আজ বৃহঃপতিবার, ১৬ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০১ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান নামক নাটক আমাদের হয়তো আদি অনন্তকাল দেখতে হতে পারে !

Published on 30 November 2017 | 5: 08 am

:: আকতারুজ্জামান মোহাম্মদ মোহসীন ::

রোহিঙ্গাদের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমার অনুমান পূর্বেই লেখা হয়েছে ।
গত ২৪ নভেম্বর ২০১৭ তারিখ মায়ানমার এবং বাংলাদেশের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন নীতিমালা/ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে । তবে তা দ্বিপক্ষীয় বলেও উল্লেখ করা হয় ।
আমাদের বিজ্ঞ পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ ব্যপারে বিস্তারিত ব্যখ্যা প্রদান করেছেন ।
এ চুক্তি বাস্তবায়িত হবে ৯২ সালের শর্ত সাপেক্ষে । ৯২ সালের শর্তও তাঁরা তেমন আমলে নেয়নি ।
২৫ বছর পর তার কতটুকু বাস্তবায়ন করবে তা বুঝা মুশকিল ।
বলতে গেলে বলতে হয়, “চুন খেয়ে গাল পুড়লে, দই খেতেও ভয় হয়”। এ চুক্তিতে মায়ানমারের ইচ্ছার প্রাধান্য দেয়া হয়েছে । তাঁরা এটার সাথে কোন বিদেশীকে, এমন কি জাতীসঙ্ঘকেও সাথে রাখতে রাজী হয়নি । তৃতীয় কেউ থাকলে হয়তো তাঁরা মায়ানমারের টালবাহানা বুঝে ফেলতে পারে । সুতারাং বাংলাদেশের জন্য এখন “শ্যাম রাখি – না কুল রাখি” অবস্থা ।
বাংলাদেশকে এমন শর্তেও রাজী হতে হচ্ছে ।
কারন খেলায় যদি ঝগড়া করার ইচ্ছা থাকে তবে যে কোন উসিলায় তা করা যায় । বাংলাদেশ যদি মায়ানমারের কথায় রাজী না হতো, তবে মায়ানমার বলতো আমরা চেয়েছিলাম কিন্তু বাংলাদেশ আমাদের কথায় রাজী হয়নি ।
তখন আপনিও বলতেন বাংলাদেশ এমন ভুল করেছে কেন ?
যদিও বিষয়টি শতভাগ লোক দেখানো, সময় ক্ষেপণ করানো, আন্তর্জাতিক চাপ এড়ানোর কৌশল ছাড়া আর কিছু নয় । মায়ানমার কোন রোহিঙ্গাকে আগেও নেয়নি, এখনও নিচ্ছে না, এমন কি ভবিষ্যতেও নেবে না বলে ধরে নেয়া যায় ।
অপর দিকে যেদিন তাঁরা এমন একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে সেদিনও স্রোতের মত রোহিঙ্গা নিজের দেশ ছেড়ে আসছে বাংলাদেশে । তাহলে বাংলাদেশের মত একটি শান্তি প্রিয় দেশের কি করনীয় থাকতে পারে ? কি করতে পারে বাংলাদেশ ? মানবিকতার কারণে বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশের মানুষ প্রশংসনীয় ভুকিকা রেখেছে, যার জন্য মানবিক বাংলাদেশ হিসাবে ভুয়শী প্রশংসা কুরিয়েছে । করনীয় হয়েছে মায়ানমার যে শর্ত দিয়েছে তাতেই রাজী হওয়া এবং তাই বিচক্ষন পররাষ্ট্র মন্ত্রী এবং রাষ্ট্রদূত সঠিক কাজটি করেছেন বলেই মনে করছি ।
আপনাদের মনে আছে, আমরা রোহিঙ্গাদের সাহায্য করতে মসজিদে চাঁদা তুলেছি, হাটবাজারে হাত পেতেছি, রাস্তাঘাটে ভিক্ষা করেছি, ষ্টেশনে খুজেছি, সদরঘাটে চেয়েছি, মার্কেটে চাঁদা ধরেছি, দোকানে টাকা তুলেছি, বাসার দরজায় দরজায় গিয়েছি, মহল্লায় মাইকিং করে চাঁদা তুলে সাহায্য করে মানবতা রক্ষা করেছি । তাহলে তাদের নিয়ে আমাদের আবেগ কেমন ছিল তা বিশ্ববাসীর বুঝতে অসুবিধা নেই ।
কিন্তু এখন যে বিষ ফোড়ায় পরিণত হয়ে যাবে তা কি আমাদের লোকজন কেউ ভেবেছে ?
অনেক বিচক্ষন ব্যক্তিবর্গ বেশ গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করে থাকেন । যেমন-
১। রোহিঙ্গাদের এখন নিজ দেশে পাঠানো উচিত হবে না ।
২। রোহিঙ্গাদের একন ঠেলে দেশে পাঠানো আর দোজখে ঠেলে দেয়া একই কথা ।
৩। তাদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করে পাঠানো উচিত । ইত্যাদি ।
মুলতঃ ধর্মীয় আর মানবিক অনুভুতি থেকে এমন মন্তব্য করা যেত যদি মায়ানমার তড়িঘড়ি করে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য ব্যস্ত হতো তখন । যেমন আপনার কোন মেহমান যদি ফিরে যেতে চায় তখন আপনার ভাবনার বিষয় হবে, সন্ধ্যার পূর্বে বাড়ি গিয়ে পৌছুতে পারবে কিনা, রাতের খাবার তৈরি করতে সমস্যা হতে পারে বলে কিছু খাবার দিয়ে দেয়া, রাস্তা দুরের হলে সাথে পথে খাওয়ার জন্য কিছু শুকনা খাবার দিয়ে দেয়া, ইত্যাদি । কিন্তু কোন মেহমান যদি বেড়াতে এসে যেতেই না চায়, তবে এমন ভাবনা হওয়ার কোন কারনই নেই । সেক্ষেত্রে চুপ করে থেকে মেহমানের বিদায় হওয়ার অপেক্ষা করা উচিত ।
এখন যদি বেশী সহানুভূতি দেখাতে যান, তবে হয়ত মেহমান নিজেও থেকে যাওয়ার বেশী উৎসাহ পাবেন । তাদের ফিরে যাওয়ার পরিস্থিতির দিকে তাকায়ে দেখি । রাখাইন এখন মায়ানমারের প্রয়োজন কেবল রোহিঙ্গাদের নিজের ভুমিতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য । কিন্তু জায়গাটা কৌশলগত দিকে সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং লোভনীয় । এরই মাঝে চীনের প্রয়োজন তাদের বিশাল বিনিয়োগ এলাকা হিসাবে । রাখাইনকে নিয়ে চীনের সুদুর প্রসারি, দীর্ঘ মেয়াদী, গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা রয়েছে । যেমন উল্লেখ যোগ্য বিষয়গুলোঃ
(১) রাখাইন একটি তৈল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ এলাকা । তারা এখান থেকে তৈল, গ্যাস উত্তোলন করে পাইপ লাইনের মাধ্যমে সরাসরি চীনে নেয়ার কাজ প্রায় চূড়ান্ত । যেখান বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করা হয়েছে । সুতারাং জায়গাটা যত বেশী শুন্য হবে তত বেশী কাজ ও নিয়ন্ত্রণ সুবিধা পাবে ।
(২) চীনের আমদানিকৃত তৈল রাখাইনে শোধন করে পাইপ লাইনের মাধ্যমে সরাসরি চীনে নেয়ার কাজও গ্যাস লাইনের মত প্রায় চূড়ান্ত । এখানেও বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করা হয়েছে । একই কারণে জায়গাটা যত বেশী শুন্য হবে তত বেশী কাজ ও নিয়ন্ত্রণ সুবিধা পাবে ।
(৩) চীন নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য এশিয়ার কৌশলগত দেশ হিসাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ মায়ানমারকে তাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন । সুতারাং যে কোন মুল্যে হোক, তাদের বন্ধু হিসাবে হোক, প্রয়োজন হলে জোর করে দখলদারী ফর্মুলায় হোক মায়ানমারকে তাদের খুব প্রয়োজন ।
(৪) চীন নিকটতম প্রতিবেশী দেশ হিসাবে নিজেদের প্রয়োজনে মায়ানমার চীনের জন্য অত্যন্ত মুল্যবান । কেউ এমন কৌশলগত দেশকে লোলুফ দৃষ্টিতে না দেখে পারে না । এখন জোর করে দেশ দখল করার নিয়ম নেই, বলে অনেকে অনেক দেশ দখল করতে পারছে না । কিন্তু আপোষে যদি কেউ এভাবে বস্তে দেয় তবে ছাড়বে বলে মনে হয় না । তার জন্য যা যা করার দরকার তা করেছে, করছে এবং করবে ।
(৫) মায়ানমারের রাজনীতিক, সামরিক কর্মকর্তা, ধর্মীয় নেতারা যে অপরাধ করেছে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ । সুতারাং চীন তাদের সমর্থন ছাড়লে মায়ানমারকে নিশ্চিত বিচার এবং শাস্তির মুখোমুখী হতে হবে । সুতারাং মোড়ল হিসাবে তাদের একমাত্র চীনই বাচাতে পারে । সুতারাং মায়ানমারের এখন দুর্বল সময়, এখনই তাদের অনুগত করে রাখা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই । তাহলে মায়ানমার চীনের কথা না শুনে ইউরোপিও ইউনিয়নের কথা শোনবে ?
এতগুলো বিষয় যেখানে জড়িয়ে আছে, সেখানে রাখাইন খালি করে দেবে, সেখানে রোহিঙ্গারা নিজ ভূখণ্ডে ফিরে যাবে তা অনেকটা আকাশ কুসুম কল্পনার মত ব্যাপার । অপর দিকে মায়ানমারের অতীত ইতিহাসও তেমন সুন্দর নয় । ব্রিটিশ থেকে আলাদা হওয়া থেকে তাদের চরিত্রগত কারণে অনেকেই পছন্দ করে না ।
এবার তাদের রোহিঙ্গা নিধনে নতুন করে তাদের চরিত্র পরিচয় পাওয়া গেল তাদের সভ্যতা এখনও আন্তর্জাতিক মানের নয় । শান্তির জন্য যিনি নোবেল পেয়েছিলেন অবশেষে দেখতে পেলাম সেটাও তার অভিনয় ছিল । কত দেশ তার কাণ্ডকারখানায় তাদের পুরস্কারও বাতিল করেছেন । সুতারাং আমাদের এখনও সরল অঙ্কে বিবেচনা করার সুযোগ নেই ।
তাছাড়া ইতোপূর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মায়ানমারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেও তেমন ফল হয়নি সেটা সারা বিশ্ব দেখতে পেয়েছে । বরং এ ফাকে রাশিয়া যেমন অস্ত্র বিক্রিতে সুবিধা নিয়েছে তেমনি চীন তাদের বন্ধু হয়ে সব সময় পাশে থেকে নিজেদের গুরুত্ব তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে । আজও তাঁরা বিশ্বস্ততায় পরীক্ষিত বন্ধুতে পরিণত হয়ে আছে ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার সুযোগ কম বেশী সবাই নিতে চেষ্টা করেছে । যা মায়ানমারকে এমন নিষেধাজ্ঞায় আরও সাহস জুগিয়েছে । তাই এখন তাঁরা ওসব তেমন তোয়াক্কা করে না । ইতোপূর্বেও কোন নিষেধাজ্ঞা মায়ানমারের উন্নয়নের অন্তরায় হয়নি । সুতারাং বিষয়গুলোর প্রতি নজর দেয়ার সময় এসেছে । চীন ক্ষমতা দিয়ে রোহিঙ্গা বিষয়ে মায়ানমারকে সামাল দিচ্ছে । আজ অবধি মায়ানমারের বিপক্ষে যত প্রস্তাব উঠেছে সবই আতুর ঘরেই মরেছে । মায়ানমারের যত সমস্যা হচ্ছে চীন তাদের সহায়তা করবে বলে জানাচ্ছে । ভবিষ্যতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারও আলোর মুখ দেখতে দেবে না । এমন পরিস্থিতিতে মায়ানমার এসব বিপদ থেকে বাঁচতে চীনের মণ রক্ষা করতে প্রয়োজনে আরও অপরাধ করবে। কে চাই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধে আন্তর্জাতিক যুদ্ধঅপরাধে নিজের বিচার হোক ?
যেখানে মায়ানমারের ক্ষতি হচ্ছে আন্তর্জাতিক বিশ্বে, সেখানে চীন পুষিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে (যদিও তা মায়ানমারকে দেখানো মাত্র) । তাছাড়া তাদের সাথে আছে বিশ্বের অনেক দেশ । কারন বিষয়টি কূটনৈতিক। আমরা অনেকে সেটা না ভেবে মোটা আন্দাজে মন্তব্য করে থাকি । কম বেশী স্পষ্ট দেশগুলো হচ্ছে রাশিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, ইত্যাদি আরও অনেক দেশ । এমন পরিস্থিতিতে চীনের বিনিয়গে কেবল লাভ আর লাভ । এমতাবস্থায় তাহলে মায়ানমার কি এখন চীনের সাথে পাল্লা দিয়ে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করার জন্য রাখাইনে রোহিঙ্গা ফেরত নিতে পারবে ? চীন কি এমন একটা মুক্তাঞ্চলকে বসতি গড়তে সম্মতি দেবে ?
সেই ক্ষমতা কি মায়ানমারের আছে যেখানে তাঁরা নিজেদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে পারবে ? মায়ানমারের জনগণ কি পারবে সামরিক জান্তাদের মানবিক আচরণে বাধ্য করতে ? এটা অসম্ভব বিষয় ।
পক্ষান্তরে মায়ানমার ধীরে ধীরে চীনের কলোনি হয়ে পরে কিনা সে ভয়ও কম নয় । সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান নামক নাটক আমাদের হয়তো আদি অনন্তকাল দেখতে হতে পারে ।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন