ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী – তরুণরাই উন্নত দেশের স্বপ্ন সার্থক করবে

1_177459

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের মেধাবী তরুণ প্রজন্মই আইসিটি সেক্টরকে এগিয়ে নেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে শামিল করার স্বপ্ন সার্থক করবে। সুন্দর আগামীর জন্য তরুণ প্রজন্মকে প্রস্তুত হওয়ার আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষায় দক্ষ করে গড়ে তুলছি। কাজেই সমগ্র বিশ্ব এখন তাদের হাতের মুঠোয় এবং আমি আশা করি এই তরুণরাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে জাতির জনকের উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে সার্থক করবে। বুধবার সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আইসিটি সেক্টরের মেগা ইভেন্ট চার দিনব্যাপী ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৭’র উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। পরে প্রধানমন্ত্রী মেলায় আসা রোবট সোফিয়ার সঙ্গে কথোপকথনে অংশগ্রহণ করেন।

আইসিটি খাত ২০২১ সাল নাগাদ দেশের উন্নয়নের সব থেকে বড় অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং আমরা আমাদের জিডিপিকে ৭ দশমিক ২৮ ভাগে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। রফতানিও আমাদের বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু আমি মনে করি, আইসিটি সেক্টরকে যদি আমরা আরও সুযোগ দিই তাহলে এখান থেকেই আমাদের রফতানি আরও ব্যাপক হারে আসবে। আমাদের আর অন্য কোনদিকে তাকাতে হবে না এবং আমাদের ছেলেমেয়েরা এ ব্যাপারে যথেষ্ট মেধাবী।

এ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য এ বছর থেকে রফতানিতে ৫ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, চলতি অর্থবছরে সফটওয়্যার রফতানি থেকে আয় ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। আশা করা হচ্ছে, ২০২১ সালের মধ্যে এ আয় ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে এবং জিডিপিতে সফটওয়্যার ও আইসিটি সেবা খাতের অবদান ৫ শতাংশে উন্নীত হবে।

আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ইমরান আহমেদ এবং বাংলাদেশ সফটওয়্যার ইনফর্মেশন সার্ভিসেস (বেসিস) সভাপতি ও বিজয় সফটওয়্যারের প্রবক্তা মোস্তাফা জব্বার। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সচিব সুবীর কিশোর চৌধুরী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন।

মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সরকারের পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, মেলায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং কম্পিউটার খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অগ্রগতি নিয়ে একটি ভিজুয়াল প্রেজেন্টেশনও পরিবেশিত হয়। কয়েকটি আইটি সংগঠনের সহযোগিতায় আইসিটি বিভাগ ও বেসিস ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৭’ এর আয়োজন করেছে। ‘রেডি ফর টুমরো’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আয়োজিত এবারের ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে দেশি-বিদেশি প্রায় ৪শ’ আইসিটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করছে।

প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক ছেলেমেয়ে আমাদের শ্রমবাজারে আসছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের জন্য চাকরির সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি নিজেরাও যেন তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা হতে পারে সে ব্যাপারেও আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, দেশজুড়ে গড়ে তোলা হচ্ছে ২৮টি হাইটেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক। এর মধ্যে ঢাকার কারওয়ান বাজার ও যশোরে সফটওয়্যার পার্কের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এছাড়া ১২টি বেসরকারি সফটওয়্যার পার্কও গড়ে উঠেছে। এসব পার্কে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করার জন্য ১০ বছরের আয়কর মওকুফ ও শতভাগ রিপেট্রিয়েশনসহ বিবিধ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পোস্ট অফিস ডিজিটাল করে দেয়া হয়েছে। ইউনিয়নে ইউনিয়নে রয়েছে ডিজিটাল সেন্টার। গ্রামে নিজের ঘরে বসে ছেলেমেয়রা এখন বিদেশ থেকে টাকা উপার্জন করতে পারছে।

তিনি বলেন, এটাকে আরও উন্নত করে দেয়া হবে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফ্রি ল্যান্সিং সাইট আপওয়ার্ক, ইল্যান্স এবং ফ্রি ল্যান্সারের প্রথম দশটির মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে আমাদের ফ্রি ল্যান্সাররা। বিশ্বে ফ্রি ল্যান্সারের সংখ্যার দিক থেকে আমরা রয়েছি দ্বিতীয় স্থানে। আমরা প্রথম স্থানে উঠব ইনশাআল্লাহ। আমরা আশা করছি, ২০২১ সাল নাগাদ আমাদের ২০ লাখ তরুণ-তরুণী তথ্যপ্রযুক্তির পেশার সঙ্গে যুক্ত হবে।

’৭৫-এর পর স্বৈরশাসন এবং পরবর্তীকালে জামায়াত-বিএনপির দুঃশাসনে দেশের পিছিয়ে পড়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের ৪৬ বছরের মধ্যে ৩০টি বছর আমাদের জীবন থেকে হেলায় হারিয়ে গেছে। দুর্ভাগ্য এই ৩০টি বছর যদি হারিয়ে না যেত এই ৩০টি বছর যদি আমরা দেশের জন্য কাজ করার সুযোগ পেতাম বাংলাদেশ অনেক আগেই বিশ্বে উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারত। সময় অনেক চলে গেছে আর সময় আমরা নষ্ট করতে চাই না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর কালক্ষেপণ যেন না হয় সেজন্য আমরা লক্ষ্য স্থির করেছি।

ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের প্রতিপাদ্য ‘রেডি ফর টুমরো’র সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নট টুডে ফর টুমরো, আমরা বাংলাদেশকে তৈরি করতে চাই। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কিভাবে তৈরি হবে সেটাই আমরা দেখতে চাই, সেভাবেই আমরা করতে চাই।’

তিনি বলেন, হয়তো আমরা দেখেও যেতে পারব না কিন্তু আমার দৃঢ়বিশ্বাস- একবার যখন উন্নয়নের চাকা গতিশীল হয়েছে এটা ভবিষ্যতে আর কেউ থামিয়ে রাখতে পারবে না। এটা আমার বিশ্বাস। সেটাই আমরা আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়ে যেতে চাই। সব সময় আমাদের তৈরি থাকতে হবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা নতুন প্রজন্মের কাছে আহবান জানান, ‘রেডি ফর টুমরো’। পরে মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রোবট সোফিয়ার কথোপকথন : মেলায় এসে চমক দেখায় বিশ্বের প্রথম নাগরিকত্ব পাওয়া রোবট সোফিয়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সে জানাল, বাংলাদেশ সম্পর্কে সে কতটা জানে। প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের উদ্বোধন ঘোষণার পরপরই হলুদ-সাদা জামদানির টপ আর স্কার্ট পরে মঞ্চে আসে রোবট সোফিয়া। ইংরেজিতে সোফিয়ার সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

শুরুতেই সম্ভাষণ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘হ্যলো সোফিয়া, কেমন আছো।’ উত্তরে সোফিয়া বলল, ‘ধন্যবাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আমি ভালো আছি। আমি গর্বিত। আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়া দারুণ ব্যাপার।’

বাঙালি মেয়ের সাজে এই রোবট মেয়ে তাকে চিনল কী করে- সে কথা জানতে চাইলেন প্রধানমন্ত্রী। সোফিয়া বলল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বাংলাদেশের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা, তা সে জানে। শেখ হাসিনাকে যে বিশ্বে এখন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ বলা হচ্ছে, তার উদ্যোগেই যে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে তাও তার জানা।

সোফিয়া আরও বলল, প্রধানমন্ত্রীর নাতনির নাম যে তার মতোই সোফিয়া- তাও তার অজানা নয়। এরপর সোফিয়াকে প্রধানমন্ত্রী বললেন, তুমি তো আমার এবং আমার ভিশন সম্পর্কে অনেক কিছু জানো। ডিজিটাল বাংলাদেশ সম্পর্কে তুমি কী জানো?

জবাবে ডিজিটাল বাংলাদেশ উদ্যোগ নিয়ে নিজের যান্ত্রিক মস্তিষ্কে সঞ্চিত তথ্য তুলে ধরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই রোবট। ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার সোফিয়াকে তৈরি করেছে হংকংয়ের হ্যানসন রোবোটিকস। মানবীর আদলে তৈরি এই রোবট প্রশ্ন শুনে ইংরেজিতে তার উত্তর দিতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সে কণ্ঠ ও চেহারা শনাক্ত করতে পারে; বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে ক্রমাগত বাড়িয়ে নিতে পারে নিজের জ্ঞান।

Mahabubur Rahman Mahabubur Rahman

Leave a Reply

Top
%d bloggers like this:
Web Design BangladeshBangladesh Online Market