হাই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রদের ৮০ বছর পূর্তি পুনঃমিলনী অনুষ্ঠানে স্মরনিকা প্রকাশে প্রধান অতিথি ছিলেন। সন্দ্বীপ মডেল হাই স্কুলের ২ জন প্রতিষ্ঠাতা, ৪ জন প্রধান শিক্ষক ও একজন শিক্ষককে সম্মননা প্রদান করা হয়। পুরো অনুষ্ঠানটি জনাব সিদ্দিক চৌঃ পরিচালনা করেন। এত বড় মহতী উদ্যোগের জন্য তিনি সর্বাধিক পরিশ্রম করেছেন। স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা মৌলভী সেকান্দর হোসেন, প্রতিষ্ঠাতা খাঁন সাহেব আমিন মিয়া, প্রধান শিক্ষক মৌলভী আবুল খায়ের খাঁন বি.এ.বি.টি, প্রধান শিক্ষক মৌলভী আলি আকবর বিএ,বি.টি, প্রধান শিক্ষক সুলতান মিঞা এম.এস.সি, প্রধান শিক্ষক মৌঃ আবদুর মন্নান, মাষ্টার আবদুল মালেক বি.এস.সি কে সম্মননা ক্রেষ্ট ও ৫ হাজার টাকা করে তাদের পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেয়া হয়। আমি ও আমার ভাই আ.লম. আবদুর রহমান সচিব সংস্থাপন মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ সরকার এ সভায় অংশ গ্রহণের সুযোগ হয়েছিল। প্রধান শিক্ষক আলি আকবর বি.এ.বি.টির সন্তান হিসেবে তিনি সভায় আমাদেওকে পরিচয় করে দিয়ে আসন প্রদান করেন। আমার ভাই আ.ল.ম আবদুর রহমান সচিব বাংলাদেশ সরকার বিশেষ মেহমান হিসেবে বক্তব্য রাখেন। যা পরের দিন চট্টগ্রামের বিভিন্ন পত্রিকায় আসে। সন্দ্বীপের ইতিহাসে মহান ব্যক্তিদের এ প্রথম বারের মত সম্মান দেখানো হয়। এ মহতি কার্যক্রমে উদ্যোক্তা ছিলেন শিক্ষক প্রেমিক জনাব এ,বি,এম, সিদ্দিক চৌধুরী। আমরা আশা করি এ ধারা অব্যাহত থাকবে। চৌধুরী সাহেব সন্দ্বীপকে ভালবাসেন, সন্দ্বীপের মানুষকে ভালবাসেন অর্পিত দায়ীত্বের প্রতি তিনি অতি মাত্রায় সচেতন। আমার বিশ্বাস, এ ধরনের আরো কিছু লোক সন্দ্বীপে জন্ম গ্রহণ করলে দ্বীপের মানুষ ধন্য হতো। সন্দ্বীপের মানুষ তার অসাধারণ লেখনী প্রচেষ্টার জন্য চিরদিন তাঁর কাছে ঋণী হয়ে থাকবেন। তার শিক্ষকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ ছিল। তিনি সন্দ্বীপ হাই স্কুলের একজন কৃতি ছাত্র। এ সময় সন্দ্বীপ হাই স্কুলে একদল দক্ষ শিক্ষক ছিলেন। যারা ছিলেন দ্বীপের মানুষ গড়ার কারিগর। তিনি শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে ভুল করেন নাই। তার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক ছিলেন প্রধান শিক্ষক আলি আকবর বিএ.বি.টি। তাঁর বিভিন্ন লিখায় প্রিয় স্যার অনেক ভালোবাসায় সিক্ত। মৌলভী আলি আকবর বিএ.বি.টি জন্ম শত বার্ষিক স্মারক গ্রন্থ তিনি সম্পাদনা করেছেন। তার সুচিন্তিত দিক নির্দেশনা আমাকে লিখা সংগ্রহ করতে উৎসাহিত করেছে। স্মৃতি শক্তি তার প্রখর। অনেক প্রাচীন কবিতা, বাংলা, ইংরেজী, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ভাষণের অংশ বিশেষ, বিভিন্ন মনিষিদের বানী, কোরান হাদিসের অনেক বিষয় তিনি স্মৃতিতে ধরে রেখেছেন। সমাজে গুনী লোককে সম্মান না দিলে গুণী জনের জন্ম নেয় না (ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ) এ.বি.এম সিদ্দিক চৌঃ একজন সাদা মনের গুণী মানুষ, একজন বিদ্রুৎশাহী মানুষ, সন্দ্বীপ প্রেমিক। বর্তমান সমাজের আমি তাকে শ্রেষ্ঠ সন্তান মনে করি। মানুষকে জীবিত অবস্থার তার যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। আমি মনে করি তার মূল্যবান লেখা সমূহ মূল্যয়ন করা দরকার। সন্দ্বীপের উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক দ্বীপের কালজয়ী শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নামের তালিকা লিখে উপজেলা অফিসে রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। এ বিষয়ে দ্বীপের সরকারী কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন বলে আমি আশাবাদী। তাদের নামে হতে পারে বিভিন্ন সড়ক, স্কুল, কলেজ, লাইব্রেরীসহ বিভিন্ন শিক্ষা স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে এ.বি.এম ছিদ্দিক চৌধুরীকে দিয়ে শুরু হউক। তাহলে আমরা সন্দ্বীপ বাসী তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারবো।
এ লেখাটি লিখেছিলাম তাঁর সম্মতিক্রমে তাঁর জীবদ্দশায় ঐ সময় সোনালী সন্দ্বীপ সহ কয়েকটি পত্রিকায় লিখাটি প্রকাশিত হয়। আমার জানামতে এ মহান পুুরুষকে নিয়ে এ লিখাটি সর্বপ্রথম ছিল। তাঁর সম্পর্কে আমি এতটুকু বাড়িয়ে লিখি নাই। এ মহান ব্যক্তিত্ত্ব সর্ম্পকে আমি মনে করি আমার লিখাটি পড়ে খুশি হয়েছিলাম। আমার সুপ্রিয় এ মানুষটি সম্পর্কে কিছু একটা লিখতে পেরে আমি নিজকে ধন্য মনে করছি। তাঁর সাথে আমার পরিচয় দীর্ঘ দিনের নয় ২০১০ এর দিকে। কিন্তু আমার মনে হয় আরেকটি মানুষ আমার হৃদয়ে এত বেশী স্থান করে নিতে পারেন নাই। তার গভীর শ্রদ্ধা, ভালবাসা, ভ্রাতৃত্ত্ববোধ, দরদ, মমত্ত্ববোধ, অনুসন্ধিৎসুমন, লেখালেখি, সত্যলেখন, ইতিহাসচর্চা, সরলতা, নিরহংকার মন তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। তাঁর বিশাল পান্ডিত্য, হাজারো গুণ ছিল তার চরিত্রের ভূষণ। তাঁর সাথে জীবনে আমার কয়েকবার দেখা হয়েছে। অনেক আলাপচারিতা হয়েছে। তার বিভিন্ন পুস্তকপ্রকাশনায় বিশেষ করে ”সন্দ্বীপে ইসলাম” গ্রন্থ প্রকাশ ”সন্দ্বীপ হাই ৮৪ বছর” প্রকাশে আমি তার খুবই কাছে গিয়েছিলাম। আমার বাবার এ প্রিয়ছাত্রের দিক নির্দেশনায় ও সম্পদনায় “মরহুম মুহাম্মদ আলি আকবর বি.এ.বি.টি গ্রন্থটি” প্রকাশিত হয়। উক্ত বইয়ে তাঁর দুটি মূল্যবান লেখা প্রকাশিত হয়। সম্পাদনার ভাষায় তাঁর অসাধারণ সাহিত্য রস জ্ঞানের গভীরতা, শিক্ষকপ্রেম প্রতিভাত হয়েছে। আমার বাসায় ২০১৬ সালের ১ম দিকে একদিন দাওয়াত দিলে বেড়াতে আসেন, সাথে ছিলেন কবি কে.এম.আজিজউল্লাহ মাস্টার, সন্দ্বীপ সমিতির প্রাক্তন সেক্রেটারী আমার সুপ্রিয় মোশাররফ হোসেন, সোনালী সন্দ্বীপের সম্পাদক আশ্রাফ সাহেব। সেদিন দুপুরে আমার বাসায় আপ্যায়ন করে আমাকে ধন্য করেছিলেন। হ্যাঁ খুবই খুশী হয়েছিলাম। আর আমি ধন্য হয়েছিলাম। পরিচিত হওয়ার পর হতে প্রতি সপ্তাহে দুএকবার আমার সাথে ফোনে আলাপ করতেন। আমার সাথে মাঝে মাঝে পত্র বিনিময় হত। তার অনেক বই আমার কাছে কুরিয়ার সার্ভিসে প্রেরণ করতেন। তার অনেক পত্র আমার কাছে এখনো সংরক্ষিত আছে। আমাদের প্রকাশিত আলি আকবর বি.এ.বি.টি গ্রন্থে তার অনেক চিঠি ছাপিয়ে ছিলাম। এ মূহুর্তে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার লাইন মনে পড়ে গেল- যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এ বাটে। হায়! সিদ্দিক চৌধুরীর চিঠি বন্ধ হয়ে গেছে। ওনার কাছে ফোন করলাম, তার কথাবার্তা আমার কাছে অগোছালো মনে হলো আমি বললাম আপনি কি অসুস্থ, আমাকে চেনেছেন? বললেন, আপনি আবদুর রহিম সাহেব না। এরপর ফোন ছেড়ে দিলেন। আমি খুবই মর্মাহত হলাম। ঐদিন হতে তিনি অসুস্থ পরে তার মেয়ের বাসায় ফোন করলাম মেয়ে প্রফেসর মিকাত শারমিন চৌধুরী বললেন বাবা একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, শরীরে লবণ কমে গেছে। এর আগে কবি কে.এন. আজিজউল্লাহ অজ্ঞান হয়ে সুস্থতার জন্য ঢাকায় চলে গেছেন। সেখানে চিকিৎসা করে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। ফোন করলে আমার সাথে কথা বলল, মনে হলো তিনিও ভাল হবেন। তিনি ভাল। সুস্থ হয়ে বর্তমানে লেখালেখি করেন। আমাদের দুর্ভাগ্য জনাব সিদ্দিক চৌঃ ভাল হয়ে ভাল হলেন না। মেয়ের বাসা থেকে পরে একমাত্র ছেলে ডাক্তার ইমরুল কায়েসের শ্বশুরের বাসায় আরো ভাল চিকিৎসার জন্য উঠলেন। একদিন দুপুরে আমি আমার এক ছাত্রকে নিয়ে তার মুরাদপুরের সন্নিকটস্থ বাসায় তাকে দেখতে গেলাম আমার দুর্ভাগ্য ঐ সময় তিনি ঘুমে ছিলেন। সময় ছিল দুপুরে খাওয়ার, বেয়াই একজন মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের আমাদের সাথে কথাবার্তা বলে দেখা করার বিষয় না করে দিলেন। বললেন তিনি এখন ঘুমে। দেখতে গিয়ে না দেখে ফিরে আসলাম ভারাক্রান্ত মন নিয়ে। এরপর অনেক বার ফোন করেছি, কেউ ফোন ধরে না, ফোন বাজে। বুঝতে পারলাম হয়ত উনার অবস্থা বেশী ভাল নয়, আমি ফোন করা বন্ধ করলাম না। দুএকবার ধরেছেন, আমার যাওয়ার বিষয় অবগত করলেন। কথাবার্তা তেমন গোছালো মনে হল না। ভাবলাম আবার দেখতে যাবো। ইতোমধ্যে তার ছেলে বিদেশ হতে এসে তাকে ঢাকায় নিয়ে গেছেন, সেখানে চিকিৎসার পর (সি.এম.এইচ.এ) অনেকটা সুস্থ হয়ে গেছেন। বাসায় চলে আসেন। নিজ ছেলে ও বউয়ের কাছে ঢাকায়। এ সময় তিনি আবার লেখালেখি শুরু করে দিয়েছেন। তিনি সুস্থ থাকা অবস্থায় আমার সাথে কথা হয়েছিল, আমার লেখা দুটি বই প্রকাশে সম্পাদনার দায়িত্ব তিনি পালন করবেন। ইতোমধ্যে আমার মামা কাজী আবদুল আহাদের উপর একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশে আমরা দুজনে যৌথভাবে সম্পাদনার বিষয়ে ঐক্যমতে পৌছি। তিনি আবদুল আহাদ সম্পর্কে একটি লেখা লিখেছেন বলে আমাকে জানিয়ে ছিলেন। নিয়তি বড়ই নির্মম। “গধহ ঢ়ৎড়ঢ়ড়ংবং, এড়ফ ফরংঢ়ড়ংবং.” মানুষভাবে এক আর ঘটে আরেক। একদিন আমার কাছে জনাব মোশাররফ হোসেন ফোনে মেসেজ পাঠালেন, জনাব এ.বি.এম সিদ্দিক চৌঃ গতরাত্রে ইন্তেকাল করেছেন। খবরটি শুনে আমি প্রিয়জন হারানোর বেদনায় ভীষণ ভেঙ্গে পড়লাম। কয়েকবার পড়লাম ”ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন”। তাৎক্ষণিক দুরাকাত নামাজ পড়ে তাঁর জন্য দোঁয়া করলাম। হে আল্লাহ আমার প্রিয়জনকে জান্নাতু ফেরদাউসে স্থান করে দিন। তাঁর মৃত্যুতে আমি ভীষণ আহত হই। তাঁর কথা প্রতি মূহুর্তে মনে পড়ে, যখনই সুযোগ পাই তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া করি। সিদ্দিক চৌধুরী আমাদের মাঝে নেই দৈহিকভাবে, কিন্তু আত্মিকভাবে তিনি সর্বদা অবস্থান করছেন আমাদের হৃদয়ের গভীর দেশে। কবিগুরু বলেছেন-
‘‘এনে ছিলে সঙ্গে করে মৃত্যুহীন প্রাণ,
মরণে তাহা তুমি করে গেলে দান”।
সিদ্দিক চৌধুরী সত্যিকার অর্থে এরকম একজন মহান মানুষ ছিলেন।
আজ তিনি ঢাকার আজিমপুরস্থ আর্মি কবর স্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। আমাদের সন্দ্বীপের মানুষের দুর্ভাগ্য এমন একজন সন্দ্বীপ প্রেমিক মানুষের জন্য তাঁর জীবদ্দশায় তেমন কিছু হয়েছে বলে আমার জানা নেই। মৃত্যুর পরও সন্দ্বীপের ঢাকাস্থ সন্দ্বীপ সমিতি, সন্দ্বীপ উন্নয়ন ফোরাম, সন্দ্বীপ শিক্ষা সমিতি, চট্টগ্রামস্থ সন্দ্বীপ শিক্ষা সমিতি, সন্দ্বীপ এসোসিয়েশন কিছু করছেন বলে আমার এ লেখা পর্যন্ত সময় শুনি নাই। কেন করেন নাই জানি না। সিদ্দিক চৌধুরী সন্দ্বীপের জন্য কি না করেছেন। তার মৃত্যুর সপ্তাহ খানেক পওে চট্টগ্রামস্থ রুপালী ইন্সুরেন্সের ডাইরেক্টর আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক জনাব আবুল কাশেম এম.এস.সি তার অফিসে একটি শোক সভার আয়োজন করেছিলেন। সে সভায় আমাকে দাওয়াত দিয়েছিলেন। অসুস্থতার কারণে আমি যেতে পারি নাই। সন্দ্বীপ এসোসিয়েশনের জন্ম কলকাতায়। এ এসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা লগ্ন হতে বর্তমান ইতিহাস পর্যন্ত তিনি সুন্দরভাবে লিখে গিয়েছেন। সন্দ্বীপ এসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠায় তার সরব ভূমিকা ছিল। তার বইয়ের মাধ্যমে সন্দ্বীপের অনেক হারানো স্মৃতি যুগ যুগ ধরে বেচেঁ থাকবে। এ.বি.এম. সিদ্দিক চৌধুরী শুধু একজন ভাল মানুষ নন। সফল পিতা নন, সৎব্যক্তি নন, শুধু একজন ভাল মানুষ নন, সার্থক সম্পাদক নন, উর্দ্ধতন সৎ সরকারী কর্মকর্তা নন, একজন খোদাভীরু মানুষ নন, শুধুমাত্র সন্দ্বীপের ক্ষণজন্মা পুরুষ নন, তিনি সমগ্র বাংলাদেশের জন্য গর্ব গৌরব। তিনি একটি নাম একটি জীবন্ত ইতিহাস। সন্দ্বীপের ইতিহাসে তার নাম এক নম্বওে থাকবে, ইতিহাস বেত্তা হিসেবে। প্রত্যেক মানুষের জীবনের ঞৎধমবফু ও গবষড়ফু থাকে। হয়ত মানুষ হিসেবে তিনি এ সবের বাইরে ছিলেন না। এক ছেলেকে সকল ডাক্তার বানানো, দুমেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করা তার বিশাল সফলতা। তিনি ছিলেন আলোকিত আদর্শ মানুষ। আমি তাকে লৌহ মানব বলে মনে করি, জীবন যুদ্ধে তিনি কখনো ভেঙ্গে পড়েন নাই, পুস্তক পাঠপুস্তক লিখায় তিনি সবসময় মগ্ন থাকতেন, থাকত দুর্লভ পত্রিকা কাটিং বিভিন্ন তথ্য মূলক ছিল। আমি ঢাকাস্থ সন্দ্বীপ শিক্ষা সমিতি সন্দ্বীপের মানুষের স্বার্থে অনেক কাজ করে যাচ্ছেন, ইতোমধ্যে অধ্যাপক রাজকুমার চক্রবর্ত্তী ও অনন্ত মোহন মামার সন্দ্বীপের ইতিহাস গ্রন্থ, ”সন্দ্বীপ সন্দর্শন” প্রকাশ করে নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তারা এবার মরহুম এ.বি.এম সিদ্দিক চৌ: শ্বাশঃত সন্দ্বীপের বইটি পুন: প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন। এ উদ্যোগে সন্দ্বীপের কৃতি সন্তান জনাব চৌধুরীর বিশ্বস্ত অনুরাগী জনাব মোশাররফ হোসেন প্রধান সমন্বয় কারীর দায়িত্ব পালন করছেন। বিষয়টি সম্পর্কে মরহুম সিদ্দিক চৌধুরীর সুযোগ্য মেয়ে অধ্যাপক সিফাত শারমিন চৌধুরী আমার সম্মতি চাইলে আমি তাৎক্ষণিক ভাবে প্রস্তাবটিকে গ্রহণ করার জন্য সাধুবাদ জানাই। পরে মোশাররফ সাথে যোগাযোগ করলে বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি। তাঁর মৃত্যুর খবর দিয়ে ‘‘আলোকিত সন্দ্বীপ পত্রিকায়’’ বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত করেন প্রফেসর মোক্তাদের আজাদ খাঁন, তাকে ধন্যবাদ। সেখানে ড: হাসান মুহাম্মদ, মোক্তারের আজাদ খান ও আমার পূর্বে লেখাটি প্রকাশিত হয়। সোনালী সন্দ্বীপের অক্টোবর ১৭ সংখ্যায় তাঁর জন্য বিশেষ প্রতিবেদনে শোক জানানো হয়েছে। আমিরাকাস্থ আবদুল কাদির ফাউন্ডেশন কতৃর্ক এক সাথে সিদ্দিক চৌ:, ড: রাজিব হুমাইয়ূন, তাহমিনা হক এর উপর একটি শোক সভার স্থির চিত্রসহ প্রত্যেকের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি প্রকাশিত হয়েছে। সোনালী সন্দ্বীপের গেল সংখ্যায় পড়ে দেখলাম। এখানে সিদ্দিক চৌ: সম্পর্কে আমার লেখাটি খন্ডিত আকারে প্রকাশিত হয়েছে, প্রতিবেদকের ভাষ্যে। কারো নাম দেওয়া হয় নাই। আর কোন কিছু হয়েছে বলে আমার জানা নেই, তবে তার মৃত্যুর খবরটি স্থানীয় বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় এসেছে, জাতীয় পত্রিকায় দেখি নাই। সোনালী সন্দ্বীপের নিয়মিত লেখকের কলামে ১ নম্বরে সিদ্দিক চৌ: অতপর আমি অধ্যাপক আ.ম.ম আবদুর রহিম, কে এম আজিজউল্ল্যাহ সহ আরো কয়েকজনের নাম সম্পাদক সাহেব প্রদান করে থাকেন। এ সংখ্যায় দেখলাম তার নাম নেই, আর আমরা বাকিরা আছি। আমার জানা মতে এ পত্রিকায় তার বহুমূল্যবান লিখা প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হয়েছে। তার লিখা পাঠক মহলকে সন্দ্বীপের অনেক অজানা কথা জানতে সুযোগ করে দিয়েছিল। তার মৃত্যুতে আমরা তার অমিয় লেখনী হতে বঞ্চিত হলাম, কবির ভাষায়, ”তোমার আসন শূণ্য আজি”। তার মোবাইল নম্বর আর বাজে না, বাজলেও কেউ ধরে না। নম্বর মুছে ফেলতে কষ্ট হচ্ছে। এত প্রিয়জনের নাম কিভাবে মুছব। এভাবে আরো কত প্রিয়জন ইতোমধ্যে পৃথিবী হতে বিদায় নিয়েছেন। মোবাইলে তাদের নাম রয়ে গেছে। সিদ্দিক চৌ: নাম মোবাইলে নয় চিরদিন হৃদয়ে অংকিত থাকবে, আমার প্রিয় মানুষ হিসেবে। আমিরাকস্থ সন্দ্বীপ শিক্ষা সমিতি একটি মূল্যবান কাজে হাত দিয়েছে ইতোমধ্যে কিছু মূল্যবান পুস্তক সফলতার সহিত প্রকাশনার কাজ সম্পন্ন করে মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। তাদের হাতে বর্তমানে আরো কিছু কর্মসূচি আছে। সিদ্দিক চৌধুরীর জীবনের অন্যতম কর্ম শ্বাশঃত সন্দ্বীপ বইটি পুণঃমুদ্রণের প্রয়াস হাতে নিয়েছেন। সিদ্দিক চৌধুরীর বিশ্বস্ত ক্ষুদে বন্ধু সন্দ্বীপ প্রেমিক মোশাররফ হোসেন এ বিষয়ে মূল সমন্বয়কারী। আমি আরো জানতে পারি। মরহুম প্রফেসর ড. রাজিব হুমাইয়ূনের সন্দ্বীপের ‘‘ইতিহাস ও সাংস্কৃতি” বইটি ছাপানোর বিষয়সহ আরো অন্যান্য সন্দ্বীপের গুণিজন নিয়ে মানুষকে নিয়ে রচিত বই সমূহ তারা পুন: ছাপাতে বিশেষভাবে আগ্রহী। তাদের এ মহতি উদ্যোগের জন্য তারা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার দাবী রাখে।

জনাব মোশাররফ সাহেব আমাকে আরো জানালেন, সিদ্দিক চৌ: এর জীবদ্দশায় আপনি উনার উপর যা লিখেছেন তা আমি পড়েছি, ভাল লেগেছে। যেহেতু সিদ্দিক চৌধুরীর শ্বাশঃত সন্দ্বীপ পুণঃ প্রকাশিত হচ্ছে, সেখানে উনার পরিচিতি মূলক একটি জীবনাদর্শ লেখা রাখা প্রয়োজন। আপনার পূর্বেও লেখাটিকে কিছু সংযোজন করে নতুন করে লিখে দিতে পারেন। বিষয়টি আমি তার পরিবারের সদস্য সুযোগ্য মেয়ে অধ্যাপক সিফাত শারমিন চৌধুরীকে জানালে তাতে তিনিও সদয় সম্মতি প্রদান করেন।

সিদ্দিক চৌধুরী সম্পর্কে আমার জানার পরিসর কম। জ্ঞানের পরিসরও কম। আমার জানামতে তার পরিচয় ২০১০ সাল হতে, আমার বাবার ছাত্র হিসেবে আমি তাকে যেভাবে দেখেছি তারি সম্পর্কে আমার কাচা হাতের দুর্বল এ লেখাটি একটি কলমি চিত্র মাত্র। পাঠক মহলে লেখাটি গ্রহন যোগ্য হলে নিজকে ধন্য মনে করব। সিদ্দিক চৌধুরীকে কাগজে লিখলে একদিন সে লেখা মুছে যাবে। তিনি হৃদয়ে লিখে থাকার মানুষ। কবির ভাষায় ‘‘পাথরে লিখে রাখলে পাথর ক্ষয়ে যাবে, কাগজে লিখে রাখো, সে লেখা মুছে যাবে, হৃদয়ে লিখে রাখো সে লিখা রয়ে যাবে”। সত্যিকার অর্থে তিনি সে মাপের মানুষ। আমরা সন্দ্বীপের মানুষ তার সুগভীর সন্দ্বীপ প্রেমের স্বীকৃতি আমরা তাকে দিতে পারি নাই। তাকে সম্মিলিত ভাবে সন্দ্বীপবাসী সংবর্ধনা দিতে পারতাম। আমরা দিতে পারি না। মৃত্যুর পর আমরা কি তাঁর জন্য কিছু করেছি? হ্যাঁ কিছু করি নাই। আমরা বড়ই অকৃতজ্ঞ হয়ে রলাম। তাঁর অমর আত্মা তাঁর মরণকালে মনে হয় এ কথাটি বলে গেলেন, তোমরা এত তাড়াতাড়ি আমাকে ভুলে গেলে?

সিদ্দিক চৌধুরী চলে গেলেন না ফেরার দেশে, আর কোনদিন তাকে দেখব না, তার সন্দ্বীপ কে নিয়ে সন্দ্বীপের অতীত গৌরব নিয়ে ইতিহাস নিয়ে, ব্যক্তি সমাজ গ্রামকে নিয়ে আর কেউ লেখবে না এত দরদ দিয়ে। ২য় সিদ্দিক চৌধুরী আর জন্মাবে বলে আমার মনে হয় না, ২য় সিদ্দিক চৌ: বলে আর কেউ আর্বিভূত হবে না। তিনি ছিলেন এক, অনন্য ও অসাধারণ। সত্যিই তিনি আর ফিরে আসবেন না। সন্দ্বীপের ভাংগা গড়ার এ খেলাঘরে। মহৎ ব্যক্তিদের বেলায় এরকমই হয়। তাঁরা একবার আসেন, যেমন- নজরুল, রবীন্দ্রনাথ। নজরুল সম্পর্কে তাঁর লেখাসমূহ খুবই মূল্যবান। তিনি রবীন্দ্রভক্তও ছিলেন, আবার নজরুল গবেষক ছিলেন। তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের লড়াকু সৈনিক ছিলেন। ছিলেন বায়ান্নের ভাষা সৈনিক। একাত্তরের মুক্তি যুদ্ধে তাঁর স্বদেশ প্রেম প্রকাশিত হয়েছে, ‘‘মুক্তিযুদ্ধে সন্দ্বীপ’’ গ্রন্থে তিনি সন্দ্বীপের গৌরব, নোয়াখালীর গৌরব, বৃহত্তর চট্টগ্রামের গৌরবও বটে। আমরা জানি সন্দ্বীপের ঐতিহ্য ও ইতিহাস তার লেখার মধ্য দিয়ে সু-প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আজ মনে বারবার প্রশ্ন জাগে আমরা সন্দ্বীপের মানুষ তাঁর জন্য তাঁর মৃত্যুর পর কি করেছি? সন্দ্বীপের অনেক রাজনৈতিক দল রয়েছে, অনেক শিক্ষা সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে, সন্দ্বীপের নিজস্ব প্রসাশন রয়েছে, যেমন- এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, মেয়র, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রমূখ। তাঁর প্রিয়জন্ম ভূমিতে কোন শোকসভা হয়েছে? সবার বিবেকের কাছে আমার এ প্রশ্ন, অবান্তর হলে ক্ষমা করবেন।

এ দ্বীপের সন্তান যারা বাংলাদেশের গৌরব আর তাদের সাথে সর্বশেষ আমি মরহুম এ.বি.এম সিদ্দিক চৌধুরীর নাম সংযোজন করতে চাই। উপরোক্ত সবার কথা তিনি লিখেছেন, তাঁর মূল্যবান গ্রন্থ ‘‘সন্দ্বীপের কৃতি সন্তান আজ যারা বেঁচে নেই।” আজকের এ ক্ষনে এ মহান সন্তানটি আমাদের মাঝে নেই। মৃত্যুর অনন্ত পাড়ে তিনি চলে গেছেন একেবারে না ফেরার দেশে। পরিশেষে কবির ভাষায় বলতে হয়
‘‘তুমি যেদিন এসেছিলে ভবে,
কেঁদে ছিলে তুমি, হেসেছিলো সবে।
এমন জীবন করিবে গঠন
মরণে হাসিবে তুমি
কাঁদিবে ভূবণ”।
হ্যাঁ, সিদ্দিক চৌধুরীর মুত্যৃর খবর জেনে তাঁর অগনিত ভক্তরা কেঁদেছে। ভক্তদের পৃথিবীতে কান্নার ¯্রােত বইয়ে গেছে। সবার মুখে একটি কথা ছিল এ. বি. এম সিদ্দিক চৌধুরী আর নেই।
সিদ্দিক চৌধুরী লেখালেখি অনেক। আমি যতটুকু জানি সিদ্দিক চৌধুরী লেখা, সম্পাদিত, সংকলিত বই সমূহ নিম্মরূপঃ-
লিখা গ্রন্থ সমূহঃ-
* শ্বাশঃত সন্দ্বীপ-১৯৮৮
* মুক্তিযুদ্ধে সন্দ্বীপ-১৯৯৮
* সন্দ্বীপের বৈচিত্রময় লোক সাহিত্য-২০০৪
* সন্দ্বীপের কৃতিসন্তান যারা আজ নেই-২০০৮
* অতীতের একটুকরো-২০০৯
* এ.কে.এম রফিক উল্লাহ চৌধুরী-২০১২
* সন্দ্বীপে ইসলাম-২০১৪
সম্পাদিত গ্রন্থ সমূহঃ-
* ৭০ বর্ষে সন্দ্বীপ মডেল হাই স্কুল
* ৭৫ বর্ষে সন্দ্বীপ মডেল হাই স্কুল
* ৮০ বর্ষে সন্দ্বীপ মডেল হাই স্কুল
* ”মৌলভী আলি আকবর বি.এ.বি.টি জন্মশত বর্ষ স্মারক গ্রন্থ”
* মৌলভী আমিন উল্লাহ
সংকলন সম্পাদকঃ-
* একজন বাঙ্গালী মুসলমানবীর
* উড়ির চর
সম্পাদিত ম্যাগাজিনঃ-
* রূপসী সন্দ্বীপ ১৯৭৮-১৯৭৯-১৯৮০ ইং
পরিশেষে বলব, জনাব সিদ্দিক চৌঃ একজন সমাজ সচেতন মানুষ ছিলেন। তিনি দেখেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক সময়কাল। দেশের স্বার্থে ৪৭, ৫২, ৭১ এ তাঁর ভূমিকা ছিল গৌরব উজ্জ্বল। এসব তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে। জনাব এ বি এম সিদ্দিক চৌধুরী আমাদের গর্ব ও অহংকার। সন্দ্বীপ বাসীর পক্ষে তাঁর অমর লেখার জন্য তাঁকে মূল্যায়ন করা হউক, তাঁর লিখা বই সমূহ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হউক। তাঁর শ্রম, প্রচেষ্টা, কষ্ট ও ত্যাগ সার্থক হবে যদি এসব করা হয়। আমি বিশ্বাস করি কোন ব্যক্তিকে মরণোত্তর এর চেয়ে জীবিত অবস্থায় মূল্যায়ন করা উত্তম, তাতে ব্যক্তি নিজে তাঁর সৃজনশীল সৃষ্টির জন্য প্রচুর আনন্দ পাই, তাঁর সৃষ্টির জগত আরো সম্প্রসারিত হয়। সে অনাবিল আনন্দ পাই, সুখ পাই, সমাজে এ ধরনের সংস্কৃতি গড়ে উঠুক। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা তা করতে পারি নাই। আজ আমি সিদ্দিক চৌধুরীর কথা লিখলাম নতুন প্রজন্মের জন্য। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তারা জানুক সিদ্দিক চৌধুরীর জীবন পরিচিতি। তাঁর অসাধারণ কর্মকান্ড, ইতিহাস চর্চা ও সন্দ্বীপ প্রীতি সম্পর্কে। আমার অনুরোধ থাকবে সন্দ্বীপের নেতৃবৃন্দের কাছে, সচেতন মানুষের কাছে, নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জন্য আমরা যেন তাঁর জন্য কিছু একটা করি। মূল কথা নতুন প্রজন্মের কাছে ধরে রাখার জন্য আমার এসব প্রস্তাব র’ল। আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি, আমিরিকাস্থ শিক্ষা সমিতির সদস্যবৃন্দদেরকে। তাদের এ উদ্যোগটি খুবই সময় উপযোগী ও যথার্থ।
পরিশেষে মহান আল্লাহের কাছে তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। তাঁর পরিবারের সদস্যদেরএ দুঃখ বহন করার জন্য আল্লাহ শক্তি দিন। তিনি সন্দ্বীপ বাসীর মনে চির অমর হয়ে থাকবেন। শেষে বলব,
”তোমার কীর্তির চেয়ে তুমিই মহৎ,
তাই তব জীবনের রথ।
পশ্চাতে ফেলে ক্ষয় কীর্তিরে তোমার বারংবার।”
মরহুম সিদ্দিক চৌধুরী ছিলেন, সে সুন্দর সোনার মানুষ। আজ শুধু তুমি আর নেই। আসবেনা সন্দ্বীপের সাগর তীরে। লিখবে না তোমার মত কেউ আর এত দরদ দিয়ে দ্বীপের কথা। সন্দ্বীপকে নিয়ে আর কে রচনা করবে ইতিহাস। ধন্য দ্বীপরানী সন্দ্বীপ, সত্যিই ধন্য তুমি। সিদ্দিক চৌধুরী তোমার ধুলাবালি গায়ে মাখিয়ে বাল্য, কৈশোর, যৌবন তোমার কাছে অতিবাহিত করেছে। আর তুমি ধন্য হয়েছো, একজন এ.বি.এম সিদ্দিক চৌধুরী জন্ম দিয়ে। জন্ম তোমার স্বার্থক।


লেখক পরিচিতি
আ.ম.ম. আবদুর রহিম
শিক্ষাবিদ, কবি ও প্রাবন্ধিক।
সাবেক অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) ফতেয়াবাদ ডিগ্রি কলেজ।
বিভাগীয় প্রধান ঃ ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ।
অধ্যক্ষ, ফতেয়াবাদ কিন্ডারগার্টেন স্কুল।
মোবাইল ঃ ০১৮১৯-৬৪৮৩৯৮


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন